আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ ত্রয়োবিংশ সংখ্যা ● ১-১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ ● ১৬-২৯ অগ্রহায়ণ, ১৪৩২

প্রবন্ধ

কাফকার এক ছোটোগল্প

অমিয় দেব


নাম 'Ein Landarzt', তথা 'এক গ্রামীণ বৈদ্য' - ইংরেজিতে 'A Country Doctor' (বস্তুত অ-জার্মানভাষী জগতে সেই নামেই বেশি পরিচিত, যেমন 'The Trial' যা আদতে 'Der Prozess' বা 'The Metamorphosis', আদতে 'Die Verwandlung')। গল্পটি বলা উত্তমপুরুষে। এক জাপানি অ্যানিমেশন চলচিত্রী, কোঝি ইয়ামামুরা, তা নিয়ে এক হ্রস্ব ছবি করেছেন যা খুবই মন দিয়ে দেখবার। গল্পটিতে যে-ক্রম আছে তা চমৎকার ফুটে উঠেছে তাতে।


'A Country Docto' বইয়ের প্রচ্ছদ।

ঘোড়ায় টানা গাড়ি আছে, কিন্তু ঘোড়া নেই (তার নিজেরটি এই শীতে খেটে খেটে সদ্য মরেছে), আর লন্ঠন হাতে গাঁয়ের অন্যত্র ঘুরে ঘুরে ঘোড়া ধার করার ব্যর্থ চেষ্টা করে যখন তার পরিচারিকা ফিরে এল, তখন হঠাৎ হতঃশ্বাস বৈদ্য তার অব্যবহৃত শুয়োরের খোঁয়াড়ের দরজা ধাক্কা দিতেই খুলে বেরিয়ে এল - না, না, কোনো শুয়োর নয় - এক অলীক সহিস ও পেছন পেছন আরও অলীক দুই টগবগে ঘোড়া। আজব কাণ্ড! এবং গাড়িতে ঘোড়াদুটি জুতে দিতেই, তারপর সে উঠে বসে লাগাম হাতে নিতেই, যেন সঙ্গে সঙ্গেই পৌঁছে গেল দশ মাইল দূরের রোগীর গৃহে - যদিও পেছনে থেকে যাওয়া সহিসের দুরন্ত কাম থেকে যুবতী পরিচারিকাকে রক্ষার কোনো উপায়ই রইল না। রুগ্ন বালককে ঘিরে তার মা-বাবা-দিদিই শুধু নয়, অবিলম্বে দৃশ্য হয়ে ওঠা প্রতিবেশীবর্গ ও এক অদৃশ্য স্কুলছাত্রদের কোরাস যার পরিচালক এক শিক্ষক (যারা পর্যায়ক্রমে গেয়ে ওঠে: (১) 'তার জামাকাপড় খুলে নাও, তবেই সে সারিয়ে তুলবে,/ আর যদি সে না সারিয়ে তোলে, তাকে মেরে ফেলো।/ মাত্র এক বৈদ্যই তো, এক বৈদ্য মাত্র।' (২) 'রোগীরা তোমরা আনন্দ করো,/ বৈদ্য তোমাদের সঙ্গে এখন একশয্যায়।')। বৈদ্যমশায়ের অবশ্য প্রথমে মনে হয়েছিল - যদিও বালকটি তাকে একান্তে বলেছিল, "আমাকে মরতে দাও" - রোগফোগ কিছু নয়, শুধু এই তীব্র শীতের রাত্তিরে তাকে টেনে এনে ভোগানো। ('প্যারিস' বা গির্জাভুক্ত অঞ্চলেরই সে অধীন বটে, তাই বলে তার বিপদ-ঘন্টা যখন খুশি বাজিয়ে দেওয়া?) কিন্তু পরে বালকটির রক্তাক্ত ক্ষত দেখে বুঝল এ সারবার নয়। আশ্চর্য, আর যাজকে নির্ভর নেই এখন গাঁয়ের লোকের, নির্ভর সবজান্তা(!) বৈদ্যে। ভগবান বুঝি এখন বৈদ্যেরই নাগালে? এবং তার জেরেই কি সবাই মিলে তার জামাকাপড় খুলে তাকে শুইয়ে দিল মরণাপন্ন বালকটির পাশে? দিয়ে দরজা বন্ধ করে চলে গেল? করুক বৈদ্য তার প্রত্যাশিত কর্ম। শুয়ে সে বালকটিকে [মিথ্যে] আশ্বাস দিল তার ক্ষত হয়তো সেরেও যেতে পারে। এদিকে সেই অলীক ঘোড়াদুটো দুই জানলা দিয়ে মুখ ঢুকিয়ে কি মৃদু হ্রেষাধ্বনিতে তাকে ডাকছে না? সমাপতন হল বালকটির চোখ বোজা তথা মৃত্যু আর তার জানলা দিয়ে পলায়নের। সময় নেই জামাকাপড় পরবার, তাই তা জানলা দিয়ে গাড়িতে ছুঁড়ে - ফার-কোটটা এক পেরেকে আটকে ঝুলতে লাগল - এক লাফে এক ঘোড়ার পিঠে চড়ে সে নগ্নদেহেই ছুটল তার বাড়ির পথে। কিন্তু তার প্রত্যাবর্তন হয়ে উঠল তার আগমনের আস্ত বিপরীত - একেবারেই ধীরগামী। কোঝি ইয়ামামুরার অ্যানিমেশন ফিল্মে এই ধীরগামিতার কাতর চেহারা আমরা দেখি। বাড়ি কি সে আদৌ পৌঁছবে?


'Ein Landarzt' চলচ্চিত্রের পোস্টার।


কোঝি ইয়ামামুরা

কাফকার এই ছোটোগল্প লেখা হয়েছিল ১৯১৭-তে, বেরোয় ১৯১৯-এ। এতে যে - 'অদ্ভুত' দানা বাঁধে - যেমন হতাশার তুঙ্গ মুহূর্তে এক সহিস ও ঘোটকদ্বয়ের অলীক আবির্ভাব, তেমনি আরোগ্যকল্পে মরণাপন্নের শয্যাপার্শ্বে বিবস্ত্রীকৃত বৈদ্যের শয়িতকরণও - তা-ই কি শতক মধ্যাহ্নের সেই প্রতীচ্য 'অ্যাবসার্ড'-এর জন্ম দিতে যাচ্ছে না যার এক প্রতিভূ আলবের কাম্যু? বা সামুয়েল বেকেট?


ফ্রান্‌ৎস কাফকা

'দি জাজমেন্ট'-এর ('Das Urteil') মতো একদমে লিখে ওঠা না হলেও (স্বীয় সার্থকতাবিলাসী পুত্রকে তার অযত্নসাধিত অহংকারী পিতার 'জলে ডুবে মৃত্যু'র শাস্তিদান যা তাকে সঙ্গে সঙ্গে তাতেই ঠেলে দেয়), বা 'দি মেটামরফোসিস'-এর মতো সদাস্মরণীয় না হলেও (দুঃস্বপ্ন শেষে ঘুম ভেঙে এক জঘন্য পোকায় নিজেকে রূপান্তরিত দেখলেও গ্রেগর সামসা গ্রেগর সামসাই থেকে যায় - দেহের বিকার ঘটলেও মনের বিকার ঘটে না), 'এক গ্রামীণ বৈদ্য' কাফকা-পাঠককে কম টেনে রাখে না। স্কুল ছেলেদের ওই কোরাস বুঝি খানিকটা এক বাঁকা বিবেকের মতোই কাজ করে। আর উত্তমপুরুষের পোশাক পরা ওই বৈদ্যের এক অপরাধবোধ থেকে যায় তার যুবতী পরিচারিকাকে নিয়ে। বস্তুত, লাগাম হাতে নিলেও অচেনা সহিসকে ফেলে রেখে সে আসতে চায়নি, কিন্তু ঘোড়াদুটি তাকে কোনো অবকাশই দেয়নি। তবে এই অপরাধবোধের আড়ালে দায়িত্ব ব্যতীত আর কিছু আছে কিনা তা স্পষ্ট নয়।

(২)

সদ্য ২০২৫-এর নোবেলে ভূষিত (২০১৫-র বুকার-প্রাপক) হাঙ্গেরীয় লেখক লাসলো ক্রাসনাহোর্কাই-এর এক উপন্যাস দৈবাৎ পড়ে ফেললাম। বলা বাহুল্য ইংরেজি অনুবাদে। নাম 'The Melancholy of Resistance'। লেখা ১৯৮৯-তে। একেবারেই উত্তর-আধুনিক। নিরাশার অতলস্পর্শী। 'কিছুরই মানে নেই, সেই তো মানে'-র এক জ্বাজল্যমান উদাহরণ।


'The Melancholy of Resistance' বইয়ের প্রচ্ছদ।


হাঙ্গেরীয় ভাষায় লেখা মূল বইয়ের প্রচ্ছদ।


লাসলো ক্রাসনাহোর্কাই

পড়ে মনে হল কাফকা কেবল প্রতীচ্য শতক মধ্যাহ্নই নয় - অপরাহ্ণও ছুঁয়ে আছেন। কাফকার অনুরোধ অমান্য করে কাফকার মৃত্যুর পর তাঁর অপ্রকাশিত লেখা ছাপতে ছাপতে, যখন মাক্স ব্রোড একদা তাঁর বক্তৃতাকালে এক উদ্দীপ্ত যুবকের মুখে শোনেন, এই শতকটাই হতে যাচ্ছে কাফকা-শতক, তখন তার মুখে ফুলচন্দনের আশা প্রকাশ করেছিলেন। আর লাসলো ক্রাসনাহোর্কাই তাঁর ঋণ স্বীকার করেছেন কাফকার কাছে। বলেছেন, কোথায় যেন পড়লাম, "আমি যখন কাফকা পড়ছি না, তখন আমি কাফকা নিয়ে ভাবছি। যখন কাফকা নিয়ে ভাবছি না, তখন তাঁকে নিয়ে ভাবনার অভাব বোধ করছি। খানিকক্ষণ তাঁকে নিয়ে ভাবনার অভাব বোধ করে, আমি তাঁর কাছে ফিরে যাই ও আবার পড়ি।"