আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্বিংশ সংখ্যা ● ১৬-৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫ ● ১-১৫ পৌষ, ১৪৩২

প্রবন্ধ

আব কি বার, ৯০ পার!

গৌতম সরকার


ভারতবর্ষ এক বিচিত্র দেশ, ততোধিক বিচিত্রতর এর অর্থনীতি। একদিকে মোট উৎপাদন বা আয়ের অঙ্কে বিশ্ব অর্থনীতিতে চতুর্থ থেকে কয়েকদিনের মধ্যেই তৃতীয় বৃহত্তম হতে চলেছে, আন্তর্জাতিক মানচিত্রে দিনে দিনে কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক গুরুত্ব বেড়েই চলেছে, শক্তি সূচকে ইতিমধ্যেই আমেরিকা ও চিনের পর তৃতীয় বৃহত্তম শক্তিশালী দেশের তকমা পেয়েছে; আবার অন্য দিকে মানব উন্নয়ন সূচক থেকে শুরু করে, বিশ্ব সুখ সূচক, বিশ্ব ক্ষুধা সূচক, লিঙ্গ বৈষম্য সূচকে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে, সেইসব কাঁটার মুকুটে নবতম সংযোজন হল ডলারের সাপেক্ষে টাকার মূল্য কমতে কমতে ৯০-এর গণ্ডি ছাড়িয়ে যাওয়া। এটি এক রেকর্ড অবনমন, এর আগে রুপি কখনও এতটা দুর্বল হয়নি। চলতি বছরে নভেম্বর মাস পর্যন্ত টাকার ৪.৮ শতাংশ অবমূল্যায়ন ঘটায় আন্তর্জাতিক সংস্থা 'ব্লুমবার্গ' ভারতীয় মুদ্রাকে 'এশিয়ার দুর্বলতম মুদ্রা' বলে আখ্যায়িত করেছে।

কেন এই পতন?

অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা টাকার দামের এই লাগাতার পতনের পিছনে কিছু কার্যকারণ খুঁজে পেয়েছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলঃ

এক, ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তাঃ

এই চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা এবং বারবার চুক্তির দিন পিছিয়ে যাওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভবিষ্যত এক প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়েছে। দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগকারীরা ভারতে বিনিয়োগে ভরসা হারাচ্ছে। এর উপর ভারতীয় পণ্যে আমেরিকার চাপানো ৫০ শতাংশ আমদানি শুল্ক ভারতীয় রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। মার্কিন বাজারে ভারতের রফতানি ২৮ শতাংশ কমে ৬.৩ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। গত অক্টোবর মাসে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল রেকর্ড ৪১.৭ বিলিয়ন ডলার। এই চুক্তি শুল্ক সংক্রান্ত সমস্যা কিছুটা মেটাতে পারলে ভারতীয় রফতানির পক্ষে অনুকূল হতে পারতো।

দুই, বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রত্যাহারঃ

বিদেশী বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় স্টক এবং ঋণ বাজার থেকে ক্রমাগতভাবে অর্থ তুলে নিচ্ছেন। চলতি বছরেই ভারতীয় বাজারে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের নিট শেয়ার বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার। ডিসেম্বরের প্রথম দুই ট্রেডিং সেশনে ফরেন পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট তুলে নেওয়া হয়েছে ৪,৩৩৫ কোটি টাকা, চলতি বছরে বিদেশী মূলধনের মোট বহির্গমন ঘটেছে ১.৪৮ লক্ষ কোটি টাকা। শুধু পোর্টফোলিও বিনিয়োগই নয়, বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের বাজারের শ্লথ গতি ভারতীয় মুদ্রায় উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এর সাথে প্রাইভেট ইক্যুয়িটি এবং ভেঞ্চার ফার্মগুলিও তাঁদের বিনিয়োগ নগদে তুলে নেওয়ায় ডলারের নিট বহিঃপ্রবাহ অনেকটাই বেড়ে গেছে। এই সবকিছুর সম্মিলিত ফল হল ভারতীয় মুদ্রার রেকর্ড অধঃপতন।

তিন, সোনা আমদানি বৃদ্ধিঃ

চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রাখতে বিদেশ থেকে সোনার আমদানি দিন দিন বাড়ছে। অক্টোবর মাসে সোনার আমদানি বৃদ্ধি পেয়ে ১৪.৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর ফলে ডলারের চাহিদা প্রভূত পরিমাণে বেড়ে গেছে, এবং ডলারের মূল্য ক্রমাগতভাবে বেড়ে চলেছে।

চার, নিরাপদ মুদ্রার খোঁজেঃ

ভূ-রাজনৈতিক চরম অনিশ্চয়তাময় এই সময়ে বিনিয়োগকারীরা মার্কিন ডলারকে একটা 'নিরাপদ আশ্রয়' বা 'সেফ হাভেন' মুদ্রা হিসেবে বিবেচনা করছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক 'ফেডারেল রিজার্ভ' কতৃর্ক সুদের হারের বৃদ্ধি। মার্কিন বন্ডের উপর সুদের হার বাড়ার ফলে বিনিয়োগকারীরা ভারত থেকে অর্থ তুলে নিয়ে ডলারে বিনিয়োগে উৎসাহী হয়ে উঠেছে, এর ফলে ডলার দিন দিন শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

পাঁচঃ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ডলার ক্রয়ঃ

রুপির রেকর্ড অবনমনের আশঙ্কা করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলি ডলার কেনার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে এটিও রাতারাতি ডলারের মূল্য ৯০ পার করে দেওয়ার জন্য দায়ী।

এককথায় ডলারের সাপেক্ষে টাকার মূল্য কমে যাওয়ার মূল কারণগুলি হল ডলারের বহির্গমন, আমদানি-রফতানির ভাসম্যহীনতা, এবং ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে মানুষের মনে তৈরি হওয়া সংশয়।

টাকার দামের এই প্রভাব শুধুমাত্র দালাল স্ট্রিট বা বিদেশী মুদ্রা বিনিময়কেই প্রভাবিত করেছে তা নয়, আমজনতার দৈনন্দিন জীবনযাপনেও এর প্রভাব পড়েছে। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে এই প্রভাবের দুটো দিক আছে, একটা প্রত্যক্ষ অন্যটা পরোক্ষ।

প্রত্যক্ষ প্রভাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলঃ

এক, আমদানীকৃত দ্রব্যের দাম বৃদ্ধিঃ

যেসব জিনিস ডলারের মূল্যে বাইরের দেশ থেকে আমদানি করা হয়, এখন সেইসব দ্রব্যের জন্য বেশি টাকা খরচ করতে হবে। মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, টিভি, রেফ্রিজারেটর, এসি, ওষুধ, চিকিৎসার যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন ছোটখাটো গ্যাজেট এই সবকিছু আমদানিরই দাম বেড়ে যাবে।

দুই, দেশের বাজারে মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টি হবেঃ

ডলারের তুলনায় টাকার দাম কমে যাওয়ার কারণে আমদানি মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টি হবে, এর ফলে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যাবে বেড়ে। স্থির আয় বিশিষ্ট পরিবারের সঞ্চয়ে হাত পড়বে, যার ফলে আগামী দিনে বিনিয়োগের পরিমাণ কমতে পারে।

তিন, বিদেশে পড়াশোনা এবং ভ্রমণের খরচ বাড়বেঃ

যেসব ছেলেমেয়েরা বিদেশে পড়াশোনা করছে এবং যারা আগামীদিনে পাড়ি দেবে ভাবছে তাদের টাকার অঙ্কে খরচ অনেকটাই বেড়ে যাবে। ডলার শক্তিশালী হয়ে যাওয়ায় এখন টাকার অঙ্কে টিউশন ফি, থাকা-খাওয়ার খরচ এবং রেমিট্যান্স বাবদ খরচ সবকিছুই বেশি বেশি দিতে হবে। বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। হোটেল খরচ, পরিবহন, এন্ট্রি ফি, মার্কেটিং সবকিছুই পর্যটকদের কাছে ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে।

একইভাবে টাকার অবমূল্যায়নের পরোক্ষ প্রভাবগুলিও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণঃ

এক, পেট্রোলিয়াম তেলের দাম বৃদ্ধিঃ

এই মুহূর্তে খনিজ তেলের মোট চাহিদার ৯০ শতাংশ মেটানো হয় আমদানীকৃত তেল দিয়ে। ডলারের দাম বৃদ্ধির ফলে পেট্রোল, ডিজেল ও রান্নার গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পাবে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাবার সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাবে এবং এই বর্ধিত দামের ক্যাসকেডিং এফেক্ট বা ক্রম প্রভাবের জেরে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি দ্রব্যের পাইকারি মূল্য বৃদ্ধি পাবে। এর অর্থ রুপির অবমূল্যায়ন সমগ্র অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির একটি শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া ঘটাবে।

দুই, বর্ধিত উপাদান মূল্যের কারণে চাকরিতে নিশ্চয়তা কমবেঃ

বেশিরভাগ শিল্পই তাদের উৎপাদনে একাধিক আমদানীকৃত উপাদান এবং যন্ত্র ব্যবহার করে। ডলারের দাম বাড়ায় এই সমস্ত উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলি ব্যয়-বৃদ্ধি জনিত মুদ্রাস্ফীতির সম্মুখীন হবে। লাভের অঙ্ক কমে যাওয়ার তারা এখন সম্প্রসারণের পথে হাঁটবে না, উল্টে নিয়োগ হ্রাস, শ্রমিকদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার কাটছাঁট, মজুরি বৃদ্ধির ধীরগতি, এমনকি শ্রমিক ছাঁটাইয়ের মতো রাস্তায় হাঁটবে সংস্থাগুলি। এই সমস্ত কিছু চাকরির বাজারে অনিশ্চয়তা এবং শ্রমিকদের আয়ে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ভূমিকাঃ

এই প্রসঙ্গে একটু সহজ অর্থনীতির উপস্থাপনা প্রয়োজন। বিদেশী মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারণ দুটি পদ্ধতিতে হয়, স্থির বিনিময় হার আর পরিবর্তনশীল বিনিময় হার নির্ধারণ পদ্ধতি। প্রথমটিতে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হার স্থির করে, কোনও কারণে ডলারের মূল্য বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনীয় ডলার বিক্রি করে এক্সচেঞ্জ রেটকে আগের জায়গায় রাখে। অন্যদিকে পরিবর্তনশীল বিনিময়ের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হাত গুটিয়ে থাকে, বাজারের চাহিদা-যোগানের ঘাত-প্রতিঘাত রুপি-ডলারের বিনিময় মূল্য স্থির করে। সেক্ষেত্রে ডলারের চাহিদা বাড়লে ডলারের দাম বাড়ে, ঠিক এখন যেটা ঘটছে এবং আমাদের রিজার্ভ ব্যাংক কোনোরকম দায়িত্বভার না নিয়ে এটা হতে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে এই মুহূর্তে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের খাতে জমা বিপুল বিদেশী মুদ্রার সম্ভার (৬৯০ বিলিয়ন ডলার) সরকার এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নিস্পৃহতার অন্যতম প্রধান কারণ।

অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে বিষয়টি এতটা সহজসরল নয়। মনে রাখতে হবে ২০২২ সালে ডলারের শক্তিশালী হওয়ার কারণে অনেক মুদ্রার সাথে টাকার অবমূল্যায়ন ঘটেছিল, এবারে ডলার কিন্তু পুরোপুরি স্থিতিশীল এবং টাকার কমজোরি হয়ে পড়ার কারণেই ডলারের আপেক্ষিক দরের বৃদ্ধি ঘটেছে। এই ঘটনাকে বিশেষ উদ্বেগপূর্ণ না ভেবে সরকার নিশ্চিত হয়ে বসে থাকলে আগামীদিনে মূলধনের বহির্গমন বাড়তে বাড়তে বিদেশী মুদ্রার স্টকে বড়সড় ধাক্কা আসতে পারে। সেই ধাক্কা সামলাবার জন্যে আমরা প্রস্তুত তো? আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ভারতীয় অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে বাজারের উপর আর সেই বাজারের সিংহভাগই শাসন করে বিদেশী মূলধন। তাই বিদেশী বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিলে মেদ মাংস সরে গিয়ে অর্থনীতির কঙ্কালটাই না প্রকট হয়ে পড়ে। একথাটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই যে, দেশীয় মূলধনী নির্ভর শিল্পস্থাপন এখন অলীক স্বপ্ন।