আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ নবম সংখ্যা ● ১-১৫ মে, ২০২৫ ● ১৬-৩১ বৈশাখ, ১৪৩২

সম্পাদকীয়

উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে মানুষের ঐক্য


পহেলগাম। শব্দটি দিন কয়েক আগে অবধি নৈস্বর্গিক প্রকৃতির অনুরণন তৈরি করত মানুষের মনে। এখন শব্দটি কালিমালিপ্ত হয়েছে এক ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ডের জন্য। পহেলগামে পাকিস্তান মদতপুষ্ট জঙ্গিদের নৃশংস আক্রমণে ২৬ জনের মৃত্যু ভারতীয়দের মনে গভীর আঘাত হেনেছে। পরিবারের সঙ্গে কাশ্মীরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে বিনা দোষে এত মানুষের হত্যা স্বাভাবিকভাবেই জন্ম দিয়েছে উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভের। খবরে প্রকাশ যে উগ্রপন্থীরা মানুষের ধর্মীয় পরিচয় জিজ্ঞেস করেছে, হিন্দুদের গুলি করে হত্যা করেছে প্রকাশ্য দিবালোকে। এই ধরনের উন্মত্ত হিংসা, যা মানুষের ধর্ম পরিচয়ের উপর ভিত্তি করে, মানুষকে টার্গেট করে হত্যা করে তার নিন্দা করার মতো শব্দ অভিধানে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এই ভয়ঙ্কর হিংসা যারা ঘটালো তাদের কঠোরতম শাস্তি চাই। দেশ তথা কাশ্মীরের সরকারের কর্তব্য এই বর্বর উগ্রপন্থীদের খুঁজে বের করে তাদের উপযুক্ত শাস্তি দেওয়ার। এই প্রশ্নে ভারতের আপামর জনসাধারণ ঐক্যমত্য।

এই বর্বর উগ্রপন্থীরা এহেন আক্রমণ কীভাবে সংঘটিত করতে পারল, সেই প্রশ্ন তোলা স্বাধীন ভারতের গণতান্ত্রিক শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কর্তব্য। বৈসরন উপত্যকায় গাড়ি যায় না। ঘোড়ার পিঠে চেপে অথবা পায়ে হেঁটে সেখানে পৌঁছতে হয়। সেখানে কয়েক হাজার পর্যটক দিনের বেলায় যান, আনন্দ করেন এবং ফিরে আসেন। এহেন একটি পর্যটনস্থলে কেন কোনো পুলিশ তথা সেনা ছিল না? যারা কাশ্মীরে গেছেন, তারা জানেন যে সেখানে প্রতি পদে সেনার দেখা পাওয়া যায়। অথচ, এরকম একটি বিখ্যাত ও জনপ্রিয় জায়গায় কেন সেনা বা পুলিশ ছিল না? ভারতের মানুষকে যদি পাকিস্তান মদতপুষ্ট জঙ্গীরা বিনা বাধায় নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করতে পারে, তাহলে দেশের সুরক্ষা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ এই হত্যাকান্ডের জন্য গভীরভাবে শোক প্রকাশ করেছেন এবং বলেছেন যে তিনি পর্যটকদের সুস্থভাবে তাদের বাড়িতে ফেরাতে পারেননি, এর ব্যর্থতার দায় তাঁরও। আবার দেশের কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে যে সুরক্ষা তথা ইন্টেলিজেন্সের গাফিলতি ছিল। কিন্তু কেন ছিল? কাদের বা কীসের ব্যর্থতায় এই নারকীয় হত্যাকান্ড ঘটল, তা চিহ্নিত করা দরকার। সুরক্ষাব্যবস্থা তথা গুপ্তচর ব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি প্রয়োজন। শুধু যুদ্ধজিগির তুলে সেই প্রয়োজনীয়তাকে আড়াল করা যাবে না।

পহেলগামের হত্যাকাণ্ডের পর থেকে দেশজুড়ে তুমুল ক্ষোভকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিবিদরা মুসলমান তথা কাশ্মীরি বিদ্বেষে পর্যবসিত করতে চাইছেন। মিডিয়ার একটা বড়ো অংশ সরাসরি সাম্প্রদায়িক প্রচার চালাচ্ছে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা বর্ষিত হচ্ছে, বিভিন্ন জায়গায় কাশ্মীরি ছাত্রদের উপর আক্রমণ নামিয়ে আনা হচ্ছে। এই সমস্ত দুরভিসন্ধিমূলক কাজের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্বও সরকারের। কাশ্মীরে যারা বৈসরন উপত্যকায় গিয়েছিলেন, তাদের সেখানে যারা নিয়ে গিয়েছিল, তাদের মধ্যে ছিলেন সৈয়দ আদিল হুসেন নামক এক সহিস। যিনি উগ্রপন্থীদের নিরস্ত্র অবস্থায় চ্যালেঞ্জ করেন, সরাসরি জিজ্ঞেস করেন কেন নির্দোষ মানুষদের তারা হত্যা করছে, কেড়ে নিতে চান তাদের রাইফেল। সেই বর্বর উগ্রপন্থীদের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া আদিল হুসেন, যিনি তাঁর পরিবারের একমাত্র রোজগেরে মানুষ, ধর্মমতে মুসলমান। কিন্তু তিনি মুসমলান পরিচয়ের থেকেও বেশি করে সেদিন তাঁর মানুষ পরিচয়কে বেছে নিয়েছিলেন। সহ-নাগরিকদের বাঁচাতে গিয়ে আত্মত্যাগী এই গরীব যুবক প্রমাণ করে দিয়েছেন যে মনুষ্যত্বের থেকে বড় কোনো ধর্ম নেই। আরেক গাইড নাজাকাত নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বাঁচিয়েছেন ১১ জন সদস্যের একটি পরিবারকে, যাদের মধ্যে একজন ছত্তিশগড়ের বিজেপি-র কর্মকর্তা। তিনি অশ্রুমিশ্রিত কন্ঠে নাজাকতকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। আবারও ধর্ম নয়, মানুষ জয়ী হয়েছে নাজাকাতের নির্ভীকতায়। আরও বহু মানুষকে প্রাণে বাঁচিয়েছেন সেখানকার সাধারণ মানুষ, সহিস, গাইড। গোটা কাশ্মীরে হরতাল পালিত হয়েছে এই বর্বরোচিত আক্রমণের বিরুদ্ধে। হোটেল, রেস্তোরাঁ খুলে দেওয়া হয়েছে পর্যটকদের জন্য, বিনামূল্যে। সেখানকার হাসপাতালের কর্মী, ডাক্তার, নার্স সবাই দিনরাত পরিশ্রম করে প্রাণ বাঁচিয়েছেন, চিকিৎসা করেছেন আহত পর্যটকদের। তাদের ধর্ম কী জিজ্ঞেস করা মহাপাতকের কাজ। তাঁরা মানুষ, মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু বর্তমান ভারতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা উদ্রেককারী রাজনীতিবিদ এবং মিডিয়ার উদ্দেশ্যে তারস্বরে বলতেই হবে যে এরা সবাই মুসলমান ধর্মাবলম্বী। কিন্তু তাঁরা মানুষের ধর্ম জানতে চাননি। তাঁরা ভারতের যুগ সঞ্চিত মনুষ্যত্বের আদর্শে বিশ্বাস রেখে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কাশ্মীর তথা ভারতের মাথা উঁচু করেছেন। মানুষ হিসেবে তাঁদের ধর্ম পালন করেছেন।

এই পরিস্থিতিতে আমাদের বুঝতে হবে উগ্রপন্থীদের আসল উদ্দেশ্য কী ছিল। তারা আসলে ধর্মের ভিত্তিতে মানুষে মানুষে লড়াই বাঁধাতে চায়। তাই তারা ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে হত্যা করেছে পহেলগামে। তারা মানবতার শত্রু, ভারতের শত্রু, কাশ্মীরের শত্রু, সংবিধানের শত্রু, ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের শত্রু। তারা চায় যে এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ভারতের মানুষ ধর্মের ভিত্তিতে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়তে থাকুক, দুর্বল হোক ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা। তা যদি হয়, তাহলে ভারতের অর্থনৈতিক উন্নতি, শান্তি, উন্নয়ন সমস্ত কিছু দুর্বল হয়ে যাবে। তাই এই উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে প্রকৃত লড়াই লড়তে হলে, তাদের অশুভ উদ্দেশ্য বিফল করতে হলে, ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা এবং মানুষের ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। যতবার আমরা পহেলগাম হত্যাকাণ্ডের পরে সহনাগরিকের উপর ধর্মের নামে আক্রমণ নামিয়ে আনব, ততবার আমরা উগ্রপন্থীদের আসল উদ্দেশ্যকে শক্তিশালী করব। তাই উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে প্রধান এবং প্রথম ধাপ হতে হবে মানুষের ঐক্য।

এই ঐক্যের পথে প্রধান অন্তরায় সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। যারা ধর্মের নামে মানুষকে পিটিয়ে খুন করে, যারা আখলাখ-জুনেইদ-এর মতন মুসলমান সমাজের মানুষকে গরু খাওয়ার অপবাদে পিটিয়ে খুন করে, যারা মানুষের থেকে গরুর জীবন বেশি মূল্যবান মনে করে, যারা মসজিদ ভাঙে, দাঙ্গা করে, দিনরাত উগ্র সাম্প্রদায়িক কথা বলে, তারা সবাই এই ঐক্যের পথে অন্তরায়। সমস্ত ধর্মীয় মৌলবাদ ও মৌলবাদীরা ভারতীয় জনগণের শত্রু। এই কথা গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল মানুষকে তারস্বরে বলতে হবে।

অন্যদিকে, এই উগ্রপন্থীদের খুঁজে বের করতে হবে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাকিস্তানের ভারত বিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করতে হবে। তাদেরকে বাধ্য করতে হবে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে কার্যকারী ব্যবস্থা নিতে। কিন্তু তা করার জন্য দেশজুড়ে যুদ্ধজিগির তোলা কাম্য নয়। সরকারের উচিত ঠাণ্ডা মাথায় সবদিক বিবেচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ণয় করা। অতীতে তারা মানুষকে বহু আশ্বাসবাণী শুনিয়েছেন। উরি-র সার্জিকাল স্ট্রাইক হয়েছে, বালাকোটে ভারতীয় যুদ্ধবিমান আক্রমণ করে সন্ত্রাসবাদীদের আঁতুড়ঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে, ৩৭০ ধারা বিলোপের ফলে কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদ ধ্বংস হবে বলেও দাবি করা হয়েছে। কিন্তু এত সমস্ত কিছু করার পরেও পহেলগাম হামলা হয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে যে অতীতের সরকারী দাবিগুলির খুব বেশি ভিত্তি নেই। এই মুহূর্তে সরকারের উচিত দেশের বিরোধী দলগুলির সঙ্গে আলাপ আলোচনা করা। তাদের দাবি মেনে পহেলগাম নিয়ে সংসদের বিশেষ আলোচনা করা। তার সঙ্গে বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে সন্ত্রাসবাদ এবং পাকিস্তান প্রশ্নে ঐক্যমত্য তৈরি করে অগ্রসর হওয়া। দেশের মানুষ তথা সমস্ত রাজনৈতিক দল সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। সেই ঐক্যমত্যকে আরও সুদৃঢ় করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।