আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ ত্রয়োবিংশ সংখ্যা ● ১-১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ ● ১৬-২৯ অগ্রহায়ণ, ১৪৩২

প্রবন্ধ

এ দেশ তোমার আমার!

রঞ্জন রায়


আখলাককে কেউ মারে নি!

আজ থেকে ঠিক দশ বছর আগের কথা। উত্তর প্রদেশের দাদরি পরগণার একটি ছোট গ্রাম বিসাদা। সন্ধ্যেবেলায় মন্দিরের পুজারী মাইকে গ্রামবাসীদের ডাক দিলেন ধর্মযুদ্ধে জমায়েত হতে। কেননা, সেই গ্রামের একটি মাত্র মুসলিম পরিবার, পেশায় লোহার কারিগর, মোহম্মদ আখলাকের বাড়িতে গরু মেরে গোমাংস রান্না হচ্ছে।

উন্মত্ত জনতা ধেয়ে গেল। টেনে হিঁচড়ে বার করল আখলাক এবং তার ছেলেকে। শুরু হল গণপিটুনি! বাধা দিতে গিয়ে মার খেল বৌ এবং মেয়ে। ওরা বারবার বলল - রান্না হয়েছে পাঁঠার মাংস। কে শোনে! আখলাক মরে গেল। ছেলে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে।

সেই হামলার নেতৃত্বে ছিল স্থানীয় বিজেপি নেতার ছেলে এবং ভাইপো।

উত্তর প্রদেশের সরকারী পরীক্ষাগারে প্রাথমিক স্যাম্পল টেস্টে জানা গেল - বীফ নয়, ছাগলের মাংসই বটে! কিন্তু আখলাক তো নিহত!

ঘটনা ঘটেছে আখলাকের পরিবারের চোখের সামনে। খবর ছড়িয়ে পড়েছে মিডিয়ায়। মেয়ে নাম নিয়ে অভিযোগ করল। পুলিশ প্রাথমিক তদন্তের পর ওই দুজন এবং আরও এক ডজনকে গ্রেফতার করল। খুনের অভিযোগে ওদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিল। কিছুদিন পরে ওরা জামিনে ছাড়া পেয়ে বীরদর্পে ঘুরে বেড়াতে লাগল। আখলাকের পরিবার গ্রাম এবং এত বছরের বসতবাটি ছেড়ে চলে গেল অনেক দূরের শহরে।

মামলা চলতে লাগল শামুকের গতিতে। সাক্ষী অনেক, কিন্তু গত দশ বছরে মাত্র আখলাকের মেয়ের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এখনও ক্রস-একজামিনেশন হয় নি।

কিন্তু উত্তর প্রদেশের বিজেপি সরকার হঠাৎ জেগে উঠে ঠিক করেছে - এই খুনের মামলা তুলে নেওয়া উচিত। সেই জন্যে ক্রিমিনাল প্রসিডিওর কোড-এর ধারা ৩২১ অনুযায়ী একটি আবেদন আদালতে জমা পড়েছে।

কারণ? "অভিযোগ কর্তাদের বয়ানে বিরোধাভাস", "কোনও ধারালো অস্ত্র উদ্ধার হয় নি", এবং "নিহত ও অভিযুক্তদের মধ্যে কোনও পুরোনো শত্রুতা ছিল না"।

তার মানে কি আখলাককে কেউ হত্যা করেনি? তাহলে ও মরল কেন? অনেক মব লিঞ্চিং কেসে এইরকম যুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু অধিকাংশ সময় আদালত এইসব আবেদন বাতিল কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দেয়।

কথা হল, আদালত কি মেনে নেবে? নিতে বাধ্য? - এমনটি নয়। এমন অনেক ক্ষেত্রেই আদালত মেনে নেয় না। কিন্তু এখন কী হবে?

মুসলিমদের বিরুদ্ধে গোরক্ষক দল

আখলাকের থেকে শুরু হল একটি ধারা। গরু পাচারকারী অভিযোগে কিছু স্বঘোষিত গোরক্ষকের দল কাউকে আটক করে 'জয় শ্রীরাম' বলতে বাধ্য করে এবং গণপিটুনি দেয় যা বেশিরভাগ সময় মৃত্যুর কারণ হয়।

যেমন ২০১৭-তে পেহলু খান নামে হরিয়ানার এক পশু ব্যবসায়ী রাজস্থানের বাজার থেকে পশু কিনে ফেরার সময় গোরক্ষকদের হাতে আক্রান্ত হন এবং মারা যান। সেই বছরই ১৬ বছরের জুনেইদ খান ট্রেনে করে ভাইয়ের সঙ্গে যাওয়ার সময় ২৫ জনের একটি দলের দ্বারা আক্রান্ত হন। বলা হয় ও বীফ খাচ্ছে, টুপি পরা পাকিস্তানি এবং শেষে ওকে ছুরি দিয়ে খুন করা হয়।

২০১৯ সালে তবরেজ আনসারিকে ঝাড়খণ্ডে একটি গ্রামে কথিত সাইকেল চুরির অভিযোগে খুঁটিতে বেঁধে পেটানো হয়। 'জয় শ্রীরাম' বলতে বাধ্য করা হয়। সবকিছুই ঘটে পুলিশের উপস্থিতিতে এবং সে মারা যায়। এই ঘটনার ভিডিও নিয়ে সংসদে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে আওয়াজ ওঠে। পুলিশ প্রথমে খুনের ধারা না লাগালেও পরে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের রিপোর্টের ভিত্তিতে খুনের ধারা দেয়।

অভিযুক্তরা প্রথমে জামিন পেলে তাদের মালা পরিয়ে সম্মান দেওয়া হয়। কারণ 'বিশ্ব হিন্দু পরিষদ'-এর অখিল ভারতীয় নেতা সুরেন্দ্র জৈনের কথায় - এসব সেকুলারদের চক্রান্ত! এমন কিছুই ঘটেনি।

এই ব্যতিক্রমী ঘটনায় দোষীদের শাস্তি হয়।

২০১৮ সালে হাপুড়ে গোহত্যার মিথ্যা অভিযোগে সময়দীনকে পিটিয়ে মারা হয়। গত বছর একটি আদালত ওই কেসে দশ জনকে যাবজ্জীবন কারাবাসের শাস্তি ঘোষণা করেছে। কিন্তু পুলিশকে আদালত ভৎসনা করে। কারণ ওরা প্রথমে কেসটিকে 'রোড রেজ' করে সাজিয়েছিল।

২০১৯ সালে দিল্লির এক সবজি বিক্রেতা মহম্মদ ইশাক গণেশ চতুর্থীর সময় প্রসাদ চুরির অভিযোগে গণ প্রহারে নিহত হয়।

ইনস্পেক্টর সুবোধ সিং হত্যা মামলা

এই ঘটনাটি উল্লেখযোগ্য। এই অফিসার আখলাকের লিঞ্চিং ঘটনায় প্রাথমিক তদন্ত করে কেস সাজিয়েছিলেন। তিন বছর পরে তিনি উত্তর প্রদেশের বুলন্দশহর জেলার সায়না থানার দায়িত্বে ছিলেন। দিনটা ৩ ডিসেম্বর, ২০১৮।

খবর পেলেন - এক উন্মত্ত জনতা একটি গ্রামে গোহত্যার মিথ্যা অভিযোগে রাস্তায় ব্যারিকেড করেছে। ওরা থানা আক্রমণ করে এবং গাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। উনি দাঙ্গা থামাতে ভীড়ের মধ্যে ঢুকলে তাঁর উপর হামলা হয়। তাঁর আঙুল কেটে ফেলা হয় এবং তাঁরই পিস্তল ছিনিয়ে নিয়ে তাঁকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়।

তদন্তে এই ঘটনাকে পূর্ব পরিকল্পিত মনে করা হয়। এবং স্থানীয় বজরং দলের নেতা যোগেশ রাজ এবং প্রাক্তন সৈনিক জিতেন্দ্র মালিককে এই ঘটনার মাথা ধরা হয়। এঁরা এবং অন্যেরা অল্পদিনে জামিন পেয়ে যান। কিন্তু পুলিশ অফিসার হত্যার মামলা একটু মাত্রাছাড়া ঘটনা।

ফলে এই বছর আগস্ট মাসে বুলন্দশহরের সেশন কোর্ট এই মামলার রায়ে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে আজীবন কারাবাসের দণ্ড দিয়েছে এবং আরও তেত্রিশ জনকে খুনের চেষ্টা, দাঙ্গা এবং অন্যান্য কিছু অভিযোগে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে।

লক্ষণীয়, সুবোধ সিং উচ্চবর্ণের হিন্দু এবং পুলিশ অফিসার। যদি সাধারণ গ্রামবাসী এবং মুসলিম হতেন!

২০১৭ সাল। রাজস্থানে বাংলা থেকে খাটতে আসা এক মুসলিম দিনমজুরকে কুড়ুল দিয়ে কুপিয়ে মেরে আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়। অভিযোগ লাভ জিহাদের। কিন্তু ওই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হিন্দু তরুণী 'লাভ জিহাদ'-এর অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে এবং ওই বাঙালি মুসলিমকে নির্দোষ বলে বিবৃতি দেয়। অভিযুক্ত শম্ভুলাল রৈগরকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু তার সমর্থনে কিছু লোকের মিছিল পুলিশের উপর পাথর ছোঁড়ে।

মধ্য প্রদেশের কিছু ঘটনা

গাছের সঙ্গে বেঁধে দুই যুবককে এলোপাথাড়ি লাঠির বাড়ি মারছে এক দল যুবক। শোনা যাচ্ছে হুঙ্কার - 'জয় শ্রীরাম'। এক মহিলাকে মাটিতে ফেলে মাথায় চপ্পলের ঘা মারা হচ্ছে। তিন জন বাঁচার জন্য অনুনয় করলেও ভ্রূক্ষেপ নেই গলায় গেরুয়া গামছা জড়ানো দলটির। উল্টে প্রহৃতদের তারা শাসাচ্ছে, 'জয় শ্রীরাম' বলতেই হবে! অভিযোগ, কংগ্রেস শাসিত মধ্যপ্রদেশের সিওনীতে গোমাংস রাখার অভিযোগে রিকশা থেকে টেনে নামিয়ে মারধর করা হয় ওই তিন জনকে। প্রহৃতেরা মুসলিম।

২০২৩ সালে খান্ডোয়া জেলার ছোটি ছাঙ্গোয়ান দেবী গ্রামে ফিরোজ নামে এক যুবককে ছোলা চুরির সন্দেহে মেরে নালায় ফেলে রাখা হয়, গায়ে অনেক ছুরির দাগ। ছেলেটি হাসপাতালে মারা যায়।

৫ জুন, ২০২৫ তারিখে মধ্যপ্রদেশের সাঁচী থানায় করা এফআইআর থেকে জানা যাচ্ছে যে ডেয়ারি মালিক জুনেইদ খান গরু পরিবহনের সময় কথিত গোরক্ষকদের হামলায় নিহত হন, সঙ্গী আরমান গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে।

ঘটনা আরও ঘটছে। আমার প্রশ্নঃ যদি গোমাংসের অভিযোগ কোনও প্রকরণে সত্যিও হয় তাহলে তাকে শাস্তি দেবার অধিকার গোরক্ষকদের কে দিয়েছে? ওদের অভিযোগ সত্যি কি মিথ্যা তার বিচার কে করবে? ওরা-ই? মানে ওরা-ই পুলিশ, ওরা-ই বিচারক এবং ওরা-ই জল্লাদ! আইনের শাসনে এটা কী করে সম্ভব হয়!

গোমাংসের অভিযোগে মুসলিমদের বাড়ি ভেঙে ফেলা!

রতলাম জেলার প্রশাসন চার জনের বাড়ি ভেঙে ফেলে। অভিযোগ ওরা নাকি জাওরা শহরের কোনো এক মন্দিরে গরুর মাংসের অবশেষ ফেলেছিল। শারিখ ও সলমান নামের দুই তরুণকে ২৪ জুন তারিখে গ্রেফতার করা হয়, এবং সেইদিনই ওদের, কোনো আইনি নোটিস না দিয়ে, বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়। নৌশাদ এবং শাহরুখকে পরে একই অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। ওদের পরিবারের লোকজন এরপর বাড়ি ভাঙা হবে এই আশংকায় একটি নাগরিক অধিকার রক্ষার সংগঠনের মাধ্যমে মধ্য প্রদেশ হাইকোর্টে স্থগিতাদেশ চেয়ে পিটিশন দেয়। প্রশাসন ১৪ তারিখের সই করা একটি নোটিস ১৬ তারিখে বেলা সাড়ে বারোটা নাগাদ ওদের ধরিয়ে দেয়। আর তারপরেই ওদের বাড়িও ভেঙে ফেলা হয়।

হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ দেয় বেলা ২:৩০ নাগাদ। কিন্তু বাড়ি ভাঙা হয়ে যায় ১২:৩০ থেকে ১:৩০-এর মধ্যে।

APCR (Association for Protection of Civil Rights) তদন্ত করে জানিয়েছে যে বাড়িগুলি আদৌ সরকারি জমিতে অবস্থিত ছিল না। আর কথিত গোমাংস ফেলা? পুলিশ বলছে যে ওদের কাছে ভিডিও ফুটেজের প্রমাণ আছে। ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং দল বলছে যে সেই সময়ে মন্দিরের সিসিটিভি বন্ধ ছিল। পুলিশের কাছে যা আছে তা হল পাশের একটি রাস্তার ক্যামেরায় দেখা যাচ্ছে যে ছেলেগুলো ওই রাস্তায় হাঁটছে।

এটা মধ্যপ্রদেশে কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মান্ডলা জেলার আদিবাসীবহুল এলাকায় ফ্রিজে বীফ রাখার অভিযোগে ১১ জনের বাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। পুলিশের বক্তব্য - ওরা গোপন সূত্রে খবর পেয়ে তল্লাসি চালিয়েছে এবং তারপর বাড়ি ভাঙা হয়েছে।

এ বিষয়ে দিল্লির আইনজীবী ও সক্রিয় মানবাধিকার কর্মী কঁওলপ্রীত কৌর বলেন - "বীফ পাওয়া যাক বা না যাক, এভাবে বাড়ি ভেঙে দেওয়া অন্যায়, ক্রুর এবং বে-আইনি কৃত্য। মনে হচ্ছে মধ্য প্রদেশ বুলডোজার রাজ নিয়ে উত্তর প্রদেশকে টেক্কা দিতে চাইছে। আদালতকে অবিলম্বে ক্ষতিগ্রস্তদের বাড়ি তৈরি করে দেওয়া, ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং বাড়ি ভাঙার আদেশ দেওয়া আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে আদেশ জারি করতে হবে"।

মজার ব্যাপার হল এই আচমকা কোনও অভিযুক্তের বাড়ি ভেঙে দেওয়া নিয়ে ১১ বছর আগেই মধ্য প্রদেশের হাইকোর্ট কড়া মন্তব্য করেছেন।

২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ন্যায়াধীশ বিবেক রুসিয়া'র বেঞ্চ বলেছিলেন - "আজকাল একটা ফ্যাশন হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন বা স্থানীয় প্রশাসনিক সংস্থা আইনের নির্ধারিত প্রক্রিয়া না মেনে ন্যাচারাল জাস্টিসের নীতির পরোয়া না করে খবরের কাগজে সূচনা না দিয়ে সোজা বাড়ি ভেঙে ফেলছেন। আদালতের বক্তব্য হল - বাড়ি ভাঙাটা অন্তিম পদক্ষেপ। আগে অভিযুক্তকে সূচনা দিয়ে ওই বে-আইনি নির্মাণকে নষ্ট না করে যদি সংশোধন করা যায় - তার সুযোগ দিতে হবে"।

আদালতের ওই বক্তব্যের এবং 'due process of Law' পরোয়া না করে প্রশাসন নিয়মিত ছোটখাটো অজুহাতে মুসলিমদের বাড়ি ভাঙার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

এছাড়া আরেকটা দিক আছে। কোনো একজনের দোষের জন্য গোটা পরিবারের আশ্রয় ভেঙে দেওয়া আসলে একজন ব্যক্তির দোষে তার পরিবারকে শাস্তি দেওয়া - Collective punishment for individual guilt!

বুলডোজার জাস্টিস!

সুপ্রীম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি বি. আর. গাভাই অবসরের আগে তাঁর ভাষণে উল্লেখ করেছেন যে ভারত 'বুলডোজার' দ্বারা নয়, বরং 'আইন' দ্বারা শাসিত হওয়া উচিত এবং এই ধরনের ধ্বংসাত্মক ব্যবস্থা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে না।

আইনের শাসনের পরিপন্থীঃ প্রধান বিচারপতি গাভাই এটিকে "বুলডোজার জাস্টিস" বা "বুলডোজার শাসন" বলে অভিহিত করেছেন, যা আইনের শাসনের সরাসরি লঙ্ঘন।

• প্রশাসনিক বিভাগ বা এগজিকিউটিভ বিচারকের ভূমিকা নিতে পারে নাঃ তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে প্রশাসন একইসাথে বিচারক, জুরি এবং জল্লাদ হতে পারে না। অপরাধের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও, কোনও ব্যক্তি দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তার সম্পত্তি ধ্বংস করা যায় না।

বেআইনি ধ্বংসের নিন্দাঃ তিনি বেআইনিভাবে নির্মিত কাঠামো ভেঙে ফেলার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের পূর্বেকার রায়ের কথা উল্লেখ করে বলেছেন যে এই ধরনের ধ্বংসের কোনও বৈধতা নেই।

গুরুত্বপূর্ণ রায়ঃ তিনি বলেছেন যে বুলডোজার জাস্টিসের বিরুদ্ধে দেওয়া আদেশটি ছিল তাঁর লেখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রায়গুলির মধ্যে একটি।

এই কথাগুলো আমাদের মনে বেশ আশা জাগায়। বিশ্বাস হয় যে দেশে সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার রক্ষায় এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সুপ্রীম কোর্ট এক সতর্ক প্রহরী। কিন্তু ধাঁধা লাগে যখন দেখি বাস্তবে কী হচ্ছে।

দুই শতাব্দীর পুরনো মসজিদ ধ্বংস!

এই বছরের জানুয়ারি মাসে মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনী নগরে দুই শতাব্দীর প্রাচীন তাকিয়া মসজিদ এবং সংলগ্ন ২৫৭টি ঘর প্রশাসন ভেঙে দেয়। উদ্দেশ্য, মহাকালেশ্বর মন্দিরের একটি করিডর নির্মাণ প্রজেক্টের রূপায়ণ যাতে দর্শনার্থীদের গাড়ি পার্কিং এর জায়গা বাড়িয়ে দেওয়া যায়! তাছাড়া একটি সন্ন্যাসীদের 'প্রবচন' দেওয়ার হলও নির্মিত হবে। এসব আগামী ২০২৮ সালে উজ্জয়িনীতে যে কুম্ভমেলা হবে তার জন্য আবশ্যক।

রাজ্য সরকারের বক্তব্য উচ্ছেদ হওয়া লোকজনকে ৬৬ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে, ৩৩ কোটি ইতিমধ্যেই দেওয়া হয়েছে। হাইকোর্ট এই ভেঙে দেওয়াকে বে-আইনি মনে করে না।

অসন্তুষ্ট আবেদনকারীরা সুপ্রীম কোর্টে যায়।

তাদের বক্তব্যঃ

এক, মসজিদের জমি ওয়াকফের জমি হিসেবে ১৯৮৫ সালে স্বীকৃত এবং রেজিস্টার্ড এবং জানুয়ারিতে আচমকা বে-আইনিভাবে ভেঙে দেওয়া অবধি নিয়মিত আরাধনার স্থল ছিল।

দুই, রাজ্য সরকারের এই কাজ নিম্নোক্ত আইনকে লংঘন করছেঃ Places of Worship (Special Provisions) Act, 1991, The Waqf Act, 1995 and the Right to Fair Compensation and Transparency in Land Acquisition, Rehabilitation and Resettlement Act, 2013.

তিন, এছাড়া সংবিধানের আর্টিকল ২৫ দ্বারা প্রদত্ত ধর্মাচরণের অধিকারেরও পরিপন্থী।

হাইকোর্ট সরকারের যুক্তিকে সঠিক মনে করেছিল।

তা হচ্ছেঃ

এক, উপাসনা বা নমাজ পড়া যেকোনো জায়গায় হতে পারে। কোনও একটি নির্দিষ্ট স্থানেই হতে হবে এমন নয়। এটা মুসলিম উপাসনার আবশ্যিক অঙ্গ নয়। কাজেই আর্টিকেল ২৫ এখানে খাটবে না।

দুই, হিসেব করে ক্ষতিপূরণের টাকা দেওয়া হয়েছে। আর করিডর নির্মাণ একটি আইনসম্মত যোজনার রূপ দেওয়া। অতএব কোনো বে-আইনি কাজ হয় নি। আবেদকদের উকিল বলেন - একটি অন্য ধর্মস্থানের পার্কিং প্লেস নির্মাণের জন্য মসজিদ ভেঙে দিয়ে বলছেন আমাদের কোনও আইনি অধিকার নেই!

সুপ্রীম কোর্টের জাস্টিস বিক্রম নাথের বেঞ্চ আপিলের শুনানি করে ৭ নভেম্বর, ২০২৫ তারিখে।

রায় দেন - "Too late now. Nothing can be done. Dismissed."

বল মা তারা, দাঁড়াই কোথা?


সূত্রঃ

● 'দি হিন্দু', ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৫ এবং 'বিবিসি বাংলা', ২২ নভেম্বর, ২০১৫।
● 'বিবিসি বাংলা', ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৭।
● 'আনন্দবাজার', ২৬ মে, ২০১৯।
● 'মুসলিম মিরর', ১১ এপ্রিল, ২০২৩।
● 'মক্তব মিডিয়া ডটকম', ১৮ জুন, ২০২৫।
● 'ইন্ডিয়া টুমরো', ২৯ নভেম্বর, ২০২৫।
● Mohammed Taiyab Vs State of Madhya Pradesh; Hearing Date: November 7, 2025 Bench: Justices Vikram Nath and Sandeep Mehta.