আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ একাদশ সংখ্যা ● ১-১৫ জুন, ২০২৬ ● ১৬-৩১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩
প্রবন্ধ
আজ এক ঢোক কম জল হোক
অম্লানকুসুম চক্রবর্তী
ফেলুদা ও সিধুজ্যাঠার একটি কাল্পনিক সংলাপের কথা ভাবা যেতে পারে। ধরা যাক, দেওয়ালে লাগানো পেরেকে দোল খাচ্ছে ২০২৬-এর ক্যালেন্ডার।
- জটিল সমস্যায় পড়ে আপনার কাছে এলাম, জ্যাঠামশাই।
- সমস্যায় না পড়লে তো আমার কাছে কেউ আসে না ফেলু। তুই তো এমুখো হওয়া কমিয়েই দিয়েছিস আজকাল। শুনলাম এআই বলে কি সব প্ল্যাটফর্ম এসেছে, সেখান থেকেই সব জেনে নিচ্ছিস।
- যে তথ্য খুঁজছি, তা আপনি ছাড়া আর কারও দেওয়ার ক্ষমতা নেই।
- সে তো বুঝলাম। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্ল্যাটফর্মে তার খোঁজ নিয়ে দেখেছিস ফেলু?
- দেখেছি।
- বিষয়টি নিয়ে পরে শুনছি। কিন্তু তার আগে আমায় জানতে হবে কতবার সার্চ দিয়েছিস?
- দু দিনটে এআই প্ল্যাটফর্ম মিলিয়ে কুড়িবার তো বটেই। তবে পছন্দমতো উত্তর পেলাম না।
- আজ এক ঢোক জল কম খাস ফেলু।
- আপনার কথার মানে ঠিক বুঝতে পারলাম না জ্যাঠামশাই।
- মনের জানালাগুলো আমার মতো কিছুতেই খোলা রাখতে পারলি না রে ফেলু। যা বলছি জেনেই বলছি। আজ এক ঢোক জল কম খাস। এআইতে খোঁজ নিয়ে এই পরিমাণ জল তুই নষ্ট করেছিস।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্ল্যাটফর্মে কিছু খোঁজার সঙ্গে জল ব্যবহারের এক আশ্চর্য সমীকরণের কথা জানতে পারা গেল সম্প্রতি। সেই সমীকরণ কোনওকিছু সার্চ দিয়ে এন্টার মারার সঙ্গে সঙ্গে জলের ছলাৎছলের গল্প শোনায়। তবে সেই ছলাৎছলের সঙ্গে মিশে রয়েছে ক্রন্দনধ্বনি। অর্থাৎ, যতবার কিছু খুঁজতে শুরু করি আমরা, ততবার পৃথিবী থেকে উবে যায় কিছুটা জল। বিষয়টি এবারে একটু খোলসা করে বলা যাক।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কথাটির সঙ্গে যে জিনিসটি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে থাকে, তা হল ডেটা সেন্টার। কম্পিউটারের পর্দা যদি আমাদের কাছে কোনও প্রেক্ষাগৃহর বাহারি মঞ্চ হয়, তাহলে ডেটা সেন্টার হল তার গ্রীণরুম। সাজঘর। আরও সহজ করে বলা যেতে পারে, ডেটা সেন্টার হল এমন একটি বড় জায়গা যেখানে অনেকগুলো কম্পিউটার সার্ভার রাখা থাকে একসঙ্গে। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারছি না। আমার এক কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার বন্ধুর স্ত্রী পাশের ঘর থেকে বন্ধুটিকে ফোন করেছিল। তাঁদের বিয়ের পরে সম্ভবত সেটি দ্বিতীয় দিন। ফ্ল্যাটবন্দি জীবন। ফোন না করে জোরে কথা বললেও তা শোনা যেত দিব্যি। কুড়ি সেকেন্ডের ফোন শেষ করেই বন্ধু পাশের ঘরে এসে তাঁর স্ত্রীকে যে কথাগুলো বলেছিল তা হল এই।
"প্রযুক্তির এমন অপব্যবহার করো না অদিতি। এর মধ্যে কতগুলো ঘটনা হল তুমি জানো?" অদিতি অবাক চোখে তাকিয়ে ছিল নতুন বরের দিকে। বন্ধু বলেছিল, "এই যে ফোন তুলেই হ্যালো বললে, তোমার ফোনের মাইক্রোফোন সেটাকে ন্যানোসেকেন্ডের মধ্যে বিদ্যুৎতরঙ্গে বদলে ফেলল। এর পরে সেই তরঙ্গ ফের বদলে গেল বাইনারি ডেটায়। এই ডেটা কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা গাইতে গাইতে ভেসে চলল দূর, আরও দূর, বহু দূর। সবচেয়ে কাছে যে মোবাইল টাওয়ার আছে, তা সেই ডেটাকে ক্রিকেট মাঠে ক্যাচ ধরার মতো খপ করে ধরে গপ করে গিলে নিল। টাওয়ার থেকে সেই ডেটা চলে গেল টেলিকম নেটওয়ার্কে, মানে ওই এয়ারটেল, জিও, ভোডাফোন এসবে। সেখান থেকে জানতে পারা গেল কয়েকশ কোটি মোবাইল গ্রাহকের মধ্যে তুমি ফোনটা আসলে কাকে করছ। জানা গেল ডেস্টিনেশন নম্বরের লোকেশন, মানে সে আছে কোথায়। তার পরে সেই ডেটা পৌঁছল গন্তব্য নম্বরের কাছের টাওয়ারে। টাওয়ার থেকে তা আবার পৌঁছল গন্তব্য ফোনে। কে প্রথম কাছে এসেছি শুনিয়ে দিয়ে আমার ফোনে রিংটোন বাজল। ডেটা তখন আবার ভয়েসের শরীর ফিরে পেল। তোমার গলার হ্যালো আমার কানে এলো। জীবনকে এত জটিল করার কোনও মানে ছিল কি? আর এত কান্ডের পরে কি জিজ্ঞেস করলে তুমি - খুচরো এক টাকার কয়েন হবে কি না! একটু হিসেব করে দেখো অদিতি।কাজটা কি তুমি ঠিক করলে?" বন্ধুমহলের জমাটি আড্ডায় শুনেছিলাম, এত তত্ত্ব শোনার পরে ডুকরে কেঁদে ফোনের সিম কার্ডটিকে সাত দিনের জন্য নির্বাসনে পাঠিয়েছিল অদিতি।
কথা হচ্ছিল সার্ভার রাখার জায়গা নিয়ে। কোটি কোটি অ্যালগোরিদম সারা শরীরে জড়িয়ে নিয়ে সার্ভারগুলো চুপচাপ বসে থাকে আমাদের আদেশের অপেক্ষায়। জোনাকির মতো বিন্দু বিন্দু আলো জ্বলে সেখানে। জ্বলে, নেভে, আবার জ্বলে। প্রসেসিং ডেটা। বিরাট বাক্সগুলোর অন্দরমহলে তৈরি হয় নয়া জমানায় বেঁচে থাকার ব্যাকরণ, রেসিপি। এআই প্ল্যাটফর্মে আমরা কোনও প্রশ্ন করলেই তা চকিতে ইন্টারনেটের সূত্র ধরে পৌঁছে যায় ডেটা সেন্টারে। কয়েক হাজার সার্ভারের মধ্যে যেটি ফাঁকা রয়েছে, সেটি হাঁ করে গিলে নেয় সেই প্রশ্ন। প্রশ্নটি ভেঙে যায় বাইনারি ভাষায়, জিরো এবং ওয়ানে। এই দুটি সংখ্যা ছাড়া কম্পিউটার তো কিছু বোঝে না! অগুণতি সম্ভাব্য উত্তরের মধ্যে সেরা উত্তর বাছাইয়ের খেলা চলতে থাকে ওই সার্ভারে। কত কোটি হিসাব সেখানে একসঙ্গে হয় তা ভাবতে শুরু করলে আমাদের দুঃখী, ক্লান্ত মস্তিষ্কে ঝিলমিল লেগে যাবে। সদুত্তর কি না জানি না, তবে উত্তর তৈরি হয় সেখানে। শুন্য এবং এক-এর পোশাক ছেড়ে ফেলে তা আবার রূপ নেয় আমাদের বোধগম্য ভাষায়। ইন্টারনেট মারফৎ ফিরে আসে আমাদের গ্যাজেটের পর্দায়। আমরা মুগ্ধ হই। কী জিনিস বানাইছে দ্যাখো সাহেব কোম্পানি।
মাছির মতো ভনভন করে কারও কানের পাশে যদি টানা প্রশ্ন করি, মানুষটি বলতেই পারেন, "মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে কিন্তু আমার। দয়া করে এবারে থামবে?" নিজেকে শান্ত করার জন্য হয়তো ঢকঢক করে তিনি একটু জল খেয়ে নেন। যন্ত্র মানুষ নয়। কয়েক লক্ষ প্রশ্নবান একসঙ্গে ধেয়ে এলেও এআই প্ল্যাটফর্ম কখনও রাগ করে না। তবে মজার বিষয়টি হল, মাথা প্রবল গরম হয় তারও। নিজেকে সংযত রাখার জন্য জলের চাহিদাও হয় বেশ। অন্দরমহলকে শান্ত রাখার জন্য জলের কোনও বিকল্প নেই। যন্ত্র হলেও জলই তার জীবন।
যাবতীয় মুশকিলের সূত্রপাত এখানেই। পরিসংখ্যান বলছে, একটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য যে কোনও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্ল্যাটফর্ম জল খরচ করে গড়ে ০.৫ মিলিলিটার। মাথা ঘামানোর সঙ্গে জল খরচের মোটামুটি এক সমানুপাতিক সম্পর্ক রয়েছে। 'আকাশের রং কি?', প্রশ্ন করলে যন্ত্রশরীরে যে উথালপাথাল হয়, 'হরমুজ সঙ্কটে আগামী দিনের বিশ্ব অর্থনীতি কোন পথে?', জানতে চাইলে ওই উথালপাথালেরপরিমাণ স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি বাড়ে। ফলে জলের প্রয়োজনও হয় বেশি। দুটি তাবড় এআই সংস্থার সূত্র অনুযায়ী, প্রতি সেকেন্ডে তারা ২৯,০০০টিরও বেশি প্রশ্নের উত্তর দেয়, বিশ্বজুড়ে। সহজ ঐকিক নিয়মের অঙ্ক বলে, প্রতি ঘন্টায় প্রশ্নসংখ্যা ছাড়িয়ে যায় ১০ কোটির মাত্রা। অর্থাৎ, দিনে ২৪০ কোটি। এটি শুধু শীর্ষস্থানীয় দুটি সংস্থার হিসাব। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, সবকটি এআই প্ল্যাটফর্মকে তালিকাভুক্ত করলে দেখা যাবে, মূর্খসম-সোজা-মাঝারি-শক্ত-অতি কঠিন দৈনিক প্রশ্নবান ৫০০ কোটির কাছাকাছি। এখন ৫০০ কোটিকে ০.৫ মিলিলিটার দিয়ে গুণ করলেই জলের প্রকৃত পরিমাণ সামনে আসে। এটি ২৫ লক্ষ লিটারের কাছাকাছি। আমার আড়াইশ টাকা দামের ক্যালকুলেটরে এই দৈনিক হিসাব অনুযায়ী বার্ষিক জলখরচের পরিমাণ জানতে চাইলাম। ২৫ লক্ষ ইনটু ৩৬৫। পর্দার বাঁদিকে এসে গেল এরর চিহ্ন। এত বড় সংখ্যার ভার ছোট যন্ত্রগণকের শরীর সইতে পারল না।
এখানে একটি বিষয় ফের উল্লেখ করা প্রয়োজন। এই বিপুল পরিমাণ জল কোনও এআই প্ল্যাটফর্ম সরাসরি 'খায়' না! জলের প্রলেপে নষ্ট হয়ে যেতে পারে মহার্ঘ্য সার্কিটবোর্ড। এই জলের ব্যবহার হয় মূলত ডেটা সেন্টারের সার্ভার ঠান্ডা রাখার জন্য। এছাড়াও ওখানকার নিজস্ব থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট চালানোর প্রয়োজন হলেও এই জল লাগতে পারে। আরও আছে বিবিধ দরকার। টেকনিকাল কারিকুরির বোঝা চাপিয়ে আপাতত লাভ নেই কোনও।
গুগল, বিং, ইয়াহুর মতো সাবেকি সার্চ ইঞ্জিনগুলি নির্জলা উপবাস করে আমাদের সার্চের চাহিদা মেটায় - এমন ধারণা করলে অবশ্য ভুল হয়ে যাবে বিলকুল। প্রশ্নোত্তর পর্বের ইনপুট-আউটপুটের জটিল সমীকরণ বলছে, একটি গুগল সার্চের জন্য যে পরিমাণ জল লাগে, তা এআই প্ল্যাটফর্মে কোনও সার্চের প্রায় অর্দ্ধেক। ঘুরিয়ে বলা যেতে পারে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জলপিপাসা চিরাচরিত সার্চ ইঞ্জিনের দ্বিগুণ। আর যেভাবে এই আধুনিক প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বাড়ছে, তার ফলে পিপাসা হায় নাহি মিটিল বলে কোরাস গাইতে শুরু করে দিয়েছে অধিকাংশ সংস্থা। অর্থাৎ, প্রয়োজন আরও বেশি জল।
২৫ লক্ষ লিটার জল দিয়ে কি হতে পারে? ভারতবর্ষে মানুষের দৈনিক জলচাহিদা ১৩৫ লিটার। অঙ্ক অনুযায়ী, প্রায় ১৮,৫০০ মানুষ এর ফলে পেতে পারেন এক দিনের ব্যবহারযোগ্য জল। খরাক্লিষ্ট অঞ্চলে, প্রখর রোদে তিন-চার কিলোমিটার হেঁটে সামান্য জল সংগ্রহ করা বহু মানুষের কাছে এমন মায়াবী আয়োজন রূপকথার গল্পকেও হার মানাবে, সন্দেহ নেই। এই জলে ৫০,০০০ লোক দিনে একবার স্নান করতে পারেন। ভরা যেতে পারে ৫-৬টি সুইমিং পুল। কয়েকশ একর চাষের জমি পেতে পারে সেচের প্রশ্রয়। তালিকা অন্তহীন। অন্য বেশ কিছু পরিসংখ্যান বলছে, ২৫ লক্ষ লিটার কার্যত এক 'চেপে রাখা' হিসেব। প্রকৃত ব্যবহার এর তুলনায় অনেক বেশি।
এক প্রযুক্তিবিদ বন্ধুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল সম্প্রতি। বলল, "কোনও অ্যানিমিক রোগীকে গলাধাক্কা দিয়ে রক্তদান শিবিরে পাঠালে কেমন লাগবে? লোকটার তো এমনিতেই রক্ত নেই। সূচ ফুটিয়ে টেনে নেবে ফের।" চোখ গোলগোল করে বললাম, "কিছুই বুঝলাম না রে।" বন্ধু বলল, "একটা আশ্চর্যের ব্যাপার কি জানিস? দুনিয়ার ডেটা সেন্টারগুলো যে এলাকায় গড়ে উঠেছে, তার সিংহভাগই খরাপ্রবণ। জলহীন অঞ্চল থেকে আরও জল কেড়ে নেওয়ার এ এক অদ্ভুত ম্যাজিক।" আন্তর্জাল ঘেঁটে দেখি, একেবারে হক কথা। আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। দেশের ২৭৮টি ডেটা সেন্টারের ৭৫ শতাংশই গড়ে উঠেছে পাঁচটি রাজ্যে - মহারাষ্ট্র, তামিলনাডু, কর্নাটক, তেলেঙ্গানা এবং উত্তরপ্রদেশ। ম্যাপের গায়ে টকটকে লাল রং। জল দাও জল দাও ধ্বনি। ঝটিতি ফোন করলাম বন্ধুকে। জিজ্ঞেস করলাম আকুল হয়ে, "কেন করল এরকম, বলো।" কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধতার পর ও প্রান্ত থেকে ভেসে এল, "সে এক অন্য গল্প। তবে গন্ধটা খুব সন্দেহজনক।"