আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ পঞ্চদশ সংখ্যা ● ১-১৫ আগস্ট, ২০২৬ ● ১৬-৩২ শ্রাবণ, ১৪৩৩

সম্পাদকীয়

'নিদ্রিত ভারত জাগে'


ভারতের আত্মা কি রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ তথা বিজেপির সাম্প্রদায়িক ও গণতন্ত্র বিরোধী আদর্শের জাঁতাকলে আবদ্ধ হয়ে গেছে? গান্ধী-নেহরু-রবীন্দ্রনাথের দেশে কি শেষ অবধি হিন্দু-মুসলমান রাজনীতির বাড়বাড়ন্ত এবং তীব্র গণতন্ত্র বিরোধী শ্বাসরোধকারী শাসনযন্ত্রের চাপে মানুষ কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে? রাষ্ট্র ও পুঁজির ভৃত্য মিডিয়া যে বিকৃত আখ্যান মানুষের সামনে ২৪ ঘন্টা উপস্থাপিত করে চলেছে, তা কি মানুষের মগজধোলাই করতে সম্পূর্ণভাবে সক্ষম হয়েছে? এই প্রশ্নগুলি বিগত ১২ বছর ধরে বারংবার ফিরে ফিরে এসেছে ভারতের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের মনে। একের পর এক রাজ্যে বিজেপির তীব্র সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের ভিত্তিতে নির্বাচনে জয়লাভ, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পশ্চাদগমন, ছাত্র-যুবদের একটি বিশাল অংশের সাম্প্রদায়িকীকরণ এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির বিরুদ্ধে ইডি-সিবিআই লাগিয়ে তাদের দুর্বল করা তথা বিরোধীদের রাজনৈতিক ব্যর্থতা মানুষের মনে এই ধারণা তৈরি করেছিল যে বিজেপি অপরাজেয় এবং ভারতের সুমহান ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য এক বিশাল বড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে।

এই তীব্র হতাশাপূর্ণ দমবন্ধ করা আবহের মধ্যে এক দমকা হিমেল হাওয়া বইয়ে দিল ছাত্র-যুবসমাজ বা জেন-জি দিল্লির যন্তর-মন্তর এবং অন্যান্য শহরে এক তীব্র অপ্রতিরোধ্য আন্দোলন গড়ে তুলে। মাত্র দুই মাস আগেও কেউ ভাবতে পারেনি যে এমন একটি আন্দোলনের জন্ম হতে চলেছে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি আচমকা একটি মামলার শুনানি চলার সময় ভারতের যুব প্রজন্মকে আরশোলার সঙ্গে তুলনা করেন। যদিও পরে তিনি এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে সমগ্র যুবসমাজ নিয়ে তিনি এই মন্তব্য করেননি। কিন্তু ততদিনে যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। ইন্টারনেটে তথা ইন্স্টাগ্রামে 'ককরোচ জনতা পার্টি' নামক একটি ব্যঙ্গাত্মক পেজের জন্ম হয়, যা রাতারাতি কোটি কোটি যুব ফলো করতে শুরু করে। ততদিনে নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস হয়েছে, যা নিয়ে ছাত্রদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষের জন্ম হয়েছে। ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্ব বুঝতে পারেন যে দেশের যুবদের মধ্যে তীব্র সরকার বিরোধী মত রয়েছে। সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরে সোজা দিল্লির যন্তর-মন্তরে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফার দাবিতে অবস্থান শুরু করেন। এই অবস্থানে যোগ দেন সোনাম ওয়াংচুক, যিনি অনশন শুরু করেন আরও কিছু ছাত্রের সঙ্গে।

সরকার তথা বিরোধীরাও প্রাথমিকভাবে মনে করেছিল যে এই আন্দোলনের কোনও ভবিষ্যৎ নেই। জমায়েতও তেমন হচ্ছিল না। কিন্তু যত ওয়াংচুকের অনশনের দিন বাড়তে থাকে, তত এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন বাড়তে থাকে। ওয়াংচুককে বলপূর্বক অনশন মঞ্চ থেকে দিল্লি পুলিশ সরিয়ে নেওয়ার পরে এই আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয়। ২০ জুলাই ব্যাপক সংখ্যায় ছাত্র-যুব সংসদ ভবন অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। পুলিশের নির্মম লাঠিচার্জ, মহিলাদের চড় মারার ঘটনা, কাঁদানে গ্যাস এবং ছররা বন্দুক ব্যবহার দেশের জনগণ তথা যুবদের কাছে এই বার্তা দেয় যে সরকার নির্দয় ও যুব-বিরোধী। একটি সাধারণ দাবি যে পরীক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে এবং প্রশ্নফাঁস যেই মন্ত্রীর আমলে হয়েছে তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে, এক বিরাট আন্দোলনের চেহারা নেয়। সরকার ভেবেছিল যে লাঠি চালিয়ে রাজপথে ছাত্রদের পিটিয়ে তাদের ভয় পাইয়ে আন্দোলন স্তিমিত করে দেবে। কিন্তু যুবসমাজ লাঠি চালানোর পরে নতুন উদ্যমে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দিল্লির যন্তর-মন্তরে হাজারো যুব রাত জেগে আন্দোলনে সামিল হয়। তাদের অনুপ্রেরণায় মুম্বাই - চেন্নাই - কলকাতা - পাটনা - আহমেদাবাদ - নাগপুর সহ বহু বড়ো ও ছোট শহরে ব্যাপক সংখ্যায় যুব ও সাধারণ মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসে। সরকার বুঝতে পারে যে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করলে এই আন্দোলন আরও বড়ো আকার ধারণ করতে পারে। অতএব ২৫ জুলাই মন্ত্রী পদত্যাগ করেন। আন্দোলনকারীরা আন্দোলন তুলে নেয় এই শর্তে যে আন্দ‌োলনে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে কোনও মামলা হবে না।

দুটি প্রশ্ন এই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ওঠে। প্রথমত, এই আন্দোলন সাফল্যের মুখ দেখল কী করে? এর প্রধান কারণ যুবসমাজের ব্যাপক অংশের অংশগ্রহণ। বিশেষ করে হিন্দি বলয়ের ছেলেমেয়েরা নিজেরা দিল্লিতে এসে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে। হিন্দি বলয়ের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক গণজমায়েত হয়েছে। এই আন্দোলনকারী এবং তাদের মাতাপিতাদের অনেকে বিজেপি-র সমর্থক বা ভোটার ছিল। কিন্তু ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকা বেকারত্ব, শিক্ষা ব্যবস্থার দেউলিয়া দশা, এবং সর্বপরি ভবিষ্যতের কোনও দিশা দেখতে না পাওয়া তরুণ প্রজন্ম ক্ষোভে ফেটে পড়েছে এই 'সিস্টেম' তথা সরকারের বিরুদ্ধে। এর সঙ্গে অবশ্যই বাহবা দিতে হবে জেন-জি-র নির্ভীকতাকে এবং তাদের সৃজনশীল ভাষা প্রয়োগকে। যেরকম দ্বিধা এবং ভয়হীনভাবে তারা পুলিশের অত্যাচারের সামনে দাঁড়িয়েছে, দেশের প্রধানমন্ত্রী তথা সরকারের কাছে জবাবদিহি তলব করেছে তার জন্য তাদের কুর্নিশ জানানো আমাদের কর্তব্য। এই কথা তারা দেশের মানুষকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে সরকারের আমরা গোলাম নই। বরং সরকার আমাদের দ্বারা নির্বাচিত যাদের কাজ হল আমাদের সেবা করা, অত্যাচার করা নয়। দেশের তরুণ প্রজন্ম বৃদ্ধদের মনে করিয়ে দিল এই সরল সত্য এবং দেখিয়ে দিল নির্ভীকভাবে আন্দোলন করলে, সঠিক বিষয়ে আন্দোলন করলে সাফল্য অবশ্যম্ভাবী।

জেন-জির ভাষা নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। তাদের শব্দপ্রয়োগে কেউ কেউ অশ্লীলতা খুঁজে পাচ্ছেন। দেশের প্রধানমন্ত্রী তথা বিজেপি সাংসদরা স্বাভাবিকভাবেই জেন-জির ভাষা নিয়ে তাদের আক্রমণ করছেন, প্রধানমন্ত্রী আবার স্বঘোষিত পিতারূপে অবতীর্ণ হয়ে 'বাচ্চা'দের ক্ষমা করে দিচ্ছেন। আসলে ভাষা প্রয়োগের সঙ্গে ক্ষমতা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ক্ষমতা সবসময় চায় যে তাদের নির্বাচিত ভাষাতেই জনতা কথা বলবে, এমনকি যখন তা ক্ষমতার বিরোধিতা করবে, তখনও। জেন-জি এই ক্ষমতার ভাষাকে অস্বীকার করেছে। তারা তাদের নিজস্ব ভাষায়, নিজস্ব আঙ্গিকে কথা বলেছে, প্রধানমন্ত্রী তথা গোটা সরকারকে ঠাট্টার বিষয়ে পর্যবসিত করেছে। ক্ষমতা যখন হাসির খোরাকে পরিণত হয়, তখন ক্ষমতা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে। গম্ভীর-কর্কশ সমালোচনা সামলানো ক্ষমতার কাছে জলভাত। কিন্তু হাস্যাস্পদ হয়ে গেলে কী করণীয় তা শিখতে ক্ষমতা এখনও অপারগ। অতএব অশ্লীলতার অভিযোগে আসলে জেন-জির এই ঠাট্টা ও বিদ্রূপের সামনে ক্ষমতা দিশেহারা। তাই অশ্লীলতার অভিযোগ তুলে তারা জেন-জির নৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নের সম্মুখে ফেলতে চাইছেন। স্বয়ং দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন লাগাতার বিরোধীদের বিরুদ্ধে কু-কথা বলেন, সাম্প্রদায়িক প্রচার চালান, যখন তাঁর সমর্থকরা সামাজিক মাধ্যমে লাগাতার মহিলাদের অশ্লীল গালিগালাজ করে, ধর্ষণের হুমকি দেয়, যখন মুসলমান মানুষদের বিরুদ্ধে সঙ্ঘের সমর্থকরা লাগাতার বিষোদ্গার করে তখন এই নীতিবাগিশরা এই অসভ্যতার পক্ষেই অবস্থান নেন। এখন যেহেতু সরকার কাঠগড়ায়, এখন তাদের অশ্লীলতার কথা মনে হচ্ছে। এই সব আসলে জনগণকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত কৌশল। মৌলিক বিষয় ভাষা নয়। মৌলিক বিষয় হল এই যে বিজেপি সরকার দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেছে। তরুণ প্রজন্ম তাই তাদের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে তাদের উচিত শিক্ষা দেওয়ার কথা ভেবেছে এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ জয় হাসিল করে নিয়েছে।

দ্বিতীয় প্রশ্ন হল সরকারের কি কোনও শিক্ষা হয়েছে? তারা কি তাদের নীতি বদল করার কথা ভাবছেন? এর উত্তর এক কথায় হল না। ধর্মেন্দ্র প্রধান নিজের পদত্যাগপত্রে প্রশ্নফাঁস নিয়ে তাঁর দায়িত্ব স্বীকার করেননি। পদত্যাগ করার পরে যখন তিনি সংসদে এলেন তখন বিজেপি সাংসদরা তাঁকে বীরের সংবর্ধনা দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে আসলে তাঁরা গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে কাঁচকলা দেখাতেই দড়। ছাত্রদের বিরুদ্ধে পুলিশি অত্যাচার বিভিন্ন রাজ্যে হয়ে চলেছে। যদিও সরকার বলেছিল যে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হবে না। সামাজিক মাধ্যমে কু-কথা ব্যবহার করার অভিযোগে মহিলাদের লাগাতার হুমকি দেওয়া হচ্ছে, তাদের ব্যক্তিগত ফোন নম্বর সার্বজনীন করে তাদের নানা হুমকি দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী দিল্লিতে কেন পুলিশ নির্মমভাবে ছাত্র পেটালো তা নিয়ে কোনও জবাবদিহি না করে, ছাত্রীদের ক্ষমা করার অছিলায় আবারও নিজেকেই 'ভিক্টিম' হিসেবে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছেন। এই সমস্ত ঘটনা পরম্পরা এই বার্তাই দেয় যে সরকার এই সাময়িক হারের ঘোর কাটিয়ে আপাতত রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে তরুণ প্রজন্মকে নিপীড়িত করার নীতি নিয়েছে। জেন-জির উচিত সরকারের উপর তীব্র নজর রাখা। আমরা আশা করব তরুণ প্রজন্মের উপরে নিপীড়ন হলে তারা আবার রাস্তায় নেমে আন্দোলন করবে।

শেষে বিরোধীরা এই আন্দোলন থেকে শিক্ষাগ্রহণ করুন। নির্ভীকভাবে আন্দোলন, তরুণদের সামনে রেখে তাদের দাবিতে আন্দোলন, নতুন রাজনৈতিক ভাষার ব্যবহার এবং সর্বপরি জনগণের দাবিকে ভাষা দেওয়াই তাদের কাছে একমাত্র পথ। কোনও রাজনৈতিক দলের স্বার্থ নয়। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের দাবিকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা আন্দোলনই একমাত্র পথ। নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থ ছেড়ে নামুন মানুষের আন্দোলনে। একমাত্র তাহলেই আপনারা জেন-জি তথা দেশের মানুষের ভরসা পাবেন।