আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্বিংশ সংখ্যা ● ১৬-৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫ ● ১-১৫ পৌষ, ১৪৩২

সম্পাদকীয়

একচেটিয়া পুঁজির রাজনীতি


'আমরা যাইনি মরে আজো - তবু কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়'। কিন্তু সব দৃশ্য সমান নয়। ২০২০ সালের লকডাউনের পরে দেশের বিভিন্ন শহরে বাড়ি ফেরার মরিয়া চেষ্টায় সাধারণ শ্রমিকদের ভিড়ের 'দৃশ্য' এখনও হয়ত অনেকের মনে পড়ে। 'হোমবাউন্ড' ছবিতে যেই দৃশ্য দর্শককে বিহ্বল করে দেয়। আবার ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে জন্ম হল আরও একটি দৃশ্যেরঃ লাখো মানুষ আটকে পড়েছেন দেশের বিমানবন্দরগুলিতে কারণ দেশের সর্ববৃহৎ উড়ান সংস্থা, ইন্ডিগো, তাদের বিমান ওড়াতে পারছে না, অসংখ্য বিমান বাতিল করা হয়েছে। খবরের কাগজে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী ডিসেম্বর মাসের প্রথম দশ দিনে ইন্ডিগো ৫০০০-এর বেশি বিমান বাতিল করে, যার ফলে ১২ লক্ষাধিক মানুষ আটকে পড়েন দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে। আমরা টিভির পর্দায় সেই দৃশ্য দেখলাম, যেখানে দেশের সচ্ছল মানুষ আটকে পড়েছেন, বিমানবন্দরে এবং স্লোগান তুলছেন ইন্ডিগোর বিরুদ্ধে। দেশের পরিযায়ী শ্রমিকদের সঙ্গে এই মানুষের তুলনার কোনও মানে হয় না। পরিযায়ী শ্রমিকদের হাহাকার রাজনৈতিকভাবে কোনও আলোড়ন তৈরি করেনি। ইন্ডিগো নিয়ে সংসদে বচসা হয়েছে, সমস্ত টিভি চ্যানেলে এই নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনাও হয়েছে। আসলে মোদীর আমলে দেশের সমস্ত ব্যবস্থা যে ধুঁকছে, এবং একচেটিয়া পুঁজিপতিদের হাতে মোদী দেশকে যে ক্রমশ বেচে দিচ্ছেন, তার প্রমাণ হল এই ইন্ডিগো সংকট।

অর্থনীতির প্রথম বর্ষের ছাত্ররাও জানে যে বাজারে প্রতিযোগিতা থাকলে উৎপাদন নিপুণভাবে করা যায়, গ্রাহকের কাছে বিভিন্ন সংস্থার থেকে পণ্য কেনার সুযোগ থাকে, যার ফলে পণ্য সুলভে পাওয়া যায়। কিন্তু একচেটিয়া পুঁজির হাতে যদি গোটা একটি ক্ষেত্র চলে যায়, তাহলে গ্রাহকের অসুবিধা এবং পরিষেবার গুণগত পতন দুই-ই বাড়তে থাকে। ইন্ডিগো ভারতের বিমান পরিষেবার ৬৫ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে টাটা-র মালিকানাধীন এয়ার ইন্ডিয়া। এই দুই সংস্থা বিমান পরিষেবার ৯২ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করে। অতএব ইন্ডিগোর উড়ান না উড়লে আপনার কাছে আর বেশি বিকল্প নেই। তদুপরি, মুনাফার লোভে বাকি বিমানসংস্থাগুলি ইন্ডিগোর সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে বিমানের টিকিটের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে যায়। লক্ষাধিক টাকা দাম ধার্য করা হয় মুম্বাই-দিল্লি বিমানের।

এই পরিস্থিতি কেন তৈরি হল? ২০২৪ সাল থেকে ভারতের অসামরিক বিমান নিয়ন্ত্রক সংস্থা নতুন নিয়ম চালু করার বিষয়ে সমস্ত সংস্থাকে নোটিশ দেয়। এই নতুন নিয়মাবলীতে পাইলটদের বিশ্রামের সময় বাড়ানোর কথা বলা হয়, বিমানকর্মীদেরও বিশ্রামের সময় বাড়ানো হয়। এই নীতি চালু করার জন্য প্রায় দুই বছর ধরে টালবাহানা চলতে থাকে। এই নিয়ম চালু হলে, স্বাভাবিকভাবেই পাইলট তথা বিমানকর্মীদের বেশি সংখ্যায় চাকরিতে বহাল করতে হবে। কিন্তু ইন্ডিগোর মতন বিমান সংস্থা প্রায় দুই বছর ধরে টালবাহানা চালিয়ে যায় কিন্তু নতুন নিয়ম মেনে বেশি করে পাইলট তথা বিমানকর্মীদের সংখ্যা বাড়ায়নি। অতএব যখন এই নতুন নিয়ম চালু হয়, ইন্ডিগোর বিমান পরিষেবা ভেঙে পড়ে।

কিন্তু এর কারণ কী? ইন্ডিগো বিমান সংস্থা নিশ্চিতভাবেই মূর্খদের দ্বারা পরিচালিত হয় না। তাহলে, তারা কেন নতুন নিয়ম চালু হওয়ার আগে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেয়নি? এর দুটি কারণ। প্রথমত, ইন্ডিগো মুনাফার জন্য ন্যূনতম পাইলট ও বিমানকর্মী নিয়ে তাদের ব্যবসা চালাচ্ছে। কর্মীদের বেশি করে খাটতে বাধ্য করে পাইলটদের রাতের ঘুম তথা বিশ্রামের তোয়াক্কা না করে তাদের বিমান চালাতে বাধ্য করে ইন্ডিগো আপনাকে আপনার গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছে। এর ফলে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার সম্ভাবনা আপনার এবং বিমানকর্মীদের। পরিশ্রান্ত পাইলটের কোনও ভুল হলে ইন্ডিগোর মালিক সুরক্ষিত থাকবেন, প্রাণ হারাবে সাধারণ মানুষ ও বিমানকর্মীরা। অতএব, ইন্ডিগোর অর্থনৈতিক মডেলে যাত্রী সুরক্ষার থেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়ে এসেছে মুনাফাকে। কিন্তু নতুন সরকারী নীতি চালু হওয়ার আলোচনা চলার পরেও, ইন্ডিগো পাইলট ও বিমানকর্মীদের নিয়োগ করেনি, কারণ তারা জানত যে তারা যেহেতু দেশের বিমান পরিষেবার একচেটিয়া মালিক, তাই তারা যদি বিমান চালাতে না পারে, তাহলে দেশের বিমান পরিষেবা ভেঙে পড়বে, এবং সরকার বাধ্য হবে নতুন নিয়ম প্রত্যাহার করে বিমান পরিষেবা চালু করতে। ঠিক এই ঘটনাই ঘটেছে। সরকার আপাতত নতুন নিয়ম মুলতুবি রেখেছে। লোক দেখানোর জন্য ইন্ডিগোর বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু তার মাধ্যমে বিমান পরিষেবার বাজারে কোনও নতুন উপাদান সরকার যোগ করেনি। বরং ইন্ডিগোর দাদাগিরিকেই মেনে নিয়েছে।

ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতির প্রধানমন্ত্রী, যিনি বিশ্বগুরু তথা একজন পরম পরাক্রমী নেতা হিসেবে নিজের ছবি তৈরি করেছেন, তিনি এই বিষয়ে নিশ্চুপ। ইন্ডিগোর দাদাগিরি খতম করার কোনও ইচ্ছে তাঁর বা সরকারের নেই। যদি থাকত, তাহলে বায়ুসেনার পাইলটদের কাজে লাগিয়ে বিমান চালিয়ে ইন্ডিগোর উপর বিশাল ক্ষতিপূরণের বোঝা চাপিয়ে এই সংস্থাকে উচিত শিক্ষা দেওয়া যেত। কিন্তু মোদীর ভারতে 'এক দেশ, এক নেতা'-র নীতির সূত্র ধরে আপাতত দেশের কর্পোরেট ক্ষেত্রে এক দেশ ও দুই সংস্থার নীতি নেওয়া হয়েছে। আদানি-আম্বানি-ইন্ডিগো-এয়ার ইন্ডিয়া এই জাঁতাকলে আপনার জীবন পিষ্ট হবে, কিন্তু অন্য কোনও বিকল্পও আপনার সামনে নেই। কারণ এই একচেটিয়া ব্যবসায়ীরা সরকারের বদান্যতায় সমস্ত ক্ষেত্রের দখল নিয়ে নিয়েছে।

পুঁজিবাদের অনেক সমস্যা রয়েছে। কিন্তু একচেটিয়া পুঁজিবাদের থেকে ক্ষতিকর কোনও ব্যবস্থা যে নেই, সেই কথা মূলধারার অর্থনীতিবিদরাও মানেন। কিন্তু মোদী সরকার লাগাতার একচেটিয়া পুঁজিপতিদেরই সম্পদ বাড়ানোর চেষ্টায় সদা নিয়োজিত। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন করতে হলে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াই আরও শক্তিশালী করতে হবে। দেশের ধনী অংশও ইন্ডিগো কাণ্ডের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অব্যবস্থার শিকার হল। কিন্তু তারা কি এই সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে মোদী তথা একচেটিয়া পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের লড়াইয়ের পাশে থাকবে?