আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ দশম সংখ্যা ● ১৬-৩১ মে, ২০২৬ ● ১-১৫ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩
প্রবন্ধ
গগন পর্যটন
শিবাশীষ বসু
(এক)
ইদানীং বেদ-পুরাণ-রামায়ণ-মহাভারত ইত্যাদির কিছু কাল্পনিক কাহিনিকে যেভাবে বাস্তব ও বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ করবার প্রচেষ্টা চলছে তা ন্যক্কারজনক। এখন আমরা সকলেই জানি যে, আধুনিক উড়োজাহাজের যাত্রা শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর শুরুতে। রাইট ভ্রাতৃদ্বয় (অলিভার রাইট ও উইলবার রাইট) নামে দুই মার্কিন প্রযুক্তিবিদ ১৯০৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর প্রথম সফলভাবে নিয়ন্ত্রিত, শক্তিসম্পন্ন এবং বাতাসের চেয়ে ভারি সুস্থিত মানুষ-বহনযোগ্য উড়োজাহাজ ওড়াতে সক্ষম হন, এই তথ্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। কিন্তু ইদানিং একটি প্রভাবশালী মহল থেকে দাবি করা শুরু হয়েছে যে, বৈদিক শাস্ত্রের সাহায্যে রাইট ভাইদের আগেই আকাশে বিমান উড়িয়েছিলেন একজন ভারতীয় বৈজ্ঞানিক; নাম শিবাকর বাবুজি তালপাড়ে। আইআইটি পাঠ্যক্রমে তাঁর জীবন ও কাজ অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত বলে কিছুদিন আগে দাবি করেছিলেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী। শুধু তাই নয়, 'রামায়ণ'-এ উল্লিখিত 'পুষ্পক রথ' সম্পর্কেও মেধাবী ছাত্রদের ধারণা থাকা প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেছেন।
১৮৬৪ সালে মুম্বাইতে জন্ম নেওয়া শিবাকর তালপাড়ে সংস্কৃত ও বৈদিক সাহিত্যের একজন পণ্ডিত হিসাবেই খ্যাত। স্কুলজীবনের শেষের দিকে তিনি বৈদিক ও পৌরাণিক সাহিত্যে বর্ণিত বিমানচালন বিদ্যা নিয়ে বিভিন্ন লেখাপত্রে আকৃষ্ট হন। বৈদিক বিমান তৈরি করতে মনস্থ হওয়ার পর তিনি কিছু বিদেশি আবিষ্কারকের অ্যাভিয়েশন টেকনোলজি সম্পর্কিত লেখাও পড়েন বলে জানা যায়। অবশেষে ১৮৯৫ সালে বিশুদ্ধ বৈদিক পদ্ধতি মেনে শিবাকরজী তৈরি করলেন তাঁর বিমান 'মরূৎসখা'। অবশ্যই আনম্যানড এয়ারক্রাফট। এর পরের ঘটনাটি যথেষ্ট বিতর্কিত। মোহন দেওয়ান ২০২৪ সালে একটি প্রবন্ধে লিখেছেন, "জানা যায়, বরোদার মহারাজা এইচ. এইচ. সায়াজি রাও গায়কোয়াড় এবং শ্রদ্ধেয় ভারতীয় বিচারপতি মহাদেব গোবিন্দ রানাডে এই উড্ডয়ন প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তালপাড়ের ছাত্র পণ্ডিত এস. ডি. সাতওয়ালেকরের মতে, 'মরূৎসখা' অল্প সময়ের জন্য উড়তে সক্ষম হয়েছিল। বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী বাল গঙ্গাধর তিলক মারাঠি সংবাদপত্র 'কেশরী'-তে বিমানটি সম্পর্কে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করেন।" কে. আর. এন. স্বামীর বক্তব্য অনুযায়ী বিচারপতি রানাডে এবং জাতীয়তাবাদী নেতা গায়কোয়াড় নাকি বিমানটিকে ১,৫০০ ফুট উচ্চতায় ওঠার পর পড়তে দেখেছেন। আবার ২০০৪ সালে সেনাবাহিনীর এক প্রাক্তন অফিসারের বক্তব্য অনুসারে ভুল ডিজাইনিং-এর জন্য বিমানটি অপারেট করা যায়নি।
দেখা যাচ্ছে উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে ঘটনাটির সত্যাসত্য বিচার করা দুরূহ। কারন তালপাড়ে যে ডিজাইন তৈরি করেছিলেন প্রযুক্তিগতভাবে তা অতি দুর্বল। পরবর্তীকালে ইসকনের জনৈক সাধু স্টিফেন রোজেন তাঁর বই 'The Jedi in the Lotus: Star Wars and the Hindu Tradition'-তে বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করে একই কথা বলেছেন যে ওভাবে বিমান ওড়া সম্ভব নয়। যদিও আজও HAL-এ তালপাড়ের এক্সপেরিমেন্টের সমস্ত ডকুমেন্টস রাখা আছে।
এখন, 'বেদ' পড়ে যে বিমান বানানো যায় না, তা নিয়ে বোধহয় ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। কারণ 'বেদ'-এ সেসব প্রযুক্তিগত তথ্য নেই। কেউ কেউ দাবি করেছেন, শুধু 'বেদ' নয়, তখন পর্যন্ত বিমান বানানোর যে প্রচেষ্টাগুলো ইউরোপে হয়েছিল, তিনি নাকি সেইসবও অধ্যয়ন করেছিলেন। তাহলে এখানে প্রশ্ন ওঠে, আদৌ তা পড়বার দরকারটাই বা কি, যদি 'বেদ'-ই সমস্ত জ্ঞানের আকর হয়ে থাকে। আর, যদি মেনে নেওয়া হয়, পশ্চিমের প্রচেষ্টাগুলোকে অধ্যয়ন করে তার ওপর স্বীয় বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের আগেই তিনি বিমান তৈরি করে ফেলেছিলেন, তাহলে প্রশ্ন ওঠে, সেখানে 'বেদ'-এর ভূমিকাটা ঠিক কোথায়।
আসলে পশ্চিমে কে কী নিয়ে গবেষণা করছেন তা বুঝতে গেলে শুধু দয়ানন্দ সরস্বতীর 'বেদ' ব্যাখ্যাই যথেষ্ট নয়, আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তি জানতে হয়। তালপাড়ের সে সক্ষমতা কি আদৌ ছিল? সেইরকম কোনো প্রমাণ আমরা পাইনি। অবশ্য অনেক সময় বিজ্ঞান না জেনেও স্রেফ ব্যবহারিক জ্ঞান দিয়ে অনেক কিছু উদ্ভাবন করে ফেলা যায়, তবে সেক্ষেত্রেও মানুষটিকে নিদেনপক্ষে কারিগরি বিদ্যা কিছুটা জানতে হবে, হাতে কলমে কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তালপাড়ে তো তাও ছিলেন না, তিনি শুধু প্রাচীন সংস্কৃত ভাষা ও শাস্ত্র ছাড়া আর কিছু জানতেন বলে খবর নেই।
'বৈমানিক শাস্ত্র' বলে যে বইয়ে প্রাচীন ভারতের বিমান-প্রযুক্তিকে প্রকৌশল অঙ্কন সহযোগে ব্যাখ্যা করা হয়েছে বলে বলা হয়, সেটি ১৯২৩ সালে লিখেছিলেন সুব্বারাইয়া শাস্ত্রী বলে এক সংস্কৃত পণ্ডিত, অর্থাৎ তালপাড়ের তথাকথিত বিমান-নির্মাণের অনেক পরে। শোনা যায় বইয়ের ড্রয়িং-গুলোও সুব্বারাইয়া করেননি, অনেক পরে বইটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য ইল্লাপ্পা বলে এক নকশাকারকে দিয়ে ড্রয়িং-গুলো করিয়ে বইতে ঢোকানো হয়।
পরবর্তীকালে ১৯৭৪ সালে বাঙ্গালোরের 'ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্স'-এর পাঁচজন বিজ্ঞানী একযোগে 'বৈমানিক শাস্ত্র' নামক গ্রন্থটি বিশ্লেষণ করে তার অসারতা প্রতিপাদন করেন। সম্পূর্ণ গ্রন্থটি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করবার পর তাঁরা এই সিদ্ধান্তে আসেন যে,
'...the planes described above are the best poor concoctions, rather than expressions of something real. None of the planes has properties or capabilities of being flown; the geometries are unimaginably horrendous from the point of view of flying; and the principles of propulsion make them resist rather than assist flying. The text and the drawings do not correlate with each other even thematically. ...All that may be said is that thematically the drawings ought to be ruled out of discussion. And the text, as it stands, is incomplete and ambiguous by itself and incorrect at many places. ...Also, no data have been given about the weights of crafts and their components. This is serious since weight is fundamental to the flying of heavier‐than‐air machines. Moreover, the unit of mass does not even appear anywhere in the text.'
উপরে বর্ণিত বিমানগুলো কোনো বাস্তব জিনিসের প্রকাশ না হয়ে, বরং নিছক দুর্বল সৃষ্টি। বিমানগুলোর কোনোটিরই ওড়ার মতো বৈশিষ্ট্য বা ক্ষমতা নেই; ওড়ার দৃষ্টিকোণ থেকে এদের জ্যামিতিক গঠন ভয়াবহ; এবং এদের চালনার নীতিগুলো ওড়াকে সাহায্য করার পরিবর্তে বাধা দেয়। লেখা এবং অঙ্কনগুলোর মধ্যে এমনকী বিষয়গতভাবেও কোনো সামঞ্জস্য নেই। ...শুধু এটুকুই বলা যায় যে, বিষয়গতভাবে অঙ্কনগুলোকে আলোচনা থেকে বাদ দেওয়া উচিত। আর লেখাটি, যেমনটি আছে, তা নিজেই অসম্পূর্ণ ও দ্ব্যর্থক এবং অনেক জায়গায় ভুল। ...এছাড়াও, যান এবং তার উপাদানগুলোর ওজন সম্পর্কে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। এটি একটি গুরুতর বিষয়, কারণ বাতাসের চেয়ে ভারি যান ওড়ানোর জন্য ওজন একটি মৌলিক বিষয়। অধিকন্তু, ভরের এককটি লেখাটির কোথাও উল্লেখই করা হয়নি। (অনুবাদ সম্পাদকমণ্ডলীর)
(দুই)
ঊনবিংশ শতাব্দীতে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই বঙ্গসাহিত্যে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান আলোচনার সূত্রপাত হল। এই প্রসঙ্গে অন্যতম যুগান্তকারী সাময়িক পত্রিকাটি 'বঙ্গদর্শন'। বঙ্কিমচন্দ্র সম্পাদিত 'বঙ্গদর্শন' বাংলা সাহিত্যে যে নবযুগ সৃষ্টি করেছিল তা আজ সর্বজনস্বীকৃত। সরস অথচ বলিষ্ঠ ভাষায় সূক্ষ্ম ও গভীর চিন্তামূলক বিজ্ঞানালোচনা পাওয়া গেল 'বঙ্গদর্শন'-এ। অধিকাংশ প্রবন্ধেরই লেখক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় স্বয়ং। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত বঙ্কিমচন্দ্রের একটি সত্তা সম্ভবত ভারতের উন্নতির জন্য আধুনিক বিজ্ঞানের সাধনা যে অত্যাবশ্যক তা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। সম্ভবত সেই কারণেই 'বঙ্গদর্শন'-এর দ্বিতীয় সংখ্যা থেকেই (জ্যৈষ্ঠ ১২৭৯, ইংরেজি ১৮৭২) বঙ্কিমচন্দ্র বিজ্ঞান বিষয়ক আলোচনার সূত্রপাত করেন। সম্বল ছিল কিছু বিদেশি বই ও পত্রপত্রিকা।
বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ভাবশিষ্য বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিজ্ঞান চর্চার ইতিহাসে বঙ্কিমের অবদান সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, "১২৭৯ সালের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় 'বিজ্ঞানকৌতুক' নাম দিয়ে বঙ্গদর্শনে বিজ্ঞানালোচনার সূত্রপাত তিনিই করেছিলেন।"
বঙ্গদর্শনের রচনাগুলির সর্বপ্রধান বৈশিষ্ট্য এদের ভাষায় - বস্তুতঃ উপন্যাস, প্রবন্ধ ও রম্যরচনাগুলিকে কেন্দ্র করে বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা ভাষার যে সংস্কারসাধন করেছিলেন তারই পরিচয় পাওয়া গেল 'বঙ্গদর্শন'-এর বিজ্ঞানালোচনাতে।
বঙ্কিমের সাহিত্য প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে একই ধরণের প্রতিক্রিয়া পাই আমরা যোগেশচন্দ্র বাগল মহাশয়ের উক্তিতেও, "বিজ্ঞানের নব্যবিষ্কৃত জটিল তত্ত্বসমূহ সরল ও সরস করিয়া বিভিন্ন প্রবন্ধে 'বঙ্গদর্শন' মারফত পরিবেশন করিতেন।" বিজ্ঞানের প্রতি বঙ্কিমচন্দ্রের আগ্রহ এবং বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলি আত্মস্থ করবার ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে লেখক হিসাবে তাঁর রসাত্মক মনোভাবও ফুটে উঠেছে, যা আমরা দেখতে পাবো বঙ্কিমচন্দ্রের বিজ্ঞানরচনাগুলি পর্যালোচনার সময়ে।
প্রবন্ধগুলি পড়লে বোঝা যায় যে বঙ্কিমচন্দ্র উনবিংশ শতকের কুসংস্কারগ্রস্ত বাঙালি তথা ভারতীয় সমাজকে কীভাবে কষাঘাত করেছেন। শুধু তাই নয়, প্রবন্ধগুলির বিষয় নির্বাচন নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের বিচক্ষণতা লক্ষ করবার মতো। কোনো গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে তিনি পাঠকের মন ভারাক্রান্ত করেননি, বরং আপাত সাধারণ কৌতূহলের বিষয়গুলি তিনি পছন্দ করেছেন এবং লঘু চালে তাঁর প্রবন্ধগুলিতে বৈজ্ঞানিক তথ্য পরিবেশন করেছেন।
এই ক্রমেরই অংশ হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্র ১৮৭৩ সালে যখন 'গগন পর্যটন' শীর্ষক প্রবন্ধটি লিখেছিলেন তখনও যান্ত্রিক বিমানপোত পরীক্ষানিরীক্ষার স্তরেই আছে। 'গগন পর্যটন' শীর্ষক প্রবন্ধের সূচনাতেই কালদর্শী বঙ্কিমচন্দ্র সম্ভবত ওই বৈদিকবাদীদেরই নির্মম বিদ্রূপ করে মন্তব্য করেন,
"পুরাণ ইতিহাসাদিতে কথিত আছে, পূর্বকালে ভারতবর্ষীয় রাজগণ আকাশ-মার্গে রথ চালাইতেন। কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষদিগের কথা স্বতন্ত্র, তাঁহারা সচরাচর এপাড়া ওপাড়ার ন্যায়, স্বর্গলোকে বেড়াইতে যাইতেন, কথায় কথায় সমুদ্রকে গণ্ডূষ করিয়া ফেলিতেন; কেহ জগদীশ্বরকে অভিশপ্ত করিতেন, কেহ তাঁহাকে যুদ্ধে পরাস্ত করিতেন। প্রাচীন ভারতবর্ষীয়দিগের কথা স্বতন্ত্র; সামান্য মনুষ্যদিগের কথা বলা যাউক।"
একই প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিজ্ঞামননস্ক সংস্কৃতির পার্থক্যনির্দেশ করতে গিয়ে ইউরোপের একটি কাহিনির অবতারণা করেন। কাহিনিটি এইরকম,
"আচার্য্য চার্লস প্রথমে জলজন বায়ুপূরিত ব্যোমযানের সৃষ্টি করেন। গ্লোব নামক ব্যোমযানে উক্ত বায়ু পূর্ণ করিয়া প্রেরণ করেন; তাহাতে সাহস করিয়া কোন মনুষ্য আরোহণ করে নাই। রাজপুরুষেরাও প্রাণিহত্যার ভয়প্রযুক্ত কাহাকেও আরোহণ করিতে দেন নাই। এই ব্যোমযান কিয়দ্দূর উঠিয়া ফাটিয়া যায়, জলজন বাহির হইয়া যাওয়ায়, ব্যোমযান তৎক্ষণাৎ ভূপতিত হয়। গোনেশ নামক ক্ষুদ্র গ্রামে উহা পতিত হয়। অদৃষ্টপূর্ব খেচর দেখিয়া, গ্রাম্য লোকে ভীত হইয়া, মহা কোলাহল আরম্ভ করে। ...অনেকে একত্রিত হইয়া গ্রাম্য লোকেরা দেখিতে আইল যে, কিরূপ জন্তু আকাশ হইতে নামিয়াছে। দুইজন ধর্মযাজক বলিলেন যে, ইহা কোনো অলৌকিক জীবের দেহাবশিষ্ট চর্ম। শুনিয়া গ্রামবাসিগণ তাহাতে ঢিল মারিতে আরম্ভ করিল, এবং খোঁচা দিতে লাগিল। তন্মধ্যে ভূত আছে, বিবেচনা করিয়া, গ্রাম্য লোকেরা ভূত শান্তির জন্য দলবদ্ধ হইয়া মন্ত্র পাঠপূর্বক গ্রাম প্রদক্ষিণ করিতে লাগিল, পরিশেষে মন্ত্রবলে ভূত ছাড়িয়া পলায় কি না দেখিবার জন্য, আবার ধীরে ধীরে সেইখানে ফিরিয়া আসিল। ভূত তথাপি যায় না - বায়ুসংস্পর্শে নানাবিধ অঙ্গভঙ্গী করে। পরে একজন গ্রাম্য বীর, সাহস করিয়া তৎপ্রতি বন্দুক ছাড়িল। তাহাতে ব্যোমযানের আবরণ ছিদ্রবিশিষ্ট হওয়াতে, বায়ু বাহির হইয়া, রাক্ষসের শরীর আরও শীর্ণ হইল। দেখিয়া সাহস পাইয়া, আর একজন বীর গিয়া তাহাতে অস্ত্রাঘাত করিল। তখন ক্ষতমুখ দিয়া বহুল পরিমাণে জলজন নির্গত হওয়ায়, বীরগণ তাহার দুর্গন্ধে ভয় পাইয়া রণে ভঙ্গ দিয়া পলায়ন করিল। কিন্তু এ জাতীয় রাক্ষসের শোণিত ঐ বায়ু। তাহা ক্ষতমুখে নির্গত হইয়া গেলে, রাক্ষস ছিন্নমুণ্ড ছাগের ন্যায় 'ধড়ফড়' করিয়া মরিয়া গেল। তখন বীরগণ প্রত্যাগত হইয়া তাহাকে অশ্বপুচ্ছে বন্ধনপূর্বক লইয়া গেলেন।"
এই হল কাহিনি। কিন্তু তারপরই বঙ্কিম তাঁর স্বভাবোচিত সরস ভঙ্গিতে বললেন, "এদেশে হইলে সঙ্গে সঙ্গে একটি রক্ষাকালী পূজা হইত, এবং ব্রাহ্মণেরা চণ্ডীপাঠ করিয়া কিছু লাভ করিতেন।"
তথ্যসূত্র:
১) মোহন দেওয়ান; আনসাং হিরোস: শিবকর বাপুজি তালপাড়ে।
২) এইচ এস মুকুন্দাস ও অন্যান্য; এ ক্রিটিক্যাল স্টাডি অফ দি ওয়ার্ক বৈমানিক শাস্ত্র; ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স।
৩) বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য; বঙ্গসাহিত্যে বিজ্ঞান।
৪) যোগেশচন্দ্র বাগল সম্পাদিত বঙ্কিম রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড)।