আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বাবিংশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ নভেম্বর, ২০২৫ ● ১-১৫ অগ্রহায়ণ, ১৪৩২

প্রবন্ধ

সমাজ বিজ্ঞানের বেসরকারিকরণ

শ্রীদীপ


সম্পদ সদাই দৃশ্যমান। তাকে অর্জন করা এক কাজ। তারপর তার দেখনদারী আরেক। দৃশ্যমান সম্পদ উন্মোচনের মাধ্যমে উদ্ভাসিত হয় শ্রেণি-পরিচয় ও শ্রেণি নির্ধারণের মানদণ্ড। এই প্রক্রিয়া, শ্রেণি-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। যে শ্রেণি ভোগ করতে সক্ষম, তাদের সাংস্কৃতিক পরিবেশ গঠিত হয় নানান বস্তুর ক্রয় ও প্রদর্শনের মাধ্যমে। উদারীকরণের পরবর্তী যুগে, সচেতন শ্রেণি-চরিত্রের ঘোষণা আরও ব্যাপক আকারে ও হাবেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। পরিচয়ের প্রতিযোগিতা, এখন আর শুধু সম্পত্তি, গাড়ি, পোশাক, অলঙ্কার বা আনুষঙ্গিক জিনিসে সীমাবদ্ধ নয় - সেই প্রতিযোগিতা, আরও আরও সামাজিক পুঁজির দখল ও প্রদর্শন চাইছে।

সামাজিক পুঁজি অর্জন ও তার প্রকাশ - মর্যাদার খেলায় অংশগ্রহণ করা ও তার সাফল্যের এক অপরিহার্য শর্ত। এই অংশগ্রহণ ও অধিকার অর্জনের খেলায়, সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদঃ শিক্ষাগত যোগ্যতা। শিক্ষার মান, স্থান এবং ধরন - নির্ধারণ করে শ্রেণিগত অবস্থান। তাই স্বাভাবিক কারণেই, গত এক দশকে, উচ্চশিক্ষার অবাধ বেসরকারিকরণে অভূতপূর্ব উল্লম্ফন ঘটেছে - যা আর কেবল ইঞ্জিনিয়ারিং, চিকিৎসা বা কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়।

বেসরকারি পুঁজি এখন সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও প্রবেশ করেছে এবং সেখানে দৃঢ়ভাবে নিজের অবস্থান তৈরি করছে - যে ক্ষেত্র, এতদিন পর্যন্ত, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির একচেটিয়া অধীনে ছিল। পনেরো বছর আগেও এটা অকল্পনীয় ছিল যে, ভারতের কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে, মানববিদ্যা বা সমাজ বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করার জন্য ছেলে মেয়েকে পাঠানো যেতে পারে, যেখানে খরচঃ পনেরো থেকে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা। কিন্তু এই অল্প সময়ের মধ্যেই, যা একসময় অকল্পনীয় ছিল, তা শহুরে অভিজাত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির একাংশের কাছে একেবারে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। এই নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ব্র্যান্ডিং ও ব্যবসায়িক মডেল তরুণদের কাছে এক ধরনের জীবনধারার প্যাকেজের প্রস্তাবনা দেয়। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি-প্রাপ্ত শিক্ষক-সমৃদ্ধ এই প্রতিষ্ঠানগুলি, এমন একাডেমিক বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতিশ্রুতি দেয়, যা বেহাল সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি হারিয়ে ফেলেছে।

একাডেমিক বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে এখানে রয়েছেঃ বিস্তীর্ণ জমির প্রতি আসক্তি ও লন রক্ষণাবেক্ষণ - যা ঔপনিবেশিক যুগের অবশিষ্ট অভ্যাস এবং যার জন্য প্রচুর জল নষ্ট হয়। ঘাস গজানোর মতো নিরর্থক নান্দনিক চিন্তা, জৌলুস বৃদ্ধির এক অপরিহার্য অংশ। বাহারি গাছ এখানে ন্যায্য কিন্তু শিক্ষার্থীদের জন্য সেই একশো একরে - ফল ও শস্য উৎপাদনের চিন্তা একেবারে ব্রাত্য।

কল্পনাহীন কাঁচ-ইস্পাত-কংক্রিটের এ এক বিচিত্র সমন্বয়। কর্পোরেট মূলধন ও মুনাফা দ্বারা সাজানো এই পরিপাটি প্রাচীরঘেরা ক্যাম্পাসগুলো বিশেষ সুবিধাভোগীদের জন্যই উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছে। এই বিলাসবহুল ক্যাম্পাসজীবন উপভোগ করতে পারে কেবলমাত্র সীমিত সংখ্যক গ্রাহক। এখানে অভিভাবকদের আকাঙ্ক্ষা পুনরুৎপাদিত হয় এমন এক পরিবেশে, যা উচ্চশ্রেণিগত আধিপত্য ও অবজ্ঞার নিশ্চয়তা দেয়। এতে সামাজিক ন্যায়বোধ বা সকলের জন্য শিক্ষার সাম্যতামূলক মূল্যবোধের কোনো ভান নেই।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শ্রেণি ও জাতিভিত্তিক একরূপতা বহন করে। অন্তর্ভুক্ত করার বা বিশ্ববিদ্যালয়কে সমতাভিত্তিক ক্ষেত্র হিসেবে দেখার কোনো দায়বদ্ধতা তার নেই। সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চল বা রাজ্য-বোর্ড থেকে আসা ছাত্রছাত্রীদের প্রায়-অনুপস্থিত একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়ঃ শিক্ষার অধিকার এখানে নির্লজ্জভাবে সংরক্ষিত ও সীমাবদ্ধ।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই শিক্ষা প্রয়াস, হয় ডিগ্রি বিক্রি করছে অযোগ্য অথচ ধন-সম্পন্ন প্রার্থীকে; অথবা এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলি কার্যত বিদেশে স্নাতকোত্তর অধ্যয়নের জন্য প্রস্তুতিমূলক বিদ্যালয়ের মতো কাজ করছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে উত্তীর্ণ প্রায় কোনো ছাত্রছাত্রীই ভারতে গবেষণা বা উচ্চতর পড়াশোনার জন্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে না বা করতে পারে না। সামাজিক বিজ্ঞান ও মানববিদ্যায় একটি ডিগ্রি অর্জনের জন্য পঞ্চাশ লক্ষ টাকা ব্যয় করাটা, অনেকের কাছেই অযৌক্তিক ও বিস্ময়কর বলে মনে হতে পারে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপ থেকে একই ধরনের স্নাতক ডিগ্রি অর্জনে খরচ পড়ে তার দ্বিগুণ। সুতরাং, যারা এতটা ব্যয় করতে প্রস্তুত, তারা প্রকৃতপক্ষে বিদেশে যাওয়া কিছুদিনের জন্য পিছিয়ে দিয়ে আদতে আরও কিছু অর্থ বাঁচাচ্ছে আপাতত।

নিজের নিকটবর্তী পরিবেশ থেকে সচেতনভাবে বিচ্ছিন্ন এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একধরনের ইউটোপীয় ও রাজনীতিবর্জিত পরিসর। মহানগরের সীমানার প্রান্তে, সম্প্রতি বাণিজ্যিকীকৃত গ্রামীণ ভূমিতে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানগুলোঃ দ্বীপসদৃশ। জাতিভেদ, সাম্প্রদায়িকতা, প্রান্তিকতা, অপুষ্টি, দারিদ্র্য এবং গেটের বাইরের আরও বহু প্রাসঙ্গিক সামাজিক দুরাবস্থা থেকে কঠোরভাবে সুরক্ষিত। আসলে, নিরাপত্তা ও সুরক্ষার নামে এই উঁচু প্রাচীরগুলো শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসের বাইরের জীবনের প্রতিদিনের বাস্তবতা থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে রাখার আয়োজন।

'সমালোচনামূলক চিন্তন' এবং 'আন্তঃবিষয়কতা'-র উপর অতিরঞ্জিত জোর এখন এক ধরনের বিক্রয়যোগ্য স্লোগানে পরিণত হয়েছে, যা আশেপাশের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতি নজর এড়িয়ে যায়। প্রশ্ন থেকে যায় - এমন সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে কতটা নিষ্ঠার সাথে সমাজ বিজ্ঞান শিক্ষণ সম্ভব? সমাজ বিজ্ঞানের মৌলিক লক্ষ্যই হলো বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামো ও সামাজিক স্থিতাবস্থাকে প্রশ্ন করা। সুতরাং মতবিরোধ বা ভিন্নমত প্রকাশ - সমাজবিজ্ঞান শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু শ্রেণিগত স্বার্থের নিশ্চিত সুরক্ষার মধ্যে ভূমিষ্ঠ ও অবস্থিত, 'সমালোচনামূলক চিন্তন' কতটা সমসাময়িক জীবনের সমালোচক হতে পারে - তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই সংশয় জাগে।

সমালোচনার উৎসে রাজনৈতিক মতবাদ ও সামাজিক সংবেদনশীলতা ও প্রতিবাদী ভাষা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ কার্যত অনুপস্থিত। সেই অনুপস্থিতি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অনীহা থেকে নয়, বরং প্রতিবাদকেই এখানে অপ্রাসঙ্গিক ও অসামাজিক করে তোলা গেছে। সম্পূর্ণ আবাসিক এই ক্যাম্পাস-জীবন রেজিমেন্টের মতো পরিচালিত হয়ে থাকে - যেখানে রয়েছে অসংখ্য কারফিউ, বিধিনিষেধ ও দমনমূলক প্রক্রিয়া। এই দমনমূলক প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রে প্রায়ই নিযুক্ত প্রাক্তন সেনা-অধিকারীরা, যারা শান্তিপূর্ণ সংগঠিত প্রতিবাদকেও শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করেন। অনেক সময় এই বিধিনিষেধগুলি অভিভাবকীয় নিষেধাজ্ঞার থেকেও কঠোর, অথচ সেগুলি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করা হয় - যেহেতু ছাত্রছাত্রীরা কঠোর নজরদারির অধীনে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। কোর্স বেছে নেওয়া বা কোর্স পরিবর্তনের মূল্যবান স্বাধীনতা, তাই প্রায়শই আসে, ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিনিময়ে।