আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ চতুর্দশ সংখ্যা ● ১৬-৩১ জুলাই, ২০২৬ ● ১-১৫ শ্রাবণ, ১৪৩৩
সম্পাদকীয়
যে মেয়েটি বাড়ি ফেরেনি
আবারও ধর্ষণ, আবারও ধর্ষণের পরে নৃশংস হত্যা। আবারও একটি মেয়ে নৃশংস অত্যাচারের বলি হয়ে হারিয়ে গেল। চিরতরে।
এবারে ধর্ষণের শিকার একটি ১১ বছর বয়সী নাবালিকা। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে নাবালিকাকে পাশবিক নির্যাতনের পরে পুকুরে চুবিয়ে ওরা খুন করেছে। নাবালিকা মেয়েটি শিশুর সারল্যে তাদের বিশ্বাস করেছিল। মনে পড়ে ইংমার বার্গম্যান-এর সেই পৃথিবী বিখ্যাত চলচ্চিত্রের কথা; সুইডেন-র মধ্যযুগের পটভূমিতে এক নিষ্পাপ বালিকা গির্জায় মোমবাতি পৌঁছে দিতে যাচ্ছিল। পথে তিন ভবঘুরে পশুপালক তাকে নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও হত্যা করে। ১৯৬০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সে ছবির নাম 'দ্য ভার্জিন স্প্রিং'।
তবে এখন মধ্যযুগ নয়, রীতিমতো একবিংশ শতকের দ্বিতীয় পাদে আমরা পদার্পণ করেছি। আর পটভূমি জনমনুষ্যহীন নির্জন প্রান্তর নয়, কলকাতা শহর থেকে বারুইপুরের সূর্যপুর গ্রামে যেতে সময় লাগে ঘন্টা খানেক।
বালিকাটির মৃতদেহ উদ্ধারের পরে মূল ধর্ষক হিসেবে প্রতিবেশী ও পুলিশের দ্বারা চিহ্নিত হয় প্রভাস মণ্ডল; চার দিনের মধ্যে মধ্যরাতে তাকে নিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময়ে পুলিশের সঙ্গে এনকাউন্টার-এ এই ব্যক্তি মারা যায়। ঘটনার পুনর্নির্মাণের অবশ্য কোনো ভিডিও পাওয়া যায়নি। তবে সত্যিই যদি সে মূল ধর্ষক হয়, তবে অনেক প্রশ্ন কিন্তু উত্তরহীন রয়ে যাবে। এই ব্যক্তি ছিল ঘটনার সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। তার সঙ্গে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে কারা যুক্ত ছিল? কীভাবে মূল ধর্ষক তার সাঙ্গপাঙ্গদের জোটালো? ঠিক কারা এবং ক'জন বালিকাটির ধর্ষণের সঙ্গে যুক্ত? বালিকাটিকে হত্যা করল কে? এসব প্রশ্ন অধরাই রয়ে গেল।
দুঃখের কথা হল, ধর্ষণ করে খুনের ওই ঘটনা সামনে আসার পরেই আঞ্চলিক মানুষের পক্ষ থেকে পুলিশি গাফিলতির অভিযোগ উঠেছিল। প্রাথমিক ময়নতদন্তের রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে যে ওই বালিকার মৃত্যু হয়েছে জলে ডুবে। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, যে সময়ে পুলিশের কাছে যাওয়া হয়, তখনই পুলিশ যদি তৎপর হতো, তাহলে হয়তো নাবালিকাটিকে বাঁচানো যেত।
প্রভাস মণ্ডল পুলিশের গুলিতে এনকাউন্টার-এ মারা গেল। তার বিরুদ্ধে ওঠা ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ অবশ্য আদালতে প্রমাণ করা গেল না। দেশের আইন অনুযায়ী, আদালতে দোষ প্রমাণ হওয়ার আগেই কোনো অভিযুক্তের এনকাউন্টার-এ মৃত্যু হলে তার বিরুদ্ধে ন্যায় সংহিতা বা পকসো আইনের অধীনে যে মামলা চলছিল, তা আইনগতভাবে স্থগিত হয়ে যায়। যেহেতু আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো রায় দেয়নি, তাই খাতায়-কলমে সে আমৃত্যু 'অভিযুক্ত' হিসেবেই থেকে গেল, তাকে আইনত 'দোষী' বলা যাবে না। ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হল 'আইনের চোখে প্রত্যেকেই নির্দোষ, যতক্ষণ না তার অপরাধ প্রমাণিত হচ্ছে।'
ভারতের বহু রাজ্যে এনকাউন্টারের গল্প এখন একই - পুলিশের অস্ত্র ছিনিয়ে পালানোর সময়ে গুলি।
খুন ও ধর্ষণের ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে স্থানীয় এক অটোচালককে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে মারধর করা হয়; গণপিটুনিতে তার মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ বলছে সেই অটোচালক নির্দোষ ছিলেন, এখানেও বিচার করছে প্রশাসন - বিচার ব্যবস্থা থেকে যাচ্ছে অন্ধকারে। পুলিশ ও প্রশাসন ঠিক করে দিচ্ছে কে দোষী ও কে নির্দোষ। মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং বলেছেন, গণপিটুনির নেপথ্যে 'সাম্প্রদায়িক অ্যাঙ্গেল' ছিল। আবার বিরোধীদের একাংশের মতে, বিচার না পাওয়ার ক্ষোভ থেকে স্থানীয় জনরোষ তৈরি হয়েছিল এবং সেই পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া 'সাম্প্রদায়িক অ্যাঙ্গেল'-এর বয়ান পরিস্থিতিকে ভিন্ন দিকে চালিত করার একটি কৌশল। তবে সন্দেহ নেই, মুখ্যমন্ত্রীর এই ধরনের মন্তব্য রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়িয়ে তুলতে পারে।
নিহত মেয়েটি মুসলিম পরিবারের। হামিদ মণ্ডল নামে এক বাসিন্দা বলেছেন, 'এখানে হিন্দু-মুসলমান কোথায়? সূর্যপুর শান্ত এলাকা। এমন একটা ঘটনা কীভাবে ঘটল সেটাই আমরা বুঝতে পারছি না। এখানে মাদ্রাসা আছে আর কিছুটা দূরে মন্দির আছে এখানে হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ নেই।' এক সময় সুজাতা নস্করের বাড়ির কাছেই থাকত নিহতের পরিবার। ঘটনার কথা জানতে পেরেই তিনি ছুটে এসেছেন সন্তানহারা পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে।
সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে অপরাধীদের শাস্তি হওয়া কাম্য। তবে সাধারণ মানুষ কি এনকাউন্টার-কে নিন্দা করছেন? তেমনভাবে কিন্তু তাঁরা সরবে নিন্দা করছেন না।
এর একটা কারণ পুলিশ, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার ঢিলেমির জন্য জনমানুষের প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে যেন কিছুটা অনাস্থা এসেছে। ফাস্ট-ট্র্যাক বিচার প্রক্রিয়ায়, যেমন পকসো মামলার ক্ষেত্রে হয়, মামলার নিষ্পত্তিতে গড়ে ৯১০ থেকে ১,৫৬২ দিন (২.৫ থেকে ৪.২ বছর) সময় লাগে। এই সময়কাল আবার সংশ্লিষ্ট রাজ্য ও তার প্রশাসনের সদিচ্ছার উপরে নির্ভর করে। জটিল মামলাগুলোর ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়ায় ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। তার উপরে এই বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের বিগত সরকারের ট্র্যাক রেকর্ড জঘন্য। কামদুনি থেকে অভয়া - সঠিক বিচার না পাওয়া, ধর্ষকের সামান্য শাস্তি, স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী সহ প্রশাসন ও তৎকালীন সরকারি দলের কর্তাব্যক্তিদের সংবেদনহীন, নিন্দনীয় মন্তব্য সাধারণ মানুষকে বিচারব্যবস্থার উপরেই কিছুটা হতাশ করে তুলেছে।
হতাশা আসতে পারে। কিন্তু রাস্তা অবরোধ করা, নিকটবর্তী রেলওয়ে ট্র্যাক অবরোধ করা হয়, টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করলে বিচার প্রক্রিয়াকে সাহায্য করা হয় না। দাবি আদায়ের পথ হল দীর্ঘকালীন সংঘবদ্ধ আন্দোলন।
'ভার্জিন স্প্রিং' সিনেমার নাবালিকার বাবা তাঁর মেয়ের হত্যাকারীদের অন্ধ আক্রোশে হত্যা করেন। তারপরে গভীর শোক ও অপরাধবোধে আচ্ছন্ন হয়ে মেয়ের নিথর দেহের পাশে বসে কাঁদতে থাকেন।
আমরা শোকাহত, আমরা যন্ত্রণাকাতর। আমরা নিঃশব্দে কেঁদে চলেছি। তবে আমরা কিন্তু মধ্যযুগে নেই।
আমরা বিচার চাই, দেশের আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।