আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ একাদশ সংখ্যা ● ১-১৫ জুন, ২০২৬ ● ১৬-৩১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩
সম্পাদকীয়
অর্থনৈতিক সংকটের সামনে ভারত
ভারতের অর্থব্যবস্থা এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। বিরোধী রাজনৈতিক দল বা বামপন্থী অর্থনীতিবিদরা নয়, এই কথা এখন শোনা যাচ্ছে খোদ ভারতের প্রধানমন্ত্রীর মুখে। তিনি অবশ্য বলেননি যে আমরা সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। তিনি বলেছেন যে মানুষ দেশের স্বার্থে যেন সোনা না কেনে, গাড়ি না চড়ে, গণপরিবহণের উপর ভরসা রাখে এবং বিদেশ সফর না করে। এই নিদানগুলি দেওয়া হচ্ছে কারণ দেশ সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে।
পশ্চিম এশিয়ায় শুরু হওয়া ইরান-আমেরিকার যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালী এখনও বন্ধ। খনিজ তেল আসছে না। স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ববাজারে খনিজ তেলের দাম বেড়েছে। দেশেও সরকার পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন অবধি চুপ করে বসেছিল। নির্বাচন শেষ হওয়ার পরেই ধাপে ধাপে ব্যাপকভাবে তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। অথচ, এই সরকার যখন ক্ষমতায় এসেছিল তখন তেলের দাম ঐতিহাসিকভাবে কম ছিল। কিন্তু সেই সময়ে, তেলের দাম মোদী সরকার কমায়নি। বরং তেলের উপর ধার্য কর ও শুল্ক বাড়িয়ে দিয়ে সরকারের ঘরে টাকা তুলেছে, মানুষের সুরাহা করেনি। আর এখন যখন তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তে শুরু করেছে তখন মানুষের উপরে বোঝা চাপিয়ে সরকারী ও বেসরকারী তেল কোম্পানিগুলির মুনাফা সুনিশ্চিত করার চেষ্টা হচ্ছে। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি। যখন তখন পুরোদমে আবারও যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে। অতএব আন্তর্জাতিক বাজারে ঘোর অনিশ্চিয়তা তৈরি হয়েছে। তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। তা যদি হয়, তাহলে শুধুমাত্র যে ভারতে তেলের দাম বাড়বে তাই নয়। তেল যদি পশ্চিম এশিয়া থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে না আসে, তাহলে পেট্রোল-ডিজেল-রান্নার গ্যাসের যোগান কমে যেতে পারে। সাধারণ মানুষ আতান্তরে পড়বেন, এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
তেলের সঙ্গেই জড়িত রয়েছে ভারতের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ঘাটতি। ভারত যত ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করে, তার থেকে বেশি মূল্যের আমদানি করে। এই আমদানির একটি বড়ো অংশ হল খনিজ তেল। এর ফলে, ভারতের প্রয়োজন হয় ডলারের। কিন্তু ভারত যেহেতু ডলার ছাপাতে পারে না, ডলারের বাড়তি যোগানের জন্য আমাদের নির্ভর করতে হয় বিদেশী বিনিয়োগের উপর এবং অনাবাসী ভারতীয়দের পাঠানো ডলারের উপর। পশ্চিম এশিয়ার সংকট শুরু হওয়ার বহু আগে থেকেই ভারত থেকে টাকা তুলে নিচ্ছে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা। যেই বিনিয়োগকারী শেয়ার বাজারে টাকা লাগায়, বা যারা কারখানা গড়তে চায়, দুই পক্ষই ভারত থেকে ২০২৩ সালের পর থেকে বিনিয়োগ তুলে নিচ্ছে। অন্যদিকে, ভারতের কর্পোরেটরা দেশে খুব বেশি বিনিয়োগ করছে না। বরং ভারত থেকে বাইরের দেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ডলার বেরিয়ে যাচ্ছে। অতএব, সব মিলিয়ে ডলারের চাহিদা বাড়ছে, তাই ডলারের দাম টাকার নিরিখে বাড়ছে। তাই আমরা দেখছি যে ডলারের মূল্য ৯৫ টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে। ডলারের মূল্য বাড়লে দেশের রপ্তানিকারকদের সুবিধা হয়, কারণ বিদেশে ভারতে প্রস্তুত পণ্যের দাম কমে। কিন্তু আমেরিকা তথা বিশ্বের বাকি অর্থব্যবস্থা যে এই যুদ্ধের জন্য সমস্যা থেকে বেরোতে পারেনি। অতএব, ভারতের রপ্তানির হার খুব বেশি বৃদ্ধি পাওয়ার আশা কম।
এখানে দুটি কথা বলা জরুরি। প্রথম, মোদী সরকার এখন যে সমস্যার কথা মানুষকে বলছে তার সূত্রপাত পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ শুরু হওয়ার বহু আগে। এর কারণ মোদী সরকারের ভ্রান্ত নীতি। তারা কর্পোরেট ক্ষেত্রকে প্রচুর পরিমাণে কর ছাড় দিয়েছে এবং বিদেশী পুঁজিপতিদের জন্য লাল কার্পেট বিছিয়েছে। কিন্তু দেশে বাড়তে থাকা বৈষম্যের ফলে ধনীরা ধনীতর হয়েছে আর গরিবেরা আরও গরিব। সাধারণ মানুষের মজুরি বাড়েনি তাই পণ্যের চাহিদা বাড়েনি। অন্যদিকে ধনীদের আয় বাড়লে তারা দেশের বাইরে তৈরি পণ্য ভোগ করতে চান, তাই আমদানি বাড়ে। তারা বিদেশে বেড়াতে যেতে চান, সেখানেও ডলার খরচ হয়ে যায়। অতএব, লাগাতার দেশে ধনী তথা পুঁজিপতিদের পক্ষে যে নীতি নিয়ে মোদী সরকার চলেছে, তা-ই আজকে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের ফলে এক বড় সংকটের চেহারা নিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, দেশে কর্মসংস্থান হচ্ছে না। বেকারত্ব বেড়ে চলেছে। এখন তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মূল্যবৃদ্ধি। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবনে সংকট আগেই এসে গিয়েছিল। এখন তা তীব্রতর হয়েছে। যেই দেশের আশি শতাংশ মানুষকে বিনা পয়সায় রেশন দিয়ে যেতে হয়, সেই দেশের উন্নতি কতটা হয়েছে তা সহজেই অনুমেয়।
ইতিহাসে বারংবার দেখা গেছে যে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দিয়ে হয় ফ্যাসিবাদের হাত শক্ত হয়েছে অথবা রাজনৈতিক পালাবদল হয়েছে। কোনটা হবে, তা নির্ভর করে রাজনীতির উপরে। বিশেষ করে যারা বামপন্থী প্রগতিশীল রাজনীতি করেন, তাদের কর্তব্য সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির লড়াই তীব্র করা এবং মোদী সরকারের অর্থনৈতিক অপদার্থতার মুখোশ জনগণের সামনে খুলে দেওয়া। সামনে জোর লড়াই আসছে। বিরোধীরা কি তৈরি আছেন?