আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ চতুর্দশ সংখ্যা ● ১৬-৩১ জুলাই, ২০২৬ ● ১-১৫ শ্রাবণ, ১৪৩৩

প্রবন্ধ

বুলডোজার-রাজ ও মহীনের ঘোড়াগুলি

দীপাঞ্জন গুহ


আমরা যাইনি মরে আজো - তবু কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয়:
মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে,
প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন - এখনও ঘাসের লোভে চরে
পৃথিবীর কিমাকার ডাইনামোর 'পরে।

বুলডোজার একটি যন্ত্র। গত একশো বছর ধরে মাঠে-ঘাটে, শহরের রাস্তায়, শক্ত মাটি থেকে পাথর বা কংক্রিট, বিভিন্ন জিনিসকে ভাঙার জন্য এই যন্ত্রের ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু এই বুলডোজার যদি একটি শাসনব্যবস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে আমাদের চিন্তিত হতে হয়, কারণ কোনো বাধা না মেনে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার যে আদর্শ এর মধ্যে নিহিত আছে সেটা একটি স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের উপযুক্ত হলেও একটি প্রাণবন্ত গণতন্ত্রের কখনোই নয়। উত্তরপ্রদেশে শুরু হয়ে গত দশ বছর ভারতের কয়েকটি রাজ্যে শাসকদল ও তাদের কট্টর সমর্থকেরা বকলমে বুলডোজারকে তাদের শাসনের প্রতীক বানাতে চেয়েছে। 'বুলডোজার রাজ' বা 'বুলডোজার অ্যাকশন' ধরনের কথার উদ্ভব হয়েছে, এবং সন্দেহ হয় রাষ্ট্রের অলিখিত স্বীকৃতি পেয়েছে। গত এক মাসে পশ্চিমবঙ্গেও আমরা সেই প্রবণতা দেখতে পাচ্ছি।

আগের সরকারের আমলের বিপুল দুর্নীতি এবং সমাজবিরোধীদের বেলাগাম দাপাদাপির হাত থেকে বাঁচতে পশ্চিমবঙ্গের বিপুল সংখ্যক মানুষ শাসকের পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। পরিবর্তনের পরে মাত্র কয়েকদিন হয়েছে, সুতরাং নতুন সরকারের কাজের বিস্তারিত মূল্যায়ন করার সময় এখনো আসেনি। তবে যে ক'টি প্রবণতা এর মধ্যে দেখা গেছে, তার মধ্যে একটি অন্যতম হচ্ছে রাজ্য, মূলত কলকাতা শহর এবং শহরতলী জুড়ে বুলডোজারের দাপাদাপি। তার মধ্যে এখনো পর্যন্ত যেটা সবচেয়ে বেশি বিতর্ক সৃষ্টি করেছে তা হচ্ছে রেলের জমিতে থাকা - প্ল্যাটফর্ম বা স্টেশন সংলগ্ন - ছোট দোকান এবং মানুষের থাকার ঘর তথা ঝুপড়ি ভেঙে রাতারাতি মানুষকে উচ্ছেদ করা। প্রকল্পটি সরকারিভাবে রেলের হলেও রাজ্য সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া একাজ সম্ভব নয়, তাই একে রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের একটি যৌথ উদ্যোগ হিসেবে ধরতে হবে। এর ফলে বহু মানুষ, যারা এমনিতেই সমাজের দুর্বলতর অংশের, রাতারাতি জীবিকা এবং বাসস্থান হারিয়ে চূড়ান্ত অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়ছেন। ভেঙে যাওয়া ঘরবাড়ি দোকানের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে অসহায় মানুষের কান্না দেখে বহু মানুষ দুঃখ পাচ্ছেন, প্রতিবাদ করছেন, আবার পাশাপাশি অনেক মানুষ এতে উল্লাস প্রকাশ করছেন।

মানবিকতা, সহমর্মিতা ইত্যাদিকে তুলে রেখে যাঁরা একেবারে আইনের সংকীর্ণ ব্যাখ্যা দিয়ে বিষয়টিকে বুঝতে চান, তাঁরা এ-কথা বলতেই পারেন যে রেলের জমি, সেখানে হকারি করা বা থাকার ঘর তৈরি করা বেআইনি, রেল তাদের যখন ইচ্ছা তুলে দিতেই পারে। কিন্তু ব্যাপারটা আমাদের মতে এতটা সরলভাবে দেখা সম্ভব নয়। ভারতের সংবিধান জীবনের অধিকারকে একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ("রাইট টু লাইফ", আর্টিকল ২১, ভারতীয় সংবিধান), এবং সুপ্রিম কোর্ট একাধিক মামলায় জীবনের অধিকারকে প্রসারিত করে জীবিকার অধিকারকেও স্বীকৃতি দিয়েছে, কারণ জীবিকা না থাকলে জীবনধারণ সম্ভব নয়। অর্থাৎ নাগরিকদের জীবনের অধিকারকে সুরক্ষিত করার জন্য তাদের একটি জীবিকা নিশ্চিত করাটাও রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তাহলে সরকারি জমিতে বসে পড়াটা যেমন অবৈধ, সেরকম যাকে রাষ্ট্র অন্য কোনো জীবিকা দিতে পারেনি, সে যদি কোনো সরকারি জমিতে একটি অস্থায়ী দোকান করে জীবিকা নির্বাহ করে, তাকে কোনো পুনর্বাসন না দিয়ে রাতারাতি উচ্ছেদ করে তার জীবনের অধিকারকে অনিশ্চিত করে দেওয়াটা কি সংবিধানের আদর্শের বিরুদ্ধে যাচ্ছে না? সুতরাং একটু তলিয়ে ভাবলে আইনের প্রশ্নটি ক্রমশ ধূসর হয়ে ওঠে!

আরো একটি দিক থেকে বিষয়টি দেখা যায়। বিশ্ব ক্ষুধা সূচক রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতবর্ষের ২২ কোটির বেশি মানুষ প্রতি রাতে ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমোতে যান। এবং ভারতবর্ষের প্রতি পাঁচজন শিশুর একজন খাদ্যাভাবে ঘোরতর অপুষ্টির শিকার। এদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র সংবিধানপ্রদত্ত জীবনের যে মৌলিক অধিকার, তা দিতে ব্যর্থ নয় কি? অথবা আমরা হামেশাই দেখি যে "আইনের চোখে সবাই সমান" হলেও শক্তিশালী এবং অর্থবান ব্যক্তিরা অপরাধ করলে তাদের দোষী সাব্যস্ত করা কত কঠিন। বা দেখি যে বিপুল পুঁজির মালিকের ঋণ মাঝেমাঝেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক মকুব করে দেয়। সুতরাং, সংবিধানের আদর্শ, আইনের ভাষ্য, এবং বাস্তব অবস্থা, এই তিনের এক নড়বড়ে ভারসাম্যের উপর আমাদের সমাজ দিনের পর দিন চলতে থাকে। এই অবস্থায় শুধুমাত্র আইনের দোহাই দিয়ে গরিব অসহায় মানুষের জীবিকা এবং বাসস্থান কেড়ে নেওয়া যায় কি?

এ তো গেল আইন বা সংবিধানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা। কিন্তু এরকম কোনো ঘটনা ঘটলে মানুষ সাধারণত আগে তার আবেগ দিয়ে, সহানুভূতি দিয়ে ঘটনার বিচার করে থাকে। রাস্তায়, ফুটপাতে বা স্টেশনে অবৈধ এবং অপরিকল্পিত নির্মাণ থাকলে - ঝুপড়ি বা হকারের স্টল (অথবা মন্দির-মসজিদ বা ফুটপাথ দখল করে বড়লোকের বাড়ির বাগান) - চলাফেরার অসুবিধা হয়। পাশাপাশি এই সমস্ত সরকারি জমিতে ঝুপড়ি করে যে সমস্ত গরিব মানুষ দোকান চালান, তাদেরকে রাতারাতি কোনো পুনর্বাসন ছাড়া তুলে দিলে তাঁদের জীবন একটা গভীর সংকটের মধ্যে পড়ে যায়। এই কথা ভেবে মানুষ দীর্ঘদিন তাদের এই অসুবিধার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে চলছে। শুধু চলছে না, পাড়ার চায়ের দোকান বা তেলেভাজার দোকান আমাদের যৌথ সংস্কৃতির একটা অংশ হয়ে গেছে (বস্তুত শহরের সমস্ত ঝুপড়ি চায়ের দোকান বা ফুটপাথের পাইস হোটেল উঠে গেলে শহর পরিচ্ছন্ন হবে ঠিকই, কিন্তু সেই নিষ্প্রাণ পরিচ্ছন্নতা আমাদের ঠিক সইবে কি!)। বড় কর্পোরেট অফিস বা ঝাঁ-চকচকে শপিং মলের পাশাপাশি অসংগঠিত ছোট উদ্যোগ বা ঝুপড়ি দোকান, প্রাইভেট গাড়ির পাশে ভিড় বাস, অল্প জায়গা, এগুলোর সঙ্গে আমরা অভ্যস্ত, কারণ এই বিপুল জনসংখ্যার ভারতবর্ষে সমস্ত মানুষের জীবনধারণের জায়গা করে দিতে সব কিছু ঠিক নিখুঁতভাবে চলে না, একটু মানিয়ে নিয়ে চলে। প্রস্তর যুগের ঘোড়ারা ঘাসের লোভে চড়ে পৃথিবীর কিমাকার ডায়নামোর পরে! আমরা চাই আমাদের রাস্তা ফাঁকা হোক, স্টেশন পরিষ্কার হোক, ট্রেনে ভিড় না থাকুক (আমরা আরো চাই আমাদের দেশের সবাই যেন কাজ পায়, ক্ষমতাবানরা যেন অপরাধ করে পার না পায়, আমাদের বাতাস যেন দূষণমুক্ত হয়, আমাদের কোনো শিশুকে যেন রাত্রে ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমোতে যেতে না হয়, সব বার না হলেও অন্তত মাঝে মাঝে যেন ভারতবর্ষ বিশ্বকাপ ফুটবল খেলতে পারে)। এক কথায়, আমরা চাই সুইস আল্পসের মধ্যে দিয়ে ছুটে চলা একটি অপরূপ ট্রেনের দৃশ্যের মতো হোক আমাদের পরিবেশ এবং চারপাশ। কিন্তু তার জন্য সমস্যার মূল কারণগুলোকে ঠিক করতে হবে। সমাজে ও অর্থনীতিতে ন্যায় ও সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে, প্রত্যেক মানুষের জীবিকা ও স্বাস্থ্য, প্রত্যেক শিশুর পুষ্টি ও সমান শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে| গরিব মানুষকে উচ্ছেদ করে দারিদ্রকে সরানো যাবে না, ক্ষুধার্ত শিশুকে চোখের সামনে থেকে সরিয়ে দিলে ক্ষুধাকে নির্মূল করা যাবে না।

যাঁরা উচ্ছেদ হচ্ছেন তাঁরা পুনর্বাসন চাইছেন। সরকারি জমি দখল করে থাকাটা যেমন বেআইনি, তেমনি পুনর্বাসনের দাবির মধ্যে সংবিধানপ্রদত্ত জীবন-জীবিকার অধিকার রক্ষার একটি অলিখিত দাবি আছে। আইনের বিশেষজ্ঞরা চুলচেরা আইনের বিচার করুন, কিন্তু আমরা জানি যে এ ধরনের মানবিক প্রশ্নগুলি জটিল, এবং জটিল প্রশ্নের বুলডোজার দিয়ে ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো সহজ সমাধান হয় না। আমরা এও জানি যে কোনো মানবিক প্রশ্নের সমাধান মানবিকতাকে উপেক্ষা করে হয় না। তাই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র যাই করুক, কোনো নিরপরাধ সহনাগরিকের দোকান বা বাসস্থান ভেঙ্গে যাওয়ার দৃশ্য দেখে আমাদের উল্লসিত হওয়া সাজে না। লেখা শুরুর কথায় ফিরে গিয়ে বলতে হয় বুলডোজার একটি যন্ত্র, কিন্তু তা যেন শাসনব্যবস্থার প্রতীক হয়ে উঠে আমাদের মস্তিষ্কে না প্রবেশ করে। কারণ তখন শুধু একটি ঝুপড়ি বা দোকান ভেঙে গুঁড়িয়ে যাবে না, সহানুভূতি, সহমর্মিতা ইত্যাদি আমাদের মনের সূক্ষ্ম মানবিক অনুভূতিগুলো, বা যুক্তি দিয়ে বিচার করার ক্ষমতা, এগুলোও ক্রমাগত ভাঙতে থাকবে। এই বাংলার এক নির্জন কবিকে একদা হিম হাওয়া বা মাঘনিশিথের কোকিল এসে জাগাতে চেয়েছিল। আমরা তাঁর উত্তরসূরি, আমাদের যেন কখনো বুলডোজার মস্তিষ্কে নিয়ে জাগতে না হয়।