আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বাবিংশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ নভেম্বর, ২০২৫ ● ১-১৫ অগ্রহায়ণ, ১৪৩২
প্রবন্ধ
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম!
গৌতম সরকার
প্রতিটি মানুষই তার নিজের সময়কালকে সেরা ভাবতে ভালোবাসে। পরিবারের পিতামহের মতে তাঁদের সময়ই ছিল সেরা, একই অভিমত পরিবারের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের পুরুষদেরও। তাই সেই অর্থে কোন প্রজন্ম সবথেকে ভালো সেটা বোঝার কোনও বৈজ্ঞানিক ফর্মুলা নেই। এই মুহূর্তে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বর্তমান প্রজন্ম, 'জেন জি'। এই 'জেন জি'-এর আচরণ নিয়ে তাদের আগের প্রজন্ম 'মিলেনিয়ালস' এবং তারও আগের প্রজন্ম 'জেন এক্স' যারপরনাই উদ্বিগ্ন। তবে এ আর নতুন কথা কি? যুগ যুগ ধরে এক প্রজন্ম তার পরের প্রজন্ম নিয়ে অভিযোগ ও অসন্তোষ পোষণ করে এসেছে। একটু প্রাচীনকাল চর্চা করলে বিষয়টির সম্যক অবধাবন ঘটবে।
গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিসের ছাত্র ছিলেন প্লেটো, আবার প্লেটোর ছাত্র হলেন অ্যারিস্টটল। এঁরাও তাঁদের পরের প্রজন্ম নিয়ে উদ্বেগ ব্যক্ত করে গেছেন। খ্রিস্টপূর্ব তিনশো বছর আগে প্লেটো বলেছেন, "আজকের তরুণদের মধ্যে এসব কী হচ্ছে? তারা পিতামাতার অবাধ্য, গুরুজনদের সম্মান করতে জানেনা। আইন কানুন মানেনা, অকারণে দাঙ্গা-হাঙ্গামায় সামিল হয়, এদের নৈতিকতার সার্বিক অবক্ষয় ঘটে গেছে, এই প্রজন্মের কী হবে?" সক্রেটিস তাঁর পরের প্রজন্ম নিয়ে কী বলছেন দেখা যাক - "এই প্রজন্ম বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দিতে পটু। এদের আচরণ খারাপ। বড়দের সম্মান করতে জানেনা, স্বভাবে স্বেচ্ছাচারী। পিতামাতার বিরোধিতা করাই এদের স্বভাব। এরা ঘরে বাইরে, শিক্ষাক্ষেত্রে ও চাকরি জগতে 'ডোন্ট কেয়ার' অ্যাটিটিউড নিয়ে সবাইকে উপেক্ষা করে।" প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এইসব মনীষীদের বক্তব্য পড়লে থমকে যেতে হয়, আরে এসব তো আমাদেরই কথা!
তবে শুধু প্লেটো বা সক্রেটিস নয়, তারও বেশ কয়েক হাজার বছর আগেও মানুষ একই ভাবে ভাবতো। মিশরের পিরামিডের ভিতরে হায়ারোগ্লিফিক্স লিপিতে অনেক বাণী লেখা আছে। এইরকম এক হায়ারোগ্লিফিকে পিরামিডের প্রতিষ্ঠাতার লিখিত একটি বাণী হল এইরকম, "পরবর্তী প্রজন্ম সময়কে সম্মান করেনা, অর্থকে সম্মান করেনা। গুরুজনদের অশ্রদ্ধা করে। তারা অলস স্বভাবের, তাদের বাস্তব জ্ঞানের অভাব আছে। আমি জানিনা তারা কীভাবে টিকে থাকবে!" প্রায় সাত হাজার বছর আগেও নবীনের প্রতি প্রবীণের সেই একই অভিযোগ, সেই একইরকম ভরসাহীনতা। আজকের মিলেনিয়ালসদের পরবর্তী প্রজন্ম 'জেন জি'-কে নিয়েও একই অভিযোগ নয় কি? তাহলে এই দ্রুত বদল, উন্নত জীবনযাত্রা, প্রযুক্তির উন্নতি, অফলাইন ছেড়ে অনলাইন জীবনে উল্লম্ফন, সবকিছু সত্ত্বেও আক্ষেপ আর অসন্তোষের জায়গাগুলো কি প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই জায়গায় মাথা খুঁড়ে মরছে?
জেটগতির দুনিয়ার সাথে পাল্লা রেখে বদলে যাচ্ছে সময় - রুচি, পছন্দ, স্বভাব, চরিত্র, ভালোমন্দ, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, চাকরি, যাবতীয় যাপন পদ্ধতি। এই দ্রুত ওঠাপড়ার অভিঘাতে সমকালীন প্রজন্মের স্বভাবগত বিবর্তন ঘটে চলেছে। এই পরিবর্তন অনেক সময়ই পূর্ববর্তী প্রজন্মের মনঃপুত হচ্ছে না, তখনই শুরু হচ্ছে সংঘাত, দুই প্রজন্মের ভালোমন্দের চুলচেরা বিচার। অনেক গবেষকের মতে, এখনও পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ প্রজন্ম হল 'মিলেনিয়ালস প্রজন্ম'। 'মিলেনিয়ালস'দের নিয়ে চলা এই অভিযোগ নিয়ে বিখ্যাত মার্কিন ম্যাগাজিন 'দ্য আটলান্টিকা'য় একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। সেই প্রবন্ধে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পাঁচটি প্রজন্মের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হয়েছিল।
১. গ্রেটেস্ট জেনারেশনঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর হয়ে যাঁরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে শহীদ হয়েছিলেন, তাঁরাই এই প্রজন্মের অন্তর্ভুক্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত (১৯৩৯-৪৪) সময়কালকে 'গ্রেটেস্ট জেনারেশন' সময়কাল ধরা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীর সেনাদের সম্মানার্থে মার্কিন সাংবাদিক ও লেখক টম ব্রোকা এই নামটি চালু করেন।
২. বেবি বুমারসঃ যুদ্ধ পরবর্তী (১৯৪৬-৬৪) সময়ে জন্ম নেওয়া প্রজন্ম। এই সময়ে পৃথিবী জুড়ে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যুদ্ধের ফলে বহু পুরুষ মারা যান, অনেক নারী যুদ্ধাপরাধের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। যুদ্ধফেরত পুরুষেরা বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। এর ফলে শিশু জন্মের হার উল্লেখোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
৩. জেনারেশন এক্সঃ এই প্রজন্মের জন্মকাল ১৯৬৫ থেকে ১৯৮০ সাল। ইতিহাসবিদেরা এই প্রজন্মকে বিশৃঙ্খলা ও অনিশ্চয়তার প্রজন্ম হিসেবে চিহ্নিত করেন। এই প্রজন্ম বহু সামাজিক উত্থান পতনের সাক্ষী থেকেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল, 'যৌথ পরিবার প্রথা'র ভাঙন।
৪. মিলেনিয়ালসঃ এরা হলেন সেই প্রজন্মের শরিক যাঁরা ১৯৮১-১৯৯৬ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছেন। এদের শৈশব কেটেছে ইন্টারনেট যুগের আগে। যখন ন'য়ের দশকের শেষ ভাগে এবং একবিংশ শতাব্দীর গোড়ায় ইন্টারনেট বিস্ফোরণ ঘটছে তখন তারা কলেজ বা সদ্য চাকরির জগতে পা দিয়েছে। তারপর হোঁচট খেতে খেতে ডেস্কটপ, ল্যাপটপের হার্ডলস পেরিয়ে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, পাওয়ার পয়েন্ট, ট্যুইটার আয়ত্ত করে এক্সেল শিট, গুগল ফর্ম, ডিজিট্যাল প্রেজেন্টেশনের যুগে নিজেদের আস্তে আস্তে মানিয়ে নিতে শিখেছে। এই জেনারেশনই সবচেয়ে দ্রুতগতিতে সবচেয়ে বেশি বদল প্রত্যক্ষ করেছে এবং সেই পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিয়েছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে এদের কাছে রেডিও, অ্যান্টেনা লাগানো ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট টেলিভিশন, বিজয়ার শুভেচ্ছা মাখা ডাক চিঠি, ল্যান্ডলাইন, দোতলা বাস, টিকিওয়ালা ট্রামগাড়ি, গ্যাসের বাতি, ভিস্তিওয়ালা সব অতীত হয়ে গেছে।
৫. জেন জিঃ ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া এই প্রজন্মই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। মিলেনিয়ালদের সঙ্গে এই 'জেন জি'দের মূল পার্থক্য হল, এদের জন্ম, বেড়ে ওঠা সবটাই ঘটেছে ডিজিট্যাল দুনিয়ায়। তাই স্মার্টফোন আর অনলাইন জীবনযাপন এদের মজ্জায় মিশে গেছে। মোবাইল মুখে বড় হয়ে ওঠা এই প্রজন্মের চোখের সামনে সবসময় একটা স্ক্রিন থাকে। এরা চোখ তুলে সামনের মানুষের দিকে তাকাতে পছন্দ করেনা, অথচ ওই একই ব্যক্তিকে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, রিলসে দেখতে পছন্দ করে। এদের কথা বলার তাগিদ কম, বললেও গোটা বাক্য বলতে চায়না। এরা নতুন নতুন শব্দের আমদানি করছে যেগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে চলতে মিলেনিয়ালদের গলদঘর্ম হতে হচ্ছে, জেন এক্সকে ছেড়েই দিলাম। এদের আত্মসম্মান প্রখর, কিন্তু দায়বদ্ধতা কম। পান থেকে চুন খসলেই যেকোনো অংশগ্রহণ থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়, সে কর্মক্ষেত্রে হোক বা অন্য কোথাও! এর ফলে ঘরে-বাইরে এদের কোনও গুরুদায়িত্ব দেওয়ার আগে কর্তৃপক্ষ দু'বার ভাবে। 'জেন জি' প্রজন্মের সবথেকে বড় বৈশিষ্ট্য হল এদের যোগ্যতা থাক বা না থাক, নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে ভালবাসে। নিজেকে ছাড়া আশপাশের কোনও কিছুকে তোয়াক্কা করেনা। বাস বা ট্রেনের সহযাত্রী, আত্মীয়-পরিজন, পাড়াপড়শি থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের শিক্ষক, হাসপাতালের ডাক্তার, উকিল মোক্তার কাউকেই বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনা। তারা তাদের নিজেদের দুনিয়ায় নিজেরাই রাজা। জেন জি'র যুগটাকে অন্যার্থে 'আমি' বা 'আমি সর্বস্ব' যুগ বললে অতিশয়োক্তি হবে না। সেলফি হল সেই আমিত্ব জাহিরের সবচেয়ে বড় অস্ত্র বা আধার। এই আমিময় দুনিয়ায় দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে মানবিক সম্পর্ক, রকের আড্ডা, পাড়ার মাঠে ফুটবল পেটানোর উত্তেজনা, শীতের দুপুরে চড়ুইভাতির আনন্দ, একসাথে নৌকা বাওয়া, কোমরে গামছা বেঁধে পাড়ার দাদা-কাকা-পিসিদের বিয়েতে পরিবেশনের তৃপ্তি, সবকিছু। তবে এই একলা হতে চাওয়ার শুরু হয়েছে মিলেনিয়াল যুগে, ঠিক যখন যৌথ পরিবারের ঘেরাটোপ থেকে নিজের বৌ-ছেলে-মেয়ে নিয়ে বেরিয়ে মানুষ মাইক্রো-ফ্যামিলির সুখের সন্ধানে ফিরেছে।
অস্থির এই সময়ের অস্থিরতাই জেন জি-এর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। তাদের চোখে কোনও কিছুই স্থায়ী নয়, শুধু যুদ্ধ, ধ্বংস, মানুষের নিষ্ঠুরতা ছাড়া। তারা মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে বদলে যেতে দেখেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের 'অর্থনৈতিক উদার নীতি' থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের 'সংরক্ষণ নীতি'। বিগত এক দশকে চারবার ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর বদল দেখেছে, আবার একইসাথে দেখেছে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের গণহত্যা। তারপর ঘটে গেছে তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগ ক্ষেত্রে একের পর এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। এইসব ভালো-মন্দ, সৃষ্টি-ধ্বংস, প্রলয় 'জেন জি'-এর মানসিক স্বাস্থ্যে যে প্রভাব ফেলছে তার ফলেই তাদের চরিত্রে বদল ঘটে চলেছে সেটা ভুললে চলবে না।
এই প্রজন্মকে যতই অস্থিরমস্তিষ্ক, আত্মসর্বস্ব, দায়িত্ব-জ্ঞানহীন বলে দাগিয়ে দেওয়া হোক না কেন, একটা প্রজন্মকে বুঝতে গেলে যে ধৈর্য লাগে, সময় লাগে সেটা আমরা দিতে রাজি নই। অস্থিরতা মাপনের মাপকাঠি যদি 'অস্থির' হয়, চটজলদি হয়, সেই বিচারে গলদ থাকে। জেন জি-এর 'খোলা আকাশহীন' শৈশবের জন্য দায়ী কারা! তাদের স্বার্থপরতার পিছনে কারণ কী? তারা না পেয়েছে বাবা-মায়ের পূর্ণ যত্ন, না পেয়েছে দাদু-ঠাকুমা, কাকা-জ্যাঠার আদর ও সোহাগ, চার দেওয়ালের মধ্যেই এদের নিজেদের জগৎ খুঁজে নিতে হয়েছে। বিনোদনের জন্যে হাতে পেয়েছে স্মার্ট ফোন, ল্যাপটপ, রিমোট চালিত গাড়ি। হোমটাস্কের পাহাড় ডিঙোতে ডিঙোতে আর বাবা-মায়ের শখসাধ মেটাতে আরও সাত-সতেরো চর্চায় এদের শৈশব কেটেছে। আমরাই তাদের বাধ্য করেছি যোগাযোগহীন বিচ্ছিন্ন জীবন কাটাতে, তাই এই প্রজন্মের প্রতি আরেকটু সহনশীল হওয়া দরকার। বুঝতে হবে সময়টা দ্রুত বদলাচ্ছে। আগামী দিনে আরও বড় বদলের সাথে এদের মানিয়ে নিতে হবে তখন আমরা কেউ এদের পাশে থাকবো না। জগতের দায়ভার যখন তাদের উপর বর্তাবে তখন ঠিকই সামলে নেবে, যেমন ভাবে সামলেছে মিলেনিয়ালস বা তার আগে জেন এক্স। আমাদের মতো এরাও ভুল-ঠিক মিলিয়ে এগিয়ে যাবে, বন্ধুর পথে হয়তো ঠোক্কর খাবে, কিন্তু এগিয়ে যাবে। কারণ এগিয়ে যাওয়াই জীবনের ধর্ম, কারণ প্রজন্মের সঙ্গে সঙ্গে সময়ও পরিবর্তনশীল।