আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ দ্বাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ জুন, ২০২৬ ● ১-১৫ আষাঢ়, ১৪৩৩

সম্পাদকীয়

বঙ্গে অলীক কুনাট্য


২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকে পশ্চিমবঙ্গ তথা দেশের মানুষ যেই অলীক কুনাট্যটি দেখে চলেছেন, তার তুলনা গোটা পৃথিবীতেই বিরল। তৃণমূল কংগ্রেস দল, যারা রাজ্যে ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিল, তারা ক্ষমতা হারাবার পর তাসের ঘরের থেকেও দ্রুততায় অবলুপ্তির পথে বিলীন হয়ে চলেছে। প্রথমে অভিযোগ এল যে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের সময় বিধায়কদের সই জাল করা হয়েছে। কিছু বিধায়ক পুলিশকে সরাসরি জানালেন যে তার সই বলে যা বিধানসভার স্পিকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে তা তার নয়। দুইজন বিধায়ক সরাসরি সরকার তথা স্পিকারকে সই জালিয়াতির অভিযোগ জানালেন। এদের দুইজনকে তৃণমূল কংগ্রেস বহিষ্কৃত করল। কিন্তু কী পরম আশ্চর্য! বাম থেকে বিতাড়িত এই আপাদমস্তক সুবিধাবাদী নেতাটি ৮০ জনের মধ্যে প্রায় ৬০ জনের সমর্থন নিয়ে হয়ে গেলেন পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা! তিনি আবার সাংবাদিক সম্মেলন করে বললেন যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁরা মুখ্য পরামর্শদাতা হিসেবে চান! যিনি দল বানালেন, লড়াই করলেন, প্রায় একক নেতৃত্বে দলকে ক্ষমতায় নিয়ে এলেন, তাঁকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এক সুবিধাবাদী জনসমর্থনহীন নেতা হেলায় পর্যুদস্ত করে দিলেন!

কলকাতায় যখন এইসব কাণ্ড হয়ে গেল, তখন তৃণমূলের সাংসদরা ভাবলেন যে তারাই বা আর মমতার হাত ধরে রেখে কী করবেন! ২৮ জনের মধ্যে ২০ জন সাংসদ লোকসভার স্পিকারকে চিঠি লিখে জানালেন যে তাঁরা সংসদে আলাদা ব্লকের মর্যাদা চান। কিন্তু আলাদা ব্লক বলে কিছু হয় না। তাই এই ২০ জন সাংসদ একটি অস্তিত্বহীন দলে সামিল হয়ে গেলেন। এনসিপিআই দলটি, যদি স্পিকার এই সাংসদদের দাবি মেনে নেন, রাতারাটি ২০ জন সাংসদ পেয়ে গেল! এই তথাকথিত বিক্ষুব্ধ সাংসদরা জানালেন যে তৃণমূলে থেকে তাঁরা কাজ করতে পারছেন না। অতএব দেশ তথা রাজ্যের উন্নয়নের জন্য তাঁরা বিজেপিকেই সমর্থন করবেন সংসদে। অন্যদিকে তৃণমূলের রাজ্যসভার তিন জন সাংসদ রাজ্যসভা তথা দলের সমস্ত পদ থেকে ইস্তফা দিলেন। তাঁরাও রাজ্য তথা দেশে গেরুয়া উন্নয়নের সওয়ারি হওয়ার মনস্কামনা জানিয়েছেন। রাতারাতি একটি দল যারা রাজ্যে ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিল, তার অস্তিত্ব নিয়েই গভীর প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে।উসেইন বোল্টের কিংবদন্তি দৌড়ের থেকেও দ্রুততায় যে একটি রাজনৈতিক দল বিলীন হয়ে যেতে পারে, এইকথা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রদের শেখাল তৃণমূল।

নির্বাচনে ভরাডুবির পরে ঢিল পড়া মৌমাছির চাক ছেড়ে যেমন মৌমাছিরা পালায়, তেমনভাবে তৃণমূল ছেড়ে বিধায়ক ও সাংসদদের পলায়নের মৌলিক দায় মক্ষীরানী মমতারই। সম্পূর্ণভাবে আদর্শহীন একটি দল তৈরি করার কৃতিত্ব তাঁর প্রাপ্য। রাজ্য থেকে বামেদের উৎখাত করার জন্য অতিবাম থেকে শুরু করে প্রতিক্রিয়াশীল দক্ষিণপন্থীদের সমাবেশ ঘটিয়ে তৃণমূল দলের জন্ম। ক্ষমতায় আসার পরে তাদের মূল আকর্ষণ হল অপার দুর্নীতি। সমাজের সমস্ত স্তরে, রাজনীতির সমস্ত স্তরে দুর্বৃত্তায়ন করার নজির গড়েছে তৃণমূল। এলাকায় এলাকায় দাদাগিরি, তোলাবাজি, এসএসসি কেলেঙ্কারি, সারদা কেলেঙ্কারি, রোজভ্যালি সহ হাজারো দুর্নীতির আঁতুড়ঘর হল তৃণমূল দল তথা সরকার। অন্যদিকে, এই দুর্বৃত্তায়ন ও দুর্নীতি যাতে লাগামহীনভাবে চলতে পারে, তার জন্য রাজ্যের গণতান্ত্রিক পরিসরকে প্রায় হত্যা করে তৃণমূল। মুখ্যমন্ত্রী বলেন যে বিরোধীদের ১০ বছর চুপ করে থাকতে হবে। পঞ্চায়েত, পুরসভা, বিধানসভা, লোকসভা সমস্ত নির্বাচনে দেদার ছাপ্পা ভোট, রাজ্যকে বিরোধী শূন্য করে দেওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা, বিরোধীদের জেতা পুরসভা বা বিধানসভা আসন জোর করে নিজেদের দখলে নিয়ে আসা - কী করেনি তৃণমূল। আজ যেই নেতারা এই সমস্ত অপরাধ করেছেন মানুষের সঙ্গে, তারা যখন বুঝতে পারছেন যে তৃণমূলের উপর মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত রাগ রয়েছে, তখন তারা নিজেদের পিঠ বাঁচাতে, রাজনৈতিক কেরিয়ার বাঁচাতে বিজেপির হাত ধরছেন। এই সমস্ত রাজনৈতিক আবর্জনার সঙ্গে সখ্য পাতিয়ে বিজেপিও প্রমাণ করছে যে ক্ষমতা ছাড়া তাদের হারানোর আর কিছুই নেই। তাই ক্ষমতা ধরে রাখতে, তাকে আরও বেশি করে কেন্দ্রীভূত করতে হলে এমন কোনও কাজ নেই যা বিজেপি করতে পিছপা হয়।

অতএব, বিজেপি অনুমোদিত তৃণমূলের ভাঙনের পরে পশ্চিমবঙ্গবাসীর কাছে রয়েছে এমন একটি বিরোধী দল যারা আসলে বিজেপি-র বি টিম। অন্যদিকে সংসদে বিজেপির প্রয়োজন দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদের সমর্থন যাতে তারা লোকসভার আসন সংখ্যা বাড়ানোর বিল, 'এক দেশ এক ভোট' আইন পাশ করাতে পারে। তাই রাজ্যের নবনিযুক্ত মুখ্যমন্ত্রী উন্নয়নের মধ্যে শত ব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও দিল্লি গিয়ে তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ সাংসদদের সঙ্গে মিটিং করেন। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ তাঁর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ রয়েছে তৃণমূলের মধ্যে এই ভাঙনের নেপথ্যে। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গকেও বিরোধীশূন্য করার স্বপ্ন সংসদীয় পরিসরে বাস্তবায়িত করে ফেলেছে। বিধানসভায় তাদেরই পছন্দের বিরোধী নেতা আর লোকসভায় বিক্ষুব্ধ তৃণমূলের সরাসরি সমর্থন তারা পাবে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি যে ধাক্কা খেয়েছিল, তারপরে অনেক রাজ্যে জয় এবং সর্বপরি পশ্চিমবঙ্গে জয়ের ফলে বিজেপি গোটা দেশে অভূতপূর্ব ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে।

একটা সময় ছিল যখন পশ্চিমবঙ্গের মানুষের তাদের রাজনীতি নিয়ে গর্ব ছিল। মতবিরোধ ছিল, এমন কি প্রাণঘাতী আক্রমণও হয়েছে বিভিন্ন দলের মানুষের মধ্যে। কিন্তু তবু একটা বিশ্বাস ছিল যে রাজ্যের নেতারা আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্থ নয়। সরকার তথা শাসকদলে অনেক ভালো মানুষ আছেন। এখানে রাজনীতি হয় আদর্শের ভিত্তিতে। কথায় কথায় এই দল থেকে সেই দলে যাওয়া আসা পশ্চিমবঙ্গের নেতারা করেন না। বামেদের সময়কার এই ধারণাকে গঙ্গার জলে ফেলে দেয় তৃণমূল। আপাদমস্তক দুর্নীতি, রাজনৈতিক সুবিধাবাদ, গণতন্ত্রের হত্যা, বিরোধী দলের নেতাদের ভাঙিয়ে নিজেদের দলে নিয়ে আসা, কী করেনি তৃণমূল! তবু এই সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে জোরদার বিরোধী শক্তি রাজ্যে ছিল। একদিকে বাম প্রগতিশীল শক্তি ও অন্যদিকে বিজেপি। কিন্তু ক্ষমতায় এসে বিজেপি বিরোধী পরিসরকে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করে ফেলল। তাদের হাতে এখন সরকার ও বিরোধী পক্ষ দুই-ই আছে। অতএব রাজ্যে তাদের কর্তৃত্ব বাধাহীনভাবে চলবে, এই আশা যদি বিজেপি নেতৃত্ব করেন, তাহলে তাঁদের দোষ দেওয়া যায় না।

এই দুর্নীতি, সুবিধাবাদ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির সম্পূর্ণ পশ্চাদগামিতার সামনে দাঁড়িয়ে এমন হয়ত অনেকে ভাবছেন যে বামেদের সামনে দরজাটা খুলে গেল বা বামপন্থীরাই বিজেপির এই বাড়বাড়ন্তের মধ্যে দাঁড়িয়ে সঠিক মানুষের রাজনীতি করতে পারবেন। বামেদের থেকে এই প্রত্যাশা করা অমূলক নয়। কিন্তু তাদের অগ্রগতি অবশ্যসম্ভাবীও নয়। রাজ্যের এই রাজনৈতিক অধঃপতনের সামনে দাঁড়িয়ে বাম ও প্রগতিশীল শক্তির আত্মসন্তুষ্টির কোনও কারণ নেই। সামনে তাঁদের অনেক কঠিন লড়াই লড়তে হবে জমি পুনরুদ্ধার করতে। বিজেপি বামেদের এক ইঞ্চি জমিও ছাড়বে না। মানুষের মধ্যে থেকে তাদের জীবনজীবিকা নিয়ে লড়াই করে অনেক পরিশ্রম ও আত্মত্যাগের মাধ্যমেই বামেরা আবার রাজ্যে পুনরুজ্জীবিত হতে পারবেন। সেই লড়াই আজ থেকেই শুরু হোক।