আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ নবম সংখ্যা ● ১-১৫ মে, ২০২৫ ● ১৬-৩১ বৈশাখ, ১৪৩২

প্রবন্ধ

সোশ্যাল মিডিয়া কি গণতন্ত্রের পরিপন্থী!

অশোক সরকার


১৫ বছর আগে এই প্রশ্নটি করলে সবাই হয়ত এক বাক্যে বলে উঠতেন, মোটেই না, সোশ্যাল মিডিয়া তো মিডিয়াকেই অনেক বেশি গণতান্ত্রিক করে তুলেছে। কথাটা অসত্য নয়। আগে মানুষ কাগজ পড়ত, কাগজে চিঠি লিখত, টেলিভিশন দেখত। কিন্তু দুটি ক্ষেত্রেই একটা প্রাতিষ্ঠানিক সেন্সর কাজ করে। কাগজের মালিক, এডিটর ও তাঁর টিম ঠিক করেন কোন বিষয়টিকে কীভাবে পেশ করা হবে এমনকী কোন চিঠিটা ছাপা হবে কোনটা নয়। টেলিভিশনের ক্ষেত্রেও তাই। অচেনা মানুষজন নিজেদের মধ্যে কোনো বিষয়ে কথাবার্তা বলবে, ভাবনার আদান প্রদান করবে তার সুযোগ ছিল না বললেই চলে। সোশ্যাল মিডিয়া সবার কাছে সেই সুযোগ এনে দিল। যে খবর প্রাতিষ্ঠানিক সেন্সরের জালে আটকে যাচ্ছিল তা এখন সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে সর্বজনীন হয়ে উঠল। সেটা তো গণতান্ত্রিকতারই প্রসার।

কিন্তু না। ২০১১-১২-র পর থেকে সমাজ চিন্তকেরা বলতে শুরু করলেন সোশ্যাল মিডিয়ার চরিত্র বদলে গেছে, এবং তা গণতন্ত্রের পরিপন্থী হতে চলেছে বা হয়ে গেছে। একটা মূল প্রশ্ন সামনে এল - সোশ্যাল মিডিয়া কি মেরুকরণ করছে? ২০০০ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত এই প্রশ্নে যেখানে বছরে ১-২টি গবেষণা প্রকাশিত হতো, ২০১২-র পর থেকে সেই সংখ্যা ৫-১০-১৫ পেরিয়ে বছরে ২০টির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। বোঝাই যায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক বিষয় হয়ে উঠেছে। অবশ্য ৮০ ভাগ গবেষণা আমেরিকার সমাজ নিয়ে, তার পরে দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের স্থান। ভারত থেকেও দু একটি গবেষণা ওই সুরে সুর মেলাল।[১] সমাজতাত্ত্বিকেরা ও মনস্তাত্ত্বিকেরা নানাভাবে দেখালেন কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়া মেরুকরণ করছে এবং গণতন্ত্রের পক্ষে অশুভ হয়ে উঠছে।

২০০২-২০০৩ সাল নাগাদ শুরুটা ভালই হয়েছিল। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষ তাদের নানা দিকে ছড়িয়ে থাকা আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব, পুরোনো সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক বাঁধছিল, গল্প-গুজব করছিল, সুখ-দুঃখের আদান-প্রদান হচ্ছিল। এই নেটওয়ার্ক মূলত দূরে থাকা চেনা পরিচিতদের মধ্যেই সীমিত ছিল। সেই অর্থে প্রথম যুগের ফেসবুক, মাইস্পেস, ফ্রেন্ডসটার এক সামাজিক বাঁধন তৈরির কাজ করছিল যা সমাজের পক্ষে শুভ ছিল বলে সবাই মনে করেছিলেন।

ক্রমশ চেনা পরিচিতদের জগতটা সত্যিকারের চেনা পরিচিতদের ছাড়িয়ে অচেনাদের চেনা করে নিতে শুরু করে। অন্যদিকে কিছু সংগঠিত শক্তি সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রচার শুরু করে। ২০১১-র আরব স্প্রিং বা অকুপাই আন্দোলন (Occupy Wall Street, তার একটা) এইভাবে দেখা দেয়। প্রায় হঠাৎই চেনা পরিচিতের জগতটা বিশ্বজনীন হয়ে পড়ে। চেনা পরিচিতির সামাজিক ভিত্তি (আত্মীয়, বন্ধু, সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী) টপকে তার ভিত্তি হয়ে দাঁড়াল সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক পছন্দ বা অপছন্দ। বিরাট কোহলি বা শ্রেয়া ঘোষাল থেকে ট্রাম্প, মোদী বা রাহুল। চেনা-পরিচিতদের ছাড়িয়ে পছন্দ-অপছন্দটাই সামাজিক ও ক্রমশ রাজনৈতিক বাঁধনের আধার হয়ে দাঁড়াল।

২০১০-২০১১ থেকে একটা বড়ো পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। ফেসবুকে ‘লাইক’ বোতাম চালু হয়, একই সময়ে টুইটারে চালু হয় ‘রিটুইট’। সেই সময় থেকেই একটা শব্দ জনপ্রিয় হতে শুরু করে, ‘ভাইরাল’। এই অদলবদল সামান্য মনে হলেও আসলে এর পিছনে সোশ্যাল মিডিয়ার দুনিয়ায় একটা বড়ো পরিবর্তন ঘটছিল। সাধারণ সামাজিক যোগাযোগের সরল জগৎ থেকে সরে গিয়ে মানুষ ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়াকে প্রদর্শনমূলক মানুষের মঞ্চ হিসেবে দেখতে শুরু করে। ক'টা লাইক, ক'টা রিটুইট, ক'টা ভাইরাল এইগুলি বড়ো হয়ে উঠতে শুরু করে। ফেসবুক বা টুইটার তো বাণিজ্যিক মিডিয়া, তাদের তো রোজগার করতে হবে। রোজগারের উপায় বিজ্ঞাপন। যে ছবি, ভিডিও, মন্তব্য মানুষ বেশি দেখছে সেইটিতে বিজ্ঞাপন পাওয়া যায়। লাইক বা রিটুইট থেকে সেই ইঙ্গিত পাওয়া যাবে। যেটা যত বেশি লাইক হয়েছে সেটা অন্যদের পাঠিয়ে যদি বলা যায় এটা এক লক্ষ লোক দেখেছে, আপনিও তা দেখতে চাইবেন। এই ব্যবস্থায় সামাজিকতা গেল ঘুচে। সোশ্যাল মিডিয়া একটা প্রচারের অস্ত্র হয়ে উঠল।

মানুষ তো অনেক কিছুই শেয়ার করে, সামাজিকতা ঘুচে গেলেও তা গণতন্ত্রের পরিপন্থী কেন হবে? গত ১২-১৩ বছরের গবেষণা সত্যিই কিছু নতুন কথা শুনিয়েছে। সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হল, কোনটি বেশি লাইক পাওয়ার সম্ভাবনা রাখে? গবেষণা দেখাচ্ছে যুক্তি সাক্ষ্য ঘেরা বিতর্ক বেশি লাইক পাবার সম্ভাবনা রাখে না, তুলনায় মানুষের আবেগঘন বা অনুভূতিময় মতামতের প্রকাশ অনেক বেশি লাইক বা রিটুইট পাবার সম্ভাবনা রাখে। আর যদি কোনোটা বেশি লাইক বা রিটুইট পায় তাহলে মানুষ তাকে তথ্য হিসেবে নিতে শুরু করে, তা আরও অনেককে শেয়ার করে। অন্য এক লেখায়[২] দেখিয়েছি, মানুষ তাদের স্বজ্ঞা (intuition) থেকে যা সঠিক মনে করে সেটাই বিশ্বাস করে, আর সেই স্বজ্ঞা তৈরি হয় তিন ধরনের উচিত-অনুচিত বোধ থেকে। স্বতন্ত্রতা, সামুদায়িক বা ঐশ্বরিক। ইংরেজিতে বলে ethic of autonomy, ethic of community, ethic of divinity।একটা উদাহরণ দিই। ধরা যাক একটি মেয়ে রাত ১১টার সময় একলা বাড়ি ফেরার পথে ধর্ষিত হয়। আমাদের সামুদায়িক উচিত-অনুচিত বোধ বলে মেয়েদের অত রাতে বাড়ির বাইরে থাকা উচিত নয়, অথচ স্বতন্ত্রতাবোধ বলে রাতের উপর মেয়েদের ততটাই অধিকার যতটা ছেলেদের। এখন যদি কেঊ টুইট করে ‘অত রাতে কেন সে বাড়ির বাইরে ছিল’, সেটা অনেক রিটুইট পাবে আবার যদি কেউ পালটা টুইট করে, ‘রাতে বাড়ির বাইরে কি শুধু ছেলেরাই থাকবে’, সেটিও বেশ কিছু রিটুইট পাবে। কিন্তু যুক্তি সাক্ষ্য সহকারে এই বিষয়ে একটা আলোচনা কেউ পড়বে না। এখানে যেটা ‘ভাইরাল’ হচ্ছে তা যুক্তি বোধ নয়, আবেগ ও অনুভূতি।

এইখান থেকে মেরুকরণের শুরু। একদল যারা মনে করে মেয়েদের রাতে বাড়ির বাইরে থাকা উচিত নয়, আরেক দল যারা তা মানে না। সোশ্যাল মিডিয়া এই দুই পক্ষকে আলাদা করে দিল।সুস্থ কথোপকথন গেল বন্ধ হয়ে।

পাশাপশি আর একটা বড়ো পরিবর্তন ঘটে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার সোশ্যাল মানে সামজিক অংশটি দুর্বল হয়েছে। সামজিক যোগাযোগের পিছনে থাকে পারস্পরিক ভালবাসা, কিছুটা শ্রদ্ধা আর আস্থা। সামাজিকতার সেটাই ভিত্তি। সোশ্যাল মিডিয়া যখন আত্মীয় বন্ধু সহকর্মীদের বলয় পেরিয়ে অচেনাকে চেনা করে নিতে লাগল, যখন লাইক, রিটুইট, ভাইরাল করাটাই মুখ্য হয়ে দাঁড়াল তখন সামাজিকতার ভিতটা নষ্ট হয়ে গেল। সোশ্যাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সমাজে যে বিশ্বাস গড়ে ওঠে, বহু মতামতের মধ্যে সমাজে যে পারস্পরিক আস্থা গড়ে ওঠে সেটাই গেল নষ্ট হয়ে। সোশ্যাল মিডিয়ার সোশ্যাল চরিত্রটি দুর্বল হয়ে প্রদর্শনমূলক চরিত্রটি বড়ো হয়ে দাঁড়াল।

এর পাশাপাশি যেটা ঘটছে তা আরও মারাত্মক। কোনো একটা মন্তব্য বা তথ্য যদি অনেক লাইক পায়, ভাইরাল হয়, মানুষ তাকে সত্য বলে ভাবতে শুরু করে। এতে রাজনৈতিক প্রচারের খুব সুবিধা হয় - এমনকী সামাজিক বা বাণিজ্যিক প্রচারেরও। মানুষ যত সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর হয়েছে, ততই সে সত্য থেকে দূরে সরে গেছে। এক গবেষণায় ২০০৬ থেকে ২০১৭-র মধ্যে টুইটারে ১ লক্ষ ২৬ হাজার খবর যা কিনা ৩০ লক্ষ মানুষের মধ্যে ছড়িয়েছে, তাকে বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে মিথ্যা খবর বা গুজব সত্যের থেকে অনেক বেশিগুণ ছড়ায়, এবং এটা সব ধরনেরর খবরের ক্ষেত্রেই পাওয়া যাচ্ছে।[৩] মানুষ যতই সত্য থেকে দূরে সরে গেছে ততই তার সত্যের খোঁজের প্রতি আগ্রহ কমে গেছে, পছন্দ-অপছন্দ প্রকাশের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। শুধু তাই নয়, অসাধুতা প্রকাশের প্রবণতা বেড়েছে। যদি অসত্যই বেশি লাইক পায়, রিটুইট পায়, ভাইরাল হয়, তাহলে মানুষ অসত্যের দিকে ঝুঁকবে - এটাই স্বাভাবিক। ফলে পারস্পরিক অবিশ্বাস বেড়েছে। আমার পছন্দের কথা হলে আমি বিশ্বাস করি না হলে সেই কথাকে এবং সেই ব্যক্তিকেও অবিশ্বাস করি - মানুষের মধ্যে এই প্রবণতা বেড়েছে। রিটুইট বোতামটি যিনি তৈরি করেছিলেন, সেই ইঞ্জিনিয়ার ক্রিস ওয়েদারহল পরে বুঝতে পেরেছিলেন তিনি কী বিপদ সৃষ্টি করেছেন, বলেছিলেন, “আমরা বোধহয় এক চার বছরের শিশুর হাতে গোলা ভরা এক অস্ত্র তুলে দিয়েছি”।[৪]

পছন্দ-অপছন্দের আবেগ থেকে সোশ্যাল মিডিয়া আর এক ধাপ এগিয়ে গেছে। আবেগের প্রকাশ শালীনতার সব সীমাই পার করেছে বললে হয়ত কম বলা হবে। অসভ্যতা, অভব্যতা যখন অনেক বেশি লাইক রিটুইট পেতে লাগল আর ভাইরাল হতে লাগল, মানুষের মধ্যেকার জান্তব চেহারাটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠল যা মেরুকরণকে নিয়ে গেল চূড়ান্ত পর্যায়ে।

অবিশ্বাস অসাধুতার পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়া আরও একটা আঘাত হেনেছে মানুষের জ্ঞান জগতের উপর। যে কোনো মানুষের মনের মধ্যে তিন ধরনের তথ্য বা জ্ঞান কাজ করে, এক, যা সাম্প্রতিক, দুই যা গত ১০-২০ বছরে প্রাপ্ত আর যা ৫০-১০০ বছর ধরে রয়েছে। মানুষের জ্ঞান বা তথ্যের পরিধি ও গভীরতা এই তিন ধরনের সময়কাল থেকে প্রাপ্ত ও মানুষ সেইমতো আচরণ করে। সোশ্যাল মিডিয়া শুধুই সাম্প্রতিক-কে জায়গা দিয়েছে, পুরোনো আর অতি পুরোনোকে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে। ফলে এতদিন ধরে সমাজে যে জ্ঞান ও তথ্য ভাণ্ডার তৈরি হয়েছিল, সেগুলি হয়ে গেছে অবাঞ্ছিত, 'এখন যা পেলাম সেটাই সত্য, সেটাই আসল’। অসত্য, অসাধুতার সঙ্গে মিশে গেছে বর্তমান৷ যুক্তি, সাক্ষ্য, ইতিহাস, সত্য - এগুলি অপাংক্তেয় হয়ে উঠেছে। তাই যদি কেউ বলে ২০১৪-তেই এসেছে আসল স্বাধীনতা, তাই ঠিক; যদি কেউ বলে বৈদিক যুগে প্লাস্টিক সার্জারি ছিল, সেটা তখনকার দিনের বিজ্ঞানে সাহিত্যে কেউ না বললেও এখন বলা হচ্ছে - তাই সত্যি।

গণতন্ত্র সমৃদ্ধ হয় - যদি মানুষের মধ্যে বহু পথ বহু মত থাকলেও পারস্পরিক বিশ্বাস থাকে, বৃহত্তর মানুষের সুবিধার প্রতি আস্থা থাকে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি আস্থা থাকে, মানুষ যুক্তি, তথ্য সহকারে নিজেদের মধ্যে সব বিষয়ে বাদানুবাদ করতে রাজি থাকে, এবং যা সত্য তা মেনে নিতে রাজি থাকে। সোশ্যাল মিডিয়ার এই নতুন রূপ প্রতিটি দিকেই আঘাত হেনেছে। পারস্পরিক বিশ্বাস কমেছে, কারণ সামাজিকতার ভিত্তিটাই দুর্বল হয়ে গেছে, যুক্তি তথ্যের চেয়ে আবেগ অনুভূতিকেই মতামতের অবলম্বন করে তুলেছে, অসত্যের প্রচারের ফলে সামাজিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি আস্থা কমেছে (অবশ্য এই প্রতিষ্ঠানগুলি নিজেরাও সে ব্যাপারে কিছুটা দায়ী), এবং সব মিলিয়ে সামাজিক মানুষ বহু ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে, যারা আয়নায় শুধু নিজেদেরই দেখছে, বৃহত্তর সত্তাকে দেখতে পাচ্ছে না, সত্তার বৈচিত্র্যকেও দেখতে পাচ্ছে না, সত্যকে তো নয়ই। সত্যকে মানতে হলে সত্যকে খোঁজার পথটিকেও মানতে হয়। সোশ্যাল মিডিয়া যুক্তি তথ্য সাক্ষ্যও সত্যকে হারিয়ে মানুষের আবেগ-অনুভুতিকেই গণপরিসরে প্রধান জায়গা করে দিল। এ এক এমন গণপরিসর যেখানে কথপোকথন নেই, আলোচনা, বিতর্ক নেই আছে খেউড়, গালাগাল, বয়কট করা ইত্যাদি অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।

এই প্রসঙ্গে আজকের সময়কে কেউ কেউ ছাপাখানা আবিষ্কারের সময়ের সঙ্গে তুলনা করছেন। গণতন্ত্রের প্রসারে ছাপাখানার ভূমিকা অনস্বীকার্য কিন্তু এও সত্যি যে ছাপাখানা আবিষ্কারের প্রথম ১০০ বছরে তা ছিল না। প্রথম ১০০ বছরে ছাপাখানা থেকে সমাজে বিষ ছড়িয়েছিল অনেক বেশি। ক্রমশ প্রিন্টিং প্রেস, খবরের কাগজ, প্রকাশক - সবার মধ্যে একটা সংযমের বাঁধন গড়ে ওঠে। কিছু নৈতিক নিয়ম গড়ে ওঠে যেটা আজকের বাণিজ্যিক সোশ্যাল মিডিয়ায় এখনও গড়ে ওঠেনি। এবিষয়ে ইউভাল নোয়া হারারি তাঁর সাম্প্রতিক বই 'Nexus'-এ প্রয়োজনীয় আলোকপাত করেছেন।[৫]

সোশ্যাল মিডিয়ার এই বিষ কমবে কীভাবে? এ বিষয়ে একাধিক প্রস্তাব সামনে এসেছে, যেমন একটিকে বলা হচ্ছে Demetrication, যার মানে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে লাইক, রিটুইট ভাইরাল ইত্যাদি সংখ্যাগুলি আড়াল করে দেওয়া যাতে মানুষের ওই প্রবণতাগুলি কমে। কত লাইক হয়েছে, কত ভাইরাল হয়েছে দেখতে না পেলে মানুষের প্রদর্শনমূলক মানসিকতাও কমবে। তার চেয়েও বেশি জরুরি হল ফেক অ্যাকাউন্ট, দুরভিসন্ধিপূর্ণ অ্যাকাউন্টগুলির সংখ্যা কমানো যার জন্য অ্যাকাউন্ট খোলার সময় ব্যক্তি পরিচিতির ব্যবস্থাটিকে কঠোর করা। কৃত্রিম মেধার সাহায্যে বিষাক্ত পোস্টগুলি চিহ্নিত করে, যিনি পোস্ট করছেন তাকে ফিরিয়ে প্রশ্ন করা। দেখা গেছে তাতে বিষাক্ত পোস্ট করার সংখ্যা কমেছে।[৬] এছাড়াও আরও ব্যবস্থা হতে পারে। মোটকথা ছাপাখানা আবিষ্কারের পর যা ১০০ বছর লেগেছিল ইচ্ছে করলে তা ২-৫ বছরেই করা সম্ভব। সেই দিকে আরও আলোচনা হোক।

তথ্যসূত্রঃ

[১] https://www.tandfonline.com/doi/epdf/10.1080/23808985.2021.1976070?needAccess=true ১৯২ পাতা।

[২] ‘মানুষ ফেক নিউজ বিশ্বাস করে কেন’; 'আরেক রকম', ১-১৫ই মার্চ, ২০২৩ দেখুন।

https://www.arekrakam.com/issues/11th-Year-5th-Issue-1-15-March-2023/details/?details=725

[৩] https://www.science.org/doi/10.1126/science.aap9559

[৪] https://www.buzzfeednews.com/article/alexkantrowitz/how-the-retweet-ruined-the-internet

[৫] Yuval Noah Harari, Nexus, a brief history of information networks from the stone age to AI, page 92-101.

[৬] https://www.theatlantic.com/magazine/archive/2019/12/social-media-democracy/600763/