আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ ত্রয়োবিংশ সংখ্যা ● ১-১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ ● ১৬-২৯ অগ্রহায়ণ, ১৪৩২

প্রবন্ধ

ওরা কাজ করে

অম্লানকুসুম চক্রবর্তী


জিরাফের মতো গলা উঁচিয়ে, তীব্র স্বরে বলেছিলাম, "দাদা! শুনতে পাচ্ছেন? বলি ও দাদা, আপনার ভয় করছে না?"

চারতলার উপরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির কানে আমার কথাগুলো হয়তো প্রথমবারে পৌঁছয়নি। চারতলার উপরে বললাম কেন? উপরে তো নয়, বাইরে। ছ'তলা ফ্ল্যাটবাড়িতে রঙের কাজ চলছিল। বাড়ির বাইরে থেকে খাড়া করা হয়েছিল বাঁশের প্ল্যাটফর্ম। প্ল্যাটফর্ম তো নামেই। আসলে বিরাট চওড়া একটা মই। ধাপ উঠে গিয়েছে ছাদ পর্যন্ত। চারতলার কাছাকাছি ধাপটিতে দাঁড়িয়ে দেওয়ালে রঙের প্রলেপ দিচ্ছিলেন তিনি। বয়স কত হবে? মেরেকেটে চল্লিশ। আমার চেঁচানোতে তিনি তখনও পর্যন্ত নিরুত্তাপ। ফলে নিজের গলায় আরও কিছু ডেসিবেল জুড়ে দিয়ে একই কথা আবার ছুঁড়ে দিতে হল। এবারে উনি শুনতে পেলেন। মুখ নামিয়ে আমার দিকে তাকালেন। তখন সকাল ন'টা পাঁচ। অফিসমুখো আমি। কাঁধে ল্যাপটপের ব্যাগ। সেই সপ্তাহে লেট হয়েছে পর পর দু' দিন।

কেন ভাই? ভয় করবে কেন?

মাথায় একটা হেলমেট তো পড়বেন অন্তত। অত উপর থেকে ঝপ করে যদি পড়ে যান?

পড়ব না।

দুর্ঘটনা বলে কয়ে আসে না। হঠাৎ কিছু হয়ে গেলে?

হবে না।

অত উঁচু থেকে পড়লে শরীর চিকিৎসা করানোরও কোনও সুযোগ দেবে না। ভীষণ রিস্কি।

বললাম তো, পড়ব না।

এভাবে কাজ করা তো আইনবিরুদ্ধ। কোনও প্রোটেকশান না নিয়ে কেউ এমন কাজে নামে?

এটা শোনার পরে আমার দিকে একদৃষ্টে চেয়েছিলেন মানুষটা। হাতের ইশারায় অপেক্ষা করতে বললেন। মই দিয়ে নেমে এলেন দ্রুত। পাশে এসে বললেন, "তুমি আমায় প্রোটেকশন দেবে নাকি?" আমি চুপ করে থাকি। কিছুক্ষণ পরে মিনমিন করে বলি, "যে আপনাকে দিয়ে কাজ করাচ্ছে, মানে ওই কনট্রাক্ট্রারেরই তো উচিত আপনাকে এই সুরক্ষা দেওয়া। এটা জানাজানি হলে তো ওকে ব্ল্যাকলিস্ট করে দেওয়া হবে। কোথাও বরাত পাবে না কাজের।" এটা শোনার পরে উনি যা উপহার দিলেন, তাকে সাদা বাংলায় অট্টহাস্য বলে। তবে সেই হাসির মধ্যে কোথাও যেন মিশেছিল মন খারাপের চোরাস্রোত। বললেন, "টিভিতে রঙের কোম্পানির বিজ্ঞাপন খুব দেখা হয় না? ঝকঝকে ইউনিফর্ম, হেলমেট, বেল্ট, চেন লাগিয়ে কপিকলের দড়ির মতো টকাস করে উপরে ওঠা, নীচে নামা দেখতে ভাল লাগে বেশ। ওরা মডেল রে ভাই, মডেল। ওইসব শুধু বিজ্ঞাপনেই হয়। আর বেশি কথা বললে কে ব্ল্যাকলিস্ট হবে জানো? আমি। এই মরা বাজারে কাজ জানা লোকের অভাব নেই। অফিসের পথে পা বাড়াও চুপচাপ।" লোকটি মইয়ের দিকে এগিয়ে গেলেন ফের।

সংবাদপত্রে পড়া কিছু খবরের কথা মনে উজিয়ে এলো হঠাৎ। স্থান-কাল-পাত্র মনে নেই। এমন খবরের জন্ম হয় প্রায়ই। অন্য খবরের ভিড়ে, অন্য দিনের একই খবরের সমাগমে আগের দিনের এমন সংবাদ বাসি হয়ে যায় খুব তাড়াতাড়ি। 'কোনও সুরক্ষা ছাড়াই কাজ করতে গিয়ে বহুতল থেকে পড়ে মৃত শ্রমিক'। 'নির্মীয়মান বাড়ি থেকে হঠাৎ পড়ে গিয়ে শ্রমিকের মৃত্যু'। এমন খবরের নিচে লেখা থাকে আরও একটি লাইন। 'বিধি না মেনে ওই শ্রমিক কেন কাজ করছিলেন, তা তদন্ত করে দেখছে পুলিস।' বলা বাহুল্য, ওই তদন্তের শেষ পর্যন্ত কী গতি হল, তা আমরা জানতে পারি না। রঙিন পৃথিবীর ঝিনচ্যাক জীবনে এসব জিনিস এত বিশদে জানতে চাওয়ার পরিণতি একটাই। অযথা কালক্ষয়।

বাড়ি তৈরি-সহ ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলোতে ঠিক কী কী নিয়ম মানা উচিত, তা নিয়ে নাকি আছে সরকারি নির্দেশিকা। ১৯৯৬ সালের 'বিল্ডিং অ্যান্ড আদার কনস্ট্রাকশান ওয়ার্কার্স অ্যাক্ট' স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় এমন কাজে শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কী করণীয়। এই বিধি বলে, কর্মীদের জন্য মজুত রাখতে হবে হেলমেট, জুতো, গ্লাভস। যাবতীয় সিঁড়ি এবং প্ল্যাটফর্ম হতে হবে সম্পূর্ণ নিরাপদ। রাখতে হবে ফার্স্ট এইডের ব্যবস্থা এবং জরুরি চিকিৎসার জন্য সঠিক বন্দোবস্ত। রয়েছে আরও কিছু বিষয় যা ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকদের শারীরিক সুরক্ষার উপরে বুলিয়ে দেয় নিরাপত্তার প্রলেপ। আরও জানা গেল, আইন লঙ্ঘনকারী সংস্থাগুলোর উপরে ধার্য করা হতে পারে কড়া জরিমানা। রয়েছে কারাবাসের রক্তচক্ষুও। একাধিকবার আইন ভাঙলে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে পারে শাস্তির পরিমাণও। বন্ধ হয়ে যেতে পারে নির্মাণকাজ। বাতিল করা হতে পারে টেন্ডার। আমার এক উকিলবন্ধু এ প্রসঙ্গে দিনকয়েক আগে বলছিল, "সবচেয়ে মজার ব্যাপার কি জানিস? আইন ভাঙার ফলে গত কয়েকবছরে ক'জনের জরিমানা হল বলে যদি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিস হাওয়ায়, কোনও উত্তর পাবি না। এই তথ্য প্রতিটা রাজ্যকে জানাতে হয় কেন্দ্রকে। হাতে গোনা কয়েকটা রাজ্য বাদ দিলে এই তথ্য কেউ দিল্লিকে জানায় না। ফলে এর কোনও সেন্ট্রাল ডেটাবেস নেই।" আমি বললাম, "ধ্যাত। এমন আবার হতে পারে নাকি? এত সিরিয়াস বিষয়ে এমন গা-ছাড়া মনোভাব? শাস্তির কথা প্রকাশ্যে না এলে বাকিরা ভয় পাবে কী করে?" আমার উকিলবন্ধু হেসে ফেলল খিলখিলিয়ে। বলল, "আমার কথা বিশ্বাস না হলে অন্য কাউকে জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারিস।" টকাটক টাইপ করলাম এআই প্ল্যাটফর্মে। উনিই তো একালের সিধুজ্যাঠা। সর্বজ্ঞানী। যে কার্সার উত্তর দেওয়ার জন্য জিওল মাছের মতো লাফায়, তা স্তব্ধ হল। একুশ সেকেন্ডের অনুসন্ধানের পরে পর্দায় ফুটে উঠল, 'আমি এমন কোনও বিশ্বস্ত, কেন্দ্রীয় বা সার্বভৌম পরিসংখ্যান খুঁজে পাইনি যা প্রমাণ করে কতজনের বিরুদ্ধে এমন জরিমানা ধার্য করা হয়েছে।' ফোন করলাম ঝটিতি আমার সেই উকিলবন্ধুকে। ও প্রান্ত থেকে শুনতে পেলাম, "জানতাম ফোন করবি। সব কিছু দেখে ফেলেছিস, ঘেঁটে ফেলেছিস নিশ্চয়ই। এবারে আমার কথাগুলো বিশ্বাস হল তো?"

স্কুলজীবনে নিজের চোখে দেখা একটি ঘটনার কথা মনে পড়ল হঠাৎ। তখন আমার ক্লাস সিক্স কিংবা সেভেন। স্কুলে যাচ্ছিলাম পুলকারে। দু'তলা বাড়ির সমান একটি ল্যাম্পপোস্টের পাশে হেলিয়ে দাঁড় করানো মইয়ে উঠছিলেন এক কর্মী। পাশ কাটিয়ে এগোতে যাওয়ার সময় মইটিতে ধাক্কা মারে একটি মোটরবাইক। উঁচু থেকে বেঘোরে পড়ে যাওয়া ওই মানুষটির আর্ত চিৎকার কানে বাজে এখনও। কয়েক দশক পেরিয়ে গিয়েছে এর পর। বয়স বেড়েছে। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার ধরণে কোনও পরিবর্তন আমার চোখে পড়েনি। আজও গলির মোড়ের ইলেকট্রিক স্তম্ভের উপরে পেটের দায়ে মই বেয়ে উঠে যান কোনও মানুষ। সাত তলা দশ তলা বাড়িতে রং হয়। চলে সারাইয়ের কাজ। সামান্য একটি হেলমেটও জোটেনা সেই শ্রমিকদের। ব্যস্ত জীবনে আমরা ছুটে চলি নিরন্তর।

মাটির তলায় ঢুকে, পাতালে প্রবেশ করে যাঁরা আমাদের সুখে রাখতে চান, তাঁরাও রয়েছেন একইরকম সঙ্কটে। ২০১৩ সালে তৈরি হওয়া 'প্রহিবিশন অফ এমপ্লয়মেন্ট অ্যাজ ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জার্স অ্যান্ড দেয়ার রিহ্যাবিলিটেশন আইন'-এর বাস্তবিকীকরণ অনেকাংশে আজও পর্যন্ত অথৈ জলে। ম্যানহোলে কাজ করতে গিয়ে বিষাক্ত গ্যাসের ছোবলে ঘটেছে একাধিক মৃত্যু। কয়েক কোটি টাকা খরচ করে স্বয়ংক্রিয় ভাবে নিকাশীব্যবস্থার যত্ন নেওয়ার জন্য যে মেশিনগুলো কেনা হয়েছিল, তা কতটা ব্যবহার হচ্ছে জানার কোনও উপায় নেই। সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, ম্যানহোলে মানুষ নামিয়ে নালা ও নিকাশী ব্যবস্থার কাজ করানো নিষিদ্ধ। কিন্তু তা মানা হচ্ছে কি না দেখার কোনও সঠিক ব্যবস্থা আমরা আজও করে উঠতে পারলাম না। মৃত্যু হলে ক্ষতিপূরণের দাবিতে কয়েকদিন সরগরম থাকে সামাজিক মঞ্চ। কিন্তু, দ্রুত তেল শেষ হয়ে যাওয়া প্রদীপের মতোই তা নিভে যায়। শ্লোগান ফিসফাস হয়। ফিসফাস এর পরে রূপ পায় মৌনতায়, আবার পরবর্তী খবরের জন্ম না হওয়া পর্যন্ত। মৃত্যুমিছিলে নড়েচড়ে বসে কেন্দ্র কখনও ধমক দেয় রাজ্যকে। রাজ্য চুপ করে থাকে। ছোটবেলায় শোনা কথাগুলো সত্যি হয়ে যায় আবার। বোবার কোনও শত্রু নেই।

আইনের মারপ্যাঁচ নিয়ে কথা বলার জন্য যোগ্য লোক আমি নই। তবে শুধুমাত্র সুরক্ষাবিধি নিশ্চিত করতে না পারার জন্য শ্রমিকের বেঘোরে মৃত্যুর খবর চামড়ায় ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ ফুটিয়ে দেওয়ার মতো লাগে। কয়েক সেকেন্ডের যন্ত্রণা। ফ্রেশ হয়ে আমি বাথরুমের ফ্ল্যাশ টানি। জল কোথায় যাচ্ছে, বেশি জেনে কি লাভ? আমি জিরাফের মতো ঘাড় উঁচিয়ে দেখি। এখন আর বলি না কিছুই। আমার পিঠে ল্যাপটপ। আমার সপ্তাহে দু'দিন লেট হয়ে যায়। আমি হনহন করে ছুটি।