আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ একাদশ সংখ্যা ● ১-১৫ জুন, ২০২৬ ● ১৬-৩১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

প্রবন্ধ

জলবায়ু শরণার্থী - এক উপেক্ষিত সংকট

গৌতম সরকার


আধুনিক বিশ্বের অন্যতম বড় উদ্বেগ হল জলবায়ুর পরিবর্তন। এই পরিবর্তন মূলত দুই প্রকারের-আকস্মিক এবং ধীরগতির। সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের যৌথ উষ্ণতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস, ঝড় ও ঘূর্ণিঝড়, ভয়াবহ বন্যা এবং অতিবৃষ্টির কারণে আকস্মিক কিংবা ধীরগতির জলবায়ু পরিবর্তনের সাক্ষী বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ। নিম্নভূমি উপকূলীয় অঞ্চলগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে আভ্যন্তরীণ বন্যা, ভূমি নিমজ্জন এবং উপকূলীয় ক্ষয়ের মতো বিরূপ জলবায়ু প্রভাবের সম্মুখীন হচ্ছে। ভারতবর্ষের গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ অঞ্চলে এই বৃদ্ধি কোথাও কোথাও ৭০ শতাংশ পর্যন্ত হয়েছে। জলবায়ুর পরিবর্তন পরিবেশ এবং আর্থ-সামাজিক বিষয়, যেমন - কৃষি, জীবিকা, স্বাস্থ্য ও জীব বৈচিত্র্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এই জৈব-ভৌত বিপন্নতা ওইসব অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রাকে অসহনীয় করে তুলছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিশাপ সমাজের শিশু, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী এবং দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী মানুষদের জীবন সবচেয়ে বেশি বিপন্ন করে তুলেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হল পরিবেশগত বা জলবায়ু শরণার্থী। বর্তমান বিশ্বের এ এক বিষম এবং দ্রুত বর্ধনশীল সংকট। এই দুর্যোগের কারণে প্রতি বছর কোটি কোটি মানুষ নিজেদের ভিটে মাটি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে, যেটা বৈশ্বিক নিরাপত্তা এবং মনের উপর চাপ তৈরি করছে। একটি তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে দুর্যোগ, সংঘাত এবং জলবায়ু সংকটের কারণে ১২৩ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, তার একটা বড় অংশ পরিবেশগত কারণে। ২০২৫ সালে অর্ধেকেরও বেশি আভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির প্রধান কারণ ছিল জলবায়ুর আকস্মিক পরিবর্তনের মতো প্রাকৃতিক দূর্যোগ। খরা, সমুদ্র ঝড়, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় ও অপেক্ষাকৃত নিচু অঞ্চলের মানুষজন বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। বাস্তুচ্যুতির সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত আছে দারিদ্র্য, খাদ্যসংকট এবং আশ্রয়হীনতার মত অভিশাপগুলো। শুধু এগুলোই নয়, পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু সংকট মানুষের মধ্যে ইকোলজিক্যাল গ্রিফ বা পরিবেশগত শোক, সোলাস্টালজিয়া (নিজ ভূমে পরবাসীর অনুভব) এবং সর্বোপরি তীব্র মানসিক উদ্বেগের সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস, এভাবে চলতে থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে শুধুমাত্র এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকায় জলবায়ু শরণার্থীর সংখ্যা ১৪ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। এই সংখ্যার বেশিরভাগটাই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে আশ্রয় নেবে, যেটা ওইসব দেশের সম্পদের উপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করবে।

জলবায়ু বাস্তুচ্যুতি কি?

প্রথমেই বলে রাখা ভালো, জলবায়ু বাস্তুচ্যুতিকে সাধারণ বাস্তুচ্যুতি গোত্রে রাখা হয়না। ইউনাইটেড নেশনস-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, 'শরণার্থী' হল সেই ব্যক্তি যিনি জাতি, ধর্ম, দেশ, সামাজিক গ্রুপের সদস্য, নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ বা সংঘাত কিংবা কোনও ঘটনা যেটা জনশৃঙ্খলাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে ইত্যাদি কারণে প্রাণের আশঙ্কা থেকে নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয়ের খোঁজে যেতে বাধ্য হন। যদিও জলবায়ু পরিবর্তন এবং সংঘাত প্রায়শই হাত ধরাধরি করে আসে, ফলে জলবায়ু শরণার্থীরা অন্যান্য শরণার্থীদের মতোই, কখনোবা তার থেকেও বেশি জীবনযন্ত্রনা ভোগ করে। কিন্তু 'ইউনাইটেড নেশনস হাই কমিশন ফর রিফিউজিস' জানাচ্ছে, সংজ্ঞা অনুযায়ী জলবায়ু শরণার্থীরা সাধারণ শরণার্থীর ক্যাটেগরিতে পড়ে না। তাদের মতে, জলবায়ু সংকটের কারণে বাস্তুচ্যুতি ঘটলেও মানুষ চিরস্থায়ীভাবে স্বভূমি ছেড়ে পরভূমে পাড়ি দেন না, এবং শুধুমাত্র এই কারণে অত্যাচার বা নিগ্রহের শিকার হন না। UNHCR জানাচ্ছে, দুর্যোগ বা বিপর্যয়ের কারণে এই মানুষগুলোর সাময়িক বাস্তুচ্যুতি ঘটে, তাই এঁদের জলবায়ু শরণার্থী কিংবা পরিবেশগত অভিবাসী শব্দবন্ধে অভিহিত করা যায়।

পরিবেশ শরণার্থীরা সাধারণ শরণার্থীদের সমান অধিকার দাবি করতে পারেন না

জলবায়ু শরণার্থীরা আন্তর্জাতিক আইনের অধীন শরণার্থী সুরক্ষা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। যদিও বিশ্বের বহু দেশ জলবায়ু সংক্রান্ত কারণে সাঙ্ঘাতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতসহ জটিল জরুরি অবস্থার সম্মুখীন হয়, যার মধ্যে অন্যতম হল বাস্তুচ্যুত জনগণকে রক্ষা করার মত আভ্যন্তরীণ সম্পদের অভাব। ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে UNHCR জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগের প্রতিকূল প্রভাবের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সুরক্ষার প্রশ্নে এক গুচ্ছ আইনি ব্যবস্থা প্রকাশ করেছেন। এই আইনে বলা হয়েছে একজন মানুষ পরিবেশগত সংকট বা আইন শৃঙ্খলার অবনতির ফলে জীবনের আশঙ্কা থেকে বাস্তুচ্যুত হলে সেই ব্যক্তি প্রকৃত শরণার্থীর সমস্ত অধিকার চাইতে পারে। যদিও প্রয়োগের ক্ষেত্রে এই আইনের প্রচুর গলতি আছে। UNHCR একটি ব্যাপারে সহমত পোষণ করে, সেটি হল - জলবায়ু পরিবর্তন বাস্তুচ্যুতির অন্যতম এক প্রধান কারণ। বিশ্ব জুড়ে প্রতি বছর প্রায় ৩০ মিলিয়ন মানুষ জলবায়ু সংক্রান্ত কারণে ঘরছাড়া হচ্ছে। ২০২২ সালে সারা বিশ্বের ৫৩ শতাংশ বাস্তুচ্যুতি ঘটেছিল দুর্যোগের কারণে, যার মধ্যে ৯৮ শতাংশ ছিল জলবায়ু জনিত দুর্যোগ।

সুন্দরবন ঘোড়ামারা দ্বীপ: একটি কেস স্টাডি

জলবায়ু বাস্তুচ্যুতির একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল সুন্দরবনের ঘোড়ামারা দ্বীপ, যেখানে মানুষ প্রতিনিয়ত তাদের ভিটেমাটি হারাচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের বুকে অবস্থিত এই দ্বীপটি ভূমিক্ষয় এবং সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে দ্রুত তলিয়ে যাচ্ছে। বাড়তে থাকা নদীর জল এবং জটিল হাইড্রো-ডায়নামিক পরিস্থিতির কারণে ক্রমবর্ধমান গতিতে ক্ষয়ে যাচ্ছে এই দ্বীপ। ১৯৭৫ সালে যে দ্বীপের বিস্তার ছিল ৮.৫১ বর্গ কিলোমিটার, ২০১২ সালে সেটা কমে হয় ৪.৪৩ বর্গ কিলোমিটার এবং ২০২২ সালে সেটা পুনরায় কমে ২.৮৮-৩.৫ বর্গ কিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। দিনের পর দিন নষ্ট হতে থাকা বাস্তুতন্ত্র এবং বারংবার গৃহহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কায় এই দ্বীপে মানুষের সংখ্যা ক্রমশ কমেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের উপর সুন্দরবন বিষয়ক ২০১৪ সালের একটি গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, ২০০১ সালে ঘোড়ামারা দ্বীপের জনসংখ্যা ৫,২৩৬ থেকে কমে ২০১১ সালে ৫,১৯৩-এ নেমে এসেছে। এর জন্য শুধু ভূমিক্ষয়ই দায়ী নয়, যেটুকু জমি টিকে আছে সমুদ্রের লবণাক্ত জল ঢুকে সেইসব ফসলি জমিকে অনুর্বর করে তুলছে। এর ফলে এলাকায় রয়ে যাওয়া মানুষেরা তাদের জীবিকা হারিয়ে খাদ্য নিরাপত্তার অভাবে ভুগছেন।

ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, বাড়তে থাকা সমুদ্রজল, কালান্তক ঝড়বৃষ্টি আর বাস্তু হারানোর আশঙ্কা বরাবরই তাড়া করে বেরিয়েছে ঘোড়ামারার অধিবাসীদের। এ যেন প্রজন্মের পর প্রজন্মের নিরন্তর কালরাত্রি যাপন। ২০০৭ সালে সিডার, ২০০৯-এর আয়লা, ২০১৩ সালের ফাইলিন, ২০১৪ সালের হুদুদ, ২০১৯ সালের ফণী ও বুলবুল আর ২০২০ সালের আম্ফান পেরিয়ে ১৯৮৭ সালে স্বীকৃত 'ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট' সুন্দরবন আজ ধ্বংসের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেছে। প্রকৃতি এতেও ক্ষান্ত হয়নি, ২০২১ সালের মে মাসের ২৬ তারিখে আরেক ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড় ইয়াস সুন্দরবনের অন্যান্য দ্বীপগুলোর সঙ্গে তছনছ করে দেয় ঘোড়ামারাকেও। মাত্র ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে ঘূর্ণি ও ভরাকোটালের যুগ্ম আক্রমণে তলিয়ে যায় পুরো দ্বীপ। খড়কুটোর মত ভেঙে পড়ে ঘরদুয়ার, মুহূর্তের মধ্যে চোখের সামনে ভেসে যায় গোলাভরা ধান, বরজভরা পান, সূর্যমুখীর খেত, সবকিছু। একবছর আগের আম্ফানের ফেলে যাওয়া ক্ষতচিহ্ন সেরে ওঠার আগেই জলবায়ু পরিবর্তনের বিষক্রিয়ায় একের পর কোটাল ডেকে আনে ইয়াসের মত ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়। ইয়াসের ভয়ংকর প্রভাবে জুন মাস থেকে ক্রমশই তলিয়ে যেতে থাকে ঘোড়ামারা। তার উপর অবিশ্রান্ত বৃষ্টি এলাকার মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলে। এহেন দুর্যোগের কারণে প্রাণহানির আশঙ্কায় রাজ্য প্রশাসন সত্ত্বর দ্বীপবাসীদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যেতে তৎপর হয়। শুধু ঘূর্ণিঝড় না বড় কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ই নয়, এমনকি ভরা কোটালের সময়ও এলাকার মানুষদের ঘরবাড়ি ছেড়ে দ্বীপান্তর পাড়ি দিতে হয়। আবার কোটাল সরে গেলে দলে দলে ঘরে ফেরা তাদের দৈনন্দিন জীবন গাথা। ঘোড়ামারার মানুষগুলোর রোজনামচায় লুকিয়ে আছে এরকম আরও অগণিত কষ্টের গল্প।

আকস্মিক বনাম ধীরগতির দুর্যোগ

বাস্তুচ্যুতির পিছনে সবচেয়ে বড় কারণ হল হ্যারিকেন, সাইক্লোন, সুনামি, তীব্র খরার মত আকস্মিক প্রাকৃতিক দূর্যোগ। তবে এগুলোই সব নয়, মানুষের গৃহহীন হয়ে পড়ার পিছনে পানীয় জলের অভাব, বেকারত্ব, খাদ্যের অভাব, রোগের প্রাদুর্ভাবের মত কারণও আছে৷ এককথায় মানুষ লক্ষ লক্ষ বছর ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম যাকে নিজের জন্মস্থল মাতৃভূমি বলে ভেবে এসেছে, পরিবেশগত পরিবর্তন সেইসব দেশ, অঞ্চল, ভূমিকে অবসবাসযোগ্য করে তুলছে। আমাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশে, যেখানে ৭৫ শতাংশ ভূমি জলের তলায় সেখানে সমুদ্র জলের উচ্চতা বৃদ্ধি আবার নতুন করে ১৭ শতাংশ ভূমিকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে এবং পুনরায় ২০ মিলিয়ন মানুষকে গৃহহারা করে তুলেছে। এতে করে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, বর্ষার সময় অতিবৃষ্টির কারণে রিলিফ ক্যাম্প ও সাময়িক আশ্রয় ভেসে গিয়ে তাদের যন্ত্রণাকে শতগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। লেবাননে আবার পরিবেশগত দুর্গতির মূল কারণ জলসংকট থেকে তীব্র শৈত্য, যার ফলশ্রুতিতে প্রায় সাড়ে সাত লক্ষ সিরিয়ান শরণার্থী কনকনে ঠান্ডার দাপট এবং বিশুদ্ধ ও নিরাপদ জলের অভাবে দিন কাটাচ্ছে। যত দিন যাচ্ছে বিশ্বব্যাপী এই সংখ্যাটি দ্রুতগতিতে বেড়ে চলেছে। 'দ্য ইনস্টিটিউট অফ ইকোনমিক্স অ্যান্ড পিস' হিসেবে করে দেখিয়েছে, এই হার বজায় থাকলে ২০৫০ সালে পৃথিবী ব্যাপী জলবায়ু সংকটের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দাঁড়াবে ১.২ বিলিয়নে। ওইসময় পৃথিবীর জনসংখ্যা যদি হিসেবমত ৯.৯ বিলিয়ন হয়, তার অর্থ জলবায়ু শরণার্থীর সংখ্যা হবে মোট জনসংখ্যার ১২ শতাংশ। অন্যদিকে ২০২২ সালে প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের এক হিসেব দেখাচ্ছে, আগামী তিরিশ বছরে জলবায়ু শরণার্থীর সংখ্যা বেড়ে হবে ২০০ মিলিয়ন।

জলবায়ু শরণার্থীর সমস্যা শুধু উপমহাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়

যদিও জলবায়ু শরণার্থীরা সিংহভাগ আসে সাব-সাহারান আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলো থেকে, তবে ইউনাইটেড ইউনিয়নের ২০২৩ সালের 'ওয়েদার অ্যান্ড ক্লাইমেট ডিসপ্লেসমেন্ট রিপোর্ট' বলছে, প্রচণ্ড বন্যার প্রকোপে ব্রিটেন, ইতালি, জার্মানি, গ্রিস, স্লোভেনিয়া, নরওয়ে ও সুইডেনের মত প্রথম বিশ্বের দেশগুলিতেও লক্ষ লক্ষ মানুষ গৃহহীন হয়েছেন। 'ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টার' পরিবেশগত দুর্যোগের কারণে বিভিন্ন দেশের বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যার হিসেব কষেছে। সেই হিসেবে আফগানিস্তানের স্থান সর্বপ্রথম, এইদেশের জলবায়ু শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ১.৫ মিলিয়ন। তারপর আছে পাকিস্তান (১.২১ মিলিয়ন), ইথিওপিয়া ( ৮৮১,০০০), টার্কি (৮২২,০০০), চিন (৬৩৯,০০০), সাউথ সুদান (৫৬৩,০০০), ফিলিপিন্স ( ২৯১,০০০), মিয়ানমার (২৩৫,০০০), ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো ( ১৪৭,০০০), মরক্কো (১৪৬,০০০)।

দিনের পর দিন জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা বাড়া সত্ত্বেও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে তারা বঞ্চিত থেকেই গেছে। 'সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডি'র পক্ষ থেকে এরোল ইয়েবোকে এন.পি.আর কে জানিয়েছে, 'এটা খুবই চিন্তার যে এই ঘরহারা মানুষগুলো সমস্ত স্তরে উপেক্ষিত হচ্ছে, সমস্ত রকম সাহায্য বা সুরক্ষার বাইরে পড়ে যাচ্ছে। এই ইস্যুতে বিভিন্ন দেশগুলোর ঐক্যমত্যে পৌঁছনো কঠিন হয়ে পড়ছে।' তবে আশার কথা বিভিন্ন দেশের সরকার এই বিষয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে। ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার আগে, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জন ক্লদ ইয়াঙ্কার জলবায়ু পরিবর্তনকে ক্রমবর্ধমান অভিবাসনের অন্যতম এক কারণ বলে দাবি করেছেন। তাঁর মতে, "আমরা যদি অতি সত্ত্বর উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হই তাহলে জলবায়ু শরণার্থী গোটা বিশ্বের দিকে ভয়ানক চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেবে।"

জলবায়ু শরণার্থীরা কি প্রকৃত শরণার্থীর সম সুবিধা পাওয়ার অধিকার অর্জন করবে?

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-এর মতে আন্তর্জাতিক আইনে জলবায়ু শরণার্থী বা পরিবেশগত শরণার্থী বলে কোনও শব্দ নেই। এখানে শুধু শরণার্থীর কথা বলা আছে। এই আইনে শরণার্থীদের মধ্যে ধর্মীয় শরণার্থী, রাজনৈতিক শরণার্থী কিংবা জলবায়ু শরণার্থীর মত কোনো শ্রেণিভেদ করা নেই। তবে ১৯৫১ সালের রিফিউজি কনভেনশন অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিরা নির্যাতনের ঝুঁকির কারণে রিফিউজি বা শরণার্থীর মর্যাদা পেতে পারেন। যদিও দীর্ঘদিনের পুরনো আইনের জোরে বর্তমান সময়ের জলবায়ু শরণার্থীরা কাঙ্ক্ষিত সুরক্ষা পাচ্ছেন না বলাই বাহুল্য। তবে শরণার্থী মর্যাদা কপালে জুটুক বা না জুটুক, মানুষ যেখান থেকে বিতাড়িত হয়েছে সেই জায়গায় ফিরে গেলে যদি নির্যাতন বা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি থাকে, সেই জায়গায় যাতে তাদের পুনরায় ফিরত যেতে না হয় সেই দায়িত্ব দেশের সরকারকেই নিতে হবে৷দেশের সরকারকে দায়বদ্ধতা দেখাতে হবে যাতে করে নতুন করে জলবায়ু শরণার্থী সৃষ্টি না হয়, মানুষ যাতে তাঁর নিজের জায়গায় বাস করতে পারে। ২০২৫-এর জুলাই মাসে, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত এক যুগান্তকারী রায় দেয়, যেখানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে জলবায়ু সংকট ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষা না করলে দেশের জনগণের জন্য পূর্ণ মানবাধিকার নিশ্চিত করা কখনোই সম্ভব নয়। এর অর্থ হল, রাষ্ট্রগুলোকে অবশ্যই জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমিত করতে হবে, যার মধ্যে দ্রুতহারে জীবাশ্ম জ্বালানি পর্যায়ক্রমে বন্ধ করা এবং গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস করা প্রাধান্য পাবে।

একটি পরিষ্কার, স্বাস্থ্যকর এবং টেকসই পরিবেশ মানুষের অধিকার। রাষ্ট্র এই দিকে নজর দিলে জলবায়ু সংকটের মত বৈশ্বিক সমস্যাগুলো আপনাআপনি কমে আসবে। এই গ্রহ আবার সমস্ত জীবকুলের জন্য বাসযোগ্য হয়ে উঠবে।