আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ নবম সংখ্যা ● ১-১৫ মে, ২০২৫ ● ১৬-৩১ বৈশাখ, ১৪৩২

প্রবন্ধ

ডায়েরির বদলে - মার্চ-এপ্রিল ২০২৫

অমিয় দেব


।। ১ ।।

এখন, প্রায় প্রত্যহই, ঘুম থেকে উঠি দু'বার। সকালে ও সন্ধ্যেয়। তবে, বলাবাহুল্য, এই দুই ঘুমের চরিত্র এক নয়। একটি রাত্রের, অন্যটি অপরাহ্ণের। দ্বিতীয় ঘুম গোড়ায় ছিল তন্দ্রা, এখন প্রায়শই ঘুম। তবে প্রথম ঘুম আমার অনেকদিনই অবিচ্ছিন্ন। তিন-চারবার উঠতে হয়। তবু স্বপ্ন দেখি মূলত প্রথম ঘুমে। অবশ্য, হঠাৎ হঠাৎ দ্বিতীয় ঘুমেও স্বপ্ন দেখে ফেলি। যেমন আজই, ৩১ মার্চ, দেখলাম কাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে, কলমে কালি ভরতে গিয়ে হাত থেকে দোয়াত উল্টে কেলেঙ্কারি। আর ঘুমও তক্ষুনি ভেঙে গেল।

।। ২ ।।

মনুষ্য নামধারী প্রাণীটি যে রন্ধ্রে রন্ধ্রে শরীরী তা কি আগে এমন করে বুঝেছি? শরীর বলতে 'তোমার মন নাই কুসুম?'-এ যে-শরীরের ইঙ্গিত আছে তার কথা আর ঠিক ভাবছি না, ভাবছি সেই অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কথা যাদের কৃপায় টিকে আছি। বেশ কিছুদিন ধরে যে শুতে যাবার সময় একবার নাড়িটা দেখে নিই, তা কবুল করতে কোনো দ্বিধা নেই। অথচ সকালে ঘুম ভেঙে যে-সুখ একদা হতো তা আর হয় না। রক্তে শর্করার ভাগ বেশি না হলেও, রক্তচাপের আপেক্ষিক অসাম্য মাঝে মাঝে ভাবায়। পাকস্থলী মোটামুটি ঠিকই আছে। তার একটা কারণ অবশ্যই প্রায় মশলা-বর্জিত খাদ্যাভ্যাস। তদুপরি পরিপাক বৃদ্ধির ওষুধ সেবন। তাও কালেভদ্রে বিপাক ঘটে, যেমন, কালেভদ্রেই, কোষ্ঠকাঠিন্যেও ভুগতে হয়। গলাধঃকরণের সমস্যা কিঞ্চিৎ আছে - শুনেছি পা হড়কে বা পিছলে গিয়ে অধঃপতনের মতো এও এক বার্ধক্যকালীন বিপত্তি। যে-কটা বড়ি রোজ নানাসময়ে গিলতে হয়, তার একটা বেশ বড়ো। গলা দিয়ে সহজে নামতে চাইত না। অবশেষে তাকে দু-টুকরো করে গেলার কথা মাথায় এল। তেমনি, রাত্রে শুতে যাবার আগে ঘুমের বড়ি সহ আরও তিনটে ছোটো বড়ি একসঙ্গে মুখে পোরার প্রবণতা ছিল। সেক্ষেত্রেও ধৈর্য অভ্যেস করতে হল। একবার একটা ছোটো পেঁয়াজ আস্ত খেতে গিয়ে মুশকিল হচ্ছিল; শেষে ওয়াক করে তা বের করে আনতে হয়।

আর পতন? তাও আমার একবার ঘটে গেছে। সেদিন ছিল মকর সংক্রান্তি। দুপুরে খেয়ে বেসিনে মুখ ধুচ্ছি। হঠাৎ কী হল কে জানে, ভারসাম্য হারিয়ে ছিটকে গিয়ে মাথায় ঠোক্কর খেলাম ফুটতিনেক পিছনে এক দরজায়। ভাগ্যিস! ঠোক্করটা মেঝেয় খেলে কেলেঙ্কারি হতো। চুল বড়ো ছিল, তাতেও বাঁচলাম। মাথা 'ফেটে' (ছেলেবেলায় তা-ই বলতাম, আসলে কিঞ্চিৎ কেটে) রক্ত বেরোল। প্রত্যুৎপন্নমতিদেবী (আমার সারাক্ষণের কাজের মেয়ে তথা অভিভাবিকা) সঙ্গে সঙ্গে ফ্রিজ থেকে বরফ এনে তা ঘষে ঘষে রক্ত আপাতত বন্ধ করল। আর টেলিফোন করল আমার ডাক্তারকে। আমিও দেবীকে দিয়ে ওই ক্ষতস্থানের ছবি তুলিয়ে ড. ইকবালের হোয়াটস্‌অ্যাপে পাঠালাম। তিনি অভয় দিয়ে, তৎক্ষণাৎ একটা প্যারাসিটামল খেতে বললেন। লিখে পাঠালেনও উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক। ইকোস্প্রিন একাদিক্রমে খেয়ে আসছি বলেই রক্ত একটু একটু চুঁইয়ে আসছিল। পরে ড. ইকবালের সহকারী এসে অ্যান্টিবায়োটিকের সঙ্গে আসা (আমাদের ঔষধদাতা মিলনের বুদ্ধিতে পাঠানো) মলম লাগিয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলেন। ক্ষতস্থানের ছবি কাঠমান্ডুতে মৌকেও (কুর্চি দাশগুপ্ত) পাঠিয়েছিলাম। সেও অভয় দিয়েছিল ও ব্যথা উপশমকারী আর্নিকার কথা বলেছিল। দেবী একসময় বেরিয়ে তা নিয়েও এল। তবে ব্যথা তেমন হয়ওনি। ঘুমও সে-রাত্রে যথারীতি হল। (সে-রাত্রে দৈবাৎ আমার ভ্রাতুষ্পুত্র অমিতাভ ভুবনেশ্বর থেকে শিলচর যাবার পথে আমার পতনান্তিক চেহারা দেখে গেল।) পরদিন ড. ইকবাল এসে ব্যান্ডেজ খুলে দিলেন। এবং ক্ষতস্থানে দেবীকে দিয়ে দিনে তিনবার ওই মলম লাগিয়ে যাবার কথা বললেন। আর, ব্যথা হলে প্যারাসিটামল। সি.টি. স্ক্যানের দরকার হয়নি। শুধু একটা টেটব্যাক নিলাম। দিনের পর দিন দেবী মলম লাগিয়ে গেল। তিনবার। ক্ষত শুকোতে শুরু করল। ব্যাথার আঁচ পেলে কয়েক দানা আর্নিকা খেয়েছি। তারপর মলম দিনে দু'বার। প্রায় শুকিয়ে এল ক্ষত। অবশেষে মলম দিনে একবার। পুরো শুকোল ক্ষত। মলমের কাজ শেষ। ছবি তুলিয়ে ড. ইকবালকে পাঠালাম। তিনি যারপরনাই সন্তোষ জানালেন। ছবি মৌকেও। মৌ খুশি। বইমেলা ফুরোবার আগে অমিতাভও এসে আরোগ্যের সাক্ষী রইল। বাকি রইল কেবল দেবীর কাছে আমার ঋণস্বীকার।

আমার ওই পতন ও আরোগ্য এক ব্যক্তিগত ইতিহাস এখন। কিন্তু একটা বড়ো বদল হয়ে গেছে আমার। স্ফিংক্সকথিত যে - তৃতীয় পদে আমি ভূষিত হয়েছি আগেই, তা এতদিন ছিল একান্ত বহির্গম্য। এবার তা হল গৃহভূষণও। এবার লাঠি আমার সারাক্ষণের। অর্থাৎ, রাজা অয়দিপৌস তাঁর দিব্যচক্ষু মেলে কি অতিদূর ভবিষ্যের আমাকেও দেখতে পেয়েছিলেন?

।। ৩ ।।

ল্যাপটপে আমার ছবি দেখার কথা বন্ধুরা কেউ কেউ জানেন। কী দেখি কী দেখি বলে কাল দেখলাম বের্গমান-এর 'সেভেন্থ সীল'। স্মৃতির যা দশা হয়েছে, গোড়ায় ওই একদা-দেখা ক্লাসিকের নামই মনে পড়ছিল না। মৃত্যু-র সঙ্গে ক্রুসেড-প্রত্যাগত 'নাইট'-এর দাবা খেলার কথাও বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম। তবে কেন জানি না ১৯৫৭-তেই করা 'ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ'-এর নাম ভুলিনি। এক কৃতী আটাত্তর বছর-বয়স্ক বিপত্নীকের গল্প যিনি তাঁর চিকিৎসাশাস্ত্রে গবেষণার জন্য এক দূরবর্তী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্মানিক ডিগ্রি পেতে যাচ্ছেন। কিন্তু মানুষটি তিনি নিরুত্তাপ ও আত্মসর্বস্ব - তাঁর সঙ্গ খুব সুখের নয়। সাক্ষী তাঁর তত্ত্বাবধায়ক মহিলা, যাঁর সঙ্গে খিটিমিটি লেগেই আছে। তাঁকে খুব পছন্দ নয় তাঁর পুত্রবধূরও যিনি তাঁর মোটর-যাত্রার সঙ্গী হলেন। যে-শহরে সম্মান নিতে যাচ্ছেন সেখানে বাস তাঁর পুত্রের, গিয়ে উঠবেনও তাঁর কাছে। তিনিও তাঁর পিতার মতোই ঠাণ্ডা। তাঁর সন্তানসম্ভবা স্ত্রী সন্তানের জন্ম দিন, এ তিনি চান না, কারণ এই জঘন্য পৃথিবীতে আরেকটি মানুষকে নিয়ে আসার কোনো মানে নেই। কিন্তু, পথে নেমে আমাদের নায়ক, স্বনামধন্য ইজাক বোর্গ, তাঁর খোলস থেকে আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসতে শুরু করেন। (তা ঘটিয়ে থাকতে পারে তাঁর সেদিনকার ভোরের স্বপ্ন, যাতে ছিল অচেনা পরিবেশে এক ফাঁপা ও ভঙ্গুর মূর্তি, আর অবশেষে এক ঘোড়ায় টানা গাড়ি থেকে ছিটকে পড়া তাঁর নিজের শববাহী কফিন।) মোটর নিয়ে তিনি প্রথমে এলেন তাঁদের এককালের পারিবারিক গ্রীষ্মাবাসে। গোড়াতেই দেখা গেল বুনো স্ট্রবেরির এক ছড়িয়ে থাকা আস্ত ঝাড়। এক কল্পদৃশ্য সেখানে ফুটে ওঠে। স্ট্রবেরি কুড়োতে এসেছে তরুণী সারা, তাঁর কাজিন ও প্রেমিকা, যেও তাঁকে - মানে তরুণ ইজাককে - ভালোবাসে। তবে সময়ের ওপার থেকে সে বৃদ্ধ ইজাকের ডাক শুনতে পায় না। সে তখন বিস্রস্ত হচ্ছে ইজাকের ভাইয়ের প্রেম নিবেদনে (যাকে সে শেষ পর্যন্ত বিয়েও করে)। সারার কথা ভাবা মানেই ইজাক বোর্গের মৃতপ্রায় বহিরাবরণ ফুঁড়ে তাঁর হৃদয়ের জাগরণ। আর সেই সময়ই এক বর্তমান সারার সঙ্গে তাঁর দেখা যে তার দুই প্রেমিক বন্ধুকে নিয়ে তাঁর মোটরগাড়িতে সওয়ারি হয়। এই সন্নিপাতে কি বাতাস বয়ে যায় না ওই বুনো স্ট্রবেরির ঝাড়ে? সাক্ষী হয়ে তা থাকুক এক মানুষী অঙ্কুরোদ্গমের।

এক প্রাথমিক বৈপরীত্য আছে 'ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ' ও 'সেভেন্থ সীল'-এ। একটায় বিষম থেকে সমে যাত্রা, অন্যটায় দুলে উঠছে মৃত্যু-র অনিবার্য বস্ত্রাঞ্চল। মৃত্যু-র আবরণ কালো, কিন্তু তাঁর মুখে খেলে যায় এক রহস্য যা হঠাৎ হঠাৎ মোনালিসার কথা মনে করিয়ে দেয়। চতুর্দশ শতকের সুইডেন। প্লেগে আক্রান্ত। প্লেগের উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়েছে এক বালিকা, যাকে বলা হচ্ছে ডাইনি, যে নাকি শয়তানের সঙ্গে রমণ করেছে। তাকে খুঁটিতে বেঁধে পোড়ানো হবে। আবার, প্লেগের কারণে স্বেচ্ছা-কশাঘাতীদের এক মিছিলও দেখা গেল যার পুরোধায় বাহিত হচ্ছেন এক ক্রুশবিদ্ধ যিশুমূর্তি। সেই মূর্তির মুখে মর্মস্পর্শী যন্ত্রণা। ঘোর মধ্যযুগ, বিশ্বাসের লীলাক্ষেত্র। এর মধ্যেই একদিকে শিশুপুত্র সহ এক মাদারি-দম্পতি ইয়ফ-মিয়া ও অন্যদিকে ক্রুসেড করে আসা 'নাইট' আন্টোনিয়ুস ব্লক ও তাঁর অনুচর ইয়ন্স। ইয়ফ স্বপ্নালু, এক বিভোর দ্রষ্টাও। ছবির গোড়ার দিকেই এক সকালে সে ঘুম ভেঙে 'দেখে' ভার্জিন মেরি তাঁর শিশুপুত্র যিশুকে নিয়ে হাঁটছেন। কয়েক মুহূর্ত মাত্র, তারপরেই সেই দৈব দৃশ্য অন্তর্হিত হয়ে যায়। আবার ছবির শেষে তার চোখেই প্রথম ধরা পড়ে সেই করাল 'মৃত্যুনৃত্য' যাতে মৃত্যু নাচিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ছবির আর সকল কুশীলবকে।

'নাইট' ও তাঁর অনুচরের বৈপরীত্য লক্ষণীয়। ইয়ন্স আগাগোড়া অবিশ্বাসী। বস্তুততার অবিশ্বাস প্রতিষ্ঠায় সে দুঃসাহসী। আর তার প্রভু 'নাইট' এক দোলাচলে ধ্বস্ত হচ্ছেন। তিনি বিশ্বাস চান না, চান বীক্ষা। মৃত্যুর সঙ্গে তিনি দাবা খেলছেন। মৃত্যুর কাছে না হারবার চাল তাঁর মাথায় আছে। কিন্তু মৃত্যু যদি ঠকিয়ে, তাঁর বীক্ষাতৃষা তিনি 'কনফেস' করতে এলে 'ফাদার কনফেসার' সেজে, তা জেনে নেন? মৃত্যু-র তো কোনো সত্যাসত্য বোধ নেই। ঈশ্বর থাকুন না থাকুন জীবনান্ত ঘটিয়ে চলাই তাঁর কাজ। তবে ইয়ফ-মিয়া ও তাদের শিশুপুত্র মিকায়েল-কে ছোঁবার সাধ্য তাঁর নেই।