আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ দশম সংখ্যা ● ১৬-৩১ মে, ২০২৬ ● ১-১৫ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩
প্রবন্ধ
আমার শেক্সপিয়র - একটি বামমার্গী ভাষ্য
রঞ্জন রায়
গৌরচন্দ্রিকা
বাংলায় শেক্সপিয়র চর্চার (মঞ্চে এবং লেখালিখিতে) অন্যতম পথিকৃৎ এবং বিশিষ্ট নট, নাট্যকার ও পরিচালক উৎপল দত্তের জন্মদিন গেল ২৯ মার্চ তারিখে। আবার উইলিয়ম শেক্সপিয়রের জীবননাট্যে ২৩ এপ্রিল তারিখটি ধরা হয় একই সঙ্গে তাঁর জন্ম ও মৃত্যুদিন হিসেবে। এই সামান্য প্রবন্ধটি ওঁদের দুজনের প্রতি আমার বিনীত শ্রদ্ধাঞ্জলি মাত্র৷ মধ্য যৌবনে শেক্সপিয়রকে পড়ার বিশেষ আগ্রহ এসেছিল উৎপল দত্তের 'শেক্সপিয়রের সমাজচেতনা' বইটি হাতে পেয়ে। আমার এই অকিঞ্চিৎকর লেখায় রয়েছে উৎপল দত্ত সমেত সমসাময়িক বামমার্গী সাহিত্য সমীক্ষক গারেথ জেঙ্কিস এবং টেরি ইগলটন-এর মতো দিকপাল মার্ক্সিস্ট সাহিত্য সমালোচকদের প্রভাব।
মার্ক্স, এঙ্গেলস, জেনি মার্ক্স ও শেক্সপিয়র
মার্ক্স ও এঙ্গেলস মুগ্ধ ছিলেন শেক্সপিয়রের বহুস্তরীয় দ্বন্দ্বে দ্বিধাদীর্ণ মানুষের চিত্রণে। এদিক ওদিক চিঠিপত্রে তাঁরা একাধিকবার উল্লেখ করেছেন 'টিমন অফ এথেন্স' নাটকে প্রায় সর্বস্বান্ত টিমনের সোনা নিয়ে বৈপরীত্যের স্বগতোক্তি।
১৮৭৭ সালে জেনি মার্ক্স ইংল্যান্ডের লাইসিয়াম থিয়েটারে হেনরি আর্ভিং-এর 'রিচার্ড দি থার্ড' অভিনয়ে বাঁধাধরা ভিলেন এর স্টেনসিল থেকে আলাদা বুদ্ধিদীপ্ত চিত্রণে মুগ্ধ হয়ে রিভিউ লিখেছিলেন। মার্ক্সের জীবনীকার ফ্রাঞ্জ মেহরিং জানিয়েছেন মার্ক্সের গোটা পরিবার ভুগত 'শেক্সপিয়রফোবিয়া'তে।
শেক্সপীয়র ছিলেন তাঁর যুগের জনতার কবি। অবশ্য মার্ক্সীয় দৃষ্টিভঙ্গীর সাহিত্য সমালোচকেরা এ'ব্যাপারে দুই বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে।
ইতিহাসের বিচারে এলিজাবেথান ইংল্যান্ডে সামন্ততন্ত্র হল প্রতিক্রিয়াশীলতার প্রতীক এবং উঠতি বণিকপুঁজি হল প্রগতিশীল। তাই শেক্সপিয়র হলেন রেনেসাঁসের এবং উঠতি বুর্জোয়ার প্রতিনিধি। তাঁরা উদাহরণ দেবেন 'মার্চেন্ট অফ ভেনিস', 'কমেডি অফ এরর্স'-এর।
জীবননাট্যের কিছু কথা
উইলিয়ম শেক্সপিয়র এসেছিলেন হ্যাভন নদীর তীরের স্ট্র্যাটফোর্ড নামের একটি গ্রামের সাধারণ পরিবার থেকে। কিন্তু তিনি দুনিয়াদারির ঘাঁতঘোঁত ভালোই বুঝতেন। তাই রানী এলিজাবেথের কড়া শাসন ও নাটক নিয়ে সেন্সার এবং জেল তথা মুন্ডচ্ছেদের সময়েও ধরি-মাছ, না-ছুঁই-পানি ভালোই চালিয়ে গেছলেন।
মননের দিক থেকে তিনি ছিলেন সে' সময়ের জনতার প্রতিনিধি। এখানেই তিনি তাঁর সমসাময়িক অন্য নাট্যকার, যেমন, বেন জনসন, এডওয়ার্ড মার্লোর থেকে স্বতন্ত্র। তাঁরা ছিলেন অভিজাত পরিশীলিত রুচির। তাই জনসন অনায়াসে শেক্সপিয়রের লাতিন এবং গ্রিক সাহিত্যের সঙ্গে অপরিচয়ের কথা বলে খোঁচা দিতে একটুও ইতস্ততঃ করেন না।
তাঁদের চোখে মহাকবি একটু গ্রাম্য রুচির। তাঁর চরিত্রদের ঠাট্টাতামাশা ভদ্রলোকের কানের পক্ষে মাত্রাছাড়া লাগে। শুধু ফলস্টাফের ভাঁড়ামো নয়, 'রোমিও জুলিয়েট'-এর একটি দৃশ্য দেখুন। জুলিয়েটের বয়স নিয়ে তাঁর মা এবং ধাইমার আলাপ। বৃদ্ধা মহিলাটি নিজের প্রয়াত স্বামীর রগুড়ে স্বভাবের কথা তুলে বলে, ছোট্ট জুলি যখন পড়ে গিয়ে কপাল ফুলিয়ে কাঁদছিল তখন আমার কত্তাটি ওকে ভোলাতে গিয়ে বলে - এখন ছোট্টটি, তাই উপুড় হয়ে পড়েছ, যখন ডাগর হয়ে উঠবে তখন চিৎ হয়ে পড়বে।
প্রশ্ন ওঠে, ডক্টর জনসন কি সেই ১৭৬৫ সালেই বলেননি যে শেক্সপিয়রের রচনা অগভীর, শুধু আনন্দলাভের জন্যেই পাঠ করা যায়, তার বেশি নয়?
যদি ওই জনরুচির তাগিদে তলোয়ারবাজি, প্রেতাত্মা, এবং স্থুল রসিকতাতেই শেক্সপিয়র আটকে থাকতেন তাহলে তাঁর রচনা কালোত্তীর্ণ হতো না। তিনি খুব বেশি হলে সেকালের জনপ্রিয় আমুদে নাট্যকার হতেন। তিনি একইসঙ্গে যুগের হয়েও ছাড়িয়ে গেছেন নিজের সময় ও সমাজকে। জনরুচিকে উপেক্ষা না করলেও তার গোলামি করেননি। প্রশ্ন করেছেন প্রচলিত মূল্যবোধকে। আমরা তাঁর লেখা থেকে তেমনই কিছু ধারণাকে - ধরুন, বাজার, মুনাফা, সমুদ্রযাত্রা, নারী এবং অল্পসংখ্যক সম্প্রদায় ইত্যাদিকে মহাকবির যুগ এবং সমাজের প্রেক্ষিতে নেড়েচেড়ে দেখি।
এলিজাবেথীয় যুগ
আমাদের মানসে রানী এলিজাবেথের রাজত্বকাল ও ইংল্যান্ডের রেনেসাঁস বা নবজাগরণ একাকার হয়ে আছে। এবং শেক্সপীয়র হলেন সেই নবজাগরণের কবি ও নাট্যকার, যেমন দান্তে হলেন ইতালীয় নবজাগরণের মুখপাত্র। কিন্তু একটু খুঁটিয়ে দেখলে এই বহুপ্রচারিত সযত্নে লালিত ধারণাটি ধাক্কা খেতে বাধ্য।
রেনেসাঁস হল মধ্যযুগের অন্ত, নতুন করে গ্রিক-লাতিন ক্লাসিক্স পড়ার ঝোঁক, এবং ফলে চিন্তা ও বিচারের ক্ষেত্রে ঈশ্বরবাদের জায়গায় মানুষের জয়গান। কিন্তু এই ধারার মুখপাত্র তো আসলে বেন জনসন, মার্লোর মতো শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী এলিট নাট্যকারেরা, আর শেক্সপিয়র তো ওই দুনিয়ার লোক ন'ন। ভুললে চলবে না, এলিজাবেথীয় যুগ একই সঙ্গে 'কর্ন ল' বা শস্য আইন জারি হওয়ার যুগও বটে! ওই কানুনের ফলে প্রান্তিক এবং ক্ষুদ্র চাষির দল নিজেদের জমি থেকে উৎখাত হয়ে শহুরে মজুর এবং ভবঘুরে হয়ে গেল। কারণ তাদের ছোটো ছোটো ক্ষেতগুলো জুড়ে তৈরি হয়েছে বিশাল বিশাল ভেড়াপালন খামার। কাপড়ের মিল-মালিকদের উলের চাহিদা পূরণ করতে হবে যে! এভাবেই ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততন্ত্রের কবরের উপর গজিয়ে উঠেছিল 'মার্কেন্টাইল ক্যাপিটালিজম' বা নব্য বণিকতন্ত্রের সৌধ।
শেক্সপীয়রের নাটক হল সেই বিশাল পরিবর্তনের ছবি, তার জীবন্ত দলিল - ঠিক যেভাবে তিন শতাব্দী পেরিয়ে লেনিনের চোখে তলস্তয়ের সৃজন সমাজবিপ্লবের ডাক না দিলেও সমাজের বিশ্বস্ত আয়না বলে ধরা দিত, অথবা মার্ক্স বালজাকের উপন্যাসে পুঁজিবাদী নরকের আগুন দেখে শিউরে উঠতেন।
অথচ মার্ক্সবাদের যান্ত্রিক ব্যাখ্যায় শেক্সপীয়রকে জোর করে বিপ্লবী বানাতে গিয়ে সামন্তবাদের বিরুদ্ধে নবাগত পুঁজিবাদ বা বণিকবাদের মুখপাত্র ধরে নেওয়া হয়েছে। সাক্ষ্য হিসেবে দেখানো হয় 'মার্চেন্ট অফ ভেনিস'। তাতে কি সাগর পেরিয়ে নতুন দেশে গিয়ে 'বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী' মন্ত্রের আরাধনা করতে বলা হয়নি?
আবারও বলছি, শেক্সপীয়র নন, উদীয়মান পুঁজিবাদের চারণ কবিরা হলেন মার্লো, জনসন, গ্রীন, মেসিঙ্গার, ও বোমন্ট এবং ফ্লেচার।
বণিকবাদঃ শেক্সপিয়র বনাম অন্যেরা
বণিকবাদের হলমার্ক হচ্ছে সামুদ্রিক বাণিজ্য, নতুন নতুন দেশের এবং বাজারের খোঁজ, এবং মুনাফা। রানী এলিজাবেথের ইংল্যান্ড তখন সাম্রাজ্যের সীমানা বাড়িয়ে চলেছে, 'যেখানে সূর্য অস্ত যায় না।'
এবার দেখুন, গ্রীনের 'অর্ল্যান্ডো' নাটক হচ্ছে আফ্রিকায়, মার্লো'র 'ট্যাম্বারলেইন' এশিয়ায়, ম্যালিগ্নারের 'রেনেগাদো' টিতিনিসে, বোমন্ট-ফ্লেচারের 'আইল্যান্ড প্রিন্সেস' ঘটছে পর্তুগালের মশলা দ্বীপে। কিন্তু আমাদের শেক্সপিয়র তাঁর বিপুল রচনায় সহজে ইউরোপের বাইরে পা ফেলেন না। এমনকি ঊনি শুধু ইংল্যান্ডেই স্বচ্ছন্দ, ইতালিতেও নয়। নইলে কোন ভূগোলের হিসেবে মিলান থেকে জাহাজ ছাড়ে (টেম্পেস্ট) বা বোহেমিয়ায় নোঙর ফেলে?
'হ্যামলেট' নাটকে প্রিন্স অফ ডেনমার্কের গল্প বললেও সেটা আসলে রূপকের আড়ালে তাঁর সমসাময়িক ইংল্যান্ডেরই কথা। যে কারণে পুশকিনের 'ক্যাপটেইন'স ডটার' উপন্যাস আসলে সম্রাজ্ঞী ক্যাথরিনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী পুগাচেভের বন্দনায় লেখা উলটপুরাণ। ধড়ের থেকে মুন্ডু খসে পড়ার ভয় সব যুগেই থাকে; সেসব যুগে আরও বেশি।
তিনি একবারই ইউরোপের বাইরে পা রেখেছিলেন, 'ওথেলো' নাটকে সাইপ্রাসে। বোঝা যায় উথালপাথাল সমুদ্রের ঢেউয়ে জাহাজে চড়ে বিদেশযাত্রা তাঁর খুব একটা পছন্দ নয়। কলম্বাস বা ম্যাগেল্লানের আবিষ্কার, ১৫০০ সালে ব্রেজিলের খোঁজ - এসবের কোন কিছুই তাঁর লেখায় নেই। চ্যাপম্যান তাঁর 'ইস্টওয়ার্ড হো' নাটকে এবং জনসন তাঁর 'এভরিম্যান ইন হিজ হিউমার' নাটকে সগৌরবে উল্লেখ করছেন স্যার ফ্রান্সিস ড্রেকের 'গোল্ডেন হাইন্ড' জাহাজে চড়ে বিজয়পতাকা ওড়ানো যা তখন ছিল পুঁজিবাদের অজেয় শক্তির প্রতীক। এর কোনোকিছুই শেক্সপিয়রকে প্রেরণা দেয়নি।
সোনার খোঁজে মুনাফার লালসায় দিকে দিকে নৌ-অভিযান শেক্সপিয়রের না-পসন্দ।
'পেরিক্লিস' নাটকের দৃশ্য দুইয়ে শুনতে পাই, সমুদ্রযাত্রায় শান্তি নেই। আকাশ থেকে বজ্র নামে, সাগরের অতলে তলিয়ে যায় বাণিজ্যপোত, এভাবেই আমাদের রাজপুত্র সর্বস্বান্ত হলেন। 'উইন্টার্স টেল' নাটকে ক্যামিল্লো রাজকুমার ফ্লোরিজেলকে বলে সাগরে না যেতে। টেম্পেস্টে শান্ত গঞ্জালো আফসোস করে বলে, মরতে হলে ডাঙায় মরব, জলে ডুবে কেন?
এবার 'মার্চেন্ট অফ ভেনিস' নাটকে মুনাফার ছবিটি কেমন দেখা যাক। সেইসময়ে সমাজে ব্যবসায়ী ও বণিককুলের প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ছিল সন্দেহ নেই। এই নাটকের ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে আছে পারস্পরিক সন্দেহ, গলাকাটা প্রতিযোগিতা, নগ্ন লোভ এবং মানবমূল্যের অবনমনের ছবি। আন্তনি তাঁর বন্ধু সালেরিও এবং সোলিনি তাঁর কথাবার্তা শুনুন,
'Your mind is tossing in the ocean' এবং 'Believe me Sir, had I such venture forth, the better part of my affection would be with my hopes abroad'.
পুঁজিবাদী সমাজে প্রেম? ব্যাসানিও এবং পোর্শিয়ার প্রেম?
বন্ধু আন্তোনিওকে ব্যাসানিও চুপি চুপি জানায় যে বেহিসাবী খরচায় ও দেউলে হয়ে গেছে। সম্পত্তি গেছে ভোগে, আকন্ঠ ধারে ডুবে সম্মান যায় যায়। উপায়? অগাধ ধনসম্পত্তির মালকিন বেলমন্টের পোর্শিয়াকে বিয়ে করা।
শুধু এই নয়, নারীকে পণ্যদ্রব্য (কমোডিটি) হিসেবে দেখা পুঁজিবাদী ধ্যানধারণায় স্বাভাবিক। তাই ব্যাসানিও'র চোখে পোর্শিয়া হলেন এক লোভনীয় বস্তু, তিনি অনায়াসে পোর্শিয়ার পাণিগ্রহণে তিন প্রার্থীর মধ্যে প্রতিযোগিতাকে বর্ণনা করেন বণিকদের মধ্যে লুটের মাল ভাগাভাগি হিসেবে।
পুঁজিবাদের গতিপ্রকৃতির সবচেয়ে গহন ভাষ্যকার মার্ক্সের চোখে শেক্সপিয়রের সময়ে বণিকতন্ত্রের জন্মলগ্নের ছবিটি কেমন ছিল? কেমনভাবে শিল্পী কারিগর ও লঘু উৎপাদকদের লুঠ করে পুঁজিবাদের ভিত্তি তৈরি হচ্ছিল?
'under the stimulus of passions, the most infamous, the most sordid, the pettiest, the most meanly odious'. [Karl Marx: Capital (New York, 1906), Part VIII, P. 835-836]
'টিমন অফ এথেন্স'-এও প্রায় একই ভাষায় অভিশাপ বর্ষিত হয় লোভ, সম্পত্তি, সোনা ও মুনাফাখোরের উপর। আপেমান্তুস এক বণিককে বলে যে ব্যবসা হল তোমাদের ভগবান। এই ভগবানই তোমাদের জাহান্নমে পাঠাক। টিমন চোরেদের সোনা বিলিয়ে দিয়ে বলেন, যাও, এবার সবার গলা কাটো আর গোল্লায় যাও।
টিমনের চোখে সোনা হল অমিত শক্তিধর। যেমন, সোনা (পড়ুন টাকা) থাকলে সবচেয়ে কুৎসিত পুরুষ হয়ে যায় সবচেয়ে রূপবান। কারণ সে অর্থের জোরে সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটিকে কুক্ষিগত করতে পারে। ঠিক যেভাবে সবচেয়ে রোগাপ্যাংলা লোকও টাকার জোরে বাউন্সার রেখে হয়ে ওঠে শক্তিমান। (Timon of Athens, I, 1, 237; IV, 3,443; III, 6, 97; and IV, 1, 8.)
শেক্সপিয়রের চোখে নারী
আজকাল নারী-স্বাধীনতা বা লিঙ্গসাম্য নিয়ে এত কথাবার্তা, কল্পনা করুন তো সাড়ে চারশ' বছর আগে কী ভাবতেন মহাকবি?
ভাবতে ভালো লাগে যে আমার (এবং আরও অগণিত মানুষের) প্রিয় কবি ও নাট্যকার এ'ব্যাপারে যুগের থেকে অনেক এগিয়ে ছিলেন। তাঁর সমসাময়িক সমাজের চোখে প্রশ্নটি অবান্তর। পাদ্রীদের মুখ থেকে নারী-নরকের-দ্বার বা শয়তানের দূতী গোছের ফতোয়া আকছার শোনা যেত। বাইবেলে দেখুন-আপেল খেলেন আদম ঈভ দুজনে, দোষী সাব্যস্ত হলেন একা ঈভ। আদম যেন এক অপাপবিদ্ধ কিশোর যাকে ফুসলে পাপের পঙ্কিল পথে টেনে নামিয়েছে ঈভ।
কিন্তু কবি নিজে কী ভাবতেন?
তাঁর অনেক নাটকে পিতা-পুত্রী মুখোমুখি, এবং মেয়েটি প্রশ্ন তুলছে, 'নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার কেন নাহি দিবে অধিকার'? নাটকের নাম 'মিড সামার নাইটস ড্রীম'। মেয়ে হার্মিয়ার পছন্দের ছেলে লাইসান্ডারকে নাকচ করেছেন বাবা। তাঁর চোখে কন্যা হল তাঁর সম্পত্তি, জমিজমা, গয়নাগাটি বা টাকাপয়সার মতো। এসব তিনি যথাসময়ে সুযোগ্য জামাইবাবাজির হাতে তুলে দেবেন। তাঁর ফরমান শুনুন,
'And she is mine; and all my right of her I do estate into Demetrius'.
আর মেয়েটি ভাবছে: 'O hell! To choose love by another's eyes.'
নাটকের শেষে হার্মিয়া বিজয়ী হয় এবং মনের মানুষকে বিয়ে করে।
'ওথেলো' নাটকে নায়িকা ডেসদেমোনার বাবা ব্রাবান্তসিও ওথেলোর নামে অপহরণের কেস করেন। কিন্তু আদালতে দাঁড়িয়ে ডেসদেমোনা বলেন,
'I am hitherto your daughter; but here's my husband,
And so much duty as my mother show'd
To you, preferring you before her father,
So much I challenge that I may profess
Due to the Moor, my Lord'.
(Othello, I, 3, 185.)
'কমেডি অব এরর্স' নাটকে আদ্রিয়ানা লিঙ্গসাম্যের দাবি তোলে, 'Why should their liberty than ours be more?'
জুলিয়েট বাবার পছন্দের পাত্রকে বিয়ে করতে দোনোমোনো করে বাবার কাছে বকুনি খায়। 'মারচেন্ট অফ ভেনিস' নাটকে জেসিকা কাপড়চোপড় গয়নাগাটি নিয়ে মায়কা থেকে পালিয়ে দয়িতের সাথে মিলিত হয়। নাট্যকারের পক্ষপাতিত্ব জেসিকার প্রতি প্রকট, সুদখোর বাবা শাইলকের জন্যে ঝরে পরে অবজ্ঞা ও সামান্য করুণা।
'হ্যামলেট' নাটকের অফিলিয়াকে বাবা পোলোনিয়াস আচ্ছা করে কড়কে দেন, কারণ ও বাবার পছন্দকে অগ্রাহ্য করে পাগলাটে রাজকুমার হ্যামলেটের প্রেমে পাগল। টেম্পেস্টের প্রসপেরো মেয়ে মিরান্দার জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার অধিকারকে তাচ্ছিল্য করে পদে পদে বাধার সৃষ্টি করেন। কিন্তু শেষপর্বে মেয়ের পছন্দকে স্বীকৃতি দিয়ে পাঠকের চোখে মহান হয়ে ওঠেন।
'মেরি ওয়াইভস অফ উইন্ডসর' নাটকে বিবাহিত মহিলারা দল পাকিয়ে রাজদরবারের বিদূষক ফলস্টাফকে আলগা চরিত্রের জন্যে ভালো করে উত্তমমধ্যম দেন। দীনবন্ধু মিত্রের 'কমলে কামিনী' নাটকে হলধর বলে চরিত্রটি, পদে মন্ত্রী স্বভাবে স্থুল রসিকতায় ডগোমগো এবং পরিণতিতে মেয়েদের হাতে উত্তমমধ্যম পাওয়া, ফলস্টাফের আদলে তৈরি।
শেক্সপিয়র এবং থিয়েটার
থিয়েটার সমস্ত যুগেই ক্ষমতার সমালোচনা করেছে এবং প্রতিবাদের মঞ্চ হয়ে উঠেছে। শাসকেরাও তাই যুগে যুগে থিয়েটারকে সন্দেহের চোখে দেখে এসেছেন।
ইংল্যান্ডে ক্রমওয়েল বিপ্লবের পর পিউরিটানরা ক্ষমতায় এসে এক অর্ডিন্যান্স জারি করে সবরকম থিয়েটারকে নিষিদ্ধ করলেন। ফিলিপ স্টাবসের চোখে থিয়েটারই হল বেশ্যাবৃত্তি ও বিকৃতির মূল। টমাস হোয়াইট লন্ডনে প্লেগের জন্যে দায়ী করলেন থিয়েটারকে।
রানী এলিজাবেথ প্রথম স্বয়ং থিয়েটারের অনুরাগী ছিলেন। সাধারণ মানুষ থিয়েটারের নামে পাগল। তাতে কী? ক্ষমতাশালী লর্ড মেয়র হরদম বখেড়া খাড়া করতেন। টমাস ন্যাশের 'আইল অফ ডগস' নাটক নিষিদ্ধ হল। ওতে নাকি রাজদ্রোহমূলক ডায়লগের বাড়াবাড়ি! অভিনেতাদের জেলে পোরা হল।
বেন জনসনের মতো নাট্যকারকেও হাজতবাস করতে হয়। 'ইস্টওয়ার্ড হো!' নাটক নিষিদ্ধ হয় এবং নাট্যকার চ্যাপমান কারারুদ্ধ হন। শেক্সপিয়রকেও বাধ্য করা হয়েছিল 'রিচার্ড দ্বিতীয়' নাটকে রাজার সিংহাসনচ্যুত হওয়ার দৃশ্যটি বাদ দিতে।
গোড়ায় ফলস্টাফ চরিত্রটির নাম ছিল 'ওল্ডক্যাসল', কিন্তু সেন্সরের চাপে শেক্সপিয়র বাধ্য হলেন বদলে দিতে, এরকম উদাহরণ আরও আছে।
শেক্সপিয়রের প্রাসঙ্গিকতা
সাড়ে চারশ' বছর আগের শেক্সপিয়র কতটা প্রাসঙ্গিক? বা আদৌ প্রাসঙ্গিক কি? তিনি কি ইতিমধ্যেই সযত্নে জাদুঘরে রক্ষিত একটি পুরাতাত্ত্বিক বস্তু হয়ে যান নি?
শেক্সপিয়রের চরিত্রগুলো আজ আমার মতো সাধারণ ছাপোষা মানুষের অনেক বেশি কাছের, ইদানীং ওদের আরও ভালো করে চিনতে পারছি।
যখনই বিশ্ববাণিজ্য ও গ্লোবালাইজেশনের বন্দনা শুনি বা নব-উদারনীতিবাদের চারণদের গাথায় এই আশ্বাসবাণী ধ্বনিত হয় যে কীভাবে মুক্ত ব্যাপার এবং ব্যক্তিগত বিদেশি পুঁজি (এফডিআই) এলে আমাদের সব জ্বালা-যন্ত্রণা জুড়োবে, তখনই আমার মগ্নচৈতন্যে মুনাফা ও বল্গাহীন লোভের ভয়াবহ পরিণামের বিষয়ে 'মার্চেন্ট অফ ভেনিস'-এর সাবধানবাণী গুরু গুরু রবে বেজে ওঠে।
যখন দৈনিক পত্রিকায় 'অনার কিলিং', 'লাভ-জিহাদের' নির্মমতা বা সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ যুগলের আত্মহত্যার খবর পড়ি তখন আমার সামনে অভিনীত হয় 'রোমিও জুলিয়েট', 'মিডসামার নাইটস ড্রিম' এবং অবশ্যই 'ওথেলো'।
এভাবেই অল্পসংখ্যক মানুষজনের উপর ধর্ম, পোশাক, খাদ্যাখাদ্য নিয়ে হিংস্র আক্রমণের খবরে দেখি 'ওথেলো' ও 'মার্চেন্ট অফ ভেনিস'-এর পুনরাভিনয়। কানে বাজে শাইলকের মার্মিক আবেদন ও অভিযোগ - 'Hath not the Jews eyes and ears?'
'মার্চেন্ট অফ ভেনিস'-এর আপাত খলনায়ক শাইলকের ওই দীর্ঘ মনোলগের মতো অল্পসংখ্যকের পক্ষে এমন শক্তিশালী বয়ান সাহিত্যে আমার চোখে পড়েনি।
আর রাজনীতিবিদদের ঘোড়া কেনাবেচা, শিবিরবদল, গুপ্তহত্যা, ক্ষমতা দখল, প্রজা খেপিয়ে বিদ্রোহ? লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ম্যাকবেথ, হ্যামলেট, জুলিয়াস সীজার, করিওলেনাস ও টিমন অফ এথেন্স। রাজাদের নিয়ে একগুচ্ছ ডার্ক নাটক, যেমন 'রিচার্ড দ্য থার্ড' এবং কিছু ডার্ক কমেডি।
এতসব লেখার পর একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি, তাহলে কি সাড়ে চারশ' বছর পরেও মানুষ একটুও এগোয়নি?