আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ দশম সংখ্যা ● ১৬-৩১ মে, ২০২৬ ● ১-১৫ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩
প্রবন্ধ
ডাকটিকিটে রবীন্দ্রনাথ
শুভাশীষ মুখোপাধ্যায়
২০২৬ সালের মে মাসের ৯ তারিখ ছিল ২৫শে বৈশাখ। এবছরে সরকারি রবীন্দ্রজন্মোৎসব পালিত হয়নি, এই জন্মদিন পালন উপলক্ষে আয়োজিত রবীন্দ্রনাথের গান-আবৃত্তি সহযোগে একটি পদযাত্রা, কবির ভাষায় 'কুলিশপাণি পুলিশ'-এর রক্তচক্ষু রুখে দিয়েছিল। রবীন্দ্র-জিজ্ঞাসুদের মধ্যে এই বিশেষ বিষয়ে বৈদান্তিক নিশ্চিন্তি দৃষ্টিকটু মনে হলেও সময়ের সঙ্গে এইসব 'তুচ্ছ' বিষয় উন্নয়নের মতো আরও অনেক 'বড়ো' বিষয় দিয়ে অচিরেই প্রতিস্থাপিত হয়ে যাবে সন্দেহ নেই।
বিশেষ 'রাজনীতির ফেরিওয়ালা'-দের কাছে কবি ব্রাত্য হলেও, তাঁর সঙ্গীত আজকে 'রুদ্ধ' হলেও অপেক্ষাকৃত তরুণ গবেষকরা রবীন্দ্র-গবেষণার মাধ্যমে রবীন্দ্রচর্চার নানান চিত্তাকর্ষক দিক জনপরিসরে তুলে আনছেন। এমনই এক এখন-পর্যন্ত স্বল্প-পরিচিত এবং প্রায় অনন্য একটি ক্ষুদ্র (মাত্র ৭২ পৃষ্ঠার) বই গবেষক-লেখকের সৌজন্যে হাতে এলো। বইটির বিষয়বস্তু 'ডাকটিকিটে রবীন্দ্রনাথ'। না, বিষয়টি এমন নয় যে স্রেফ চমৎকারিত্বের সন্ধানে পাড়ি দিয়ে এখন পর্যন্ত রবীন্দ্র-গবেষক-অস্পৃশ্য বিষয় বেছে নেওয়ার তাগিদে লেখক-গবেষক এই কাজে হাত দিয়েছেন।
বইটির লেখক-গবেষক শ্রী শ্রয়ণ বসু, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের এখনও ছাত্র। শৈশব-কৈশোরে অনেকে যেমন নানা 'বিচিত্র বস্তু' সংগ্রহ করার উদগ্র আগ্রহ দেখান, শ্রয়ণও তার ব্যতিক্রমী কোনও রাস্তা বাছেন নি, তবে তিনি সেই আগ্রহকে একটি মননশীল কর্মে রূপান্তরিত করার প্রাথমিক ধাপটি পেরিয়ে এসেছেন। নিজের বহু বিচিত্র সংগ্রহকে একটি সংগ্রহশালায় রূপান্তরিত করার কাজটি মোটেই সহজ নয়।
২১টি সুলিখিত (বাঙলা ভাষাটি অতি চমৎকার!) ক্ষুদ্র পরিসরের, কিন্তু ডাকটিকিটের উৎস থেকে উপসংহার, এই কটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত হয়েছে রবীন্দ্রনাথ এবং ঠাকুর পরিবারের অন্যান্যদের নিয়ে সারা বিশ্বে যত ধরণের যেসব ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়েছে তার পরিচয় এবং ছবি। পাশাপাশি এসেছে সারা বিশ্বের যাঁরা রবীন্দ্রসান্নিধ্যে এসেছেন এবং কিছু আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানুষ, যাঁদের সঙ্গে একই ডাকটিকিটে রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁরা শোভা পেয়েছেন।
এই বইটিতে স্বভাবতই ভারতে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর সুহৃদ, আত্মীয়-পরিজন, তাঁর সাহিত্য কীর্তির পাশাপাশি বিশ্বভারতীর বিভিন্ন স্মৃতি-বিজড়িত বাড়ি ও অন্যান্য স্থান নিয়ে প্রকাশিত ডাকটিকিটের প্রকাশকালসহ নানান চিত্তাকর্ষক তথ্যের সন্ধান আমরা পেয়ে যাই। আমরা জানতে পারি যে এই দেশে তাঁকে নিয়ে প্রথম ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫১ সালের অক্টোবর ১ তারিখে, একটি ডাকটিকিটের সম্ভারের অংশ হিসেবে। ১৯৪৭ সালের পর দীর্ঘ ৪ বছর লেগেছিল ভারতের ডাকবিভাগের মহারাণী ভিক্টোরিয়ার মস্তক-শোভিত উপস্থিতিকে জনমানস থেকে অপসারিত করে রবীন্দ্রনাথকে স্থান দিতে! অবশ্য অন্য একটি দিক থেকে দেখলে আমাদের খানিকটা সান্ত্বনা মিলতে পারে - এই সম্ভারের শেষ ডাকটিকিটটির মধ্যে রবীন্দ্রনাথের একটি ছবি, যার মূল্য ছিল সেদিনের ১২ আনা - সেই সময়ের নিরিখে যথেষ্ট মহার্ঘই বলতে হবে। ১৯৬১ সালের রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষের টিকিটের পরিকল্পনাকারী ছিলেন সত্যজিত রায়। রবীন্দ্রনাথের ১২৫তম জন্মশতবর্ষে রবীন্দ্রনাথের আত্মপ্রতিকৃতিতে সজ্জিত হয়ে একটি ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়, সার্ধশতবর্ষে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে সবচেয়ে মহার্ঘ ডাকটিকিটি প্রকাশিত হয় এর পরে, মূল্য ১২৫ টাকা!
কে-ই বা জানতেন (ডাকটিকিট জমানো-র শখ যাঁদের আছে, তাঁদের বাদ দিয়েই বলছি) যে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বিশ্বের এতগুলি দেশ ডাকটিকিট প্রকাশ করেছেন। আমরা জানি রবীন্দ্রনাথ নিজে অনেক লেখা, যার মধ্যে পড়ে তাঁর অনেক মুখ্য লেখাও, ইংরেজি ভাষায় লিখেছেন। শ্রয়ণ আমাদের সারা বিশ্বের যেসব দেশ রবীন্দ্রনাথের সম্মানে ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে, তার একটি প্রায় তালিকা দিয়েছেন বলা যায়। এই সব দেশের অনেকগুলিই তথাকথিত 'অ্যাগ্লোফোন' দেশ নয় - সেসব দেশের কাজের বা আবশ্যিক ভাষা মোটেই ইংরেজি নয়। রবীন্দ্রশতবর্ষে ভারতের বাইরে, এমনকি এশিয়ার বাইরেও যে দেশগুলি রবীন্দ্রনাথের স্মরণে ডাকটিকিট প্রকাশ করেছিল সেগুলি লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা, ইউরোপের তৎকালীন সোভিয়েট রাশিয়া এবং রোমানিয়া।
নোবেল পুরষ্কার প্রাপকদের পুরষ্কার পাওয়ার ৬০-তম বার্ষিকীতে সুইডেন-এর 'নোবেল' সংস্থা প্রাপকদের স্মৃতিতে ডাকটিকিট প্রকাশ করে থাকে, সেই সূত্রে ১৯৭৩ সালে ১৯১৩ সালের নোবেল প্রাপকদের স্মৃতিতে যে চারটি ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়, তার একটি রবীন্দ্রনাথের ছবি সম্বলিত ডাকটিকিট - এই ডাকটিকিটটি চারটি টিকিটের মধ্যে ছিল সবচেয়ে বেশি মূল্যের। আমাদের স্মৃতিকোষে যে দেশের নামগুলি কোনো পরিচিতির স্পন্দন জাগায় না, এমন দেশগুলিও, যেমন কোমোরোস দ্বীপপুঞ্জ বা সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, বা পর্যটনের কারণে জনপরিসরে উঠে আসা ভূখণ্ড - মালদ্বীপ। এই দেশগুলিও রবীন্দ্রনাথকে সম্মান জানিয়ে ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে।
এছাড়া রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন জন্মবর্ষে, যেমন শতবর্ষ, সার্ধশতবর্ষ ইত্যাদি বছরগুলিকে স্মরণে রেখে গিনি বিসাউ ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে। দেশটির সরকারি ভাষা পর্তুগিজ, দেশের বেশিরভাগ মানুষই কথা বলেন ক্রিয়ল ভাষায়। সে দেশের ৩ শতাংশের চেয়েও কম মানুষ ইংরেজিতে কথা বলেন। রবীন্দ্রনাথের 'গীতাঞ্জলী' বা 'ঘরে-বাইরে' ছাড়া আর খুব বেশি কিছু বই পর্তুগিজ-বিশ্বের জন্য অনূদিত হয়নি। কিন্তু সেই দেশটি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে চার চারটি ডাকটিকিটের একটি সম্ভার প্রকাশ করেছে ২০১১ সালে। এছাড়া রয়েছে স্পেন, উরুগুয়ে এবং ঘরের পাশের দেশ শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ। ব্রাজিলের মতো মোজাম্বিকেরও সরকারি ভাষা পর্তুগিজ; তারাও রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিতে একটি আটকোণা ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে! সিয়েরা লিওন, চাদ, নাইজার প্রভৃতি দেশও রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিতে ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে। এই সব দেশ যখন রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিতে ডাকটিকিট প্রকাশ করছে, তখন সারা পৃথিবী ই-মেল এবং ইন্টারনেটের যুগে গভীরভাবে নিমগ্ন - ডাকঘর, ডাক-হরকরা, হাতে লেখা চিঠি অতীতের ডাইনোসর-এ রূপান্তরিত হয়ে যাদুঘরে ক্রমশ স্থান করে নিচ্ছে। ডাকটিকিট প্রায় আবশ্যিকভাবে ডাকটিকিট সংগ্রাহকের অ্যালবামে বন্দি হয়ে 'কলেক্টার-আইটেম'-এ পর্যবসিত হয়ে উঠছে। কিন্তু ভিন দেশের একজন মানবতাবাদী কবি হিসেবে, তাঁর সৃষ্টির ভাষা সম্পর্কে সম্যকভাবে অবহিত হওয়ার অসুবিধা সত্ত্বেও সেই দেশগুলির কবিকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান প্রদর্শনে কার্পণ্য দেখায় নি। এই তালিকায় আরও অনেক দেশের নাম রয়েছে, যে দেশগুলির নাম শ্রয়ণ খুব যত্নসহকারে তাঁর বইতে আলোচনা করেছেন।
আমাদের দেশে স্বভাবতই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে একই ডাকটিকিটে স্থান পেয়েছেন নেহরু, গান্ধী। আর তাঁর বিদেশি সুহৃদদের মধ্যে রয়েছেন রমা রঁলা, আইনস্টাইন এবং ভিক্টোরিও ওকাম্পো।
এই বইটিতে ৪৫টি রবীন্দ্র-সম্পৃক্ত ডাকটিকিটের রঙিন ছবি বইটির সৌষ্ঠব বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছ। শ্রী প্রসাদ রায় মহাশয়ের ভূমিকাটি হাল্কা চালে লেখা হলেও তরুণ লেখকের প্রতি তাঁর তারিফ করার মনোভাব পাঠককেও সংক্রামিত করবে। বইটি পাঠে মনে পড়ল একটি বইয়ের নামলিপি - স্মল ইস বিউটিফুল।
______________________________
ডাকটিকিটে রবীন্দ্রনাথ
শ্রয়ণ বসু
প্রকাশক: টেগোর রিসার্চ ইন্সটিটিউট, কলকাতা
প্রথম প্রকাশ: ২৫ বৈশাখ, ১৪৩২
মূল্য: ২৫০ টাকা