আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ দ্বাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ জুন, ২০২৬ ● ১-১৫ আষাঢ়, ১৪৩৩
প্রবন্ধ
সস্তার বাস্তুতন্ত্র বনাম বড়লোকের শহর
অর্ক ভাদুড়ি
"সরগরম কিন্তু বাইরে রাস্তা, পানের দোকান/ রেডিওতে হঠাৎ একটা পুরোনো গান/ তার সুরটা চেনা চেনা বলেই ছোয়াঁচ লাগে/ কলকাতাতে সন্ধে হবার একটু আগে।"
গত মাসখানেকের ওপর কলকাতাতে সন্ধ্যে নামছে ক্রমশ শুনশান হয়ে। যে পানের দোকান, চায়ের দোকানগুলোতে রেডিও বাজে, জমে ওঠে আড্ডা থেকে রাজনৈতিক আলোচনা, তা এই শহরের যৌথজীবনের দৈনন্দিন ধারক বাহক। এই জমজমাট দোকানপাটই পড়েছে রাজ্যের নবনির্বাচিত সরকারের অতিতৎপর প্রশাসনের উদ্যত বুলডোজারের নীচে।
রাস্তায় চা খাই যারা, গুমটি দোকানে দুপুরের খাবার বা সন্ধ্যের জলখাবার, স্টেশনে বা স্কুল কলেজের সামনে শসা-পেয়ারা-ঘুঘনি - তারা জানি কেমন করে ঘরের গল্প বা সামাজিক হতাশার কথা উঠে আসে টাকার নোট আর খাদ্যসামগ্রীর হাতবদলের ফাঁকে ফাঁকে। জানি ফুটপাথের পরিচিত বাজারে হিসেব করে কেনা ফুলকপি বেগুনের সঙ্গে কেমন অবলীলায় চেয়ে নিই একমুঠো লংকা। রোজকার চেনাজানা হয়ে যাওয়া এই দোকানিরা এক-আধদিন ভালোবেসে নিজেরাই এটা ওটা ফাউ দেন। গরমের দিনে বলেন দোকানের ছায়ার মধ্যে দাঁড়াতে, জিজ্ঞেস করেন জল খাব কি না।
কাচের দরজাওয়ালা কোনো শোরুমে - তা সে ফোনের শোরুম হোক, কাপড়জামার, অথবা কেক প্যাটিস মিষ্টির - পণ্য বেচাকেনার বাইরের কোনো আলাপ তেমন জায়গা পায় না। বাজার করতে গিয়ে দরদাম করার যে দক্ষতা অথবা আনন্দ, তা ফলাবার সুযোগও ওই কাচের দরজার ওপারে খুব একটা থাকে না। স্থানীয় পরিচিত ব্যবসায়ীর দোকান হলে যেটুকু বা বাড়তি আলাপচারিতা ও দরাদরির সুযোগ থাকে, ব্র্যান্ডেড দোকানে সেটুকুও নয়।
মিয়ো আমোর, হলদিরাম, ওয়াও মোমো, সিসিডি, খাদিমস, বিগ বাজার - বিক্রেতাদের পোশাকী নাম ফ্রাঞ্চাইজি কিম্বা রিটেইলার। দোকানের পোশাকী নাম আউটলেট। সেই আউটলেটের কমবয়সী কর্মচারীরা কথা বলেন কম শব্দে, হাসি দেন মাপজোক করে (আদৌ দিলে), বিক্রয়যোগ্য জিনিসের বিবরণ দেন পেশাদারি কণ্ঠস্বরে। তাঁরা বিক্রেতা নন, কর্মচারী। এবং কর্মের সঙ্গে কর্মীর বিচ্ছিন্নতার তথা বাকি সমাজের সঙ্গেও তার বিচ্ছিন্নতার মার্ক্সীয় তত্ত্ব সেখানে হাতে হাতে ফলিত।
পুঁজিবাদী বৃহৎ বিপণন বৈচিত্র্যের পরিপন্থী। একচেটিয়া পুঁজি সংজ্ঞাগতভাবেই ক্রেতার নির্বাচনের অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিক্রেতার সংখ্যা যত কম আর ক্রেতার সংখ্যা যত বেশি, ক্রেতার "না" বলার অধিকার তত কম। আর "না" বলার অধিকার যত কম, পণ্যের দাম ও মানের ওপর ক্রেতার নিয়ন্ত্রণও ততই কম।
কলকাতা শহরের স্ট্রীটফুডের খ্যাতি তো জগৎজোড়া। এই রাজ্যের প্রতিটি শহরে মফস্বলে আজও যে বিচিত্র খাবারের সুস্বাদু সম্ভার যে দামে মেলে তার পিছনে প্রধান ভূমিকা এই অস্থায়ী বিক্রেতা, ফেরিওয়ালা ও পুরোনো দোকানদারদের। অথচ, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে তাঁদেরই একটা বড় অংশকে এক কথায় "অবৈধ" বলে দাগিয়ে দিচ্ছে আমাদের "আগে বেড়ে চলা" সমাজ।
নির্বাচনী পালাবদল - উল্টে যাওয়া প্রতিশ্রুতি
"পাল্টানো দরকার, চাই বিজেপি সরকার" অথবা "ভয় আউট, ভরসা ইন"-এর মত শ্লোগান দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে সরকার গঠন করা দলটি রাজ্যের ও রাজধানীর "সৌন্দর্যায়নে" বদ্ধপরিকর। এবং এই সৌন্দর্যায়নের ক্ষেত্রে তাদের মূল নীতিই হল ঝাঁ চকচকে নয় এমন সমস্ত কিছুকে দৃষ্টির আওতা থেকে সরিয়ে ফেলা। তাতে হাজার হাজার পরিবার রাতারাতি ভেসে যাক, সরকার দায় নিতে নারাজ।
পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত ইস্যুগুলো ছিল অনুপ্রবেশ ও সরকারি দুর্নীতি। রাজ্যে বেকারত্ব এবং শিল্প তথা কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরী না হওয়ার আলোচনাও মূলত সরকারি দুর্নীতিকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছিল। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী সুরক্ষার মত বিষয়গুলোও তাই। বিগত সরকারের কারণে রাজ্যের উন্নয়ন আটকে গিয়েছে - এ ব্যাপারে বাকি সমস্ত দলই একমত ছিল, কিন্তু অন্য দল ক্ষমতায় এলে সেই আটকে যাওয়া উন্নয়নকে বাস্তবায়িত করার রূপরেখা কী হবে তা নিয়ে আলোচনা ছিল না।
৪ঠা মে নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকেই "মুসলমানদের টাইট দেওয়ার" সমান্তরালে শুরু হল রাজ্যের নিম্নবিত্ত খেটে খাওয়া মানুষের পেটে লাথি মারা। ফল ঘোষণাই বা কেন, দ্বিতীয় দফার ভোট মিটতেই, ৩০ এপ্রিল তারিখে পূর্ব রেলের হাওড়া ডিভিশনের তরফে নোটিশ জারি করে ২রা মে-র মধ্যে "অবৈধ দখলদারদের" রেলের জায়গা থেকে উঠে যেতে বলা হয়েছিল। নির্দেশ অমান্য করলে উচ্ছেদের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছিল ওই নোটিশে। নোটিশ যায় দমদম, শিয়ালদা, হাওড়া, পূর্ব বর্ধমান, মেমারী, ব্যান্ডেল, মগরা, প্রভৃতি অনেকগুলো স্টেশনে। বলা বাহুল্য, এই বিপুল পরিমাণ হকার উচ্ছেদের সম্ভাবনা নির্বাচনের আগে স্পষ্ট হলে ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে নিম্নবিত্ত মানুষের বড় অংশের সমর্থন বিজেপি হারাতে পারত।
বিগত চল্লিশ পঞ্চাশ বছর ধরে ওই জমিতে দোকান চালানো বা বসবাস করা মানুষেরা উঠে যেতে সম্মত হননি, বলাই বাহুল্য। তিনদিনের মধ্যে এতো এতো মানুষজন যাবেনই বা কোথায়? ২রা মে'র রাতেই উচ্ছেদ অভিযান চলল পাণ্ডুয়া স্টেশনে। ফল ঘোষণার পরের দিন ভেঙে দেওয়া হল বালি স্টেশন লাগোয়া মাছের বাজার। তার কয়েকদিনের মাথায় সম্পূর্ণ ফাঁকা করে দেওয়া হল শিয়ালদা স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম। পূর্ণ উদ্যমে উচ্ছেদ অভিযান চলল পূর্ব বর্ধমান, আসানসোল, রানীগঞ্জ, বহরমপুর, চাকদা সহ বিভিন্ন জায়গায়। কোথাও কোথাও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা রেল কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেন কিছুটা বাড়তি সময় চেয়ে। এতে সময় বাড়ানো হয় ১৮ মে পর্যন্ত। ১৯ মে রাতেই বুলডোজার চলে মেমারী স্টেশনে। ক্রমে, হাওড়া স্টেশন, বেলঘড়িয়া স্টেশন। ৩০ মে রাত্রে তছনছ করে ফেলা হল দমদম স্টেশন। ওই রাতেই ভাঙা পড়ল উত্তরপাড়া স্টেশনের দুইদিকের মাছ এবং ফল-সবজির বাজার। পরিবেশ দিবসের প্রাক্কালে গুঁড়িয়ে দেওয়া হল কলকাতার মল্লিকঘাটের সুবিশাল ফুলের বাজারও।
স্থানীয় বিক্রেতারা রুখে দাঁড়ালেন কোথাও কোথাও। বামপন্থী দলগুলোর নেতৃত্বে প্রতিরোধ সংগঠিত হল। জয়নগরে একজোট হয়ে উচ্ছেদ রুখতে পারলেন হকাররা। যাদবপুর রেলওয়ে সাইডিংয়ে স্থানীয় মানুষ ও বামপন্থী নেতৃত্বের যৌথ প্রচেষ্টায় ফিরিয়ে দেওয়া গেছিলো প্রথম দিনের উচ্ছেদ অভিযান। কথা হয়েছিল খতিয়ে দেখা হবে আইনি দলিলপত্র এবং ২৯এ জুন অবধি ওই জায়গায় উচ্ছেদ স্থগিত থাকবে। অথচ পাঁচদিনের মাথায় প্রবল ঝড়জলের রাত্রে ফের চড়াও হল বুলডোজার। মাত্র দশ মিনিটের নোটিশে ভেঙে দেওয়া হল সাইডিংএর বাজার এবং বসতিগুলো। বিপুল সংখ্যায় সুসজ্জিত পুলিশ বাহিনী এনে মেরে ভাগিয়ে দেওয়া হল সমস্ত প্রতিবাদকারীকে, যাদের মধ্যে ছিলেন বর্ষীয়ান বামপন্থী নেতা তথা প্রাক্তন সাংসদ ও বিধায়কও। জল থইথই যাদবপুরে বুলডোজারের থাবায় চুরমার হয়ে গেল তখনও ভিতরে আলো জ্বলতে থাকা ঘরবাড়ি - মানুষের ঘরবাড়ি।
সৌন্দর্যায়নের ফাঁকি - 'অমৃত ভারতে' গরলের ভাগ কার?
খ্যাপা ষাঁড়ের মতো বুলডোজারের এই বিপুল ভাঙচুর চলছে বেআইনি দখলদারির হাত থেকে রেলের জমি পুনরুদ্ধারের নামে। কিন্তু রেলের জমিতে এইসব অস্থায়ী বাজার নিয়মিত বসছে বছরের পর বছরে ধরে। হঠাৎ ২০২৬-এ এসে সেই দখলদারি মুক্ত করার প্রয়োজন কেন? উত্তরটা হল "অমৃত ভারত" প্রকল্প।
এই প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে গোটা দেশ জুড়ে ১২৭৫টি রেলস্টেশনের ভোল বদলে দেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ (১)। এর মধ্যে ছিল পশ্চিমবঙ্গেরও ৯৫টি স্টেশন, পরে সে সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়ায় ১০২তে। বস্তুত, নির্বাচিত স্টেশনের সংখ্যার বিচারে উত্তর প্রদেশ এবং মহারাষ্ট্রের পরেই রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। কিন্তু উচ্ছেদ কি কেবল এই ১০২টি স্টেশনেই সীমিত থাকবে বা থাকছে? কারণ এই তালিকার মধ্যে কিন্তু মেমারী, পাণ্ডুয়া বা উত্তরপাড়া নেই। দমদম, শিয়ালদা, হাওড়া, কলকাতার নাম থাকলেও, আলাদা করে নেই যাদবপুর স্টেশনের নামও।
রাস্তা চওড়া করা, গাড়ি পার্কিং-এর জায়গা বাড়ানো, এবং স্টেশন ও স্টেশন লাগোয়া অঞ্চল থেকে "অবাঞ্ছিত নির্মাণ" হটানোর পাশাপাশি, প্রস্তাবিত সংস্কারের মধ্যে রয়েছে "এক স্টেশন, এক পণ্য" নামের পরিকপল্পনা। এই পরিকল্পনায় স্টেশনগুলোতে নির্ধারিত শোরুমের মাধ্যমে স্থানীয় হস্তশিল্প, বয়নশিল্প, চা-কফি বা আঞ্চলিক খাদ্যদ্রব্য বিক্রী করা হবে। বিশ্ববাংলা শোরুমের কথা মনে পড়ছে কি? তার সঙ্গে সঙ্গে ওই শোরুমে বিক্রীত পণ্যের দামও মনে পড়ছে নিশ্চই?
গতবছর নভেম্বরে দ্য হিন্দুর করা প্রতিবেদন (২) অনুযায়ী, সমস্ত জোনের জেনারেল ম্যানেজারদের কাছে পাঠানো একটি নির্দেশিকায় ভারতীয় রেল বোর্ড জানায় যে ম্যাকডোনাল্ডস, কেএফসি, পিজ্জা হাট, বাস্কিন রবিন্স, বিকানেরওয়ালা, হলদিরাম প্রভৃতি "সিঙ্গল ব্র্যান্ড ফুড আউটলেট"কে এবার থেকে নিলামের ভিত্তিতে স্টেশনে জায়গা দেয়া যাবে। শুধু তাই নয়, পূর্বতন পলিসিতে সংশোধন এনে "প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড কেটারিং আউটলেট" নামে একটি নতুন ব্যবসায়িক ক্যাটিগরি তৈরী করে ন্যূনতম লাইসেন্স মূল্যে এই ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোকে পাঁচ বছরের চুক্তি দেওয়ার কথা বলা হয়।
অর্থাৎ, স্টেশন চত্বর থেকে "অবৈধ" হকারদের সরিয়ে দেওয়ার কারণ কেবল তাদের আইনি বৈধতার অভাব নয়। বরং, হকারদের সরিয়ে বৃহৎ ফ্রাঞ্চাইজি গুলোকে জায়গা করে দেওয়াই এই জমি পুনরুদ্ধারের পিছনে মূল কারণ।
উচ্ছেদের নৈতিকতা - কী বৈধ আর কে অবৈধ?
কিন্তু জমি যেমন সরকারের, দেশের জনগণের হেফাজতের ভারও তো সরকারের। তাহলে সরকার অথবা সরকারের অধীন রেলদপ্তর কি চাইলেই দেশের যেকোনো জমি থেকে উঠিয়ে দিতে পারে সেই জমির ব্যবহারকারীদের?
এইখানে দুটো বিষয় আসে। এক, রেলের জমি রেলের হল কেমন করে? আর দুই, জমির অধিকারের আইনি ভিত্তি কি নিছক মালিকানা?
উনিশ শতকের ঠিক মাঝামাঝি হাওড়া থেকে রানীগঞ্জ পর্যন্ত রেললাইন স্থাপনের জন্য হুগলী নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের বিস্তীর্ণ জমি দখলে নেয় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। কোনরকম ক্ষতিপূরণ ছাড়া গ্রামকে গ্রাম জমি গায়ের জোরে দখল করে কোম্পানি। ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় স্থানীয় মানুষের ঘরবাড়ি, বাংলার সমৃদ্ধ প্রাচীন জনপদ। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সেই জমি ইস্টার্ন ইন্ডিয়া রেলওয়ের হাতে তুলে দেয় কোম্পানি।
ভারতের মাটিতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য পোক্ত হওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রেললাইনের প্রসার ঘটে বাণিজ্যিক ও সামরিক প্রয়োজনে। একের পর এক জমি অধিগ্রহণ আইন আনা হয়। রাতারাতি নিজেদের জমিতে অবৈধ হয়ে যান অগুনতি পরাধীন ভারতবাসী। বিশেষত প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সামরিক প্রয়োজনের অজুহাতে লক্ষ লক্ষ একর জমি রেলের দখলে যায়। বর্তমানে ভারতীয় রেলের অধীনস্থ মোট জমির ৯০ শতাংশের কাছাকাছিই ব্রিটিশ আমলের বলপূর্বক কেড়ে নেওয়া জমি।
সেদিনকার ব্রিটিশ সরকারের ভূমিকায় আজ স্বাধীন ভারতের নির্বাচিত সরকার। আর বিলিতি রেল কোম্পানির জায়গা নিয়েছে আদানি আম্বানির মত দেশীয় ধনকুবেরের দল। সঙ্গে আছে বিদেশী ফ্রাঞ্চাইজিও।
দ্বিতীয় প্রশ্নটা হল মালিকানা রেলের হলেও, দীর্ঘদিন ধরে ওইসব জমিতে বসবাস বা ব্যবসা করা মানুষের ওপর দখলীসত্ত্বা বর্তায় কি না। ১৯৬৩ সালের লিমিটেশন এক্ট অনুসারে সরকারের মালিকানাধীন কোনও জমিতে একটানা তিরিশ বছর কেউ থাকলে ওই জমির ওপর তারও মালিকানা জন্মাবে। কোথাও কোথাও এই আইনের ভিত্তিতে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আদালতে আপীল করা হচ্ছে। আপীল হচ্ছে ২০১৪ সালের স্ট্রিট ভেন্ডরস অ্যাক্টের ভিত্তিতেও।
যদিও, রেলের যুক্তি হল ২০১৪র ওই অ্যাক্ট কেবল সাধারণ ফুটপাথের হকারদের সুরক্ষা দিতে পারে। রেলের জমির ক্ষেত্রে সেটি প্রযোজ্য নয়। ১৯৮৯ এর রেলওয়ে অ্যাক্টের ১৪৪ ধারায় রেলের জমিতে বিনা লাইসেন্সে যেকোনো ধরনের বিকিকিনি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু মানুষের জীবনধারণের জন্য মাথা গোঁজার ঠাঁই লাগে, লাগে রুজি রুটির উপায়ও। তাই যাবতীয় আইনি তর্কের পরেও প্রশ্ন থেকে যায় সেই জীবনধারণের বৈধতা কেবল আইন দ্বারা নির্ণয় করার নৈতিকতা নিয়ে।
অসংগঠিত অর্থনীতির বাস্তুতন্ত্র বনাম পুঁজির রাজনীতি
জীবনধারণের নৈতিকতার কথায় প্রশ্নের মুখে পড়ে রাজ্য এবং কেন্দ্র উভয় সরকারই। সরকারি বেসরকারি চাকরি তথা সংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সুযোগ আমাদের দেশের বিপুল পরিমাণ কর্মক্ষম জনসংখ্যার জন্য নিতান্তই অপ্রতুল। নীতি আয়োগের তথ্য অনুযায়ী ভারতের জিডিপির ৫০-৫৫% আসে সংগঠিত ক্ষেত্র থেকে আর বাকি ৪৫-৫৫% অসংগঠিত ক্ষেত্রের অবদান।
অসংগঠিত ক্ষেত্রের একটা বড় অংশই অস্থায়ী বিক্রেতা বা হকার। ক্রমবর্ধমান নগরায়নের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষের সংখ্যা। শহরাঞ্চলে, বিশেষত মেট্রো সিটিগুলোতে যাত্রী বাড়ার সঙ্গে বেড়েছে রেল-বাস-মেট্রো স্টেশন সংলগ্ন বাজারও। হকার সংগ্রাম কমিটির তথ্যমতে ২০২৪ সালে ভারতে হকারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৭ লক্ষ।
একই শহরে নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত সকলের সহাবস্থানের জন্য প্রয়োজন সকলের সাধ্যের উপযুক্ত পণ্য। মেট্রোসিটিতে বিপুল সংখ্যক নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনধারণ সম্ভব হয় এই অস্থায়ী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য, যাঁরা নিজেরাও একইসঙ্গে ক্রেতা ও বিক্রেতা। আবারও মার্ক্সের বিচ্ছিন্নতার তত্ত্বকে ভিত্তি করে দেখি যে ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র পুঁজির ব্যবহার অনেকাংশেই ব্যক্তিগত উৎপাদন-নির্ভরও বটে। এই সীমিত সম্ভাবনার স্বাধীন মালিকানা উৎপাদক-ব্যক্তির সম্প্রদায়গত স্বভাব বাস্তবায়িত করতে সাহায্য করে। স্বাধীন ক্ষুদ্র পুঁজি ধ্বংস করে দিলেই কিন্তু অসংগঠিত অর্থনীতি শেষ হয়ে যায় না। বরং বর্তমান পুঁজিবাদী বাজারব্যবস্থায় বড় ব্যবসাকে আশ্রয় করে গড়ে ওঠে গিগ ইকোনমি - যেখানে কর্মীরা স্বাধীনও নন, আবার তাদের জীবিকার নিশ্চয়তাও ন্যূনতম।
অন্যদিকে সস্তায় নানারকমের ভালো জিনিস পাওয়ার সুযোগ কমে গেলে সার্বিকভাবেই ভোক্তার জীবনধারণের খরচ বৃদ্ধি পায়। তাই হকারদের সরে যাওয়াকে কেবল তাঁদের জীবন ও জীবিকার প্রশ্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আপামর ক্রেতাস্বার্থ। হকার উচ্ছেদের মাধ্যমে আমাদের নগর মফস্বলের নিজস্ব সস্তার বাস্তুতন্ত্রকে উৎখাত করে বড় পুঁজির হাতে তুলে দিতে চাইছে বর্তমানের বানিয়া সরকার। স্কুলে স্কুলে বন্দেমাতরম বাধ্যতামূলক করার সমান্তরালে চলছে দেশী ছোট পুঁজি ধ্বংস করে দেশী ও বিদেশী বৃহৎ পুঁজির হাতে সাধারণ নাগরিকের জীবনকে বন্ধক দেওয়া, একবার বাঁধা পড়লে যা আর সহজে ছাড়ানো যায় না।
শহরের জলছবি
"লোহার গেটের পাশে উনুন ধরায় কারা?/ রেলিং ঘেঁষেই সংসার করে কজন বাস্তুহারা।/ একটু দূরেই আছে ক্যাচক্যাচে টিপকল/ পড়ন্তবেলা বালতিকে বলে "চল রে জলকে চল"
এই ফুটপাথে ত্রিপলের সংসার, রান্নাবাড়া, বিকেলবেলার কলে জল আসা, চপের দোকানে উনুন ধরানো আর চায়ের দোকানে ধোঁয়া ওঠা - এই সবকিছুই বাঙালির সামাজিক এবং নিভৃত জীবনের সঙ্গী। সুমন বা অঞ্জনের গান তাই বারবার এই পথবাসীর কলকাতার কাছে এসে দাঁড়ায়।
আর প্রগতির শর্তাবলী বারে বারে দাঁড়ায় এই কলকাতার বিপক্ষে। হকার উচ্ছেদের উদ্যোগ কমবেশি বিগত সব সরকারের আমলেই হয়েছে। ষাটের দশকে কংগ্রেস সরকার করেছে। বাম আমলে ১৯৯৬ সালের অপারেশন সানশাইনে একইভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল শ্যামবাজার, হাতিবাগান, গড়িয়াহাটের ফুটপাথের অবৈধ দোকানপাট। তৃণমূল সরকারের আমলে বিভিন্ন জায়গায় হকার উচ্ছেদ হয় ২০২৪এর লোকসভা নির্বাচনের পর। অনেকক্ষেত্রেই মেলেনি ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসন, অথবা মিললেও তা ব্যবসার পক্ষে সুবিধেজনক হয়নি।
প্রতিটি উচ্ছেদের পরেও আবার সেই জায়গা ধীরে ধীরে ভরে উঠেছে নতুন বিক্রেতায়। আমাদের এই বিপুল জনসংখ্যা ও জনঘনত্বের দেশে জমি আসলে ফাঁকা পড়ে থাকে না। দেশভাগের খাঁড়ার ঘা থেকে এখনো রক্ত ঝরে নিঃশব্দে। তারপরে আসে নতুন নতুন উদ্বাস্তুর ঢল। রাজনীতির পাকেচক্রে বন্ধ হয়ে যায় একের পর এক কারখানা। আসে নোটবন্দি। আসে কোভিড। আসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ছাঁটাই হওয়া চাকুরে একদিন হাঁড়িকুঁড়ি নিয়ে চা অথবা ঘুঘনি বানাতে দাঁড়িয়ে পড়েন রাস্তার ধারে।
হকার উচ্ছেদে কেবলমাত্র পশ্চিমবঙ্গে ঘটছে এমনটা না। অমৃত ভারত প্রকল্পের জন্য উচ্ছেদকে কেন্দ্র করেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছে অন্যান্য কোনও কোনও রাজ্যেও। মূল বিষয়টা যেহেতু কর্পোরেট আদলে উন্নয়নের মডেল এবং স্বাধীন ক্ষুদ্র পুঁজির মধ্যেকার দ্বন্দ্ব, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে হকার উচ্ছেদের নজির তাই বিরল নয় একেবারেই। বিভিন্ন কালপর্বে অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে প্রতিবেশী বাংলাদেশ, শ্রীলংকা থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে (৩)। মেক্সিকো থেকে ঘানা, আর্জেন্টিনা থেকে পেরু, জিম্বাবুয়ে থেকে মালাউই - শহর পরিচ্ছন্ন করার নাম করে পথবিক্রেতাদের নির্বিচারে হটিয়ে দেওয়ার কাহিনী অনেকটা একইরকম (৪)।
পশ্চিমী উন্নয়নের ঝাঁ চকচকে আদলে চোখে ঝিলিমিলি লেগে যাওয়া উচ্চ-মধ্যবিত্তের চিন্তায় স্থান পায় না জীবনের প্রাথমিক চাহিদাগুলো পূরণের জন্য আশেপাশের অগণিত মানুষের লড়াই। তাই গাড়িঘোড়া বৃদ্ধি বা জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে যাতায়াতের অসুবিধে হয় না, কিন্তু ফুটপাতে হকার বসলেই দুই বেলা গাড়িতে চড়া মানুষটিও শহরে হাঁটার জায়গার অভাবে নাক সিঁটকান। বৃহৎ পুঁজিপতিদের ঠাটবাট দেখে অসহায় ঈর্ষা ছাড়া আর কিছু বোধ করার মত চিন্তার স্বচ্ছতা যাদের নেই, চায়ের দোকান দিয়ে কেউ বাড়ি বানিয়ে ফেললে তার কষ্টের রোজগারকে তারা অবৈধ ঠাওরান। রেলগাড়ির অপ্রতুলতা বা রেলের অব্যবস্থার বিরুদ্ধে গলা তুলতে না পারলেও, হকাররা কেন স্টেশন জুড়ে বসলেন তাই নিয়ে একদল মানুষ বলেন "ব্যাটাদের যা বাড় বেড়েছে!"
আমাদের ও আমাদের সরকারের দ্বিচারিতার তালিকা দীর্ঘ করে লাভ নেই। দরিদ্র মেহনতী মানুষ তাঁদের জীবনসংগ্রাম চিরকাল নিজেরাই বুঝে নিয়েছেন। আমরা শুধু যেন মনে রাখি শ্রেণী অবস্থান পরিবর্তনশীল। পুঁজিবাদের সোনার হরিণ আমাদের একলা দৌড় করাচ্ছে। আর ঘরে পথে বাজারে সর্বত্র একা হতে হতে আমরা যে কেউ যে কোনোদিন বুলডোজারের সামনে পড়ে যেতে পারি।
তথ্যসূত্রঃ
(১) ইনফ্রাইনফো হাব।
(২) 'দ্য হিন্দু'র প্রতিবেদন "ম্যাকডোনাল্ডস, কেএফসি, এন্ড আদার পপুলার ফুড ব্র্যান্ডস এট রেলওয়ে স্টেশনস সুন্", ১৫ নভেম্বর ২০২৫।
(৩) সরিৎ ভৌমিক, ২০০৫, "স্ট্রিট ভেন্ডরস ইন এশিয়া: আ রিভিয়্যু", ইকোনমিক এন্ড পলিটিক্যাল উইকলি।
(৪) "ওয়র্ল্ড স্ট্রিট ভেন্ডার্স: ইকোনোমিক ইঞ্জিন অফ আওয়ার সিটিস...", স্ট্রিটনেট ইন্টারন্যাশনাল।