আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ দ্বাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ জুন, ২০২৬ ● ১-১৫ আষাঢ়, ১৪৩৩

প্রবন্ধ

'তোলা' থেকে 'তুলে দেওয়া' - এক বিচিত্র উপাখ্যান

অমিত পান


পশ্চিমবঙ্গের শতকরা কত শতাংশ মানুষ মাস গেলে মাইনে পায়? যারা মাস মাইনা পান তাদের মধ্য থেকে যদি আবার গৃহ সহায়ক/সহায়িকা, আয়া ও গাড়িচালকদের বাদ দেওয়া হয়, তাহলে সংখ্যাটা খুবই কম হবে। এর উপর রয়েছে পরিযায়ী শ্রমিক সে অদক্ষ, অর্ধদক্ষ বা দক্ষ যাই হোক। সঠিক হিসেব আছে কিনা জানি না, কিন্তু এ সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ নেই বাকি বিরাট সংখ্যংক মানুষ যা সম্ভবত মোট কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, তারা প্রায় পুরোপুরি নির্ভরশীল অনিয়মিত কাজের উপর; সে অটো-টোটো চালক, আনাজ / ফল / মাছ-মাংস / টুকিটাকি জিনিস বিক্রেতা, ফেরিওয়ালা বা হকার যাই হোক।

এদের মধ্যো ঠিক কতজন সরকারি বা সাধারণের জন্য সুনির্দিষ্ট জমি বা রাস্তা ব্যেবহার না করে শুধুমাত্র আইনিভাবে নিজস্ব জমি ব্যেবহার করে অর্থোপার্জন বা জীবন নির্বাহের চেষ্টা করেন? শুধু হকার কেন, আনাজ-ফল বিক্রেতা প্রায় সকলেই নিজস্ব জমির বাইরে তাদের ছোটখাট ব্যুবসা করেন! যেটুকু রোজগার সারাদিনে হয় তা সাধারণের জন্য নির্দিষ্ট জমি/জায়গা ব্যসবহার করে। তাহলে কি হকার উচ্ছেদের সঙ্গে তাদেরও সবাইকে তুলে দিতে হবে? একটা কথা খুব চালু আছে, 'বিকল্প ব্যাবস্থা না করে উচ্ছেদ করা যাবে না'। কথাটা নিঃসন্দেহে ভালো, কিন্তু কী কী বিকল্প ব্যরবস্থা হতে পারে? সবাইকে চাকরি দেওয়া হবে? সম্ভব নয়। অন্য্ কোনো জায়গায় বসানো হবে? যেখানে বসানো হবে সে জমিটা কার হবে? সেটাও তো কোনো সাধারণের বা সরকারি জমিই হবে। আর সেই জায়গাটা যদি ব্যটস্ত অঞ্চল বা পথচলতি রাস্তা থেকে দূরবর্তী স্থানে হয়, তাহলে সেখানে পসরা সাজানোর মানে থাকবে তো?

মাননীয় মুখ্যামন্ত্রী জানিয়েছেন ফাঁকা জমি বা পুরোনো বাজারে বসতে। ফাঁকা জমি কি আর কোথাও রেখেছে বিগত জমানার তোলাবাজরা? আর পুরোনো বা পরিত্যইক্ত বাজারে বসে কি তারা পরস্পরের সুখদুঃখের আলোচনা করবে, কারণ সে জায়গায় লোকে যায় না বলেই তো পরিত্যদক্ত!

একটা জিনিস খুবই পরিষ্কার সরকার এদের ঝেড়ে ফেলতে চাইছে। বাস্তুহীন মানুষ, রাজপথের দরিদ্র হকার এদের চলে যেতে হবে দূরে শহরের প্রান্তে, এটাই বোধহয় এদের আসল উদ্দেশ্য্।

রাস্তা দখল কি শুধুমাত্র হকার বা বাস্তুহীন মানুষেরাই করেন? যত্রতত্র পার্কিং করা গাড়ির জন্য বহু রাস্তা আংশিকভাবে বদ্ধ হয়ে থাকে। সল্টলেক ও শহর কলকাতার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বেশিরভাগ গাড়িই বোধহয় গ্যারেজে নয়, রাস্তায় থাকে। দুপাশে রেখে দেওয়া গাড়ির মাঝখান দিয়ে গাড়ি চালানো আর ছুঁচে সুতো পড়ানো প্রায় সমার্থক বলা যেতে পারে। সিকিমে এক সময়ে নিয়ম করা হয়েছিল, নতুন কোনো গাড়ির রেজিস্ট্রেশন করাতে গেলে গাড়ি রাখার জায়গা দেখাতে হবে। এখানে অবশ্য লোকে গ্যারেজ থাকলেও তা অন্য কাজে লাগায়; গাড়ির ক্রমবর্ধমান সংখ্যার কারণে ঘটেছে সবিশেষ স্থান সঙ্কুলান। যথারীতি গাড়ি থাকে রাস্তায়, অবশ্যই দখল করে এবং যাতায়াতের পথ সঙ্কুচিত করে। আবার শুধু গাড়ি নয়, বাড়িগুলির বিভিন্ন বর্দ্ধিত অংশও নানাভাবে দখল করে রেখেছে সাধারণের ব্যবহৃত পথের একটা বড়ো অংশকে। বড়ো দোকানগুলো যাদের অনেক যুক্তিযুক্ত অভিযোগ আছে হকারদের বিরুদ্ধে, তারাও বিভিন্ন অজুহাতে সামনের পথ অনায়াসে দখল করে ফেলে!

এসব খুব একটা আলোচ্যসূচীতে আসার কথা নয়; কারণ, এক্ষেত্রে রাস্তা দখলকারীরা শুধু ধনবানই নন, যথেষ্ট ক্ষমতাবানও বটে! তাই যত সহজে বা প্রায় অনায়াস ক্ষিপ্রতায় হকার উচ্ছেদ করা যায় তা কখনোই আশা করা যাবে না, এসব ক্ষেত্রে।

আসলে, কোনো সমস্যাই একমাত্রিক নয়। 'দিন-আনি-দিন-খাই' মানুষেরা কদিন আগেই স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়েছিল এই ভেবে যে তাদের আর তোলা দিতে হবেনা। এই রাজ্যের আসমুদ্রহিমাচল সমস্ত অঞ্চল ছেয়ে গেল গেরুয়া পতাকায়, প্রত্যাশা-ভয়-ভক্তি-উল্লাসের অদ্ভুত সমন্বয়ে।

আর আজ? তোলা নয়, তাদের একেবারে তুলেই দেওয়ার উপক্রম! অনেকের কাছে যা উপার্জনের বা বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন, এক কথায় তা বাতিল হবার পথে! আশা ভরসার কী অসামান্য পরিণতি!

একটা জিনিস পরিষ্কার করা উচিত, হকার কাকে বলব আর হকার ও দোকানদারের মধ্যে পার্থক্য কী? হকার হল মোবাইল ইউনিট, আর দোকানদার হল স্থায়ী ইউনিট। হকারের কিন্তু স্থায়ী স্ট্রাকচার থাকার কথা নয়। বস্ততঃ, পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত শহরে হকার আছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা দিনের শেষে পসরা গুছিয়ে চলে যায় সমস্ত কিছু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে। টুকিটাকি জিনিস, সস্তায় বা আয়ত্তের মধ্যে ভালো খাবার বা বিভিন্ন তুলনামূলক কম দামের শিল্পকর্মের সংগ্রহ, পুরোনো বই - এ সব কিছুতে এই 'হকার'দের ভূমিকা শুধু অসাধারণ নয় অনেক ক্ষেত্রেই অপরিহার্য। পৃথিবীর অনেক শহরে এরকম ঐতিহ্যয়মণ্ডিত 'হকিং জোন' আছে যা ট্যু রিস্টদের কাছেও যথেষ্ট আকর্ষণীয়।

মনে রাখতে হবে, হকারি শুধু বিরাট সংখ্যক মানুষের জীবন জীবিকার একমাত্র উপায় নয়,বিশাল সংখ্যক মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা ও প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অনেক সময়ে তা যথেষ্ট অর্থ সাশ্রয়কারীও বটে। রাস্তার ধারের জলখাবার বা একটি মিল যে টাকায় হয়ে যায়, দোকানে গিয়ে খেলে সেই টাকাতে তার কতো অংশ আশা করা যাবে? রেলের প্লাটফর্মে সামনে লুচি-পুরি-তরকারি তৈরি করে যে দামে বিক্রি হত এতকাল, সেই টাকা দিয়ে রেলের নির্ধারিত দোকানে খাবার খেতে গেলে অর্থ অনেক বেশি লাগবে। রেল বলছে, সেগুলো যথেষ্ট স্বাস্থ্যরবিধি মানত না। আসলে স্বাস্থ্যযবিধিটা আমাদের কোনো পছন্দের মধ্যে্ পড়ে না, আমরা খাবারের স্বাদে যে গুরুত্ব দিই, তার সিকির ভাগও গুরুত্ব দিই না খাবারের স্বাস্থ্যেবিধিতে। দোকান ছেড়ে দিন বড়োবড়ো হোটেলগুলোর রান্নাঘরে গিয়ে একবার দেখুন কীভাবে রান্না হচ্ছে, খাবার রাখা হচ্ছে, একশ জনের মধ্যো দশজনও পাশমার্ক পাবে কিনা সন্দেহ।

ফুটপাথ বা প্লাটফর্মে স্বাস্থ্যেবিধি ভঙ্গ হচ্ছে প্রকাশ্যেধ আর অন্যপদের ক্ষেত্রে চোখের আড়ালে। দ্বিতীয়টা কিন্তু অনেক বেশি বিপজ্জনক। যেটা দরকার সেটা হল সমস্ত 'খাবারের জায়গায়' স্বাস্থ্যেবিধি মানা বাধ্য্তামূলক করার ব্যুবস্থাবলী নেওয়া এবং বারে বারে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয়ভাবে 'ওয়ার্কশপ অর্গানাইজ' করা। বিভিন্ন লেভেলে 'ফুড ইন্সপেক্টর' পদের সংখ্যারবৃদ্ধি ও তাদের কাজের সমন্বয়সাধন। মূল কথা, দরকার ছিল একটা সদিচ্ছার যা উন্নত করতে পারতো সাধারণ 'ফুড সেফটি'। রেলের প্লাটফর্ম থেকে খাবারের স্টল তুলে দিয়ে বাণিজ্যি ক সংস্থার দোকানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মধ্যে একটা ইচ্ছে তো আছে, কিন্তু সেটা 'সৎ+ইচ্ছা' কিনা গুরুতর সন্দেহ আছে। জানিনা, সাধারণ রেলের কামরাতেও ক্রমে 'সাধারণ' হকার হারিয়ে যাবে কিনা।

আসলে, কোনো সমস্যার চটজলদি বা সিঙ্গেলট্র্যাক সমাধান সম্ভব নয়। সমাধান বার করতে গেলে প্রশাসন ও সরকারকে বসতে হবে তাদের সঙ্গে যাদের মাথার উপর ঝুলছে উচ্ছেদের নোটিশ, কথা বলতে হবে সরাসরি। অসুবিধাটা কোথায়, গণতন্ত্রে তো বনিয়াদ হল 'dialogue', গ্রিক শব্দ dia(through) আর logos(discourse)-এর স়ংমিশ্রণ। সরকার বা প্রশাসন কথা তো বলুক হকারদের সঙ্গে। তাদের সমস্যা, সরকারের পরিকল্পনা, বাস্তব পটভূমিকা, পথচলতি মানুষের সমস্যার এ সব কিছু নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা না করার কী আছে?

সাধারণ পথচলতি মানুষের অনেক ক্ষেত্রে অসুবিধা হয় প্রায় পুরো ফুটপাথ হকারের দখলে থাকায়, যাতায়াতের রাস্তা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় বিপজ্জনকভাবে নামতে হয় বড়ো রাস্তায়। তার প্রতিবিধান দরকার। কিন্ত এটাও মনে রাখতে হবে, হকার মানেই 'বেআইনি' নয়। Street Vendors Act 2014-তে হকারদের আইনি স্বীকৃতি ও অধিকার দেওয়া আছে। তার ভিত্তিতে কথা বলা সম্ভব, বিচ্যুrতি ও সমস্যড়/অসুবিধাগুলো ঠিক কোথায় কোথায়।আলোচনা এলাকা ধরে ধরে করতে হবে,প্রতিটি এলাকার সমস্যাি এক হতে পারে না। ঠিকই, পুরো কাজটা সময়সাপেক্ষ এবং যথেষ্ট ধৈর্যের অপেক্ষা রাখে। তবে, মনে রাখতে হবে, হকাররাও এ দেশের নাগরিক। তাদের উপর যারা নির্ভর করে আছে এবং সর্বোপরি খরচ সঙ্কুলান করতে যারা প্রতিনিয়ত তাদের কাছে যায়, সব মিলিয়ে মোট সংখ্যাটা কিন্তু কিছু কম হবে না।

একটা কথা পরিষ্কার রাখা ভালো। স্বাধীনতার পরে পরপর যে দলগুলি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে, প্রত্যেকেই এসেছে প্রবল জনপ্রিয়তা নিয়ে, এবং রাজত্বও করেছে টানা বেশ কিছু বছর। কিন্তু, তাদের সকলেরই পতন শুরু হয়েছে যখন থেকে তারা মানুষের কথায় কর্ণপাত করা বন্ধ করে নিজেদের মতো করেই সব সিদ্ধান্তই নিতে লাগল। বস্তুত, এটাকে প্রায় স্বতঃসিদ্ধই বলা চলে, ব্যতিক্রমের বিন্দুমাত্র স্থান ব্যতিরেকেই। যারাই শাসন করুক, এটা তাদের সকলের ক্ষেত্রেই বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ৷ আর, সেটা মাথায় থাকলে সকলেরই মঙ্গল...

পরিশেষে, গত ৫ জুন আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত এক স়ংবাদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করব। এক জেসিবি (বুলডোজার) চালকের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা, এক প্রৌঢ়া তার যন্ত্রের সামনের অংশ (বাকেট) ধরে আপ্রাণ চেষ্টা করছে পথ আটকাতে। পুলিশ জোর করে সরিয়ে নিয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু চালকের মনে রয়ে গেছে সেই ছবিটা। সে গ্রামের বাড়িতে ফিরে গেছে, বলেছে,'গরীবের পেটে লাথি মারতে পারব না', তাতে যদি কম খাওয়া জোটে তাও সই। এই সংবেদনশীলতা কি সমাজের একটা বিশেষ স্তরেই সীমাবদ্ধ? সমাজের নীচের অংশ পেরিয়ে যত উপরের দিকে ওঠা যায়, ততই যেন তা ক্রম অপসৃয়মান।