আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ ত্রয়োবিংশ সংখ্যা ● ১-১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ ● ১৬-২৯ অগ্রহায়ণ, ১৪৩২

সম্পাদকীয়

'বুলডোজার রাজের' নতুন অস্ত্র শ্রম আইন - ২০২৫


পাড়ায় পাড়ায় দুষ্কৃতিদের শব্দকোষে যেমন দুরমুশ শব্দটা চালু আছে ঠিক তেমনটাই এখন ভোটে জেতা শাসকদল পথে নেমেছে তাদের প্রতিপক্ষকে দুরমুশ করতে। ফলে বিহারের নির্বাচনী ফল প্রকাশ হওয়ার অব্যবহিত পরেই সরকার শিল্পক্ষেত্রে শ্রমজীবী মানুষকে দুরমুশ করতে ঝোলা থেকে বের করেছে নতুন শ্রম আইন। গেরুয়া শাসকের দৃষ্টিতে দেশজুড়ে বিভাজনী রাজনীতির নতুন মডেল এসআইআর বিহারে সফল হয়েছে। এমন প্রেক্ষিতে হিন্দুত্বের রাজনীতির সাথে কর্পোরেট অর্থনীতির যে ককটেল, তার দ্রুত বাস্তবায়নের পথ খুঁজছে শাসক। বিহার ভোটে নিরঙ্কুশ জয়ের পেছনে যেমন কাজ করেছে হিন্দুত্বের মেরুকরণের লক্ষ্যে এসআইআর তেমনই সেই ভোটে আদানি আম্বানিদের মতো শাসক বন্ধু কর্পোরেটরা বিপুল পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করেছিল ভোটের ফলাফল প্রভাবিত করতে। ফলে সেই নির্বাচন জয়ের পরেই দেশজুড়ে কর্পোরেট অর্থনীতির পথ সুগম করতে দেশের গেরুয়া শাসক দ্রুত বাজারে নিয়ে এসেছে নতুন শ্রম আইন।

গত দু' দশকে এদেশে আর্থিক বৈষম্য উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে। কর্পোরেট শিল্পগোষ্ঠীর নেতৃত্বে আর্থিক মানদণ্ডে দেশের ওপরতলার ৫% মানুষ ভোগ করে দেশের ৬০% সম্পদ। কার্যত এমন বৈষম্য তৈরি হচ্ছে দেশজুড়ে এই কর্পোরেট লুঠের মাধ্যমেই। আর এখন সেই কর্পোরেট লুঠের কার্যকরী পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে দেশের সরকার। ফলে এই নতুন শ্রম আইনে প্রত্যাশিতভাবেই শ্রমিক শোষণের বাড়তি মাত্রা, শ্রমিক কল্যাণ কিংবা শ্রমিক সুরক্ষার খরচ ছাঁটাই হয়ে উঠেছে পাখির চোখ। দেশের ধ্বসে পড়া অর্থনীতিতে বাজারের প্রসার থমকে দাঁড়িয়েছে সরকারের ভ্রান্ত নীতিতে। এই প্রেক্ষিতে উৎপাদন বাড়িয়ে বাড়তি লাভের বাজার যখন স্থির হয়ে গেছে তখন উৎপাদনের খরচ কমিয়ে কর্পোরেট লাভের নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে শ্রমিক কর্মচারীদের ওপর শোষণের মাত্রা বাড়িয়ে। কৃষিভিত্তিক এদেশের অর্থনীতিতে এখন শিল্প পরিষেবার পাল্লা ভারী। ফলে দেড়শ কোটি মানুষের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ জীবন জীবিকার জন্য ওই শিল্প পরিষেবা ক্ষেত্রের উপর নির্ভরশীল। এ দেশে অসংগঠিত ক্ষেত্রের তুলনায় সংগঠিত শিল্পক্ষেত্রে শ্রম সুরক্ষা থেকে মজুরি তুলনায় উন্নত। আর সংগঠিত ক্ষেত্রেই কর্পোরেট শিল্পগোষ্ঠীর উপস্থিতি সর্বাধিক। ফলে কর্পোরেট লাভ বাড়ানোর লক্ষ্যে শ্রমিকদের মজুরি থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রমিক কল্যাণ প্রকল্পে খরচ ছাঁটাই জরুরি। ফলে জরুরী হয়ে উঠেছে শিল্পগোষ্ঠীর স্বার্থে শ্রমিক স্বার্থ বলি দিয়ে তৈরি ওই নতুন শ্রম আইন। যার পোশাকি নাম দেওয়া হয়েছে 'লেবার কোড'।

ঐ শ্রম আইনের মূল লক্ষ্য হিসেবে সরকারি ভাষ্যে ঘোষিত হয়েছে দেশের শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণের কথা।কিন্তু যাঁদের কল্যাণে এমন নতুন আইন চালুর তোড়জোড় শুরু হয়েছে দেশজুড়ে, সেই শ্রমিক সংগঠনগুলি ওই প্রস্তাবিত শ্রম আইনের তীব্র বিরোধিতা করছে। করোনাকালে কৃষক কল্যাণের নাম করে রাতের অন্ধকারে দেশের সরকার কৃষি আইন চাপিয়ে দিতে চাইলেও সরকারকে শেষমেশ প্রবল আন্দোলনের চাপে পিছু হটতে হয়েছিল। এখন দেখার শ্রমিক কল্যাণের নামে নতুন এই দানবীয় শ্রম আইনের বিরুদ্ধে শ্রমিক আন্দোলন কোন মাত্রায় পৌঁছায়?

একদিকে দেশের প্রধানমন্ত্রী এই আকালের বাজারে 'আত্মনির্ভর ভারত' গড়ার বিজ্ঞাপনে দেশীয় শিল্পপ্রযুক্তির বিকাশের ডাক দিচ্ছেন। আর অন্যদিকে সেই শিল্পের সাথে জড়িয়ে থাকা কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষের ন্যূনতম মজুরি থেকে সুরক্ষা বাতিল করছেন আইন বানিয়ে। নতুন এই শ্রম আইনে দেশের শিল্প পরিষেবা ক্ষেত্র জুড়ে তৈরি হওয়া স্থায়ী চাকরির ধারণাকে ধূলিস্মাৎ করা হয়েছে। স্থায়ী চাকরি কিংবা কাজের পরিবর্তে অস্থায়ী চুক্তিভিত্তিক কাজই পাখির চোখ হয়ে উঠেছে নতুন আইনে। ফলে শিল্পক্ষেত্রে স্থায়ী কর্মীদের চাকরির মেয়াদ কিংবা তাঁদের কর্মক্ষেত্রে কল্যাণ ও সুরক্ষার স্বার্থে যে যে ব্যবস্থা চালু ছিল, অস্থায়ী চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকদের ক্ষেত্রে তার কোনোটাই থাকছে না প্রস্তাবিত নতুন আইনে। ফলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পথ ধরে শ্রমিকের বিধিবদ্ধ সুযোগ সুবিধার যাবতীয় দায়-দায়িত্ব কর্পোরেট শিল্পগোষ্ঠী অনায়াসে ঝেড়ে ফেলতে পারবে এই শ্রম আইনকে ঢাল বানিয়ে। নতুন আইনে শ্রমিকদের কাজের মেয়াদ ৮ ঘণ্টা থেকে বাড়িয়ে ১২ ঘণ্টা অবধি প্রস্তাবিত হয়েছে। পাশাপাশি শ্রমিকদের প্রভিডেন্ট ফান্ডে শিল্প মালিকদের প্রদেয় পরিমাণ বেতনের ১২% থেকে কমিয়ে ১০% করা হয়েছে। ফলে নতুন আইনে না থাকছে শ্রমিকের বেতন-পিএফ-পেনশনের নিশ্চয়তা, কাজের নির্ঘণ্টের নিশ্চয়তা, সুরক্ষার নিশ্চয়তা অথচ শ্রমিক ছাঁটাই-এর নিশ্চয়তার গ্যারান্টি করা হয়েছে নতুন ওই শ্রম কোডের বিভিন্ন ধারা উপধারা জুড়ে।

দেশের চালু আইনে কোনো শিল্প সংস্থায় অন্তত ১০০ জন শ্রমিক কাজ করলে সেখানে তাদের ছাঁটাই কিংবা লে-অফ-এর ক্ষেত্রে এতদিন সরকারি অনুমোদন প্রয়োজন ছিল। কিন্তু নতুন আইনে কোনো শিল্প সংস্থায় অন্তত তিনশ জন শ্রমিক কর্মচারী না থাকলে সেই সুরক্ষা আইন আর প্রযোজ্য হবে না। এখানে উল্লেখ্য যে এদেশে ২০২৩- ২৪ সালে গড়ে শিল্পপিছু শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৭৩ জন। এমন প্রেক্ষিতে শিল্পে কর্মীর সংখ্যা ১০০ থেকে ৩০০ হয়ে গেলে এদেশের সিংহভাগ শিল্প কারখানা যে সেই আইনের আওতার বাইরে চলে যাবে, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। ফলে নতুন এই শ্রমবিধি কার্যত শিল্প মালিকদের দেশজুড়ে একচ্ছত্র শ্রমিক ছাঁটাই-এর অধিকার প্রতিষ্ঠা করছে। পাশাপাশি শিল্পক্ষেত্রে শ্রমিকদের প্রতিবাদ আন্দোলন শায়েস্তা করতে ট্রেড ইউনিয়নের ওপরেও রাশ টানা হয়েছে। কার্যত শ্রমিক শোষণের যাবতীয় পদ্ধতি নিষ্কণ্টক করে তুলতে শ্রমিকদের বিভিন্নভাবে ব্ল্যাকমেল করার ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে নতুন এই একপেশে শ্রম আইনে যেটা আদ্যন্ত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী এবং শ্রমজীবী মানুষের মানবাধিকার হরণের অস্ত্র। এই আইনে নতুন বিপদ ঘনিয়ে আসছে পরিযায়ী শ্রমিকদের যাঁদের বিভিন্ন রাজ্যে নিয়োগ করে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা। নতুন আইনে এমন সংস্থাগুলিতে পঞ্চাশের নিচে কর্মী কাজ করলে তাদের আর কোনও লাইসেন্স নিতে হবে না। ফলে লাইসেন্সহীন ওই সংস্থাগুলি, শেষমেশ শ্রমিক শোষণের বুলডোজার হয়ে উঠবে। যেখানে উপেক্ষিত হবে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি থেকে কর্মক্ষেত্রে তাদের নিরাপত্তা। ফলে এমন লাইসেন্সহীন সংস্থাগুলিতে ভিন রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে শ্রমিক মারা গেলেও ক্ষতিপূরণ দূর অস্ত বরং তাঁদের স্থান হবে নিরুদ্দেশের তালিকায়। দেশের শ্রম আইন মূলত দেশের শিল্পক্ষেত্রে শ্রমিক কর্মচারীদের নিয়ন্ত্রণের ফাঁসে ফেলার অস্ত্র হলেও সেই আইন শেষমেশ দেশের নাগরিক সমাজের কাছে 'একুশে আইন'-এর প্রতিচ্ছবি তুলে ধরছে। গভীরতর বিপদের বীজ রয়েছে সেখানেই!