আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ দশম সংখ্যা ● ১৬-৩১ মে, ২০২৬ ● ১-১৫ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

প্রবন্ধ

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬: একটি পর্যালোচনা

উত্তম ভট্টাচার্য


বিগত এপ্রিল ২০২৬-এ, ভারতে চার রাজ্য (আসাম, কেরলম, তামিলনাড়ু, কেন্দ্রশাসিত পুদুচেরি) সহ, পশ্চিমবঙ্গে দুই দফাতে (১৫২ এবং ১৪২ আসনের জন্য), দুই পৃথক দিনে, ২৩ ও ২৯ এপ্রিল, ২০২৬) বিধানসভার ২৯৪টি আসনের জন্য নির্বাচন হয়ে গেল এবং ৪ই মে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ হয়। একমাত্র ফলতা কেন্দ্র বাদে সমস্ত কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণা হয়। নির্বাচনে অস্বচ্ছতা জনিত কারণে ফলতার নির্বাচন বাতিল হয় এবং ২১ মে, ২০২৬ পুনঃনির্বাচন-এর দিন ঘোষণা হয়।

পশ্চিমবঙ্গের এটি ১৮তম বিধানসভা নির্বাচন। অন্য বারের অনেক নির্বাচন-এর মতো ২০২৬-এর নির্বাচন নানা বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্যে ভরা। তার মধ্যে প্রধানতঃ

(১) নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন, Special Intensive Revision (SIR) এবং সেই সংশোধন পদ্ধতি ঘিরে নানা বিতর্ক, লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি ঘটিত তর্ক বিতর্ক, সুপ্রিম কোর্ট এবং হাইকোর্টের বিচারকদের তত্ত্বাবধানে ভোটার তালিকা নির্দিষ্ট করা, বিপুল সংখ্যক (২৭ লক্ষ-এর কিছু বেশি) ভোটার-এর ভোটাধিকার সংশয়-এর মধ্যে রাখা ও প্রভূত ভোটার-এর নাম বাদ যাওয়া (সংখ্যার হিসাব যা ৯০ লক্ষ-এর মতন)

(২) কয়েক লক্ষ কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিতে, কেন্দ্রীয় সরকারী কর্মীবৃন্দের সহায়তাতে, নির্বাচন কমিশন-এর নির্বাচন পরিচালনা।

(৩) কয়েক স্তরের কঠোর নিরাপত্তার মোড়কে ভোট গণনা এবং ফল ঘোষণা।

(৪) ভোট গণনা যথাযথ হয়নি, গরমিল হয়েছে ও জোর করে পরাজিত করা হয়েছে এই সব 'অভিযোগের' ভিত্তিতে, চলতি তৃণমূল সরকার-এর প্রধানের (মুখ্যমন্ত্রীর) নিয়মবিধি মেনে, রাজ্যপালের কাছে পদত্যাগ পত্র পেশ না করা।

(৫) নির্বাচন ঘোষণার পর নির্বাচন বিধি লাগু হবার পরপরই বহু রাজ্য সরকারি কর্মচারি ও পুলিশ কর্মী বদলি এবং 'নিরপেক্ষ' নির্বাচন পরিচালনার স্বার্থে বেশ কিছু সরকারি কর্মীদের নির্বাচন প্রক্রিয়া হতে সরিয়ে দেওয়া (সুষ্ঠু নির্বাচন-এর স্বার্থে এটা কোনো নতুন বিষয় নয়, তবে সংখ্যার বিচারে যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য ঘটনা)।

(৬) পশ্চিমবঙ্গে এই প্রথম প্রায় ৯৩ শতাংশ ভোটার-এর ভোটদান।

(৭) চলতি শাসনে থাকা, বর্তমানে পরাজিত রাজনৈতিক দলের পক্ষ হতে যথাযথ বিচারের দাবিতে, এবং 'স্বচ্ছ' ভোটার তালিকা প্রকাশের দাবিতে আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা।

এসব আলোচনা আপাতত স্থগিত রেখে, বর্তমানে আমরা বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল বিষয়ে সংক্ষিপ্ত কিছু আলোচনা করতে পারি। এখানে আমাদের ব্যবহৃত পরিসংখ্যান, মূলত ৬-৭ই মে, ২০২৬-এর নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী। নির্বাচন কমিশন-এর তথ্য অনুসারে এবার মোট ভোটার-এর সংখ্যা ছিল ৬,৮২,৫১,০০৮। প্রায় ছয় কোটি বিরাশি লক্ষ। এর ভিতর পুরুষ ৫১.১৮ শতাংশ, মহিলা ভোটার সংখ্যা ৪৮.৮২ শতাংশ। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার সংখ্যা মোট ১,২৫৭। নির্বাচন কমিশন-এর তথ্য অনুসারে পুরুষরা ভোট দেয় ৯১.৭৪ শতাংশ এবং মহিলা দলের ভোট দেবার হার ৯৩.২৪ শতাংশ। অর্থাৎ মহিলাদের ভোট বেশি পড়ে। শতাংশ হিসেবে মিলিত মোট ভোট পড়ে ৯২.৪৭ শতাংশ। তৃতীয় লিঙ্গের ভোট পড়ে ১,২৫৭ জনের মধ্যে ৭৫১ জনের, অর্থাৎ প্রায় ৬০ শতাংশ। কোন রাজনৈতিক দল কত ভোট পেয়েছে এই হিসাব দেখলে, বিজয়ী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পেয়েছে মোট প্রদেয় ভোটের ৪৫.৮৪ শতাংশ। সংখ্যায় ২.৯২ কোটি ভোট। তৃণমূল দলের প্রাপ্য ভোট শতাংশ ৪০.৮ শতাংশ। সংখ্যায় ২.৬০ কোটি। সিপিআই(এম) পায় মোট ভোটের ৪.৪৫ শতাংশ। সংখ্যায় ২৮ লক্ষ ৩৯ হাজার। জাতীয় কংগ্রেস-এর ভোট সংখ্যা ১৮ লক্ষ ৯০ হাজার যা মোট ভোটের ২.৯৭ শতাংশ। নোটায় ভোট পড়ে ০.৭৮ শতাংশ। সংখ্যার হিসেবে প্রায় ৪ লক্ষ ৯৫ হাজার।

এবার যদি আসন সংখ্যা দেখা যায় তবে দেখা যাচ্ছে, মোট ২৯৩ আসনের মধ্যে ২০৭টি আসন জয় করে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি, ১৮তম বিধানসভায় সরকার গঠন করার অধিকারী হয়েছে। এর ভিতর অবশ্য শ্রী শুভেন্দু অধিকারী, নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর এই দুই কেন্দ্র হতে বিজয়ী। তৃণমূল (এআইটিইউসি)-এর আসন সংখ্যা ৮০টি। সর্বভারতীয় কংগ্রেস-এর দখলে দুটি (২) আসন, দুটিই মুর্শিদাবাদ জেলায়। আমজনতা উন্নয়ন পার্টি পেয়েছে দুটি আসন (মুর্শিদাবাদ-এর নওদা ও রেজিনগর আসন)। দুটি আসনেই জয়ী হুমায়ূন কবীর। নিয়ম অনুসারে শ্রী অধিকারী একটি আসন, অর্থাৎ ভবানীপুর-এর আসনটি রাখবেন। অন্য আসনে পরে নির্বাচন হবে। হুমায়ূন কবীর নওদা আসনটি রাখবেন। অন্য দিকে রেজিনগর আসন তিনি ছেড়ে দেবেন। ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ)-এর চেয়ারম্যান নওসাদ সিদ্দিকী ভাঙড় আসনে জয়ী হয়েছেন। মুর্শিদাবাদ জেলার, ডোমকল আসনে জয়ী হয়েছেন সিপিআই(এম) প্রার্থী মহঃ মুস্তাফিজুর রহমান (রানা)।

নির্বাচন শেষে ছবি এরকম: বিজেপি ২০৭, তৃণমূল ৮০, কংগ্রেস ২, আমজনতা উন্নয়ন পার্টি ২, সিপিআই(এম) ১, আইএসএফ ১। মোট নির্বাচিত আসন ২৯৩।

এবার বিশেষ ভাবে শ্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভোট প্রাপ্তির ছবি আলোচনা করা যায়। ভবানীপুর কেন্দ্রে তিনি ৭৩,৯১৭টি ভোট পেয়েছেন। সেখানে শ্রীমতী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পেয়েছেন ৫৮,৮১২টি ভোট। অর্থাৎ তিনি ১৫,১০৫ ভোটে হেরেছেন। এখানে নোটাতে ভোট পড়ে ৮২৯টি। ভবানীপুর কেন্দ্রে মোট ভোট পড়ে ১,৩৯,৪১০টি। শ্রী অধিকারী পান মোট ভোটের ৫৩ শতাংশ ভোট। শ্রী শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রামে ভোট পেয়েছেন ১ লক্ষ ২৭ হাজার-এর মতো। সেখানে মোট ভোটের ৫০.৪ শতাংশ ভোট। সেখানে তৃণমূল প্রার্থীকে তিনি প্রায় ৯ হাজার-এর বেশি ভোটে হারিয়েছেন।

নির্বাচন কমিশন-এ জমা পড়া তথ্য অনুসারে শ্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং শ্রীমতী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর শিক্ষাগত যোগ্যতা পোস্ট গ্রাজুয়েট বা স্নাতকোত্তর। নির্বাচন অফিসে তথ্য জমা দেবার সময়ে শ্রী অধিকারীর বয়স ৫৭ বছর। সম্পত্তি ৮৫ লক্ষ ৮৭ হাজার ৬০০ টাকা। এবং তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ২৯টি আছে। সেখানে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শ্রীমতী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর বয়স ৭১ বছর। সম্পত্তি ১৫ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫০৯ টাকা। তাঁর বিরুদ্ধে কোনও ফৌজদারী মামলার খবর নেই।

আলোচনা শেষ করব অন্য এক তথ্য দিয়ে। এর তথ্যসূত্র, মূলত 'ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস' সংবাদপত্র (৬ই মে, ২০২৬)। সেখানে দেখানো হয়েছে, ২৯৩ আসনের মধ্যে ৪৯টি আসনে যাঁরা জয়লাভ করেছেন, তাঁদের জয়লাভ-এর সংখ্যা, সেখানকার ভোট বাতিল-এর সংখ্যার (১০ হাজার বা আরও বেশি) থেকে কম। উদাহরণ হিসেবে প্রায় ১৬টি আসনে এমন দেখা গেছে। এর মধ্যে ৫টি আসনে বিজেপি জেতে। অর্থাৎ এসআইআর-এ, নাম না কাটা গেলে হয়ত সেখানে অন্য দলও জিততে পারতো। তবে আকর্ষণীয় ঘটনা, ৯টি আসনের হিসাব দেখানো হয়েছে, সেখানে তৃণমূল প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। সংবাদে প্রকাশ ৪৯ আসনের মধ্যে বিজেপি ২৬ স্থানে (৫৩ শতাংশ), এবং তৃণমূল ২১টি (৪৩ শতাংশ) আসনে, এবং কংগ্রেস ২টি আসনে (৪ শতাংশ) জিতেছে, যেখানে ভোটে জেতার ব্যবধান, নাম কেটে যাওয়ার সংখ্যা থেকে অনেকটা কম। সামসেরগঞ্জ, লালগোলা, ফারাক্কা, মাদারবাড়ি, জাঙ্গিপুর ইত্যাদি আসন তার সাক্ষী দেয়।

আরও একটি বিষয় আলোচনা হয়েছে। দেখানো হয়েছে এবার নির্বাচনে মোট ৪০ জন মুসলমান প্রার্থী জিতেছেন। এদের মধ্যে কংগ্রেস থেকে দুই ও সিপিআই(এম) এবং সেকুলার ফ্রন্ট থেকে দুই মুসলমানধর্মী প্রার্থীও আছেন। গত নির্বাচনে মুসলমান ধর্মাবলম্বী জেতেন ৪৪ জন। ২০১৬ নির্বাচনে বিধানসভাতে ৫৯ জন মুসলিম ছিলেন (ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, মে ২০২৬, পৃঃ ৫)। এবার বিজেপি থেকে কোনো মুসলমান প্রার্থী ছিলেন না।

তৃণমূল-এর পরাজয়-এর কারণ নিয়ে, বিজেপির বিপুল জয় নিয়ে এবং সিপিআই(এম), কংগ্রেস সহ অন্য রাজনৈতিক দলের সামান্য ভোট পাবার কারণ নিয়ে ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই অনেক বিশ্লেষণ হবে। তবে সাধারণ জনগণ, আর্থিক অনটন হতে, মুক্তি চায়, ভাত, কাপড় আর বাসস্থান-এর নিরাপত্তা চায়, উপযুক্ত শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং মানবিক সম্মান চায়। গণতন্ত্রিক মূল্যবোধের সুরক্ষা চায়, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চর্চা চায়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ভেদাভেদহীন, শ্রেণি বিদ্বেষমুক্ত পরিবেশ চায়, প্রাকৃতিক পরিবেশের উন্নতি চায়। আগামীদিনে, সরকার এবং বিরোধী পক্ষ, সকলে মিলে জনগণের একান্ত এই কিছু দাবির সুরক্ষাতে যত্নবান হবেন এমনই শুধু প্রার্থনা করার সময় এই 'নতুন ভোরে'।