আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ দশম সংখ্যা ● ১৬-৩১ মে, ২০২৬ ● ১-১৫ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

প্রবন্ধ

স্ট্র্যাডফোর্ড, জোড়াসাঁকো ও সংরক্ষণ

গৌতম হোড়


আজ থেকে ৪৬২ বছর আগে যে বাড়িতে জন্মেছিলেন, বড়ো হয়েছিলেন উইলিয়াম শেক্সপিয়র, সেই বাড়ি অবিকল সেভাবে রাখা আছে। প্রতিদিন সেই বাড়ি দেখতে ভিড় করেন হাজারো মানুষ। অন্ততপক্ষে ২৭ পাউন্ড খরচ করে সেই বাড়িতে ঢুকতে হয় অডিও ভিস্যুয়াল শো দেখে, শেক্সপিয়রের বাবার কাজের জিনিস, সিটি কাউন্সিলের সম্মান, চার্চের কিছু নিদর্শন-সহ অনেক জিনিস দেখে ঢোকা যায় জন্মভিটেতে।

শেক্সপিয়রের সঙ্গে যুক্ত বা এভন নদীর ধারে স্ট্র্যাডফোর্ড শহরের ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত একাধিক ভবনের সংরক্ষণ করে 'শেক্সপিয়র বার্থপ্লেস ট্রাস্ট'। এই যে যারা টিকিট কেটে ঢুকছেন, তাদের টাকা থেকে এবং শেক্সপিয়র ভক্তদের অনুদানে অসাধারণ দক্ষতায় এই ট্রাস্ট রক্ষা করে চলেছে বিশ্বসাহিত্যের এই পীঠস্থানটিকে।

বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় গিফট শপ। শেক্সপিয়রের সব বই, তাঁকে নিয়ে লেখা বই, পালকের কলম, ছবি, বিভিন্ন ধরনের স্মারক রাখা সেখানে। প্রচুর বিক্রি হচ্ছে। স্ট্র্যাটফোর্ড-আপন-অ্যাভন (Stratford-upon-Avon) শহরটা রমরম করছে শেক্সপিয়রের জন্য। কীভাবে বিশ্বের একজন সেরা সাহিত্যিককে বিপনন করতে হয়, কীভাবে ৪৬২ বছর পরেও তিনি এতজন মানুষের রুটিরুজির ব্যবস্থা করছেন, তা বুঝতে গেলে স্ট্র্যাডফোর্ড আসতেই হবে।

শেক্সপিয়রের জন্মস্থানের বাগানে মাত্র একজন কবি, সাহিত্যিকের আবক্ষ মূর্তি আছে। শুধুমাত্র একজনেরই। তিনি হলেন রবীন্দ্রনাথ। শেক্সপিয়রকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, 'যেদিন উদিলে তুমি বিশ্বকবি দূরে সিন্ধুপারে...'। রবীন্দ্রনাথের মূর্তির নীচে এই কবিতাটি বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা আছে।

'শেক্সপিয়র বার্থপ্লেস ট্রাস্ট'-এর একজন বয়স্ক স্বেচ্ছাসেবককে বললাম, রবীন্দ্রনাথের মূর্তি দেখে বড়ো ভালো লাগল। কিন্তু আর তো কোনো কবি, সাহিত্যিকের মূর্তি নেই, শুধু রবীন্দ্রনাথের আছে? তাঁর জবাব, আমরাও তো তাঁকে শ্রদ্ধা করি। আর তিনিও তো শেক্সপিয়রকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করতেন।

এই বাক্যালাপের মধ্যেই আমার মনে পড়ে গেল, আমি এক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে বলেছিলাম, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি থেকে দয়া করে 'রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়'কে সরান। নিউটাউন বা সল্টলেকে তাদের নতুন ক্যাম্পাস করে দিন। আর পুরো বাড়ি নিয়ে তৈরি করুন মিউজিয়ম। রোজ রাতে শুরু করুন বাংলা, ইংরেজি ও হিন্দিতে রবীন্দ্রনাথের গান, নাচ, নাটকের অনুষ্ঠান। সেখানে অবশ্যই গিফট শপ থাকবে। থাকবে আরও নানা আয়োজন।

সবকিছু শোনার পর তিনি বলেছিলেন, পারব না। অত পয়সা নেই। 'রবীন্দ্রভারতী' সরাতে গেলে প্রচুর অর্থ লাগবে। শুনে কষ্ট হয়েছিল। শেক্সপিয়রের বাড়ি দেখার পর সেই কষ্টটা আবার চাগিয়ে উঠল। ৪৬২ বছর আগের বাড়ি কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। আর ১৬৫ বছর আগে যেখানে রবীন্দ্রনাথের জন্ম হয়েছিল সেই ঐতিহাসিক ঠাকুরবাড়িকে এতটা অবহেলা করব? ঠাকুরবাড়ি তো শুধু রবীন্দ্রনাথের জন্মস্থান নয়, বাংলার নবজাগরণের পীঠস্থান। রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর আগের ও পরের সময়টাকে ধরে রাখার, দেখার ও দেখানোর সুযোগ আমরা গ্রহণ করিনি। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির একটা ছোট অংশ সকলে দেখতে পারেন। সেই জায়গাগুলোয় ঘুরলে রবীন্দ্রানুরাগীরা আবেগবিহ্বল হয়ে পড়েন। পুরো ঠাকুরবাড়ি নিয়ে বড় করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করলে গোটা বিশ্বের মানুষকে টানা যেত, যেমন টানছে স্ট্র্যাটফোর্ড-আপন-অ্যাভন।

কাজটা সহজ নয়। তবে অসম্ভবও নয়। দরকার শুধু সদিচ্ছার। পরিকল্পনার এবং তা বাস্তবায়নের।