আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ দ্বাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ জুন, ২০২৬ ● ১-১৫ আষাঢ়, ১৪৩৩
প্রবন্ধ
ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিজয়ের একাশি বছর পরে
অম্বিকেশ মহাপাত্র
ফ্যাসিবাদের পরিণতি বিশ্বযুদ্ধ
সাতাশে ফেব্রুয়ারি ১৯৩৩, জার্মানির সংসদ ভবন বার্লিনের রাইখস্ট্যাগ (Reichstag) আগুনে পুড়িয়ে, মিথ্যে মামলা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের নেতা কমরেড দিমিত্রভের ঘাড়ে। এরই মধ্যদিয়ে ইতালির ফ্যাসিস্ট শক্তির প্রতিভূ বেনিতো মুসোলিনীর শিষ্য অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বে জার্মানীতে ফ্যাসিবাদের নবরূপে সূচনা ঘটেছিল। সাইরেন, ভারী বুটের শব্দ, কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প, গ্যাস চেম্বার, গিলোটিন,... ইত্যাদির মাধ্যমে ষাট লক্ষাধিক ইহুদি, কমিউনিস্ট, ট্রেড ইউনিয়নিস্ট, সোশ্যালিস্ট মানুষদের পরিকল্পনামাফিক ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয়। ফলশ্রুতিতে হিটলারের নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদি শক্তি বিশ্বত্রাসে পরিণত হয়েছিল। এই পথে পয়লা সেপ্টেম্বর ১৯৩৯, হিটলারের বিশ্বজয়ের নেশায় পোলান্ড আক্রমণের মধ্যদিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা ঘটেছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে সাতই আগস্ট ১৯৪১, মানুষের প্রাণের ঠাকুর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ আশি বছর তিন মাস বয়সে প্রয়াত হন। মৃত্যুর কয়েকদিন আগেআশি বছরের পরিণত বয়সে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, রাজনীতি বিষয়ক তাঁর শেষ প্রবন্ধ 'সভ্যতার সংকট'। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর প্রায় চার বছর পর ফ্যাসিবাদের পরাজয় এবং মানবসভ্যতার জয় সূচিত হয় আট/নয়-ই মে ১৯৪৫। মিত্রশক্তির চার প্রতিনিধির সামনে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করেছিলেন জার্মানীর নাৎসী বাহিনী। অবশেষে পরাজিত হয়েছিল, একদাকথিত অপরাজেয় নাৎসি বাহিনী। আনুষ্ঠানিকভাবে পরিসমাপ্তি ঘটেছিল পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে অভিঘাতময় পর্ব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। প্রায় পাঁচ কোটি জীবনের বিনিময়ে (যার সিংহভাগই সোভিয়েত ইউনিয়নের) বিশ্বমানবতা তার সবচেয়ে বড় বিপদকে মোকাবিলা করে ইতিহাসের ভয়ংকরতম অধ্যায় পেরিয়ে পা রেখেছিল নতুন এক পর্বে। বার্লিনের সংসদ ভবন রাইখস্ট্যগের মাথায় তখন লাল ঝান্ডা হিল্লোলিত হয়েছিল।
রবীন্দ্রনাথ ও 'সভ্যতার সংকট'
আজ বিশ্বব্যাপী মন্দা, ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে অশান্তি, ডোনাল্ড ট্র্যাম্পের অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ ও দাদাগিরি, ইউক্রেন-রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধ, প্যালেস্তাইন-ইজরায়েল মধ্যে যুদ্ধ, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ,... প্রভৃতির কারণে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষ মরছেন, প্রভূত সম্পত্তি ধ্বংস হচ্ছে। অসামরিক এলাকা, হাসপাতাল, সাংবাদিক, নারী, শিশুরাও আক্রমণের নিশানা থেকে বাদ যাচ্ছে না। এমন সময়ে মানবতার কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'সভ্যতার সংকট' প্রবন্ধে যা লিখে রেখে গেছেন, আজকের পরিস্থিতির তাগিদ অনুভবে তার প্রাসঙ্গিক অংশ উল্লেখ জরুরি।
"আজ আমার বয়স আশি বৎসর পূর্ণ হল, আমার জীবনক্ষেত্রের বিস্তীর্ণতা আজ আমার সম্মুখে প্রসারিত। পূর্বতম দিগন্তে যে জীবন আরম্ভ হয়েছিল তার দৃশ্য অপর প্রান্ত থেকে নিঃসক্ত দৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি এবং অনুভব করতে পারছি যে, আমার জীবনের এবং সমস্ত দেশের মনোবৃত্তির পরিণতি দ্বিখণ্ডিত (দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ প্রাসঙ্গিক) হয়ে গেছে; সেই বিচ্ছিন্নতার মধ্যে গভীর দুঃখের কারণ আছে। ...জীবনের প্রথম আরম্ভে সমস্ত মন থেকে বিশ্বাস করেছিলুম য়ুরোপের অন্তরের সম্পদ এই সভ্যতার দানকে। আর আজ আমার বিদায়ের দিনে সে বিশ্বাস একেবারে দেউলিয়া হয়ে গেল। আজ আশা করে আছি, পরিত্রাণকর্তার (লাল নিশান প্রাসঙ্গিক) জন্মদিন আসছে আমাদের এই দারিদ্র্যলাঞ্ছিত কুটিরের মধ্যে; অপেক্ষা করে থাকব, সভ্যতার দৈববাণী সে নিয়ে আসবে, মানুষের চরম আশ্বাসের কথা মানুষকে এসে শোনাবে এই পূর্বদিগন্ত থেকেই। আজ পারের দিকে যাত্রা করেছি-পিছনের ঘাটে কী দেখে এলুম, কী রেখে এলুম, ইতিহাসের কী অকিঞ্চিৎকর উচ্ছিষ্ট সভ্যতাভিমানের পরিকীর্ণ ভগ্নস্তূপ! কিন্তু মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব। আশা করব, মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ (রাইখস্ট্যগের মাথায় তখন লাল ঝান্ডা প্রাসঙ্গিক) হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে। আর-একদিন অপরাজিত মানুষ নিজের জয়যাত্রার অভিযানে সকল বাধা অতিক্রম করে অগ্রসর হবে তার মহৎ মর্যাদা ফিরে পাবার পথে। মনুষ্যত্বের অন্তহীন প্রতিকারহীন পরাভবকে চরম বলে বিশ্বাস করাকে আমি অপমান মনে করি।
এই কথা আজ বলে যাব, প্রবল প্রতাপশালীরও ক্ষমতা মদমত্ততা আত্মম্ভরিতা যে নিরাপদ নয় তারই প্রমাণ হবার দিন আজ সম্মুখে উপস্থিত হয়েছে; নিশ্চিত এ সত্য প্রমাণিত হবে। কবিগুরু শেষ করেছেন যে কথা বলে,
"ঐ মহামানব আসে।
দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে
মর্ত্যধূলির ঘাসে ঘাসে।
সুরলোকে বেজে ওঠে শঙ্খ,
নরলোকে বাজে জয়ডঙ্ক -
এল মহাজন্মের লগ্ন।
আজি অমারাত্রির দুর্গতোরণ যত
ধূলিতলে হয়ে গেল ভগ্ন।
উদয়শিখরে জাগে মাভৈঃ মাভৈঃ রব
নবজীবনের আশ্বাসে।
'জয় জয় জয় রে মানব - অভ্যুদয়'
মন্দ্রি উঠিল মহাকাশে।”
(পয়লা বৈশাখ, ১৩৪৮)
রবীন্দ্রনাথ ও রাশিয়া ভ্রমণ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যুগযুগান্তরব্যাপী সমাজ পরিবর্তন এবং সমাজের নিত্যপ্রয়োজন মেটানোর চালিকাশক্তি হিসেবে তাঁদেরই, যাঁরা মাঠে ঘাটে কলে কারখানায় নগরে প্রান্তরে কাজ করেন অর্থাৎ শ্রমজীবিদেরই চিহ্নিত করেছেন। রবীন্দ্রনাথ মার্কসবাদী ছিলেন না। কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যও ছিলেন না। কিন্তু নিঃসন্দেহে মানুষের কল্যাণকামী বামপন্থী মননের অধিকারী ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'রাশিয়ার চিঠি' পড়ে সেই ধারণাই দৃঢ় হয়েছে। নভেম্বর বিপ্লবের তের বছর পর রাশিয়া ভ্রমণ (দুই সপ্তাহ, সেপ্টেম্বর-অক্টোম্বর, ১৯৩০)-এর অভিজ্ঞতা সঞ্জাত 'রাশিয়ার চিঠি'তে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, "আপাতত রাশিয়ায় এসেছি, না এলে এজন্মের তীর্থ দর্শন অত্যন্ত অসমাপ্ত থাকত।” তিনি আরও লিখেছেন, "দেখতে পাচ্ছি, বহুদূরব্যাপী একটা ক্ষেত্র নিয়ে এরা একটা নূতন জগৎ গড়ে তুলতে কোমর বেঁধে লেগে আছে। দেরি সইছে না; কেননা জগৎ জুড়ে এদের প্রতিকূলতা, সবাই এদের বিরোধী - যত শীঘ্র পারে এদের খাড়া হয়ে দাঁড়াতে হবে, হাতে হাতে প্রমাণ করে দিতে হবে, এরা যেটা চাচ্ছে সেটা ভুল নয়, ফাঁকি নয়। হাজার বছরের বিরুদ্ধে দশ-পনেরো বছরে জিতবে বলে পণ করেছে।” সে দেশের জনশিক্ষা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, "আমি নিজের চোখে না দেখলে কোনও মতেই বিশ্বাস করতে পারতুম না যে, অশিক্ষা ও অবমাননার নিম্নতম তল থেকে আজ কেবলমাত্র দশ বৎসরের মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষকে এরা শুধু ক খ গ ঘ শেখায়নি, মনুষ্যত্বে সম্মানিত করেছে। শুধু নিজের জাতকে নয়, অন্য জাতের জন্য এদের সমান চেষ্টা।” মানুষের কল্যাণকামী বামপন্থী মনন ছাড়া লেখণিতে এই লেখা আসতে পারেনা।
তারসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ রাশিয়া ভ্রমণের পর এও লিখছেন, "মস্কাও শহরে গিয়ে রাশিয়ার শাসনকার্যের একটি অসাধারণতা আমার অন্তরকে স্পর্শ করেছিল - দেখেছিলেম, সেখানকার মুসলমানদের সঙ্গে রাষ্ট্র - অধিকারের ভাগ বাঁটোয়ারা নিয়ে অমুসলমানদের কোনো বিরোধ ঘটে না; তাদের উভয়ের মিলিত স্বার্থসম্বন্ধের ভিতরে রয়েছে শাসনব্যবস্থার যথার্থ সত্য ভূমিকা।”
রবীন্দ্রনাথ ও 'ভারততীর্থ'
স্মরণ করি, রবীন্দ্রনাথের 'ভারততীর্থ' কবিতার অংশ বিশেষও - "হে মোর চিত্ত, পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে, এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে। কেহ নাহি জানে, কার আহ্বানে, কত মানুষের ধারা, দুর্বার স্রোতে এল কোথা হতে, সমুদ্রে হল হারা। হেথায় আর্য, হেথা অনার্য, হেথায় দ্রাবিড়, চীন - শক-হুন-দল পাঠান-মোগল এক দেহে হল লীন।" রবীন্দ্রনাথ, তাঁর সঙ্গে এক নিঃশ্বাসে উচ্চারিত নাম নজরুল; সেই রবীন্দ্র-নজরুলের পৃষ্ঠভূমি বাংলা সহ সারা ভারতবর্ষে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সংসদীয় রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) আজরাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। বিজেপি প্রশাসন এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে, ধর্মনিরপেক্ষ 'ভারতীয় সংবিধান' বিরোধী ধর্মীয় বিভাজন, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার, মানুষের মধ্যে পারস্পরিক ঘৃণার বাতাবরণ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার উস্কানির মধ্যদিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভারততীর্থে 'আধুনিক নয়া ফ্যাসিবাদ'কায়েম করেছে। ফলশ্রুতিতে রুটি, রুজি, মাথা গোঁজার ঠাঁই, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, ...মানবতা নিয়ে চর্চার বিপরীতে হিন্দু-মুসলিম, মন্দির-মসজিদ, গরুর মাংস-শুয়োরের মাংসের আলোচনা আন্তর্জাতিক অন্তর্জাল ব্যবহারে নিরন্তর মগজ ধোলাই করে চলেছে। পাশাপাশি রাম এবং রহিমের মধ্যে বিভেদের প্রাচীর তুলে উভয়কে বিপদে ফেলেছে। রবীন্দ্র-নজরুলের বাংলা তথা ভারততীর্থে তীব্র সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটকালে সংকটমুক্ত সুস্থ সমাজের দিশা মিলবে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে একসাথে নজরুলের বস্তুনিষ্ঠ ব্যাপক চর্চার মধ্যদিয়ে। আসুন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিজয়ের একাশি বছর পরে 'আধুনিক নয়া ফ্যাসিবাদ'-এর করাল গ্রাস থেকে মুক্ত হতেসকলে মিলে রবীন্দ্র-নজরুলের চর্চায় পুনরায় ব্রতী হই।