আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ একাদশ সংখ্যা ● ১-১৫ জুন, ২০২৬ ● ১৬-৩১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩
প্রবন্ধ
সলিল চৌধুরী
আনন্দ দাশগুপ্ত
সলিলের অসমাপ্ত আত্মস্মৃতিকণ্ডূয়নের নাম 'জীবন উজ্জীবন'। এক উজ্জীবিত জীবন তিনি যাপন করেছেন তাঁর গানে, কবিতায়, নাটকে, ছোটগল্পে, রাজনীতিতে। কিন্তু সব ছাপিয়ে তাঁর সাংগীতিক পরিচয়টাই আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে। একথা ঠিক যে তাঁর গানে, সে সুর হোক বা কথা, তিনি যা বলতে পেরেছেন ততখানি বোধ করি আর কোনওভাবেই তিনি বলতে পারেননি। তাই আত্মজীবনী লেখায় তাঁর উৎসাহ ছিল না কোনও দিন। অথচ আমাদের মতো সাধারণের জন্য তো জীবনচরিতই সবচেয়ে স্পর্শযোগ্য উপাদান। সলিল চলে গিয়েছেন ৩০ বছর আগে। দেশে-বিদেশে সলিলের অসংখ্য অনুরাগী, গুণগ্রাহী। কিন্তু তাঁর এই শতবর্ষে পৌঁছে আমরা বলতে চাইব, আমাদের সলিল-অনুরাগ দাঁড়িয়ে আছে কেবল অভিভূত তন্ময়তায়। এই ৩০ বছরে আমরা সলিলের কোনও নির্ভরযোগ্য জীবনী লিখে উঠতে পারিনি। এখনও তাঁর জীবনকে জানার জন্য আমাদের সম্বল ইতিউতি কিছু উপাদান। কিছু মানুষের স্মৃতিকথা, খানকতক দায়সারা বা দাঁতভাঙা প্রবন্ধ, আর বেশ কিছু গান। সত্যিই কি সলিলের মতো একজন কৃতী বাঙালির আরও একটু মনোযোগ প্রাপ্য ছিল না? ইদানীং শতবর্ষের আবহে সলিলের লেখাগুলি নতুন করে প্রকাশিত হচ্ছে। এটা আশার কথা, কিন্তু তাঁকে নিয়ে সমাজবিজ্ঞানের, সংস্কৃতিবিদ্যার দৃষ্টিকোণ থেকে তো কাজ হওয়া দরকার, দরকার একটা আপাত নির্মোহ জীবনী ('আপাত' শব্দটা বললাম তার কারণ হল সত্যিকারের নির্মোহ কাজ করে ওঠা হয়তো সম্ভব নয় - কিছুটা মোহাবিষ্ট না হলে কোনও কাজই শেষ পর্যন্ত করে ওঠা সম্ভব নয়।) অন্তত তাঁর সমগ্র জীবনের একটা পরিচয় আমাদের সামনে থাকলে হয়তো আমরা তাঁর অন্য যেসব দিক আমাদের কাছে উদ্ভাসিত নয় সে ব্যাপারে অনুসন্ধানে আগ্রহী হয়ে উঠব।
সলিল একসময় গল্প লিখেছেন, ছবি এঁকেছেন, রাজনৈতিক ইশতাহার তৈরি করেছেন - সেসবের কোনও হিসেব কি আমাদের হাতে আছে এখনও? আমরা কি জানি তাঁর অসামান্য সুরসৃষ্টির নেপথ্যকথা? কীভাবে তৈরি হল তাঁর মনোভূমি, বাংলার ভৌগোলিক সীমানার বাইরের বিরাট পৃথিবীতে সলিলের যে বিচরণ তার খবর কতটুকু আমরা জানি! তাঁর সম্পর্কে প্রায়ই নানা ধরনের গল্পকথা শোনা যায় - সেসব যে সবসময় তাঁর গুণগান করে, তা নয়। সেসব গল্পের থেকে নীর বাদ দিয়ে ক্ষীর তুলে আনার কাজটি হতে পারে একমাত্র তাঁর একটা পূর্ণাঙ্গ জীবনী লেখার মধ্য দিয়েই। একজন মানুষের জীবনী লেখার জন্য তাঁর সঙ্গে একটা দূরত্ব তৈরি হওয়া দরকার। মৃত্যুর ৩০ বছর পরে আজকে এই দূরত্ব যথেষ্টই তৈরি হয়েছে বলে মনে হয়। ব্যষ্টি বা সামষ্টিক উদ্যোগে এই কাজ আমাদের শুরু করা উচিত। সলিল-শতবর্ষ উদ্যাপনের একটা অংশ হওয়া উচিত আমাদের এই না-হওয়া কাজের খতিয়ান তৈরি করাও। মানুষ হিসেবে তাঁর স্খলন, পতন, ত্রুটিও এড়িয়ে যাওয়া হবে না তাতে। আর সলিলের গানের তালিকা যাও বা কিছু আছে, সে গান শোনার উপায় কী! গান তো কেবল তালিকানির্ভর বিমূর্ততা নয় - সেগুলি শোনার জন্য কি কোনও আন্তর্জালিক মহাফেজখানার আয়োজন আমরা করতে পারি না?
এই সঙ্গে আরও একটা কথা জরুরি। বিখ্যাত মানুষদের বিভিন্ন উপলক্ষে স্মরণ করা আমাদের একটা কর্তব্য। কিন্তু সেই ভিড়ে হারিয়ে যান আরও কত সংস্কৃতি সাধক। ২০২৫-এই শতবর্ষ পূর্ণ হল আর-এক কীর্তিমান বাঙালির - রণেন্দ্রবল্লভ রায়চৌধুরীর (১৯২৫-১৯৮৫)। আমাদের মনে থাকবে ঋত্বিকের 'মেঘে ঢাকা তারা'র সেই অবিস্মরণীয় গান - 'মাঝি তোর নাম জানি না'। সলিলের শতবর্ষে তাঁকে স্মরণ করা হচ্ছে, তাঁর কাজ বা তাঁকে নিয়ে কাজ নতুন করে সামনে আসছে। এর কারণ শুধুই সলিলের প্রতিভার অনন্যতা নয়, এর কারণ বাংলার বাইরে সলিলের সাফল্য, খ্যাতি এবং জনপ্রিয়তা। এর ভিড়ে হারিয়ে যাবেন রণেন রায়চৌধুরী বা কালী দাশগুপ্তের (১৯২৬-২০০৫; ২০২৬ তাঁর জন্মশতবর্ষ) মতো অনন্য সংস্কৃতি সাধকরা। সাম্প্রতিক অতীতে দেখেছি হেমন্ত-রবিশঙ্করের জন্মশতবর্ষের প্রদীপের তলার অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছেন অখিলবন্ধু ঘোষের মতো মানুষ। অথচ দেখুন সলিল চৌধুরীর কথা বলতে গিয়ে তাঁর যে সংগ্রামী ইতিহাসের কথা আমরা বারে বারে বলে থাকি, সে ইতিহাস কিন্তু রণেন রায়চৌধুরী বা কালী দাশগুপ্তরও আছে।
সলিলের সংগ্রামী জীবনের হাতেখড়ি আসামের চা বাগানে - বাবার কাজের সূত্রে তিনি চা বাগানের শ্রমিকদের জীবনকে কাছ থেকে দেখেছেন, তাদের কান্না-ঘাম-রক্তের ইতিহাসকে তিনি বুকে ধারণ করেছেন, এমনকী, সলিলের জীবনের প্রথম প্রেমও এই চা-বাগানে। তাঁর স্মৃতিকথা 'জীবন উজ্জীবন'-এ সুখিয়ার সঙ্গে প্রেমের এক নিবিড় বর্ণনা দিয়েছেন সলিল: "সত্যিই সুখিয়াকে আমি ভালোবেসেছিলাম। ওর জন্য আমি জাহান্নামে যেতেও প্রস্তুত ছিলাম। আজ চার দশকেরও বেশি বছর পেরিয়ে গিয়েছে, ও হারিয়ে গিয়েছে আমার জীবন থেকে। কিন্তু এখনও আমি ইচ্ছে করলে ওর ছোঁয়া পেতে পারি, ওর গন্ধ পেতে পারি, ওর গলার স্বর শুনতে পারি - 'নখিন্দর'। এই সুর আমি হারমোনিয়মে বাজাতে পারি। ও আমার রক্তে মিশে গিয়ে ওর নিঃস্বার্থ, একেবারে আদিম ভালোবাসা দিয়ে আমাকে বহুগুণে ধনী করেছে। আমাকে বলত, 'তুকে তো হামি কোনোদিন পাব না, উতো হামি জানি! শুন, হামাকে একটা বেটা দিবি যে তুর মতো দেখতে হবেক? উকে হামি পালব। পেলে বড় করব। উ হামাকে মা বলবেক। বাস্, উকে নিয়ে হামার দিন গুজার হয়ে যাবেক।"
কিন্তু যে কথা বলতে চাইছি তা হল সলিলের এই যে সংগ্রামী অভিযাত্রা, সেই একই পথের পথিক ছিলেন রণেন এবং কালী দাশগুপ্ত। সলিলের মতো এই দু'জনেরই শুরুতে চা-বাগান লগ্ন জীবন, পরবর্তীকালে গণনাট্য সংঘ হয়ে এঁদের জীবন অন্য পথে বা অন্য ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। সে প্রবাহ সলিলের মতো সাফল্যের ঝলকানিতে চোখ ধাঁধানো নয়, সে পথ ছিল নিবিষ্টতার। রণেন মারিফতি বা মারফতি গানের সুর আর কথাকে অত্যন্ত যত্ন করে সংরক্ষণ করার চেষ্টা করেছেন, আর কালী চা-বাগিচার গান-সহ বহু ধারার লোকগান। এই ধরনের সংগ্রহ বাঙালির সংস্কৃতি চর্চার উজ্জ্বল সম্পদ, অথচ আজ ক'জন মনে রাখছেন বা সেই চর্চাকে বাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছেন? সলিলের উজ্জীবিত জীবনের পাশাপাশি যেন এঁরাও থাকেন তাঁদের যথাযোগ্য উপস্থিতি নিয়ে - এটুকুও আমাদের চাইতেই হবে।
এই সঙ্গেই আর-একটা কথা বলার প্রয়োজন - সলিলের সুরের যে বৈচিত্র এবং সংগীত আয়োজনের যে বৈভব আমরা দেখেছি, যার জন্য সলিল অন্যদের মাঝেও বিশিষ্ট হয়ে থেকেছেন, সেটা এসেছে ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি তাঁর বোম্বে যাওয়ার এবং বলিউডে কাজ শুরু করার পরেই। 'রানার' (১৯৫১), 'সেই মেয়ে' (১৯৫০) বা 'গাঁয়ের বধূ'র (১৯৪৯) মতো এমন কাব্যগীতি নির্মাণ করেও সলিল তার সংগীতায়োজনে কিন্তু সেভাবে বিশিষ্টতা অর্জন করতে পারেননি তখনও। সলিলের আলোচনা তো শুধু সলিলে সীমাবদ্ধ থাকার নয়, বাংলা গানের সার্বিক প্রেক্ষাপটে সলিলের অবস্থান, সমসাময়িক অন্যান্য সুরকার-গীতিকারদের থেকে সলিলের স্বতন্ত্র যাত্রাপথ, সর্বভারতীয় অঙ্গনে সলিলের অংশগ্রহণ এসবই বিস্তৃত এবং গভীর আলোচনার পরিসর দাবি করে। সুধীর চক্রবর্তী রবীন্দ্রনাথের সুরের কথা বলতে গিয়ে একবার বলেছিলেন যে রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় রাগ-রাগিণীকে এড়িয়ে নয়, পেরিয়ে গিয়েছিলেন। সলিল সম্পর্কে বলার কথা হল পাশ্চাত্য সুরের বিভঙ্গ, ভারতীয় রাগ-রাগিণীর চড়াই-উতরাই আর বাংলার গানের আউল-বাউল-কীর্তনের আলপথ ধরে এগিয়ে সলিল তৈরি করে নিয়েছিলেন নিজের একটা রাজপথ, যেখানে এইসব পথ এসে মিলেছিল।
আর-একটা কথা এখানে উল্লেখ করি - সলিলের সংগ্রামী রাজনৈতিক পরিচয় বারে বারে আমাদের আলোচনায় আসে, কিন্তু যেটা বাদই থেকে যায় তা হল তাঁর রসবোধের কথা। তাঁর আত্মজীবনী এবং কবিতায় এর উদাহরণ বেশ কিছু আছে। একটা নমুনা দিয়ে এই লেখা শেষ করি -
হাঁপানির জাপানি ওষুধ
হামাগুচি সামুরাই নামকরা জাপানি
রপ্তানী করত সে বোতলেতে চাপানি
চাপানি এমন পানি খেলে পরে হাঁপানি
সেরে যাবে ঠিকই, তবে হবে হাড়-কাঁপানি
কাঁপানি শুধু তো নয়, লাফানি ও ঝাঁপানি
ফুঁপিয়ে কান্না পাবে, শুরু হবে ফোঁপানি
একবার খেয়েছিল হরিমতি ধোপানি
কাপড় কাচতে জলে কী নাকানি চোবানি!
ভেবে দেখো যদি কারও হয়ে থাকে হাঁপানি
খাবে কি খাবে না সেই হামাগুচি চাপানি!