আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ একাদশ সংখ্যা ● ১-১৫ জুন, ২০২৬ ● ১৬-৩১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

প্রবন্ধ

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬: আরো কিছু কথা

উত্তম ভট্টাচার্য


আগের সংখ্যাতে আমরা পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এর ফলাফল বিষয়ে কিছু আলোচনা করি। তখন উল্লেখ করা হয় যে, কিছু নির্দিষ্ট কারণে, দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার, ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে ২৯ এপ্রিল ২০২৬ নির্বাচন বাতিল হয় এবং নতুন ভাবে নির্বাচন হয় বিগত ২১ মে ২০২৬। নির্বাচনের ফলপ্রকাশ হয় ২৪ মে ২০২৬। এই বিশেষ নির্বাচন এর দু' একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য এবং ফলাফল আলোচনা খুবই প্রাসঙ্গিক। এখানে সংক্ষেপে তা জানাব।

ফলতা কেন্দ্র ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রের অধীন এক অন্যতম বিধানসভা কেন্দ্র। বিগত লোকসভা নির্বাচনে, শ্রী অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-এর বিপুল জয়ের পিছনে এই অঞ্চলের বিপুল ভোট এক অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়া এক ব্যতিক্রমী ঘটনা এবারই প্রচারের শেষ দিন, অর্থাৎ ১৯ মে ২০২৬, ভোটদানের ৪৮ ঘন্টা আগে, নির্বাচন থেকে "সরে" দাঁড়ান তৃণমূলের প্রার্থী জাহাঙ্গীর খান। যদিও নির্বাচন বিধিমতে সে সরে দাঁড়ানো নিয়ম বহির্ভূত। নির্বাচনে প্রার্থীর আবেদনপত্র তোলার নির্দিষ্ট সময় (১৯ এপ্রিল, ২০২৬) চলে গেলে, এমন পদক্ষেপ মূল্যহীন।

একদিকে ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে, বিজেপি বিপুল সাফল্য লাভ করেছে, এবং তৃণমূল প্রার্থীর বিরুদ্ধে এক বিপরীত স্রোত বা জনরোষ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ১৮ মে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রচারে, বিজেপির সমর্থনে যে উল্লাস দেখা যায়, তাতে স্পষ্ট ছিল, তৃণমূলের বেশি ভোট পাওয়া একেবারেই দূরাশা। দক্ষিণ ২৪ পরগনা জুড়ে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে "ভয়ের" রাজনীতি তৈরি হয়েছিল, বিজেপি শাসনে আসার পর তা সম্পূর্ণ লুপ্ত। সুতরাং, নির্বাচন লড়াই-এ থাকা অর্থহীন হয়ে যায়, তৃণমূল প্রার্থীর কাছে। ফলাফল যা অনুমান করা হয়েছিল তেমনই ঘটে নিতান্তই স্বাভাবিক গতিতে।

নির্বাচন কমিশন-এর তথ্য অনুসারে, ফলতা বিধানসভা নির্বাচনে মোট ভোট পড়ে ২ লক্ষ ১০ হাজার-এর মতো (২,১০,১৯২)। মোট ভোটারের ৮৮ শতাংশ মানুষ ভোট দেয়, ২৮৫ ভোট কেন্দ্রে। এখানে বিজেপির শ্রী দেবাংশু পান্ডা মোট ভোট পান ১,৪৯,৬৬৬। এটা মোট প্রদেয় ভোটের ৭১.২ শতাংশ। তিনি ১ লক্ষ ৯ হাজার ভোটের ব্যবধানে জেতেন, তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সিপিআই(এম)-এর শম্ভুনাথ কুর্মির থেকে। তাঁর প্রাপ্য ভোট ৪০,৬৪৫। এটা মোট প্রদেয় ভোটের ১৯.৩৪ শতাংশ। তৃতীয় স্থানে ছিলেন কংগ্রেসের আব্দুল রাজ্জাক মোল্লা। তিনি ভোট পান ১০ হাজার এর সামান্য বেশি। শতকরা হিসেবে যা ৪.৮ শতাংশ। আর চতুর্থ স্থানে ছিলেন তৃণমূলের জাহাঙ্গীর খান। তাঁর প্রাপ্য ভোট ছিল ৭,৭৮৩ বা ৩.৭ শতাংশ মাত্র। নোটা-তে ভোট পড়ে ৭৮৪টি, বা ০.৩৭ শতাংশ। ফলতা বিধানসভা নির্বাচনে এক আকর্ষণীয় ঘটনা, পোস্টাল ভোট। এর সংখ্যা মোট ১,৮০৮টি বা মোট ভোটের ০.৮৬ শতাংশ। মজার কথা এই পোস্টাল ভোট-এর ৮৪ শতাংশ (১,৫২৬টি ভোট) পায় তৃণমূলের জাহাঙ্গীর খান। আর বিজেপি দলের প্রার্থী পান মাত্র ২৪১টি ভোট বা ১৩.৩ শতাংশ। এমন হওয়ার অন্যতম কারণ পোস্টাল ভোট আসে, নির্বাচনের পূর্ব নিয়মে ২৯ এপ্রিল ২০২৬-এর আগে, অর্থাৎ শেষ নির্বাচন এর অনেক আগে। অন্য বৈশিষ্ট্য, বুথ ভিত্তিক ফল-এ দেখা গেছে বহু বুথে তৃণমূল-এর পক্ষে ভোট পড়ে মাত্র ১-১০-এর মধ্যে।

নির্বাচন কমিশন যে তথ্য দিচ্ছে তাতে দেখা গেছে দেবাংশু পন্ডার বিরুদ্ধে ১৭টি ক্রিমিনাল বা ফৌজদারী কেস আছে। সেখানে জাহাঙ্গীর খানের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারী কেস নেই। দেবাংশু পন্ডার বয়স ৪৬ বছর। পড়াশোনা স্নাতক স্তর উত্তীর্ণ। সম্পত্তি ১.৯২ কোটি টাকা। সেখানে পরাজিত তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গীর খানের বয়স ৪১ বছর, শিক্ষা দ্বাদশ শ্রেণি উত্তীর্ণ সম্পত্তি ২.০৭ কোটি টাকা।

এখন গোটা পশ্চিমবঙ্গের দিকে তাকালে, নির্বাচন শেষে ছবি এরকম: বিজেপির প্রাপ্তি ২০৮টি আসন, তৃণমূল ৮০টি আসন। কংগ্রেস এবং আমজনতা উন্নয়ন পার্টির ২টি করে, সিপিআই(এম) এবং আইএসএফ ১টি করে আসন জয় করেছে। এর ভিতর বিজেপির শ্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং আম জনতা পার্টির হুমায়ূন কবীর দুইটি করে আসনে জিতেছেন। আগামী ছয় মাসের মধ্যে পুনঃনির্বাচন হবার নিয়ম। কারণ তাঁদের একটি করে আসন ছেড়ে দিতে হবে। বিধানসভার মোট আসনের নিরিখে, ২৯৪ আসনের মধ্যে বিজেপি ৭০ শতাংশ আসন জয় করেছে। একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মান্যতা দখল করেছে। আর তৃণমূল মোট আসনের ২৭ শতাংশ পেয়ে বিরোধী দলের সম্মান পেয়েছে। অন্য দল মোট আসনের মাত্র ৩ শতাংশ পেয়েছে মাত্র। আগেই বলা হয়েছে যে, বিজেপি মোট ভোটের ৪৫.৮ শতাংশ ভোট পেয়েছে। সেখানে তৃণমূল-এর ভোট প্রাপ্তি ৪০.৮ শতাংশ। সিপিআই(এম)-এর ভোট প্রাপ্তি ৪.৪ শতাংশ।

ডিভিশনের হিসেবে পাঁচটি ডিভিশনের মধ্যে, প্রেসিডেন্সি ডিভিশনের ৯৭ আসনের মধ্যে বিজেপি ৬৩টি আসন পেয়েছে। তৃণমূল-এর আসন সংখ্যা ৩৩, অন্য দল ১টি আসন। মেদিনীপুর ডিভিশনের ৬৭টি আসনের মধ্যে বিজেপি ৫৪টি আসন পেয়েছে। তৃণমূল-এর আসন ১২টি। বর্ধমান এর ৪৬টি আসনের ভিতর বিজেপি ৪৪টি আসন। তৃনমূলের মাত্র ২টি। মালদা ডিভিশনে ৪৯ আসনের মধ্যে বিজেপি দখল করে ২২টি, তৃণমূল ও একই সংখ্যা, ২২টি আসন প্রাপ্তি। জলপাইগুড়ি ডিভিশনের ৩৫টি আসনের ভিতর তৃণমূল-এর প্রাপ্ত আসন মাত্র ১টি।

এখন শেষ করব অন্য কিছু আকর্ষনীয় তথ্য দিয়ে। অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্ম (ADR) (National Election Watch, link: myneta.info,) নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া কিছু তথ্য বিশ্লেষণ করে। সেখানে ধরে ধরে নির্বাচন প্রার্থীদের, সম্পত্তি (এসেট), ধার-দেনা (লাইয়াবিলিটি), শিক্ষা, ফৌজদারী মামলা, আয়কর রিটার্ন, প্যান নং. ইত্যাদির পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কিছু তথ্য সরবরাহ করা হয়। খুবই আকর্ষণীয় সে সমস্ত তথ্য। এখন সে বিষয়ে সামান্য কিছু আলোচনা করা যায়। সেখানে দেখা গেছে রাকেশ সিং, কলকাতা পোর্টের বিজেপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ফৌজদারী মামলা ঝুলছে। এই সংখ্যা ৯১। এখানে মোট দশজন প্রার্থীর নাম আছে যাঁদের বিরুদ্ধে ২০ বা তার বেশি ফৌজদারী মামলা দায়ের আছে (প্রমাণিত নয়, শাস্তি প্রাপ্ত নয়)।

আবার নির্বাচিত প্রার্থীদের মধ্যে মেদিনীপুরের বিজেপির শ্রী শংকর গুছাই-এর বিরুদ্ধে ২৯টি মামলা আছে, শ্রী শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে ২৯টি ফৌজদারী মামলা, শ্রী দিলীপ ঘোষের বিরুদ্ধে ২৮টি মামলা আছে। শ্রীমতী অগ্নিমিত্রা পালের বিরুদ্ধে ২৩টি ফৌজদারী মামলা দায়ের আছে।

সম্পত্তি বা এসেট হিসেবে অনন্ত ১১ জন প্রার্থী আছে যাঁদের সম্পত্তি ২০ কোটি বা তার বেশি। দুইজন আছেন যাঁদের সম্পত্তি ১০০ কোটির ওপর। যেমন শ্রী গৌতম মিশ্র, তৃনমূল প্রার্থীর সম্পত্তি ১০৫.৭৫ কোটি।

নির্বাচিত প্রার্থীদের মধ্যে, মুর্শিদাবাদের নবগ্রামের বিজেপির নির্বাচীত প্রার্থী, শ্রী দিলীপ সাহার সবচেয়ে বেশি সম্পত্তি (৪৩.০৩ কোটি টাকা)। তৃণমূলের নির্বাচিত আহমেদ জাভেদ খাঁর সম্পত্তি ৩৯ কোটি টাকা। তাঁর অবশ্য ঋণ ৪৩.৭২ কোটি টাকা। সাগরদিঘীর নির্বাচিত তৃণমূল প্রার্থী শ্রী বাইরন বিশ্বাসের সম্পত্তি ৩৩.৪২ কোটি টাকা।

আকর্ষণীয় বিষয় হলো, শিক্ষাগত মান, সম্পত্তি এবং ফৌজদারী মামলার মধ্যে পরস্পর কোনো সম্পর্ক আছে এমন কিছু প্রমাণ করা যাচ্ছে না। অনুমান করা ঠিক নয় এই সব তথ্য থেকে। অশিক্ষিত বা আট/দশ শ্রেণি উত্তীর্ণ প্রার্থীদের অনেক সম্পত্তির খোঁজ পাওয়া যাবে। শিক্ষিত অশিক্ষিত সব স্তরেই, ঝুলে থাকা ফৌজদারী মামলার সন্ধান মিলবে। বলা যাবে না, কী হলে কী হয়। অন্তত আমাদের কাছে এ ছবি পরিষ্কার নয় একেবারেই।

আলোচনা শেষ করতে চাই ১৮৫৯ সালে চার্লস ডিকেন্স-এর উপন্যাস, 'এ টেল অফ টু সিটিস', দুই শহরের গল্পের শুরু দিয়ে: "it was the best of the times, it was the worst of the times", আগামীদিন কে বলবে, বর্তমান সময়টা সবচেয়ে ভালো সময়, না কি খুব খারাপ সময়! তবে আমাদের একান্ত প্রার্থনা, আমাদের সকলের একান্ত আশা, "ভালো"র জন্য।