আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ একাদশ সংখ্যা ● ১-১৫ জুন, ২০২৬ ● ১৬-৩১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩
সমসাময়িক
বঙ্গে বুলডোজার রাজ?
ভোটে জেতার পর পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা গঠনের আগেই রাজ্য জুড়ে নতুন সরকারের প্রশাসনিক কঠোরতা এবং দক্ষতা প্রমাণের লক্ষ্যে চটজলদি সস্তা জনপ্রিয়তার বিজ্ঞাপন শুরু হয়েছে 'বুলডোজার' রাজের বাংলা সংস্করণ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে প্রয়োগের মাধ্যমে। সাম্প্রতিক অতীতে বিজেপির দিল্লির এক সাংসদ নির্মাণ ভাঙার যন্ত্র 'জেসিবি' শব্দের অর্থ ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন 'জেহাদি কন্ট্রোল ব্যুরো'। ফলে দিল্লির জাহাঙ্গীরপুরির ঘটনার প্রেক্ষিতে করা সেই বাক্যবন্ধগুলি এরাজ্যের মাটিতেও প্রয়োগ হবে কিনা সেই আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে রাজ্যের সাম্প্রতিক ঘটনাক্রমে।
এমন প্রেক্ষিতে কলকাতা শহরের তিলজলা অঞ্চলের ঘিঞ্জি এলাকায় এক বেআইনি নির্মাণের ভেতরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার প্রেক্ষিতে রাজ্য সরকারের আপৎকালীন তৎপরতায় তৈরি হয়েছে বিতর্ক। বিশেষত সেই অভিশপ্ত জতুগৃহের সাথে থাকা বেআইনি আবাসের ঘর ভাঙতে সরাসরি বুলডোজার নেমেছে শহরের রাজপথে। বিশাল পুলিশ বাহিনীর ঘেরাটোপে ওই দোতলা বসত বাড়িকে বুলডোজারের হাতল দিয়ে থেতলে ভাঙ্গা হয়েছে। ফলে সরগরম সংবাদমাধ্যম জুড়ে সমস্বরে প্রচারিত হয়েছে বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে নতুন সরকারের 'জিরো টলারেন্স' অবস্থানের কথা। সরকারে আসীন হওয়ার সপ্তাহ অতিক্রান্ত হতে না হতেই মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে সরকারের এমন অবস্থান যেমন বহু মানুষের মনে স্বস্তি এনেছে আবার বহু মানুষের মনে এনেছে আতঙ্কের উপাদান। এতকাল ধরে কলকাতা থেকে কোচবিহার রাজ্যের মানুষ দেখে এসেছে যে রাজ্যের শাসক দলের আশ্রয় এবং পুলিশ প্রশাসনের ছাতার তলায় যে অবৈধ নির্মাণ হয় রাজ্য জুড়ে তার বিরুদ্ধে হাজার অভিযোগ করেও সুরাহা মেলে না। ফলে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার অব্যবহিত পরেই অবৈধ নির্মাণ রাতারাতি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলায় বেশ কিছু মানুষের মনে স্বস্তি আনলেও যে পদ্ধতি অনুসরণ করে সেই নির্মাণ গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তাতে বহু মানুষের মনে আরও বড় অস্বস্তি ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
কোনও সন্দেহ নেই তৃণমূল কংগ্রেসের ভয়াবহ দুর্নীতির এক অন্যতম ভরকেন্দ্র ছিল এই অবৈধ নির্মাণ ক্ষেত্র। ঐ অবৈধ নির্মাণের ব্যবসা ছিল শাসক দলের নেতাকর্মীদের কোটি কোটি অবৈধ অর্থের খনি। ফলে দুর্নীতিগ্রস্ত ঐ সরকারের পতনের পর নতুন সরকার যে অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেবে সেটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু সেই কড়া ব্যবস্থা নিতে হবে সরকারকে নিয়মসিদ্ধ পথেই। আজ 'টি -২০' ক্রিকেটের 'ধর তক্তা মার পেরেকের' যুগে মানুষ বিচার পেতে চায় চটজলদি , হাতে গরম । কিন্তু তাই বলে সরকারি প্রশাসন অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিয়ম কিংবা নীতি বিরুদ্ধ পথে কোনও পদক্ষেপ নিলে সেটা আরও বড় বিপদের বার্তা ডেকে আনতে পারে। ফলে বৃহত্তর জনস্বার্থে সুবিচারের ক্ষেত্রে সরকারকে আইনসিদ্ধ পথেই এগোতে হবে। বৈধ পথেই অবৈধ নির্মাণের বিষবৃক্ষের মোকাবিলা প্রয়োজন। কিন্তু মনে রাখতে হবে সেই নির্মাণের বিষবৃক্ষের নিধন করতে গিয়ে শাসক যেন সাম্প্রদায়িকতার বিষে বিদ্ধ না হয়। গত পনেরো বছরে গোটা শহর জুড়েই অবৈধ নির্মাণ বেড়েছে হু হু করে। কিন্তু অবৈধ নির্মাণক্ষেত্র মানেই গার্ডেনরিচ, মোমিনপুর রাজাবাজার, মেটিয়াবুরুজ ইকবালপুর কিংবা তিলজলার মতো সংখ্যালঘু প্রধান এলাকার নাম প্রথমেই ভাসিয়ে দেওয়া হয়। অথচ বড়বাজার, কাশিপুর, বেহালা, গড়িয়া, টালিগঞ্জ, আনন্দপুরের মতো অঞ্চলগুলিতেও বেআইনি নির্মাণের বাড় বাড়ন্ত। ফলে বেআইনি নির্মাণ চিহ্নিতকরণের আলোচনার ক্ষেত্রেও ঢুকে পড়ে ধর্মীয় মেরুকরণের চেনা ছক। ফলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে ধর্মীয় মেরুকরণের যে রাজনীতি ভোটের আগে চলছিল রাজ্য জুড়ে কার্যত সেটাই ঘটে চলেছে ভোটের পরেও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে সঙ্গী করে। ফলে অবৈধ নির্মাণের স্থান কাল পাত্র, কিংবা তার ক্রিয়া - প্রতিক্রিয়া নির্ধারণের ক্ষেত্রেও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির আবর্তে প্রশাসনিক তৎপরতা জড়িয়ে গেলে সুশাসন দেওয়া কঠিন হয়। ফলে অবৈধ নির্মাণের বিষবৃক্ষ নিধনের সাথে নতুন শাসকের কাছে জরুরী হয়ে উঠছে মেরুকরণের রাজনীতির চারা রোপণ।
অন্যদিকে চলছে হকারদের বিরুদ্ধে বুলডোজার। বিভিন্ন রেল স্টেশনে রাতারাতি হকারদের দোকানপাট ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে রেল ও রাজ্য সরকারের যৌথ উদ্যোগে। হকারদের পুনর্বাসনের কথা না ভেবে, তাদের পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে রাতের অন্ধকারে বুলডোজার চালিয়ে গরিব মানুষে জীবনজীবিকা কেড়ে নিয়ে পরিষ্কার গরিববিহীন রাজপথ তথা রেল প্ল্যাটফর্মের কাহিনি হীরক রাজার কথা মনে করায়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যা কখনই কাম্য নয়। বিজেপি নির্বাচনের সময় প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিল যে বেকারদের চাকরি দেবে, কর্মসংস্থান নাকি বিপুলভাবে বাড়বে। সেই পথে সরকারের চলা উচিত। পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান রাজ্যে তৈরি হলে হকারদের সংখ্যাও কমবে। কেই বা সাধ করে ফুটপাথে বা প্ল্যাটফর্মে দোকান নিয়ে বসতে চায়! কর্মসংস্থান তৈরি করার সেই পথে সরকার এখনও হাঁটেনি। তা না করে গরিব মানুষের রুটি-রুজি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া এক ভয়ঙ্কর গরিব এবং মানবাধিকার বিরোধী মানসিকতার পরিচয়।
বুলডোজার নির্মাণ বিদ্যার ক্ষেত্রে এক জরুরি উপকরণ। নির্মাণক্ষেত্রে এমন বিপুল আকারের দাঁত , নখ বের করা পেশী বহুল যন্ত্রের বহুল ব্যবহার মানুষ দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং এর এই বুলডোজার যে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ কাজে আসবে এটা দেশের মানুষ এক দশক আগেও দেখেনি, যা দেখতে শুরু করেছে উত্তর ভারতের গোবলয়ের রাজনীতির হাতধরে। কার্যত মধ্যপ্রদেশ থেকে উত্তরপ্রদেশ এমনকি দেশের রাজধানী খোদ নয়াদিল্লি শহরেও বুলডোজার দিয়ে সংখ্যালঘু কিংবা রাজনৈতিক বিরোধীদের দোকান,বাড়ি, ধর্মস্থান ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়া শুরু হয়েছিল সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির পুলিশ প্রশাসনকে ঢাল বানিয়ে। এভাবেই বেশ কিছু নির্মাণ বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলার নজিরকে 'প্রশাসনিক বলিষ্ঠতার' প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে রাজ্যে রাজ্যে 'বুলডোজার রাজ' প্রতিষ্ঠার ডাক দিয়েছিল গেরুয়া শাসক দল। এ রাজ্যেও ভোট প্রচারে গেরুয়া শাসক বাহিনীকে ভাড়া করা বাস-গাড়ি-জিপের পরিবর্তে বুলডোজারে আসীন হতে দেখা গিয়েছিল। আর ভোটের পর পুলিশ প্রশাসনের তৎপরতায় অবৈধ নির্মাণ ভাঙতে শহরের রাজপথে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় নেমেছে বুলডোজার। ফলে পুলিশের সাথে বুলডোজারের জোড়া ভয় দেখিয়ে মানুষকে ভয়ের বাতাবরণে রাখতে চাইছে রাজ্যের নতুন শাসক। ইতিমধ্যে ঐ অবৈধ নির্মাণ রাতারাতি বিনা নোটিশে ভাঙার বিরুদ্ধে করা জনস্বার্থ মামলায় আদালত স্থগিতাদেশ দিয়েছে। বিশেষত যে বাহুবলি প্রোমোটার বাহিনী শহরজুড়ে অবৈধ নির্মাণ করে দোকান,বাড়ি,ফ্ল্যাট বানিয়ে অন্যায় পথে লাখ লাখ টাকায় বিক্রি করেছে, বহু মানুষকে, তাদের কোমরে দড়ি পরানোর পরিবর্তে সেই অবৈধ নির্মাণের বাসিন্দাদের রাতারাতি পথে বসানোর পদক্ষেপ নিচ্ছে প্রশাসন। ফলে প্রশাসনিক সক্রিয়তার বর্ষামুখ ওই অবৈধ নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধে না গিয়ে সেই নির্মাণক্ষেত্রে বসবাসকারীদের বিরুদ্ধে চালিত হচ্ছে রাতারাতি বিনা নোটিশে, যা কেবল অন্যায় নয়, অনৈতিকও বটে।