আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ ত্রয়োবিংশ সংখ্যা ● ১-১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ ● ১৬-২৯ অগ্রহায়ণ, ১৪৩২
প্রবন্ধ
ভোটের অধিকার ও নাগরিকত্ব
দীপঙ্কর রায়
"পরের জায়গা পরের জমিন ঘর বানাইয়া আমি রই..."
এই দেশটা আমার কি পরের এই ভাবনায় সবাই ভেবে সারা। বিশেষ করে এই ভোটার লিস্টের নিবিড় সংশোধন শুরু হবার পর। আদালতের যতই নির্দেশ থাক, ভোটার লিস্টের সংশোধন আর নাগরিকত্ব যাচাই এই দুটোকে মেলানো যাবে না, সেটা সোনার পাথরবাটি। নাগরিক হলে তবেই ভোটাধিকার, আর তাই নাগরিকত্ব যাচাই হলে তবেই ভোটার তালিকায় স্থান। অবশ্য এই যাচাই প্রক্রিয়া তাদের জন্যই প্রযোজ্য, যাদের নাম অথবা পিতৃ-মাতৃ কুলের নাম ২০০২ সালের নিবিড় সংশোধিত ভোটার তালিকায় নেই। ঐ সংশোধনে নাগরিকত্ব প্রমাণে কোনো কাগজ দাখিল করতে হয়েছিল কিনা স্মরণে নেই, তবে ব্যাপারটা যা দাঁড়াচ্ছে, ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সাথে নিজের যোগসূত্র থাকলে তুমি অবশ্যই ভারতীয় নাগরিক। নয়ত সেটা প্রমাণ করার জন্য কাগজ দেখাতে হবে।
নাগরিকত্ব না হলেও, নাগরিক পরিচিতির কাগজ বলতে আগে বুঝতাম রেশন কার্ড। প্রথম বারের ভোট দিতে যাওয়ার আগে বাবা সঙ্গে রেশন কার্ড নিতে বলেছিল। তারপর তো ভোটার কার্ড এল, আধার কার্ড এল। রেশন কার্ড না হলে রেশনের ভর্তুকি পাবে না, আধার কার্ড না হলে রান্নার গ্যাসের ভর্তুকি পাবে না। ভোটার কার্ড না হলে ভোট দিতে পারবে না যেহেতু নাগরিক না হলে ভর্তুকি পাবে না আর ভোট দিতেও পারবে না, ধরে নেওয়া হয়েছিল, রেশন কার্ড, আধার কার্ড, ভোটার কার্ড এই সবই নাগরিকত্বের পরিচিতি। নির্বাচন কমিশনের লিস্টে দেখা গেল, এই সবই বাদ। আধার আছে বটে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে, কিন্তু এটাও সোনার পাথরবাটি। সুপ্রিম নির্দেশেই আছে ওটা শুধু পরিচিতি। নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র নয়। তাই যদি না হবে, তবে ভর্তুকি নিতে আধার কার্ড লাগে কেন? আমার পাসপোর্ট বানাতে আধার লেগেছিল, আর আধার বানাতে দিয়েছিলাম ভোটার কার্ড। নাগরিকত্ব প্রমাণে পাসপোর্ট দেওয়া যাবে, কিন্তু যেসব নথির ভিত্তিতে সেটা তৈরি, সেগুলো দেওয়া যাবেনা। কেন? না আধার আর ভোটার কার্ড জাল হতে পারে। সে তো পাসপোর্টও বহু জাল হচ্ছে।
প্রশ্ন থেকেই যায়, কোন ফস্কা গেরোর ফাঁক দিয়ে জালিয়াতি হয়? ঠগ বাছতে না পেরে গাঁ উজাড়। চাল কাঁকড় আলাদা করতে না পেরে পুরো প্যানেল বাতিল করার মতো ব্যাপার।

২০০২ সালের ভোটার লিস্টে নাম আছে বলে, আমার কোনও কাগজ লাগবে না। তবু অঙ্ক মিলিয়ে দেখলাম, যদি দিতে হতো, তবে ঐ এগারোটা কাগজের মধ্যে আমার কাছে আছে তিনটি। ইস্কুল পাশের কাগজ, সরকারি পেনশনের কাগজ, আর পাসপোর্ট। এই সবগুলোই জন্ম প্রমাণপত্রের বিকল্প নথি। গ্রামের গরীব খেটে খাওয়া মানুষের কাছে কী কী নথি আছে, কিম্বা আদৌ আছে কিনা, বা না থাকলে কত গুণ তেল পুড়িয়ে তা বানাতে হবে সেটা বোঝা যাবে ৯ই ডিসেম্বর-এর (পরবর্তীতে ১৬ ডিসেম্বর করা হয়েছে) পর নোটিস আর শুনানির সময়। আপাতত রাজনীতি জমে উঠেছে। একদল বলছে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার লিস্টের এক কোটি রোহিঙ্গা বাদ পড়বে (তথ্য বলছে সারা পৃথিবীর রোহিঙ্গা জনসংখ্যা পনেরো লাখের মতো), হিন্দুরা প্লিজ সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের সাহারা নিন, আর আইনত ভারতীয় ভোটার হয়ে আমাদের ভোট দিন। আরেক দল বলছে ম্যান মার্কিং করে খেলা হবে, দেখি কেমন করে বাদ দিস। মাঝখান থেকে উলুখাগড়ার মতো কিছু বুথ লেভেল অফিসার (বিএলও), ছা-পোষা সরকারী কর্মচারী মারা গেল। সে রক্ত যদি কারুর হাতে লেগে থাকে, তা হল রাজনীতির।
ভোটার লিস্ট সংশোধন আর স্বচ্ছ নাগরিক পঞ্জি প্রকাশ, অত্যাবশ্যক। তবে পদ্ধতি যখন পঁচাত্তর বছর ধরে রাজনীতির ঘোলা জলে হাবুডুবু খায় তখন নিবিড় সংশোধনের এই বিভ্রান্তি সহজেই অনুমেয়।
কেউ প্রশ্ন করেনা, জনগণনা ২০১১ সালের পর আর হয়নি কেন? ডেমোগ্রাফি পালটে গিয়ে 'খতরে মেঁ হ্যায়' মিথ ভেঙ্গে যাবে বলে?