আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ পঞ্চদশ সংখ্যা ● ১-১৫ আগস্ট, ২০২৬ ● ১৬-৩২ শ্রাবণ, ১৪৩৩
সম্পাদকীয়
গুণ্ডা নয়, বিরোধী দমন
ক্ষমতায় আসার আগে রাজ্যে গেরুয়া শাসক দলের আপ্তবাক্য হয়ে উঠেছিল 'ভয়-আউট, ভরসা-ইন'। অথচ ক্ষমতায় আসার অব্যবহিত পরেই তার উলটো পুরাণ দেখে চলেছে রাজ্যের মানুষ। রাজ্যে ঘাসফুল সরকারের মেয়াদ জুড়ে ছিল বিরোধীশূন্য রাজনীতির পাশা খেলা। অথচ সেই আক্রান্ত বিরোধী পরিসরে রাজনীতি করেই গেরুয়া শাসক দল ক্ষমতায় এসে এখন ছলে-বলে-কৌশলে বিরোধী স্বর রুখতে আদা জল খেয়ে নেমেছে। ঘাসফুল সরকারের দমন পীড়নের অন্যতম অস্ত্র ছিল পুলিশ প্রশাসনকে ব্যবহার করে ত্রাসের ঘরে বিরোধী স্বর দমন করা। গত পনেরো বছরে ঘাসফুলের স্বৈরাচারী শাসনে বিরক্ত, বীতশ্রদ্ধ মানুষ চেয়েছিল এবারের ভোটে রাজ্যে সুস্থ স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পুনরুদ্ধার ঘটানো । কিন্তু রাজ্যে পালা বদলের পরেও 'যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ' এই চিত্রনাট্যের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
সম্প্রতি ক্ষমতায় আসার পরেই ভোটের আগের ভরসার প্রতিশ্রুতি ভেঙে উচ্ছেদ অভিযানের নামে নির্মমভাবে গরিব মানুষের উপর দমন পীড়ন নামিয়ে এনেছে সরকার। সেই দমন পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ার কথা ছিল ঘাসফুলের বিরোধী দলের; অথচ তারা আজ বহুধা বিভক্ত হয়ে শাসক পোষিত বিরোধী দলে পরিণত। দুর্নীতির পাঁকে নিমজ্জিত ঐ বাঘ মার্কা বিরোধীদেরকে রাজ্যের শাসক পোষ মানা খাঁচাবন্দি বিড়ালে পরিণত করেছে। এমন প্রেক্ষিতে বিধানসভার ভিতরে কিংবা বাইরে শাসক বিরোধী স্বর যখন হারিয়ে যাচ্ছে তখন পরিষদীয় রাজনীতির মাপকাঠিতে টিম টিম করে জ্বলতে থাকা বামেরাই রাজ্যে প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়েছে নতুন করে।
আর এমন প্রেক্ষিতেই রাজ্যের নতুন সরকার 'গুন্ডা দমন আইন' পাস করিয়েছে রাজ্যের বিধানসভায়। ভাবখানা এমন যেন আইনের অভাবেই এ রাজ্যে গুন্ডা সংস্কৃতির আজ বড় বাড়বাড়ন্ত। ফলে শিরোনামে ওই আইনে গুন্ডা দমনের কথা বলা হলেও এই আইনটি আসলে রাজ্যে শাসক বিরোধী স্বর দমনের লক্ষ্যেই যে তৈরি হয়েছে এমন অনুমান সত্যে পরিণত করেছেন মাননীয় প্রশাসনিক প্রধান স্বয়ং। ইতিমধ্যে এক কিশোরী ধর্ষণ খুনের প্রতিবাদে আন্দোলনরত বামপন্থী নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশ প্রশাসনের জুলুম দিয়ে শুরু হয়েছে রাজ্যে বিরোধী স্বর দমনের কর্মসূচি। পাশাপাশি 'নিট' আন্দোলনে দেশের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে কলকাতায় আন্দোলনরত হাজার হাজার পড়ুয়াদের উপরেও গুন্ডা দমন আইনের প্রয়োগের হুমকি প্রকাশ্যেই এসেছে সরকারের থেকে। কেবল আন্দোলনরত নেতাকর্মীরাই নয় বরং তাঁদের তিন পুরুষ এমন আইনি দাওয়াই মনে রাখবে এমন হুমকি প্রকাশ্যে এসেছে। সন্দেহ নেই যে বড় মাপের স্বতঃস্ফূর্ত বহু গনআন্দোলনের মধ্যে কখনও কখনও বেশ কিছু বিচ্ছিন্ন অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটে যায়। সেক্ষেত্রে আন্দোলনের নামে এমন অবাঞ্ছিত কর্মকাণ্ডের নিরপেক্ষ প্রশাসনিক তদন্ত মারফৎ দোষীদের চিহ্নিত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়াই চালু প্রশাসনিক পদ্ধতি। কিন্তু তাই বলে শাসকের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে নতুন প্রজন্ম থেকে অন্তিম প্রজন্মের মানুষেরা মুখে 'লিউকোপ্লাস্ট' লাগিয়ে ঘরে বসে থাকবে শাসকের এমন ইচ্ছায় সায় দেওয়া গণতন্ত্রের পক্ষে ভয়াবহ। অথচ রাজ্যের সরকার চাইছে তেমনটাই । রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী একদা ক্ষমতায় আসার অব্যবহিত পরেই তৎকালীন বিরোধী বামপন্থীদের মুখে 'সেলোটেপ' লাগানোর যে নিদান দিয়েছিলেন তারই এক ভিন্নরূপ প্রকাশিত হয়েছে বর্তমানের নতুন গুন্ডা দমন আইনে।
শোনা যাচ্ছে 'গুন্ডা দমন আইন' এমন ভাবে প্রয়োগ করা হবে যে প্রশাসন যাকে মনে করবে সমাজের পক্ষে বিপজ্জনক তাকেই গ্রেফতার করতে পারবে এবং তারপর তাকে বিনা বিচারে এক বছর পর্যন্ত আটক করে রাখতে পারবে। এই ধরনের প্রশাসনিক ক্ষমতা সমাজের পক্ষে বিপজ্জনক। এর দ্বারা বিচারব্যবস্থাকে অস্বীকার করা হয়। এটা কখনোই যুক্তিযুক্ত নয়। এই ধরনের ব্যবস্থা সার্বিকভাবেই সংবিধানবিরোধী। ফলে কেবলমাত্র শাসকের অনুমানের ভিত্তিতে বিপজ্জনক ব্যক্তিকে যদি বিনা বিচারে জেলে রাখা যায় এর চেয়ে বড় প্রহসন সমকালীন গনতন্ত্রে কী হতে পারে? মোদ্দা কথায় বিচার বিভাগকে এড়িয়ে রাজ্যে শাসকের আইন প্রতিষ্ঠার হাতে গরম দৃষ্টান্ত এই দানবীয় আইন। ব্রিটিশ আমলের ১৯১৯ সালের কুখ্যাত রাওলাট আইনে বলা ছিল যে প্রশাসন বিপজ্জনক ব্যক্তিকে দু'বছর আটক করে রাখতে পারবে বিনা বিচারে। আজ সেটা নতুন আইনে একবছরে নামিয়ে আনা হয়েছে। তফাত এইটুকু বাকিটা ব্রিটিশদের মতোই। সন্দেহ নেই যে কোনও আইনে বিচারবিভাগকে উপেক্ষা করার প্রবণতার মাঝে লুকিয়ে রয়েছে মানবাধিকার লঙ্ঘনের রোগ। ফলে যে দানবীয় আইন মানুষের মানবাধিকার হরণের লক্ষ্যে তৈরি হয়েছে সেই আইন বাতিলের দাবীতে এখন থেকেই সোচ্চার না হলে রাজ্যের গণতন্ত্রের ভবিষ্যতে যে ঘোর অমবস্যা ঘনিয়ে আসছে সেটা স্পষ্ট হচ্ছে প্রতিদিন, শাসকের ভাবভঙ্গি থেকে চাল চলন সবেতেই।