আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ নবম সংখ্যা ● ১-১৫ মে, ২০২৫ ● ১৬-৩১ বৈশাখ, ১৪৩২

প্রবন্ধ

দুর্নীতির সরকারিকরণ

অম্বিকেশ মহাপাত্র


।। ১ ।।

হাজার লক্ষ কোটি বছর ধরে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে এককোষী প্রাণী বহুকোষী প্রাণীতে রূপান্তরিত হয়েছে। এই বিবর্তন প্রক্রিয়ায় বানর থেকে বন্য-মানুষ থেকে আজকের সামাজিক তথাকথিত সভ্য মানুষ। যে সময়কাল থেকে মানুষ সমাজবদ্ধভাবে বসবাস শুরু করেছেন, সেই সময়কাল থেকে সকল প্রাকৃতিক সম্পদ সহ খাদ্যের উপর অধিকার কায়েমকাল শুরু হয়েছে। সেকারণে আদিকাল থেকে সমাজের অঙ্গ হয়ে গেছে, একে অপরের উপর অধিকার কায়েম। তারই অনিবার্য পরিণতি গায়ের জোর, বুদ্ধির জোর, ঘুষ, চুরি দুর্নীতি সহ নানান রকম অপরাধ প্রবণতা। অপরাধ প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং (সম্ভব হলে) নির্মূল করার দায়িত্ব বর্তেছে, বিভিন্ন সময়কালে প্রশাসনের উপর। সেই পথ ধরে সমাজে নানা রকমের বিধি-নিষেধ (ধর্মীয় এবং আইনি), আইন-কানুন, আইনের ধারা উপধারা, ফৌজদারি ধারা উপধারা, পুলিশ প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, শাস্তি, জরিমানা, জেল, মৃত্যুদণ্ড চালু হয়েছে এবং রয়েছে।

।। ২ ।।

১৯৭৬ সালে সত্যজিত রায়ের ‘জন-অরণ্য’ চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছিল। চলচ্চিত্রটির ইংলিশ সাব-টাইটেল ‘দ্য মিডলম্যান’। কারণ চলচ্চিত্রের কেন্দ্রিয় চরিত্রে ‘দ্য মিডলম্যান’-ই।১৯৭০-এর দশকের পশ্চিমবঙ্গ তথা কলকাতার সমাজ জীবনের একটি প্রতিচ্ছবি চলচ্চিত্রে দেখানো হয়েছে। চলচ্চিত্রের প্রথম দৃশ্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন একটি কলেজের পরীক্ষা কেন্দ্র। পরীক্ষা কেন্দ্রের ক্লাস রুমের দেওয়াল জুড়ে লেখা বিভিন্ন বৈপ্লবিক স্লোগান। দু'জন মাষ্টারমশাইয়ের পর্যবেক্ষণে পরীক্ষার্থীরা অনায়াসে গণহারে টোকাটুকি করে চলেছেন। দর্শকের বুঝতে কোনো অসুবিধা হবে না যে, সরকারি এবং বেসরকারি সমস্ত কাজে মিডলম্যানের দাপট কিভাবে ক্রিয়াশীল। অর্থাৎ সব দেশে, সব কালে, সব সমাজে চুরি ছিনতাই ঘুষ দালালি দুর্নীতি সহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ চলে এসেছে। সেক্ষেত্রে প্রশাসনের কাজ অপরাধীদের চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থা করা, প্রচলিত বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে।

।। ৩ ।।

১৯৮৫ সাল, রাজ্যে স্কুলে শিক্ষক নিয়োগে ‘স্কুল সার্ভিস কমিশন’ চালু হয়নি। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি সরকারি নিয়মে শিক্ষক বাছাই করে নিয়োগপত্র দিতেন। স্কুল কর্তৃপক্ষ স্থানীয় এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ থেকে ন্যূনতম যোগ্যতা সম্পন্ন প্রয়োজনীয় সংখ্যক চাকুরি প্রত্যাশী না পেলে, খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিতেন। এই প্রেক্ষিতে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএসসি পড়বার সময়, একটি উচ্চ-মাধ্যমিক স্কুলের কেমিস্ট্রি শিক্ষক পদের বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন করি। গোপন ভাবা হলেও আসলে যা সকলেরই জানা ছিল অর্থাৎ open secret, তা হল, সেই সময় শিক্ষক নিয়োগে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি বাছাই তালিকা চূড়ান্ত করার আগে চাকুরি প্রত্যাশীদের মধ্য থেকে টাকা দান বা অনুদান আদায় করতেন। এর ফলে ন্যূনতম যোগ্যতা সম্পন্ন চাকুরি প্রত্যাশীদের মধ্যে কম মেধাসম্পন্ন প্রার্থী অগ্রাধিকার পেয়ে যেতেন, বলাই বাহুল্য। ফলতঃ স্কুলে শিক্ষক নিয়োগে স্বজন-পোষণ, দুর্নীতি, অস্বচ্ছতার অভিযোগ ছিলই। এইসব জানা থাকলেও আবেদন করেছিলাম। কারণ চাকুরির দরকার ছিল। আবেদন না করলে প্রতিযোগিতায় আসার প্রশ্নই থাকে না। অর্থাৎ “যস্মিন দেশে যদাচার”।

কিছুদিন পর পথ-নির্দেশ সহ ইন্টারভিউ চিঠি। ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে শুনলাম, স্কুলের প্রধান শিক্ষকের ঘোরতর আপত্তিতে, দান/অনুদান ছাড়াই শিক্ষক নিয়োগ হয় এবং এক্ষেত্রেও হবে। যদিও আশপাশের সকল স্কুলে অনুদান আদায়ের মধ্য দিয়ে শিক্ষক নিয়োগ হয়ে থাকে। পরে স্কুলের নিয়োগপত্র পেয়ে স্কুলে যোগদান করি। একদিন প্রধান শিক্ষক মহাশয় বলেন, "আপনার জয়েনিং রিপোর্ট সহ সমস্ত কাগজপত্র ডিআই অফিসে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ডিআই অফিসে ঘুষ না দিলে ফাইল নড়ে না। ফলে আপনার এ্যাপ্রুভাল আসতে দেরি হবে। মাইনে পাওয়া শুরু হতে দেরি হবে। এবার আপনি দেখুন, ডিআই অফিস থেকে কীভাবে সত্বর এ্যাপ্রুভাল আনাবেন। আমাদের স্কুলের একজন মাস্টারমশাইয়ের ডিআই অফিসে যোগাযোগ আছে। প্রয়োজন হলে, আপনি ওঁনার সঙ্গে কথা বলতে পারেন"। ছাত্রাবস্থায় সদ্য স্কুলে যোগদান করেছি। ধুতি পাঞ্জাবি পরিহিত প্রবীণ প্রধান শিক্ষক মহাশয়ের এই বক্তব্য শুনে অবাক! কী বলবো? তখনই প্রধান শিক্ষক মহাশয় একটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন। "আচ্ছা বলুন তো আমাদের সমাজে ঘুষ দুর্নীতি ইত্যাদি সামাজিক অপরাধগুলো কেন রয়েছে?" আমি এবারও নিরুত্তর। তখন প্রধান শিক্ষক মহাশয় জানালেন - "আমরা চাই বলেই রয়েছে"। শুনে বিস্মিত হলেও কথাটা মনের গভীরে দাগ কেটে দিয়েছিল।

পরে স্কুলের টিচার্স কমন রুমে মাষ্টারমশায়দের প্রায়শই সরবে বলতে শুনেছি, "আমাদের স্কুলের হেডমাস্টার ধর্মপুত্তুর যুধিষ্ঠির, তিনি ঘুষ নেবেন না!" প্রধান শিক্ষক মশাইয়ের অবর্তমানে এই ধরণের আলোচনাকে প্রায় সকল মাষ্টারমশাইদের সমর্থন করতে নতুবা নীরবে সমর্থন জানাতে দেখেছি। এর থেকেই প্রধান শিক্ষক মহাশয়ের অভিজ্ঞতা লব্ধ বক্তব্য - "আমরা চাই বলে সমাজে ঘুষ দুর্নীতি ইত্যাদি সামাজিক অপরাধগুলো রয়েছে" সঠিক মনে হয়েছিল। তারপর চল্লিশটা বছর নানান ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, সেই অভিজ্ঞতা থেকে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি, “সমাজের আদিকাল থেকে ঘুষ দুর্নীতি ইত্যাদি সামাজিক অপরাধের প্রতি পরোক্ষে সামাজিক সমর্থন আছে”। উল্লেখ্য, পরবর্তী সময়কালে রাজ্য সরকার দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষক নিয়োগে ‘স্কুল সার্ভিস কমিশন’ চালু করেছিলেন।

।। ৪ ।।

প্রজাতান্ত্রিক ভারতবর্ষের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় জাতীয়স্তরে জাতীয় সরকার এবং রাজ্যস্তরে রাজ্য সরকার প্রশাসন পরিচালনা করেন। প্রশাসনের সাংবিধানিক দায়িত্ব সমাজে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, রাহাজানি, খুন, ধর্ষণ, দুর্নীতি সহ নানান অপরাধকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং অপরাধীদের বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে শাস্তির ব্যবস্থা করা। উল্লেখ্য, রাজ্যে ২০১১ সালে সংবিধান মতে সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর, সর্বস্তরের সমাজবিরোধী দুর্নীতিবাজ দুষ্কৃতি অপরাধীরা প্রকাশ্যে জড়ো হয়ে নাগরিকের জীবন-জীবিকা সহ নাগরিক অধিকারের উপর বেপরোয়া আক্রমণ নামিয়ে এনেছে।

২০১২ সালের ১২ই এপ্রিল রাত্রিবেলা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কলকাতার শহরতলিতে নিউ গড়িয়া সমবায় আবাসনে বাড়ি ফেরার পথে শাসকদল আশ্রিত সত্তর থেকে আশি জন দুষ্কৃতী ঘিরে ধরে, যথেচ্ছভাবে মারধর করে, কুৎসিত গালিগালাজ করে, পুলিশকে ডেকে মৌখিক নির্দেশে গ্রেফতার করিয়ে সেই রাত্রে স্থানীয় পূর্ব যাদবপুর থানার নোংরা পূতি-গন্ধময় লক্-আপে রাত্রিবাসের ব্যবস্থা করে। অপরাধ কী? সমকালীন বিষয়ের উপর তৈরি একটি নিরীহ অথচ বুদ্ধিদীপ্ত (শাসকদলের সমালোচনা করা) কোলাজ কার্টুন আমার বন্ধুদেরকে ই-মেলে শেয়ার করেছিলাম।

।। ৫ ।।

রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী, স্কুল সার্ভিস কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও সচিব, মধ্যশিক্ষা পর্ষদের প্রাক্তন চেয়ারম্যান, প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের প্রাক্তন চেয়ারম্যান সহ শিক্ষা দপ্তরের সংশ্লিষ্ট আধিকারিক এবং শাসকদলের অনেক জনপ্রতিনিধি ও নেতা দুর্নীতির অপরাধে জেলবন্দি। কিসের দুর্নীতি? স্কুলে শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মী নিয়োগে রাজ্য সরকারের পরিকল্পনায় টাকার বিনিময়ে অযোগ্যদের বিভিন্ন বে-আইনি পথে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে। নেতা এবং মন্ত্রীদের ঘরে এবং ব্যাংক একাউন্টে কোটি কোটি টাকার হদিস পাওয়া গেছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এসএসসি-২০১৬ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত ২৫,৭৫২ জনের চাকুরি বাতিল। রাজ্যজুড়ে হাহাকার এবং ক্রন্দন। শুধু কি শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি? রেশনের চাল গম আটা বন্টনে, ‘১০০ দিনের কাজ’ প্রকল্পে, ‘ইন্দিরা আবাস যোজনা’য় গৃহহীনদের গৃহনির্মাণ প্রকল্পে সবেতেই লাগামহীন প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি হয়েছে। বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার সাহায্যে দুর্নীতি প্রকাশ্যে আসার পর রাজ্য সরকার বিচারব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে এবং প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে দুর্নীতিকে সামাজিকীকরণ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আগেও হতো, এখনও বিভিন্ন রাজ্যে হয়ে চলেছে, ইত্যাদি। প্রসঙ্গতঃ আর. জি. কর প্রাতিষ্ঠানিক হত্যাকাণ্ডে, রাজ্য প্রশাসন এবং শাসকদল সমস্ত শক্তি ব্যবহার করে, এমনকি দেশের সর্বোচ্চ তদন্তকারীকে কব্জায় নিয়ে, গণবিস্ফোরণের একমাত্র দাবি ‘বিচার চাই’-কে নস্যাৎ করতে সচেষ্ট।

।। ৬ ।।

শুধুই কি রাজ্যের সরকার দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করে চলেছেন? জাতীয় সরকার এবং শাসকদল আরও বড় স্কেলে বড় মাপের দুর্নীতি চুরি ডাকাতি এবং দেশের সম্পদ লুঠে সহযোগিতা করে চলেছেন। তার সঙ্গে নাগরিক অধিকার, স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার, সাংবিধানিক অধিকার পরিকল্পনামাফিক হত্যা করে চলেছেন। নোটবন্দি, ইলেক্টোরাল বন্ড, পিএম কেয়ার্স ফান্ড, দেশের সম্পদ বিক্রি,... ইত্যাদির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ইলেক্টোরাল বন্ডের সকল তথ্য সামনে আসায় প্রমাণও হয়ে গেছে। ইলেক্টোরাল বন্ডের যা দস্তাবেজ সামনে এসেছে, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ লিখলে একটি মহাঘোটালা কাব্যগ্রন্থ হয়ে যাবে। সাম্প্রতিক নিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস সহ একাধিক পরীক্ষা বাতিল/স্থগিত; প্রমাণ করে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছে।

।। ৭ ।।

প্রকৃতি বিজ্ঞানের নিয়মাবলি কোনো আইনসভা বা সংসদে তৈরি হয় না; পরিবর্তনও করা যায় না। অর্থাৎ বিজ্ঞানের নিয়ম-কানুন অপরিবর্তনীয়। সূর্য পূব দিগন্তে উঠবে, সময়মতোই উঠবে। রাজা-উজির, বিজ্ঞানী-প্রযুক্তিবিদ, গুরু-শিষ্য, দেব-দেবী কারুর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না, হবেও না। ঠিক তেমনই প্রকৃতি বিজ্ঞানের নিয়ম বলছে, সমাজের দুর্নীতিবাজ দুষ্কৃতকারী সহ অপরাধীরা যখন প্রশাসন দখল করে বসবে, তখন সেই শক্তি লাগামহীন দুর্নীতি সহ গণতন্ত্র হত্যার মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করবে। আবার অপরদিকে সমাজবিরোধী শক্তিকে ক্ষমতাচ্যুত না করতে পারলে, সমাজে বিশৃঙ্খলা সহ আর্থিক বৈষম্য বহুগুণ বেড়ে যাবে। এর থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার একমাত্র পথ সংঘবদ্ধ প্রতিরোধের মাধ্যমে দুর্নীতিবাজদের ক্ষমতাচ্যুত করা। আজকের পরিস্থিতিতে সমাজে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকতা এবং সামাজিকীকরণের প্রয়াস রুখতে দলমত নির্বিশেষে জনসাধারণের সংঘবদ্ধ প্রয়াসই একমাত্র পথ।