আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ নবম সংখ্যা ● ১-১৫ মে, ২০২৫ ● ১৬-৩১ বৈশাখ, ১৪৩২
সম্পাদকীয়
নিয়োগ কেলেঙ্কারি
শিব ঠাকুরের আপন দেশে, আইন কানুন সব্বনেশে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকার যেন এই আপ্তবাক্যের মূর্ত প্রতীক। সুপ্রিম কোর্টে একাধিক দফায় বিপর্যস্ত হওয়ার পরেও যে রাজ্যের সরকার তাদের ভুল থেকে কোনো শিক্ষাই নিতে চায়না, আজ তা পরিষ্কার। এই অপারগতা নেহাতই অপদার্থতা প্রসূত না ইচ্ছাকৃত তা নিয়ে অবশ্য সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। রাজ্যে ২০১৬ সালে এসএসসি দ্বারা নিযুক্ত প্রায় ২৬,০০০ শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিল হয়েছে বেনজির দুর্নীতির দায়ে। সর্বোচ্চ আদালত তাদের রায়ে স্পষ্ট জানিয়েছে যে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া এতটাই দুর্নীতিগ্রস্ত যে কে সৎপথে চাকরি পেয়েছেন আর কে দুর্নীতি করে পেয়েছেন তা আলাদা করা যাচ্ছেনা। তারা একাধিকবার নিয়োগকারী সংস্থা তথা এসএসসি-এর কাছে জানতে চেয়েছেন যে তারা এই তালিকা দিতে পারবে কিনা। প্রতিবারই এসএসসি তাদের হলফনামায় জানিয়েছে যে তাদের পক্ষে এই তালিকা দেওয়া সম্ভব নয়, কারণ সমস্ত ধরণের প্রমাণ তারা বেনজিরভাবে ধ্বংস করে ফেলেছেন। হ্যাঁ, তারা ধ্বংস করে ফেলেছেন। তারা পরীক্ষার্থীদের ওএমআর পুড়িয়ে ফেলেছেন। তার কোনো বিকল্প তথ্য তারা রাখেননি। ফলে তারা নিজেরা আর বলতে পারবেন না কারা যোগ্য এবং কারা নয়। এমতাবস্থায় আইন মোতাবেক আদালত পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করে দেয়। সাথে সিবিআই-এর দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী শিক্ষাকর্মীর সবার এবং চিহ্নিত শিক্ষকদের নিয়োগ বেআইনি বলে বাতিল করার রায় দেন। রায়ের ফলে চিহ্নিত ৮,৮১৬ জন শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের আর কাজে ফেরার কোনো সুযোগ নেই। এদের বেতনের সমস্ত টাকা সুদ সমেত ফেরত দিতে হবে। বাকি অচিহ্নিত শিক্ষকদের মে মাসের ভিতর পুনরায় পরীক্ষা নিয়ে চাকরিতে বহাল করার বা তাদের পুরোনো চাকরিতে ফেরত যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। এর প্রেক্ষিতে রাজ্য সরকার সর্বোচ্চ আদালত এই রায়ের স্পষ্টীকরণের আবেদন জানায়। যার ভিত্তিতে আদালত রায় দেয় যে অচিহ্নিত শিক্ষকদের সুযোগ দিয়ে ৩১শে ডিসেম্বরের মধ্যে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া এসএসসি-কে সম্পূর্ণ করতে হবে। এর পরে আর কোনো সুযোগ পাওয়া যাবেনা।
এর প্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী চাকরিহারাদের নিয়ে প্রথমে একটি সভা করেন গত ৭ই এপ্রিল। এই সভায় তিনি প্রথমেই চিহ্নিত ও অচিহ্নিত প্রেক্ষিতকে গুলিয়ে দিয়ে এদের যোগ্য এবং অযোগ্য হিসাবে সম্বোধন করতে শুরু করেন। সেই সভায় তিনি বলেন যে যোগ্য প্রার্থীদের পাশে সরকার থাকবে। এর পাশাপাশি অযোগ্যদের পাশেও সরকার থাকার চেষ্টা করবে এরকম এক অভয়বাণী দেন। পরবর্তী সময়ে তথাকথিত চাকরিচ্যুত যোগ্য শিক্ষকেরা এসএসসি দপ্তরের বাইরে অবস্থান শুরু করলে প্রথমে শিক্ষামন্ত্রী ও এসএসসি ঘোষণা করে যে তারা যোগ্য ও অযোগ্যদের তালিকা প্রকাশ করবে। কিন্তু তারপরেই এই তালিকা নিয়ে শুরু হয় চাপানউতোর। স্বাভাবিক, যে সংস্থা বা সরকার একাধিকবার কোর্টের আদেশেও তালিকা প্রকাশ করায় অপারগ ছিল, রাতারাতি কোন মন্ত্রবলে তারা সেই তালিকা দেবেন তা নিয়ে সন্দেহ ছিল। পরে এটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে আদপেই তারা কোনোদিনই এরকম তালিকা প্রকাশ করবে না। ইতিমধ্যে গত ২৭শে এপ্রিল চিহ্নিত তালিকায় থাকা প্রার্থীদের সাথে একটি সভা করেন রাজ্যের মুখ্যসচিব। সেই সভাতেই মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন যে আপাতত রাজ্যের শ্রমদপ্তর এই সমস্ত প্রার্থীদের, যারা শিক্ষাকর্মী, তাদের মাসিক ভাতা দেবে। গ্রুপ সি কর্মীদের জন্য ২৫,০০০ এবং গ্রুপ ডি কর্মীদের জন্য ২০,০০০ টাকা মাসিক ভাতা তিনি ঘোষণা করে দেন। সাথে এটাও উল্লেখ করা হয় যে এই ভাতা শিক্ষাদপ্তর নয়, রাজ্যের শ্রমদপ্তর দেবে। এটি দেওয়া হবে শ্রমিকদের উন্নয়নকল্পের অর্থ থেকে।
এই ঘোষণা আদতেই এক সমস্যার ঝাঁপি খুলে দিয়েছে। প্রথমত, শিক্ষাদপ্তরের অধীনে নিযুক্ত কর্মীদের মাসিক আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে শ্রমদপ্তরের প্রকল্প থেকে। এটি কীভাবে আইনত গ্রহণযোগ্য, তা অস্পষ্ট। রাজ্যের শ্রমদপ্তরের প্রকল্প মূলত অসংগঠিত ক্ষেত্রের প্রকৃত শ্রমজীবীদের জন্য - যেমন নির্মাণ শ্রমিক, পরিবহণ শ্রমিক বা কৃষি শ্রমিক। সেখানে একটি শিক্ষা-সংক্রান্ত দুর্নীতির পরিণতিতে বরখাস্তকৃত কর্মীদের, যাঁদের নিয়োগই অবৈধ বলে চিহ্নিত, এমন একটি তহবিল থেকে অর্থ প্রদান এক গভীর আইনি এবং নীতিগত প্রশ্ন তোলে। এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতে আদালতের অবমাননার শামিল হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, আদালতের রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে চিহ্নিত প্রার্থীদের চাকরি অবৈধ এবং সেই অর্থ সুদ-সহ ফেরত দিতে হবে। তাহলে রাজ্য সরকার কীভাবে করদাতার অর্থ ব্যবহার করে এই প্রার্থীদের 'ক্ষতিপূরণ' বা মাসিক ভাতা দিতে পারে? আদালতের এই নির্দেশের মূল যুক্তিই ছিল যে বেআইনিভাবে প্রাপ্ত বেতন ফেরত দিতে হবে, অথচ সেই সিদ্ধান্তকে কার্যত খারিজ করে এই ভাতা প্রদান আইনশৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচারের মূল নির্যাস ও লক্ষ্যকেই বিলোপ করছে।
তৃতীয়ত, সরকারি অনুগ্রহ কেন কেবল এই মুষ্টিমেয় অংশের জন্য, যারা ইতিমধ্যেই বেআইনিভাবে নিযুক্ত হওয়ার জন্য চিহ্নিত? এই প্রশ্নের নৈতিক গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। কারণ, এই দুর্নীতির ফলে বঞ্চিত হয়েছেন প্রায় ২২ লক্ষ পরীক্ষার্থী, যাঁরা কোনো রাজনৈতিক সুবিধা বা প্রভাব ছাড়াই স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের প্রতি প্রশাসনের কোনো সহানুভূতি নেই - না আর্থিক ক্ষতিপূরণ, না বিকল্প চাকরির প্রতিশ্রুতি, না পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ। বরং, দুর্নীতির মাধ্যমে সুবিধা পাওয়া একটি বিশেষ গোষ্ঠীই এখন সরকারের 'সহানুভূতির' ছায়ায়।
এখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে - রাজ্যের অন্যান্য দপ্তরে যারা প্রকৃত অর্থেই চুক্তিভিত্তিক বা পার্শ্ব-চাকরিতে নিযুক্ত হয়ে বছরের পর বছর কাজ করছেন, যেমন ICDS কর্মী, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী, স্বাস্থ্য সহায়ক, ASHA কর্মী, গ্রামীণ লাইব্রেরি কর্মী, বা প্রকল্পভিত্তিক অস্থায়ী কর্মী - তাঁদের জন্য কি এমন মাসিক ভাতার কোনো ঘোষণা আছে? তাদের অনেকেই মাসে মাত্র ৫,০০০-৮,০০০ টাকায় কাজ করেন, স্থায়ীকরণের কোনো আশ্বাস ছাড়াই। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, রাজ্যের প্রাথমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নিযুক্ত পার্শ্ব শিক্ষকরা, যাঁরা বাস্তবিক পাঠদানে যুক্ত, বছরের পর বছর ধরে মাসে মাত্র ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকা ভাতা পান। তারা শিক্ষা দপ্তরের অনুমোদিত হলেও, পূর্ণ শিক্ষক পদে উন্নীত হন না, পেনশন পান না, অনেক সময় উৎসব ভাতা পর্যন্ত পান না। অথচ, এদের কেউ বেআইনিভাবে নিয়োগ পাননি। তাদের প্রশ্নও অত্যন্ত ন্যায্য - যেখানে তারা প্রকৃত কাজ করছেন, কোনও দুর্নীতির অভিযোগ ছাড়াই, সেখানে শুধুমাত্র বেআইনি নিয়োগপ্রাপ্ত চিহ্নিতদের জন্য এত অনুগ্রহ কেন? এটি স্পষ্টতই রাজনৈতিক ও আইনি চাপ সামাল দিতে নেওয়া প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, যা কার্যত নৈতিকতার মানদণ্ডে ব্যর্থ।
এই মুহূর্তে প্রশ্ন শুধুমাত্র চাকরি বাঁচানো বা ভাতা পাওয়া নয় - প্রশ্ন এই রাজ্যে ন্যায়ের সংজ্ঞা কী? মুখ্যমন্ত্রীর মানবিকতার মাপকাঠি কি? প্রশ্ন প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রতি তাদের দায়বদ্ধতার। দীর্ঘদিন ধরে একদিকে দুর্নীতিগ্রস্ত নিয়োগের ফলে প্রভাবিত হয়েছেন লক্ষ লক্ষ বেকার তরুণ, অন্যদিকে বছরের পর বছর ধরে কম বেতনে, চুক্তিভিত্তিক অবস্থায় কাজ করছেন হাজার হাজার সরকারি প্রকল্প-কর্মী ও পার্শ্ব শিক্ষক। তাদের কারোর জন্য নেই কোনও সহানুভূতি, নেই বিকল্প পরিকল্পনা। অথচ, বেআইনিভাবে চাকরি পাওয়া এবং কোর্টের রায়ে চাকরি হারানো একটি বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য তৈরি হচ্ছে আর্থিক অনুগ্রহের কাঠামো - তাও শ্রমদপ্তরের প্রকল্পের টাকা ব্যবহার করে।
এই প্রবণতা শুধু প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব নয়, গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক এক সাংকেতিক বার্তা। আদালতের রায়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা এড়িয়ে গিয়ে, রাজনৈতিক চাপে বা নির্বাচনী কৌশলে যদি প্রশাসন আইনকে পাশ কাটিয়ে চলে, তবে তা রাজনীতির চেয়েও আইনবিরুদ্ধ সংস্কৃতির উত্থান ডেকে আনে। একে প্রশ্রয় দিলে আগামীদিনে এই বার্তাই সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে - যোগ্যতা নয়, দুর্নীতির ফলেও সুযোগ মিলতে পারে, এবং ক্ষেত্র বিশেষে প্রশাসনের হাত ধরেই। পরিশেষে বলতেই হয়, আজ যদি এই প্রশ্নগুলির উত্তর না চাওয়া হয়, যদি সমাজ নীরব থাকে, তবে আগামীদিনে পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ আরও অন্ধকারে যাবে। এমতাবস্থায় রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল, যাদের দায়িত্ব ছিল এই প্রশ্ন তোলা, তারা সমাজকে ধর্মের রাজনীতিতে ভাঙতে উদ্যত। অন্যদিকে বাম শিবির আজও দোদুল্যমান এই আন্দোলনে সামনের সারি দখল করতে। প্রশাসন এবং রাজনীতির এই মেলবন্ধন, যা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়, তার বিরুদ্ধে বিচারবোধসম্পন্ন নাগরিক সমাজকেই তাই আওয়াজ তুলতে হবে। সমাজকেই দায় নিতে হবে তার রাজনৈতিক শুদ্ধির।