আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ একাদশ সংখ্যা ● ১-১৫ জুন, ২০২৬ ● ১৬-৩১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

প্রবন্ধ

শেখার সংকট: যে প্রশ্নটি কেউ জিজ্ঞাসা করে না

অঞ্জন মুখোপাধ্যায়


শুরুর কথা

লেখাটা তৈরীর চিন্তা মাথায় এসেছিল দি হিন্দু পত্রিকায় এই আর্টিকেলটি পড়ে (https://epaper.thehindu.com/articleshare?articleurl=https%3A%2F%2Fepaper.thehindu.com%2Fccidist-ws%2Fth%2Fth_kolkata%2Fissues%2F181386%2FOPS%2FGBSFSJNDO.1%2BGCGFSL7GP.1.html) এটা হয়তো সরাসরি ক্লিক করলে নাও দেখাতে পারে (পে-ওয়ালের জন্য) তাই আমি লেখাটির শিরোনাম - 'Puzzle of missing urgency around learning', লেখকের নাম Jatin Goyal, Civil Servant of the DANICS cadre, presently posted in the UT of Dadra & Nagar Haveli and Daman & Diu। উল্লেখ করে দিলাম। লেখাটি 'দি হিন্দু' পত্রিকার কলকাতা সংস্করণে ২১শে এপিল ২০২৬-এ প্রকাশিত হয়েছিল।

ঐ লেখাটির মূল সুর ছিল "লক্ষ লক্ষ শিশু স্কুলে ভর্তি হওয়া সত্ত্বেও, তারা শিখছে না... অথচ এই নিয়ে কারোর কোনও হেলদোল নেই..."। এই লেখাতে বারবার গোয়েলের নামের উল্লেখ থাকবে তাই সেটার লিঙ্ক আমি দিয়ে দিয়েছি।

পড়ার সময় মাথায় রাখবেন: এই লেখায় 'শেখা' মানে মুখস্থ নয় - বরং নিজের চোখে দেখা, প্রশ্ন করা, আর ভুল থেকে শেখার অধিকার।

১. একটা সোজা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি

ভারতে প্রতিদিন কত কোটি শিশু স্কুলে যায়? হাজিরা দেয়, মিড-ডে মিল খায়, পরীক্ষা দেয়, সার্টিফিকেট পায়। কিন্তু তারপরও ক'জন সত্যি সত্যি পড়তে শেখে? কতজন নিজের অজানা প্রশ্ন নিজেই খুঁজে বের করতে পারে?

Annual Status of Education Report (ASER) রিপোর্ট বছর বছর একই ভয়ানক কথা বলে - পঞ্চম শ্রেণির অনেক শিশু দ্বিতীয় শ্রেণির একটি বাক্যও ঠিকমতো পড়তে পারে না। তৃতীয় শ্রেণির অনেকে দুই অঙ্কের বিয়োগ করতে জানে না।এটা কোনো রাজ্যের বা জেলার সমস্যা নয়। এটা ভারত জুড়ে, গভীর, দীর্ঘমেয়াদী এক দুর্যোগ।

তবু দেশ জুড়ে কোনো উত্তেজনা নেই। সংসদে ঝড় নেই। রাস্তায় মশাল নেই। নীতিনির্ধারকদের মুখে শুধু দুশ্চিন্তার অভিনয় - কিন্তু সেটা বাগাড়ম্বরের বাইরে কোনওমতেই যায় না।

সাম্প্রতিক এক নিবন্ধে যতীন গোয়েল নামের এক সরকারি আধিকারিক ঠিকই প্রশ্ন তুলেছেন: শেখার দুর্যোগ ঘিরে এই জরুরি অনুভূতির অনুপস্থিতির ধাঁধার সমাধান কোথায়?

উত্তরটা হয়তো পাবলিক ম্যানেজমেন্টে নেই, রাজনৈতিক সিগন্যালে আছে।

এই লেখা সেদিকেই যেতে চায়: ভারতের শিক্ষাসংকট কেন টিকে থাকে? আর নব্যউদারবাদের চাকরির বাজার আর হিন্দুত্বের অন্ধ মতাদর্শ মিলে কীভাবে এই সংকটকে নতুন করে পুষে দেয়?

২. স্কুল মানেই শিক্ষা নয় - একটা সোজা-সাপটা ফাঁকি

ভারতে বহু বছর ধরে শিক্ষানীতি একটা ভুল পথে হাঁটছে: ভর্তির সংখ্যাকে শিক্ষার সাফল্য বানিয়ে ফেলা হয়েছে।

২০১০ সালে যখন শিক্ষার অধিকার আইন (Right to Education Act) কার্যকর হয়, তখন তার মূল প্রতিশ্রুতি ছিল ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রতিটি শিশুকে বিদ্যালয়মুখী করা। সেই লক্ষ্যে উল্লেখযোগ্য সাফল্যও এসেছে। নামতালিকায় শিশুর সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু নামতালিকায় নাম থাকলেই শিক্ষা হয় না।

আসলে আমরা 'স্কুলিং' আর 'লার্নিং'-কে গুলিয়ে ফেলেছি।

প্রথমটা সহজে মাপা যায়, দেখানো যায়, নিউজে দেওয়া যায়।

দ্বিতীয়টা জটিল, সময় নেয়, আর জানা গেলেই বোঝা যায় কত বড় ব্যর্থতা।

গোয়েল ঠিকই বলেছেন - স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটি বা অভিভাবকসভায় শুধু আলোচনা হয় বেড়ার রং, টয়লেটের দরজা, কত শিক্ষকের পদ খালি। কিন্তু 'ছেলেটা কী পড়তে পারছে'? - এই প্রশ্নটা কে করে?

এই যে 'দেখনদারির রাজনীতি' - এটাঅ্যাক্সিডেন্ট না। যেটা বোর্ডে লেখা যায়, পরিসংখ্যানে তোলা যায়, শুধু সেটাই অগ্রাধিকার পায়। আর শেখার মতো অদৃশ্য ব্যাপারটা থাকে প্রান্তে।

৩. নব্যউদারবাদের থাবা: শিক্ষা যখন পণ্য

১৯৯১-এর পর থেকে আমরা যে সংস্কারের ঝড় দেখেছি, তাতে শিক্ষা পুরোদস্তর বাজারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। তিনটি দিক পরিষ্কার করে দেখা দরকার।

ক. সরকারি স্কুলের পথে রাষ্ট্রের পিঠটান

যুক্তি শুনতে মজার - রাষ্ট্র অদক্ষ, বাজার দক্ষ। তার মানে স্কুলের দায়িত্ব রাষ্ট্রের না, বাজারের।

ফলে শিক্ষায় জিডিপির ৬ শতাংশ দেওয়ার পুরনো কোঠারি কমিশনের সুপারিশ আজও ধোপে টেকেনি।

বিত্তবানরা সন্তান পাঠায় বেসরকারি স্কুলে, গরিবরা যায় সরকারি স্কুলে - যেখানে শিক্ষকের অভাব, বই নেই, পড়ানোর আগ্রহ নেই।

এটা কোনো অনিচ্ছাকৃত ব্যাপার না। এটা শ্রেণি-ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার স্বাভাবিক রূপ। কারও জন্য মানসম্মত শিক্ষা - কারও জন্য ঠেলা-ঠেলির সার্টিফিকেট।

খ. শিক্ষক - অর্ধেক পেটে, প্রশিক্ষণহীন, ক্ষমতাহীন

নব্যউদারবাদের দ্বিতীয় মারণ হল চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক। যাঁর নিয়মিত বেতন নেই, পেনশন নেই, চাকরির নিরাপত্তা নেই - তিনি কীভাবে ৪০ জন শিশুকে মন দিয়ে পড়াবেন?

তার ওপরে প্রশিক্ষণের বাজে অবস্থা। B.Ed. ডিগ্রি এখন নেহাত ব্যবসা। পেডাগগি (Pedagogy)[1] যাকে বলে, সেটা তো দূরের কথা।

শিক্ষক নিজেই জানেন না কীভাবে পড়াবেন। শিশু বুঝতে পারছে না - শিক্ষক সেই যন্ত্রটাই পাননি। ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে পড়িয়ে যান, আর শিশুরা মুখস্থ করে - কিন্তু শেখার আলো জ্বলে না।

গ. জবাবদিহি মানেই পরীক্ষার র‌্যাঙ্ক?

নতুন মডেলে শিক্ষার মান নির্ধারিত হয় পরীক্ষার ফল দিয়ে। র‌্যাঙ্কিং দেয়া হয়, লিগ টেবিল বানানো হয়। তাহলে শিক্ষক কী করবেন? তিনি পড়াবেন পরীক্ষার জন্য, শেখার জন্য না।

শিশু শেখে কীভাবে সঠিক উত্তরের বৃত্তে দাগ দিতে হয় - কিন্তু কেন সেটা সঠিক, তা জানে না।

প্রকৃত শিক্ষা তো প্রশ্ন করে, ভুল করে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। সেটা সহজে মাপা যায় না - আর বাজারে যা মাপা যায় না, তার দাম নেই।

৪. হিন্দুত্বের হাতে পাঠ্যবই যখন ভগবানের দোহাই দেয়

একদিকে নব্যউদারবাদের মামলা, অন্যদিকে হিন্দুত্বের হাতে ধরা শিক্ষা। বিপরীতমুখী মনে হলেও এই দু'শক্তি অদ্ভুত সুন্দর সহাবস্থান করছে।

ক. ইতিহাস আর বিজ্ঞান সরিয়ে দিয়ে পুরাণ বসানো

২০২৩ সালে NCERT-এর বই পুনর্লিখনের মধ্যে দিয়ে এক পরিকল্পিত চেহারা দেখা যাচ্ছে। বিজ্ঞানের বইতে বিবর্তন কেটে দেওয়া, ইতিহাস থেকে মুঘলদের ছেঁটে ফেলা, সমাজতন্ত্র আর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পাতাগুলো না দেখানো।

বদলে আসছে পৌরাণিক গাথা, একটাই সরল জাতীয়তাবাদী ইতিহাস, আর হিন্দু সভ্যতার জয়গান।

এটা শুধু ভুল তথ্য নয় - এটা শিশুর 'প্রশ্ন করার ক্ষমতা'কে গুঁড়িয়ে দেওয়া। যে শিক্ষা বলে 'যা দেওয়া আছে তাই গিলে ফেলো', সেটা মুক্তির শিক্ষা নয় - সেটা আনুগত্যের ট্রেনিং।

খ. মাতৃভাষার অত্যাচার আর উত্তর-দক্ষিণের ফাটল

NEP 2020 মাতৃভাষায় শিক্ষার কথা বলে - ভালো কথা। কিন্তু একই সঙ্গে হিন্দিকে চাপিয়ে দেওয়ার যে অলিখিত চেষ্টা, তা দক্ষিণ ভারতে আগুন জ্বালিয়েছে।

যে শিশুর ঘরে হিন্দি বলা হয় না, তাকে হিন্দিতে পরীক্ষা দিতে বাধ্য করা মানে শেখার পথে কাঁটা পেতে দেওয়া।

গ. মাদ্রাসা আর সংখ্যালঘু নিশানা

হিন্দুত্বের শিক্ষা-হামলার আরেক দিক: সংখ্যালঘু স্কুল-মাদ্রাসাগুলোকে সন্ত্রাসের আস্তানা বলে তকমা দেওয়া। কোনো তথ্যভিত্তি নেই, কিন্তু উদ্দেশ্য পরিষ্কার - রাজ্যগুলোতে মাদ্রাসার স্বীকৃতি কাটিয়ে দেওয়া, অনুদান বন্ধ করে দেওয়া।

লক্ষ লক্ষ শিশুর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে দেওয়া।

৫. ভিয়েতনাম আর কেরালার কাছে শেখার বাকি

গোয়েল ভিয়েতনামের উদাহরণ দিয়েছেন। ধনী দেশগুলোর চেয়েও ভিয়েতনাম শেখার ফলাফলে এগিয়ে - অথচ বেশি খরচ করে না। কারণ শুধু একটিই: তারা সত্যিই চেয়েছিল।

ভারতের ভিতরেই কেরালা বড় দৃষ্টান্ত। সেখানে শিক্ষার মান এত এগিয়ে কেন? শুধু টাকা না - ইতিহাস। বাম আন্দোলনের লম্বা ঐতিহ্য, যা শিক্ষাকে দেখেছে শ্রেণি-মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে। ভূমিসংস্কার, পঞ্চায়েত, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা - সব এক সুতোয় গাঁথা ছিল।

পশ্চিমবঙ্গের প্রথম দুই দশকের বাম আমলেও গণশিক্ষার প্রসার হয়েছিল, পরে গতি থমকে যায়।

এটাই প্রমাণ করে: শিক্ষার সংকট টাকার না, রাজনৈতিক ইচ্ছের সংকট।

৬. কে জবাব দেবে? - এক অদ্ভুত নো-ম্যানস ল্যান্ড

গোয়েল আঙুল তুলেছেন ক্ষমতার অসামঞ্জস্যের দিকে। শিক্ষক-প্রশাসন উঁচু আসনে, আর দরিদ্র অভিভাবকের গলার স্বর নেই।

মধ্যবিত্ত সরকারি স্কুল থেকে সরে যাচ্ছে, ফলে জনচাপ কমছে।

আরও গভীর ব্যাপার: রাষ্ট্র মনে করে এটা ব্যক্তির দায়িত্ব, কিন্তু পরিবার মনে করে রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তার মানে কেউই আসলে দায়ী নয় - আর এই চাপান-উতরের ফাঁকে শিশুটি পিষ্ট হয়।

নব্যউদারবাদের চমক: 'তোমার সন্তানের স্কুল বেছে নাও' - যার বেছে নেওয়ার ক্ষমতা নেই, তার ব্যর্থতাটা তখন 'ব্যক্তির ব্যর্থতা' বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। কত সুবিধে!

৭. দলিত, আদিবাসী - যাদের স্কুল আরও কঠিন

মার্কসবাদী দৃষ্টিতে শিক্ষা কেবল পড়ানো না - সমাজের সম্পর্কগুলোর পুনরুৎপাদন। আলথুসার বলেছিলেন, শিক্ষা রাষ্ট্রের 'আদর্শগত যন্ত্র'। পল উইলিস দেখিয়েছিলেন কীভাবে শ্রমিকশ্রেণির ছেলেরা অজান্তেই নিজেদের শ্রমিক বানিয়ে ফেলে।

ভারতে তার ওপরে আছে বর্ণপ্রথা। দলিত বা আদিবাসী শিশু স্কুলে যায় শেখার আশায়, আর পায় অপমান। উচ্চবর্ণের শিক্ষক তাদের একই থালায় খেতে দেন না, এক বেঞ্চে বসতে দেন না।

অম্বেডকর দেখেছিলেন শিক্ষাকে মুক্তির পথ। কিন্তু সেই শিক্ষা যেখানে বর্ণের কাঁটা বিছানো - সেখানে তা মুক্তি নয়, অপমানের নতুন মঞ্চ।

৮. 'কিছু হবে না' - এই ভাগ্যবাদই বড় শত্রু

গোয়েল বলেছেন, যখন ব্যবস্থা বারবার ব্যর্থ হয়, মানুষের ভিতরে 'অচেঞ্জেবল'-এর বাসা বাঁধে। 'কিছুই বদলাবে না' - এই ভাগ্যবাদ ব্যবস্থারই বন্ধু।

কিন্তু ইতিহাস কিন্তু উল্টো চিৎকার করে। কেরালা, ভিয়েতনাম, কিউবা দেখিয়েছে - রাজনৈতিক সংকল্প আর গণআন্দোলন মিলে সম্ভব। 'Teaching at the Right Level'-এর মতো সহজ পদ্ধতিও সাফল্য এনে দিয়েছে।

পরিবর্তন শুধু সম্ভব না - সাশ্রয়ীভাবেও সম্ভব। শুধু দরকার এক রাজনৈতিক শক্তি, যে শিক্ষাকে পণ্য নয়, মতাদর্শের হাতিয়ার নয় - সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন বলে দেখে।

৯. বামপন্থীদের হাতে এখন কী?

ভারতের বাম আন্দোলন যদি শিক্ষাকে বড় প্রশ্ন না করে, তাহলে তারা অর্ধেক যুদ্ধ হেরেই বসে থাকবে। অনেক বামপন্থী বলেন 'অর্থনৈতিক সংগ্রাম প্রধান' - কিন্তু মেহনতি মানুষের সন্তান যদি পড়তে না শেখে, তবে সেই সংগ্রাম স্বপ্নই থেকে যায়। "ভুখা মানুষ ধরো বই ওটা হাতিয়ার" - এই বাক্যটি কেবল দরবারের শ্লোগান নয়। আজকের ভারতের লক্ষ লক্ষ শিশু, যারা পড়তে পারে না, তারা যেন একদিন এই হাতিয়ার হাতে পায় - সেটাই প্রকৃত জরুরি কাজ।

অম্বেডকর ও মার্কসবাদ - এই দু'স্রোতের মিলনস্থলে দাঁড়িয়ে আজ বামদের দরকার একটি শিক্ষাকর্মসূচি:
● জিডিপির ৬% শিক্ষাবাজেট
● চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক প্রথা বন্ধ
● পাঠ্যক্রমের বাণিজ্যিকীকরণ ও সাম্প্রদায়িকীকরণের প্রতিরোধ
● দলিত-আদিবাসী শিশুদের বিদ্যালয়ে সমান মর্যাদার দাবি

এগুলো বাগাড়ম্বড় না - এগুলো সংগ্রামের বুলেট।

১০. শেষ কথা: জরুরি অনুভূতি ফিরিয়ে আনতে গেলে

যতীন গোয়েল তাঁর নিবন্ধে বলেছিলেন, শেখার সংকটকে ঘিরে জরুরি অনুভূতি তৈরি হতে পারে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে - যখন কোনো নীতিনির্ধারক নিজের চোখে সরকারি স্কুলের ভিতরটা দেখেন, যখন মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ির সামনে দাঁড়ায় এক ঝাঁক দরিদ্র শিশু। কিন্তু এই 'ব্যক্তিগত সংবেদনশীলতা' কখনোই ব্যবস্থাগত সংকটের স্থায়ী সমাধান দেয় না।

কারণ জরুরি অনুভূতি, কর্তার ঘরে বসে তৈরি হয় না।

জরুরি অনুভূতি তৈরি হয় যখন সংকটগ্রস্ত মানুষ নিজেরা গর্জে ওঠে, যখন মায়েরা জিজ্ঞেস করে - 'আমার ছেলে পড়তে শেখে না কেন?'

ক. ভাগ্যবাদের জাল ছিঁড়তে হবে

অনেক জায়গায় এখন নীরব পদত্যাগ চলে। বাবা-মা ভাবেন - 'যা হওয়ার হবে, স্কুলে তো যায়', শিক্ষক ভাবেন - 'বেতন তো পাচ্ছি, বাকিটা ভাগ্য', আর ছাত্র ভাবে - 'উত্তরগুলো দাগিয়ে দেব, আর পাস করে যাব'।

এই ভাগ্যবাদই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ঢাল। কারণ ভাগ্যবাদ মানুষকে অচল করে দেয়, 'আন্দোলন করলে কী হবে' ভাবতে শেখায়।

কেরালার ইতিহাস কিন্তু উল্টো কথা বলে। সেখানে ১৯৫০-৬০-এর দশকে দরিদ্র কৃষক ও শ্রমিকেরা কীভাবে শিক্ষাকে হাতিয়ার বানিয়েছিল? তারা প্রথমে জমির দাবি করেছিল, পঞ্চায়েতের ক্ষমতা দাবি করেছিল, তারপর স্কুল চেয়েছিল - এমন স্কুল যেখানে তাদের সন্তানকে 'তুই পারবি না' বলা হবে না।

এই আন্দোলন 'জরুরি অনুভূতি' তৈরি করেছিল নিচ থেকে, ওপরে নয়।

খ. 'ভুখা মানুষ ধরো বই' - সেটা আক্ষরিক অর্থেই করতে হবে

আমরা শ্লোগান দিতে অভ্যস্ত - 'ভুখা মানুষ ধরো বই ওটা হাতিয়ার'। কিন্তু বাস্তবের ভুখা মানুষ যদি বই হাতে নেয়, আর বইটা পড়তে না পারে, তাহলে হাতিয়ারটা কি কাজে আসে?

জরুরি অনুভূতি তৈরীর প্রথম ধাপ: স্বীকার করা যে পড়তে না জানা মানেই অসহায় থাকা।

দ্বিতীয় ধাপ: ক্ষোভ তৈরি করা।

তৃতীয় ধাপ: ক্ষোভকে সংগঠনে পরিণত করা।

আজকের ভারতের প্রতিটি জেলায় গিয়ে দেখুন - সেখানে একটি অভিভাবক সংগঠন নেই যে প্রশ্ন করবে 'পঞ্চম শ্রেণির ছেলে দ্বিতীয় শ্রেণির বই পড়তে পারে না কেন?'

মিড-ডে মিল বন্ধ হলেই বিক্ষোভ হয়। বই না থাকলেও বিক্ষোভ হয়।

কিন্তু শেখা হচ্ছে না - সেটা নিয়ে কেউ মিছিলে নামে না।

এটাই শূন্যস্থান। এই শূন্যস্থান পূরণ করতেই হবে।

গ. জরুরি অনুভূতির চারটি স্তম্ভ

শেখার সংকটের বিরুদ্ধে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে গেলে চারটি জিনিস একসঙ্গে দরকার:

১. নিচ থেকে গর্জন

প্রতি স্কুলের বাইরে অভিভাবকদের একটি 'শেখার মনিটরিং কমিটি' গড়ে উঠতে পারে। তারা মাসে একদিন জড়ো হবে, এলোমেলোভাবে কোনো শিশুকে ডেকে বলবে - 'একটু পড়ে দেখো তো।' যদি পড়তে না পারে - সেটা স্কুলের বার্ষিক সভায় উচ্চৈঃস্বরে বলা হবে। লজ্জা তৈরি হবে। লজ্জা না বদলায়, সংকট বদলায় না।

২. শিক্ষকদের ভিতর থেকে বাঁচানো

হাজার হাজার চুক্তিভিত্তিক, অর্ধ-প্রশিক্ষিত শিক্ষক আজ নিজেরা দিশেহারা। তাদের দরকার ইউনিয়ন, দরকার গ্যারান্টিযুক্ত বেতন ও পেনশন, দরকার মাসিক পেডাগজি কর্মশালা - যেখানে তারা বলতে পারবে 'আমি পড়াতে পারছি না, আমাকে শেখান।'

জরুরি অনুভূতি মানে শিক্ষককেও শত্রু না ভেবে বন্ধু বানানো।

৩. পাঠ্যক্রমের যুদ্ধ

যে পাঠ্যক্রম বিবর্তন কাটে, ইতিহাস ছেঁটে ফেলে, আর গুজরাটের সাংঘাতিক দাঙ্গা এড়িয়ে চলে - তার বিরুদ্ধে প্রতিটি স্কুলের অডিটোরিয়ামে বিতর্ক দরকার। শিক্ষার্থীরাই হোক সেই বিতর্কের সামনের সারি। কারণ তাদের প্রশ্ন - 'আমাকে পৌরাণিক অন্ধকারে ঢুকিয়ে কেন রাখা হচ্ছে?' - এই প্রশ্নটিই প্রথম স্বস্তির নিঃশ্বাস।

৪. গণমাধ্যম আর গবেষণাকে টেনে আনা

আজ শিক্ষা নিয়ে কঠিন প্রতিবেদন করে শুধু ASER আর কিছু স্বাধীন সাংবাদিক। বাণিজ্যিক টেলিভিশনে শিক্ষার সংকট আসে না, কারণ সেখানে টিআরপি হয় না। জরুরি অনুভূতি তৈরি করতে হলে শিক্ষাবিদ, গবেষক, সাংবাদিকদের একসঙ্গে 'শেখার দুর্যোগ' নামে একটি জাতীয় প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে। প্রতি সপ্তাহে একটি স্কুলের গল্প - সেই শিশুর নাম, ছবি, তার ব্যর্থতা আর সম্ভাবনা - যাতে সাড়া দেয় দেশ।

ঘ. বামপন্থীদের জন্য এক সতর্ক বার্তা

বামপন্থীরা শিক্ষাকে প্রায়ই 'সুপারস্ট্রাকচার' বলে পেছনে ফেলে দেন। অর্থনৈতিক সংগ্রাম চলুক, শিক্ষা পরে হবে। এটি একটি বড় ভুল।

শিক্ষার সংকট মেটানো মানে হাতিয়ার ভাঙা মানুষকে নতুন করে হাতিয়ার দেওয়া।

যে দল স্কুলের গেটে '৬% জিডিপি শিক্ষায় চাই' বলে মিছিল করবে না, যে দল চুক্তিভুক্ত শিক্ষকের অনিশ্চয়তা নিয়ে রাস্তায় নামবে না, যে দল বিবর্তন কাটাকাটির বিরুদ্ধে স্বাক্ষর সংগ্রহ করবে না - সেই দল 'ভুখা মানুষ'কে বই হাতে দিতে পারবে না।

আম্বেডকর আর মার্কসের মিলনস্থল হল শিক্ষা। সেটা যদি বামেরা হারায়, তবে তারা হারায় নিজেদের ভিত্তি।

ঙ. 'জরুরি অবস্থা' ঘোষণার দৃষ্টান্ত

ভিয়েতনাম এক দেশ। কেরালা এক রাজ্য। আমরা দরকার ছোট ছোট পকেটে পরীক্ষা-নিরীক্ষা।

উদাহরণ: পশ্চিমবঙ্গের একটি জেলা - উত্তর দিনাজপুর। সেখানে একটি সেচ্ছাসেবী সংগঠন 'পাঠশালা' নামে একটি পরীক্ষা চালাচ্ছে। প্রতি রোববার এক ঘণ্টার জন্য অভিভাবক ও শিশুরা বসে, একজন স্বেচ্ছাসেবক তাদের পড়ায়। তিন মাসেই শিশুরা অক্ষর চিনতে শিখছে। এই কাজটি রাষ্ট্রীয় করা দরকার। প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েতে 'সপ্তাহে একদিন শেখার আড্ডা' বাধ্যতামূলক করতে হবে।

আর সেই আড্ডায় কোনো রাজনৈতিক দলের পতাকা ওঠানো যাবে না - শুধু বই আর ব্ল্যাকবোর্ড।

জরুরি অনুভূতি মানে সরকারি স্কুলের জন্য 'অপারেশন পাঠশালা' নামে একটি ১০০ দিনের অভিযান। সেই অভিযানে আইএএস অফিসার, স্বাস্থ্যকর্মী, পঞ্চায়েত সদস্য, কলেজের ছাত্র - সবাই নামতে বাধ্য হবে। যারা পড়াতে পারে না, তাদের জন্য দ্রুত প্রশিক্ষণ। যেসব স্কুলে একটিও শিশু 'পঞ্চমে পঞ্চম মানে পড়তে পারে না' - সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা।

এটা কি স্বপ্ন? কিউবা ৬ মাসে সাক্ষরতা অভিযান চালিয়েছিল। ভিয়েতনাম যুদ্ধের মধ্যেও স্কুল বসিয়েছিল। আমরা কেন পারব না?

পারব - যদি 'জরুরি অনুভূতি' সত্যিই জরুরি হয়।

চ. শেষ কথাটা আসলেই শেষ নয়

লক্ষ লক্ষ শিশু প্রতিদিন স্কুলে যায় কিন্তু শেখে না। তারা হেসে খেলে বেড়ায়, কিন্তু তাদের ভবিষ্যতের দেয়ালটা ইট ইট করে গেঁথে যায় তাদের অশিক্ষার ইট দিয়ে।

'ভুখা মানুষ ধরো বই, ওটা হাতিয়ার' - এই বাক্যটি কেবলমাত্র শ্লোগান থাকতে পারে না।

এটা হতে পারে প্রতিটি বিদ্যালয়ের দেয়ালে লেখা অঙ্গীকার।

এটা হতে পারে সংসদের অধিবেশন।

এটা হতে পারে রাস্তার ডাক।

এটা হতে পারে বাবার মুখ থেকে মেয়ের কানে বলা প্রথম বাণী।

জরুরি অনুভূতি ফিরিয়ে আনতে গেলে ভাবতে হবে: আমরা চাই কোন ভারত - যেখানে পঞ্চমের শিশু দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠ্যবইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে? নাকি এমন ভারত, যেখানে প্রতিটি শিশু নিজের প্রশ্ন নিজে কষে আঁকে?

আমাদের উত্তরটা এখনই দিতে হবে। কারণ অপেক্ষা করলে আরও এক প্রজন্ম অন্ধকারে থাকবে।

জরুরি অবস্থার জবাব দিতে দেরি করা যাবে না।

লক্ষ লক্ষ শিশু প্রতিদিন স্কুলে যায়, কিন্তু শেখে না - এটা সংখ্যা নয়, এটা রাজনৈতিক জরুরি অবস্থা। আর জরুরি অবস্থার জবাব দিতে হয় জরুরি ভঙ্গিতেই।

______________________________
1) Pedagogy (পেডাগোগি) শব্দের অর্থ হলো শিক্ষাবিজ্ঞান, শিক্ষণপদ্ধতি, বা শিক্ষাদান কৌশল। এটি মূলত কীভাবে শিক্ষার্থীদের কার্যকরভাবে শিক্ষা দেওয়া হয় এবং শেখার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা হয়, তার তত্ত্ব ও প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করে।