আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ দশম সংখ্যা ● ১৬-৩১ মে, ২০২৬ ● ১-১৫ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

সম্পাদকীয়

পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তন


২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী স্বাক্ষর রেখেছে। রাজ্যের ইতিহাসে প্রথমবার ভারতীয় জনতা পার্টি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গড়েছে। মোট ভোটের ৪৫.৮৪ শতাংশ এবং ২০৭টি আসন পেয়ে মুখ্যমন্ত্রী পদে আসীন হয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। ২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপি-র প্রাপ্ত ভোট ছিল ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ তাদের ভোট শতাংশ সাত শতাংশের বেশি বৃদ্ধি হয়েছে। অন্যদিকে, রাজ্যের প্রাক্তন শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস ৪০.৮ শতাংশ ভোট পেয়ে মাত্র ৮০টি আসনে জয়লাভ করেছে। ২০২১ সালে তাদের প্রাপ্ত ভোট ছিল প্রায় ৪৮ শতাংশ এবং তারা জিতেছিল ২১৫টি আসন। অন্যদিকে, বামপন্থীরা ১টি আসনে জয়ী হয়েছেন, তাঁদের জোটসঙ্গী আইএসএফ জিতেছে একটি আসন এবং কংগ্রেস জিতেছে দুটি আসন।

তৃণমূল কংগ্রেসের এই বিপুল হারের জন্য তাদের প্রথম এবং প্রাথমিকভাবে নিজেদের বিগত ১৫ বছরের কর্মকাণ্ডের দিকে তাকানো উচিত। ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন বিরোধীদের ১০ বছর চুপ করে থাকতে হবে, ভোট পরবর্তী হিংসায় বামপন্থীদের হাজারো সমর্থকদের উপর আক্রমণ নামিয়ে আনে তাঁর সরকার। ২০১৮, ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে ব্যাপক হিংসা চালানো হয়। বিরোধীদের মনোনয়ন পর্যন্ত জমা করতে দেয়নি তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতিরা। বহু পুরসভা জবরদখল করা হয়, অনেক পুরসভায় ভোট হয়নি বহু বছর, ছাত্রদের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়ে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র নির্বাচন বাতিল করা হয়। এই দমবন্ধকর পরিস্থিতি তৈরি করে, বিরোধীদের উপর লাগাতার শারীরিক আক্রমণ করে, তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে মাননীয়া হয়ত ভেবেছিলেন যে মানুষ মুখ বুজে এই অত্যাচার বছরের পর বছর চলতে দেবেন! ১৫ বছর চলেছে, কিন্তু মানুষ আর মেনে নিতে পারেনি। তারা ভোটের বাক্সে এই সরকারকে সমূলে উৎখাত করেছে।

একদিকে তৃণমূল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে, অন্যদিকে তাদের দুই আনার নেতা থেকে শুরু করে ক্যাবিনেট মন্ত্রীরা সীমাহীন দুর্নীতি করেছেন। চাকরি বিক্রি হয়ে গেছে রাজ্যে, শিক্ষামন্ত্রীর খাটের তলা থেকে কোটি কোটি টাকা উদ্ধার হয়েছে, ইঁট-বালি-চুন-সুরকি-পাথর-সিমেন্ট সহ সমস্ত কিছু তৃণমূলের দুষ্কৃতি এবং সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেছে, কাটমানি খেয়েছে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার-বিধবা ভাতা-যুবসাথী ইত্যাদি প্রকল্পগুলির টাকা যেমন মানুষকে দেওয়া হয়েছে, তেমনই, তৃণমূলের স্থানীয় নেতারা সেই টাকার ভাগও মানুষের থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে। গরু-বালি-পাথর পাচারচক্রীরা তৃণমূলের ছোট-বড় নেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। স্থানীয় নেতা থেকে শুরু করে বড় নেতা সবার বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়ি, আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিহীন জীবনযাত্রা মানুষ প্রতিনিয়ত দেখেছেন। এই দুর্নীতিগ্রস্থ সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ প্রতিফলিত হয়েছে তাদের ভোটে।

মমতা বন্দ্যেপাধ্যায় প্রশ্নের সম্মুখীন হলেই বলতেন যে তাদের সরকার নাকি ১০০ শতাংশ কাজ করে ফেলেছে। অথচ রাজ্যের শিল্পে বিনিয়োগ প্রায় কিছুই বাড়েনি, কর্মসংস্থান হয়নি, রাজ্যের দেনার পরিমাণ লাগাতার বেড়েছে, স্কুল-কলেজ-শিক্ষাব্যবস্থা জরাগ্রস্থ হয়ে পড়েছে। রাজ্যের মানুষ ভিনরাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন কাজের সন্ধানে। তাদের জীবনযন্ত্রণার উপশম না ঘটিয়ে বারংবার দাম্ভিকভাবে বলে দেওয়া হয়েছে যে সব কাজ হয়ে গিয়েছে। তাই সরকারী কর্মীরা তাদের প্রাপ্য মহার্ঘ ভাতা পায়নি, সুপ্রিম কোর্টের রায় বেরোনোর পরেও সুরাহা মেলেনি। অন্যদিকে, আর. জি. কর হাসপাতালে খুন ও ধর্ষণের ঘটনার পরে কলকাতা-সহ রাজ্যের শহরগুলিতে মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়েন নারী সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের দুর্নীতির বিরুদ্ধে। এই সমস্ত ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়ে ভোটের বাক্সে ফেটে পড়েছে।

কিন্তু এই ক্ষোভের বিস্ফোরণ একদিকে যেমন ভোটের ফলাফল থেকে স্পষ্ট, তেমনই অন্যদিকে বিজেপি-র মেরুকরণের রাজনীতির প্রভাব বাদ দিয়ে এই ফলাফলকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনে বিজেপি একজনও মুসলমান প্রার্থী দেয়নি। গোটা নির্বাচনী প্রচারে তারা অনুপ্রবেশকে ইস্যু বানিয়ে বকলমে রাজ্যের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়েছে। তাদের নেতারা সম্পূর্ণভাবে সাম্প্রদায়িক কথা বলেছেন কিন্তু নির্বাচন কমিশন কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। রাজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ সংখ্যালঘু মানুষের একজন প্রতিনিধিকেও বিজেপি তাদের প্রার্থী হওয়ার যোগ্য মনে করেনি, তবু তারা রাজ্যের বিপুল সংখ্যক মানুষের ভোট পেয়েছেন। এটি সম্ভব হয়েছে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতির মাধ্যমে। পশ্চিমবঙ্গের তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিশীলতা যে চিনের প্রাচীর নয়, এবং তাকে কীভাবে 'সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিং'-এর মাধ্যমে হিন্দুত্বের পক্ষে নিয়ে আসা যায়, বিজেপি এই নির্বাচনে তা করে দেখিয়েছে। অবশ্যই এই পরিবর্তন একদিনে বা নির্বাচনী প্রচারের মধ্য দিয়েই শুধু হয়নি। এর নেপথ্যে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ সহ বিজেপির সংগঠন ও রাজনীতির বহু বছরের মেহনত রয়েছে।

এখানেই প্রশ্ন ওঠে যে বাম ও প্রগতিশীল রাজনীতি তৃণমূল বিরোধী মানুষের অভিমতকে নিজেদের দিকে টানতে সক্ষম হল না কেন? এর একটি উত্তর নিশ্চিতভাবেই নিহিত রয়েছে বিজেপি-র অপার অর্থবল, রাষ্ট্রক্ষমতার ব্যবহার এবং কেন্দ্রীয় সরকারে থাকার সুবাদে পাওয়া বাড়তি সুবিধা। মানুষ মনে করেছেন যে বামপন্থীরা দুর্বল, বিজেপি সবল, অতএব তৃণমূলকে হারাতে হলে বিজেপিকে ভোট দিতে হবে। কথাটি অর্ধসত্য এবং অলসবুদ্ধির ফসল। আসলে বামপন্থীরা তাদের রাজনীতির ব্যকরণ সম্পর্কে বিস্মৃত হয়েছেন। রাজনৈতিকভাবে তারা কী বলতে চাইছেন তা সাধারণ মানুষের সাধারণ বুদ্ধির বাইরে থেকে যাচ্ছে। তারা একটি নির্বাচনে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করেন, পরের নির্বাচনে করেন না। আবার তার পরের নির্বাচনে করেন। কিন্তু এসবের ঊর্ধ্বে আসল কথাটি হল তারা মানুষের রোজকার জীবনের সমস্যা নিয়ে লড়াই আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ। রুটিনমাফিক কিছু কর্মসূচী অবশ্যই হয়েছে। কিন্তু জমিতে নেমে মানুষকে সঙ্গে নিয়ে জোরদার লড়াই হয়নি। সাংগঠনিকভাবে বামেরা দুর্বল হয়েছেন। সেই দুর্বলতা কাটাতে যে কঠিন পরিশ্রম দরকার তাদের নেতৃত্ব তা করেননি। তেতো হলেও কথাটি সত্যি। এই নির্বাচনেও তারা তাদের কথায় 'বাইনারি' ভাঙতে পারেননি। এবারের নির্বাচনে একটি আসনে বামপন্থীরা জয়লাভ করলেও, তাদের প্রাপ্য ভোট বাড়েনি।

এই নির্বাচনের সর্বাধিক দুর্ভাগ্যের বিষয় হল ২৭ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পারা। নির্বাচন কমিশন ও সুপ্রিম কোর্টের অবিমৃশ্যকারিতার কারণে আমাদের লক্ষ লক্ষ সহনাগরিক ভোট দিতে পারেনি। নির্বাচন কমিশন শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে 'লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সি' শব্দবন্ধের প্রয়োগ করে এই মানুষদের বাদ দিয়েছে। এই বস্তুটি অন্য কোনও রাজ্যে ব্যবহৃত হয়নি এবং তার কোনও আইনি স্বীকৃতিও নেই। ভোটের পরে একদল জিতবে অন্যদল হারবে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াতে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার পরে যে ভোট হল, তা ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। এই মানুষদের বিচার সুনিশ্চিত করা এখন সবার আশু কর্তব্য হওয়া উচিত।

নতুন সরকার শপথগ্রহণের পরে কাজ করতে শুরু করেছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন যে বিজেপি-র সঙ্কল্পপত্র অনুযায়ী কাজ হবে। আগামীদিনে নতুন রাজ্য সরকারের নীতির পর্যবেক্ষণ করে বিরোধীদের তাদের রণকৌশল ঠিক করতে হবে। সাধারণ মানুষের স্বার্থে, ভারতের সুমহান ঐতিহ্য, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও ব্যক্তিস্বাধীনতা তথা ভারতের সংবিধানকে অগ্রাধিকার দিয়ে গরিব সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ লড়াই গড়ে তোলার দায়িত্ব বাম ও প্রগতিশীল শক্তিকেই নিতে হবে।