আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ একাদশ সংখ্যা ● ১-১৫ জুন, ২০২৬ ● ১৬-৩১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

সমসাময়িক

আরশোলার বার্তা


ভারত আজ ভূত দেখছে - আরশোলার ভূত। কেবল একটি মন্তব্য, আর তাতেই যেন আগুনে ঘি পড়ল। ব্যবস্থার কাছে মার খাওয়া, বঞ্চিত তরুণ প্রজন্ম আরশোলার মতো কিলবিল করে বেরিয়ে এসেছে। তারা সদম্ভে ঘোষণা করেছে নিজেদের দল - ককরোচ জনতা পার্টি, সংক্ষেপে সিজেপি। তারা কী চায়? তারা চায় তাদের দিকে রাষ্ট্রব্যবস্থা যে তাচ্ছিল্য ছুঁড়ে দিয়েছে তাকেই প্রতিবাদের হাতিয়ারে পরিণত করতে। সমাজের উচ্চকোটিতে বসে থেকে যে অবলীলায় তাদের দিকে আঙুল তুলে বলে দেওয়া হল যে তারা আরশোলার মতো আদতে পরজীবী, অপাংক্তেয়, সেই অপমানের তীব্র ক্ষোভ ফুটে বেরোল সমাজমাধ্যমের পাতায়। তারা সগর্বে ঘোষণা করল তাদের দাবিসনদ। যা ছত্রে ছত্রে প্রমাণ করে দিল চালু রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি তাদের ক্ষোভ, বিদ্বেষ আর অন্তঃসারশূন্যতার প্রতি ব্যঙ্গের চাবুক। নড়ে উঠল ভারতের জগদ্দল রাষ্ট্র। সরকার থেকে শুরু করে ক্ষমতার বৃত্তে থাকা চাটুকারেরা নেমে পড়ল এই আরশোলারা কত বড় দেশদ্রোহী তা প্রমাণ করতে। বাজারে চলে এল একের পর এক রোমহর্ষক চক্রান্তের তত্ত্ব। কিন্তু যা হওয়ার তা হয়ে গিয়েছে। সাধারণ মানুষ চিনে নিয়েছে তার প্রতিবাদের নতুন রূপক।

তবে এই দৃশ্যমান উদ্দীপনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক আতঙ্কের ঠিক উল্টো পিঠেই লুকিয়ে রয়েছে এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সংকট। সিজেপি নামক এই ব্যঙ্গাত্মক মঞ্চের আত্মপ্রকাশ এবং তার নজিরবিহীন সামাজিক মাধ্যমের জনপ্রিয়তা দেশের সমাজতত্ত্বে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দলটির দাবি সনদে বেকারত্ব, প্রশ্নপত্র ফাঁস, করপোরেট সংস্কৃতির দাসত্ব থেকে শুরু করে বিচার বিভাগের সংস্কারের মতো অত্যন্ত গুরুতর ও বাস্তবসম্মত বিষয়গুলো স্থান পেয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে একে একটি সফল কৌতুক বা রসাত্মক প্রতিবাদ মনে হলেও, এর গভীরে নিহিত রয়েছে বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা ও চালু রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতি ভারতীয় যুবসমাজের এক পুঞ্জীভূত ও তীব্র ক্ষোভ। তরুণ প্রজন্ম যে এই চেনা বৃত্তের বাইরে গিয়ে একটি বিকল্পের খোঁজ করছে, সিজেপির উত্থান তারই অকাট্য প্রমাণ। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো এই তথাকথিত আন্দোলনের কাণ্ডারি বা যারা বিপুল লাইক-শেয়ার দিয়ে এটিকে রাতারাতি বিখ্যাত করে তুলেছেন, তারা আদৌ ময়দানের লড়াই লড়তে আগ্রহী কি না।

এই আন্দোলনের উদ্যোক্তারা ময়দানে নামুন বা না নামুন, তাদের তৈরি এই দাবি সনদটিকে টেবিল ল্যাম্পের তলায় রেখে ভালো করে খতিয়ে দেখলে বর্তমান ভারতের এক ভয়ঙ্কর দেউলিয়াপনা সামনে আসে। প্রতিদিন সকাল-সকাল কোটি কোটি টাকার সরকারি বিজ্ঞাপনে, 'বিশ্বগুরু' হয়ে ওঠার ঢাকঢোলের আড়ালে এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধির উচ্চকিত আস্ফালনের নিচে যে কী বিপুল পরিমাণ অন্ধকার জমেছে, তা এই দাবিগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। সিজেপি যখন দাবি করে যে সরকারি দপ্তরের শূন্যপদগুলো অবিলম্বে পূরণ করতে হবে এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করতে হবে, তখন রাষ্ট্রব্যবস্থার সেই কদর্য রূপটি উন্মোচিত হয় যেখানে বছরের পর বছর মেধা বিক্রি করেও তরুণরা নিয়তি আটকে থাকে এক একটি কেলেঙ্কারি বা দুর্নীতির বেড়াজালে। মস্ত বড় অর্থনীতির গালভরা গল্পের সমান্তরালে যখন লাখ লাখ শিক্ষিত যুবককে একটি ডেলিভারি বয় বা অস্থায়ী কর্মীর সুরক্ষাহীনতায় ধুঁকতে হয়, তখনই বোঝা যায় সরকার আসলে কতটা অন্তঃসারশূন্য। সরকারের শত সহস্র সামাজিক প্রকল্পের ঘোষণা যে এই নির্মম বাস্তবতাকে আর চাপা দিতে পারছে না, সিজেপির এই ইশতেহারই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এটি কোনো কাল্পনিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নয়, এটি ভারতীয় যুবসমাজের প্রতিদিনের বঞ্চনা ও অপমানের এক জীবন্ত দলিল।

সমাজমাধ্যমে আরশোলার আগমন আসলে দেশের যুবসমাজের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের ইঙ্গিত। কিন্তু প্রশ্ন হল দেশের যুবসমাজের ক্ষোভের কারণ কী? প্রথাগত চেনা রাজনীতি তাদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং আত্মসম্মানকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। খুব অদ্ভুত শোনায় যখন দাবিসনদে এমন দাবি রাখা হয় যে, "ভোট বাতিলের জন্য মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেফতার করতে হবে" বা "কোনো প্রধান বিচারপতি অবসর নেওয়ার পর কোনো লাভজনক সরকারি পদ পাবেন না" - তখন বোঝা যায়, যুবসমাজ এই ব্যবস্থার মাথাগুলোকে ঠিক কতটা চিনে ফেলেছে। ক্ষমতার অলিন্দে বসে থাকা ব্যক্তিরা যখন সাধারণ মানুষের করের টাকায় বিলাসবহুল জীবন কাটান আর আমজনতার গণতান্ত্রিক অধিকারকে বুড়ো আঙুল দেখান, তখন তরুণের ক্ষোভ আর চার দেওয়ালে আটকে থাকে না। সিজেপির দাবিগুলো আসলে শাসকের সেই দম্ভের গালে এক একটি চপেটাঘাত, যা প্রমাণ করে যে তরুণরা আজ আর কেবল ধর্মের সুড়সুড়ি বা জাত-পাতের অঙ্কে ভুলছে না। তারা দেখছে কীভাবে বড় পুঁজির স্বার্থে সংবাদমাধ্যমকে কেনা হচ্ছে, কীভাবে নিরপেক্ষতার মুখোশ পরে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতার তাবেদারি করছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক পচন এবং শোষণের বিরুদ্ধে একালের শিক্ষিত-বেকার যুবকদের পুঞ্জীভূত ঘৃণাই এই দাবি সনদের ছত্রে ছত্রে বিস্ফোরিত হয়েছে।

পর্দার আড়ালের এই শোষণ আরও নগ্ন হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, দেশের সরকার কীভাবে তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বন্ধু-পুঁজিপতিদের স্বার্থে একের পর এক জনকল্যাণমুখী নীতি বিসর্জন দিচ্ছে। দেশের বিস্তীর্ণ বাজার, জল-জঙ্গল-জমি আর অমূল্য খনিজ সম্পদ অবলীলায় তুলে দেওয়া হচ্ছে কর্পরেট থাবায়, সামান্যতম নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে। অথচ, এই বিপুল পুঁজির কারবারে দেশের আসল সম্পদ - যে যুবসমাজ - তাদের স্থান কোথায়? তারা আজ এই নিষ্ঠুর পুঁজিবাদের বাজারে ন্যূনতম দামে নিজেদের শ্রম, জীবন আর ন্যূনতম সামাজিক সুরক্ষাটুকু বাজি রেখে লড়াই করে চলেছে। তাদের নেই কোনো পেনশনের নিশ্চয়তা, নেই চিকিৎসার অধিকার, নেই দৈনিক কর্মঘণ্টার আইনি সুরক্ষা। সরকার যখন পুঁজিপতি বন্ধুদের জন্য লাল গালিচা পাতে, তখন দেশের সাধারণ ঘরের যুবকদের কপালে জোটে কেবল হাড়ভাঙা খাটুনি আর বঞ্চনা। আর এই চরম বৈষম্যের বিরুদ্ধে তারা যখনই প্রশ্ন তোলে, তখনই চতুর শাসনব্যবস্থা তাদের গায়ে 'পরজীবী' বা 'অলস' তকমা সেঁটে দিয়ে তাদের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারগুলোকে নির্মমভাবে পদদলিত করে যায়। এই দ্বিচারিতাই তরুণদের মনে আজ এক অপমানের অগ্নিকুণ্ড তৈরি করেছে।

কিন্তু কেবল এই নেতিবাচকতা বা সীমাবদ্ধতার গোলকধাঁধায় আটকে থাকলে এই আন্দোলনের প্রকৃত সত্যকে এড়িয়ে যাওয়া হবে। আজ এক প্রবল আশাবাদের আলোও কিন্তু এই আরশোলার ভূত দেখার মধ্যেই নিহিত রয়েছে। যে লড়াই আজ কেবল সমাজমাধ্যমের পাতায় সীমাবদ্ধ বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাকেই কিন্তু এই সর্বশক্তিমান সরকার মরণপণ ভয় পেতে শুরু করেছে। দলটির মূল ইন্টারনেট অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া, এর উদ্যোক্তাদের আইনি নোটিশ পাঠানো কিংবা তাদের পরিবারকে প্রচ্ছন্ন হুমকি দেওয়ার যে ঘটনাগুলো ঘটছে তাতে স্পষ্ট যে সরকার আজ কোণঠাসা। ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ শাসকেরা আর তাদের তথাকথিত 'গণতান্ত্রিক মুখোশ' পরে থাকতে পারছে না। ব্যঙ্গের চাবুকে তাদের সাজানো পরিকাঠামো আজ রক্তাক্ত। রাষ্ট্রশক্তির এই কাপুরুষোচিত আক্রমণই প্রমাণ করে দেয় যে তরুণদের এই দাবি কতটা ন্যায্য, তাদের এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ কতটা যৌক্তিক। মোবাইল স্ক্রিনের সামান্য এক একটি মিম যদি মস্ত বড় অর্থনীতির অহংকারকে এভাবে কাঁপিয়ে দিতে পারে, তবে বুঝতে হবে বারুদ তৈরিই আছে, শুধু স্ফুলিঙ্গের অপেক্ষা।

সুতরাং, এখন আর শুধু সমাজ মাধ্যমের দেওয়ালে লাইক-শেয়ারের খেলায় মেতে থাকার সময় নয়। এখন সময় এই ন্যায্য দাবিগুলোকে সামনে রেখে বাস্তব মাটিতে সংগঠিত হওয়ার। আজকের দিনের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক দায় হলো এই বিক্ষিপ্ত যুবসমাজকে এক সূত্রে গেঁথে একটি ইস্পাতকঠিন আন্দোলন গড়ে তোলা। রাষ্ট্র ক্ষমতার অহংকারে অন্ধ হয়ে গণতন্ত্রের যে গৌরবময় পতাকাটি ধুলোয় ফেলে দিয়েছে, এই লড়াকু তরুণ প্রজন্মকেই সেই পতাকা সগর্বে তুলে নিতে হবে। এই ক্ষোভকে স্রেফ অনলাইন বিনোদনে অপচয় না করে বুথ স্তরে, পাড়ায় পাড়ায়, কারখানায় আর বিশ্ববিদ্যালয়ের অলিন্দে এক অপরাজেয় সাংগঠনিক রূপ দিতে হবে। কারণ প্রকৃত পরিবর্তন সহজে আসে না, তা আসে ময়দানের দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের মাধ্যমে।

দমন-পীড়নের ফলে যে অন্ধকার পরিবেশ আজ চারদিকে তৈরি করা হয়েছে, তাকে চূর্ণ করার ক্ষমতা কেবল এই যুবশক্তিরই আছে। এই আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেবে তা হয়তো সময়ই শেষ কথা বলবে, কিন্তু এই স্ফুলিঙ্গকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার। সমাজমাধ্যম থেকে শুরু হওয়া এই আরশোলার বিদ্রোহকে এবার রাজপথের মিছিলে রূপান্তর করতে হবে। সংগঠন গড়ে, আন্দোলনের স্পর্ধায় স্বৈরাচারী ক্ষমতার ভিত নাড়িয়ে দিয়ে দেশকে এক প্রকৃত মানবিক উন্নয়নের দিকে নিয়ে যেতে হবে - যেখানে দেশের সম্পদ কোনো পুঁজিপতির সিন্দুকে যাবে না, বরং দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবনকে উন্নীত করবে। এই আরশোলারা পরজীবী নয়, ওরাই এই দেশের ভবিষ্যৎ, আর সেই ভবিষ্যৎকে ছিনিয়ে আনার লড়াই এবার শুরু করার সময় এসেছে।

দেশের প্রথাগত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি কি তরুণ প্রজন্মের বার্তা শুনতে পাচ্ছেন? তারা কি বুঝতে পারছেন ছাইচাপা আগুনের তাপ? তারা কি তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ-আকুতি-বীতরাগকে সম্মান জানিয়ে তাদের ভাষায় তাদের দাবি তুলে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এই ক্ষোভকে বহিঃপ্রকাশ করতে? নাকি সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের যোগ-বিয়োগের অঙ্কে ডুবে থেকে তরুণের ডাকে সাড়া দিতে ব্যর্থ হবেন? এই প্রশ্নের উত্তরে লুকিয়ে রয়েছে আগামীদিনে ভারতের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি। শুধু বলতে চাই যে ইতিহাস ও রাজনীতিতে শূণ্যস্থান বলে কিছু হয় না। মূলধারার বিরোধী দলগুলির এই শিক্ষা মনে রাখা উচিত।