আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ একবিংশ সংখ্যা ● ১-১৬ নভেম্বর, ২০২৫ ● ১৬-৩০ কার্তিক, ১৪৩২

সম্পাদকীয়

ভোটার তালিকার রাজনীতি


পশ্চিমবঙ্গ সহ ১২টি রাজ্যে (২টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল) নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন [Special Intensive Revision (SIR)] প্রক্রিয়া ঘোষণা করল কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন। বর্তমান ভোটার তালিকা অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে ভোটার সংখ্যা ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ আর ১২টি রাজ্যের এই সম্মিলিত সংখ্যা প্রায় ৫১ কোটি। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকাকে নির্ভুল করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার আসল উদ্দেশ্য কি তাই?

এর আগে বিহারের ক্ষেত্রে এই SIR করা হল। সেখানে জুন মাসের ভোটার তালিকায় ছিল ৭ কোটি ৮৯ লক্ষ মানুষের নাম। খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ হওয়ার পরে দেখা যায় যে ৬৫ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গেছে। চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় নাম রয়েছে ৭ কোটি ৪২ লক্ষ মানুষের। খসড়া তালিকা থেকে আরও ৩ লক্ষ ৬৬ হাজার মানুষের নাম বাদ যায় আর যোগ করা হয়েছে প্রায় ২২ লক্ষ মানুষের নাম। সব মিলিয়ে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় নাম রয়েছে ৭ কোটি ৪২ লক্ষ মানুষের। অর্থাৎ বাদ গেছে ৪৭ লক্ষ মানুষের নাম। এর মধ্যে মহিলা এবং মুসলমানদের সংখ্যাধিক্য রয়েছে। প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ভারতীয় নাগরিকের ভোটাধিকার সংবিধান স্বীকৃত। কিন্তু বিহারের ক্ষেত্রে পরিযায়ী শ্রমিক, মহিলা ও মুসলমান সম্প্রদায়ের বহু মানুষের ভোটাধিকার চলে গেছে।

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে বিজেপি নেতারা লাগাতার মুসলমান মানুষদের নাম বাদ দেওয়ার কথা সোচ্চারে বলছেন। বাংলাদেশী, অনুপ্রবেশকারী ও রোহিঙ্গাদের নাম বাদ দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, আসলে মুসলমান মানুষদের টার্গেট করে। বিহারের ক্ষেত্রেও বলা হয়েছিল যে অনুপ্রবেশকারীদের নাম বাদ দেওয়া হবে। কিন্তু মুখ্য নির্বাচন কমিশনার কতজন অনুপ্রবেশকারীকে চিহ্নিত করে তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, সেই তথ্য দেননি, প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা হিসেব করে দেখিয়েছেন, অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত মানুষের সংখ্যা বিহারের ক্ষেত্রে নগন্য বললেও কম বলা হয়। কিন্তু তাতে কী! বিহারের নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহ লাগাতার অনুপ্রবেশকারী নিয়ে বিবৃতি দিয়ে নির্বাচনী প্রচারকে মেরুকরণের রাজনীতিতে আবারও পর্যবসিত করার চেষ্টা করে চলেছেন।

এমন নয়, যে দেশে প্রথমবার SIR হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে শেষবার হয়েছিল ২০০২ সালে। এই ভোটার তালিকা সংশোধন করার সময় নির্বাচন কমিশনের তরফে যাচাই করা হয়েছিল যে আপনি 'প্রকৃত ভোটার' কি না। সহজলভ্য দলিলের মাধ্যমেই তা প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছিল। ২০০২ সালের পরে এই রাজ্যে ৭টি নির্বাচন হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায়। সেখানে ভোট দিয়ে মানুষ কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার নির্বাচিত করেছে। কিন্তু এখন ২০২৪ সালের নির্বাচন তালিকাকেও নির্বাচন কমিশন গ্রাহ্য করছে না। তাদের কাছে মূল তালিকা ২০০২ সালের, যা ২৩ বছর আগের। কিন্তু কেন? যেই তালিকা ভিত্তি করে নরেন্দ্র মোদী দেশের প্রধানমন্ত্রী হলেন, তা কি জাল ছিল? যদি তাই হয়, তাহলে তাঁকে SIR শেষ হওয়া অবধি ইস্তফা দিয়ে অপেক্ষা করা উচিত সংশোধিত ভোটার তালিকার। কিন্তু তা তিনি করবেন না। ২০১৬ সালে আমাদের সবাইকে লাইনে দাঁড় করানো হয়েছিল নিজের সঞ্চিত টাকা ব্যাঙ্ক থেকে তোলার জন্য, কারণ তিনি নোটবন্দী করেছিলেন। ২০২৫ সালে আমাদের সবাইকে প্রমাণ করতে হবে যে আমরা এই দেশের নাগরিক!

SIR প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় ত্রুটি ও বিপদ এইটি। নাগরিকত্বের প্রমাণ নেওয়াই নির্বাচন কমিশনের মূল লক্ষ্য। আসলে এনআরসি ভারতে করা সম্ভব হয়নি। তাই SIR-এর মাধ্যমে নাগরিকত্বের পরীক্ষা দিতে হবে আপামর জনসাধারণকে। নির্বাচন কমিশনের নাগরিত্ব যাচাই করার কোনও আইনি এক্তিয়ার আছে কি না, তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের রয়েছে। আমরা আশা করব, আর বিলম্ব না করে সুপ্রিম কোর্ট এই প্রশ্নে তাদের মতামত রাখবেন।

কিন্তু নাগরিকত্ব প্রমাণ করার জন্য যেই দলিলগুলি নির্বাচন কমিশন চাইছে, তা কি যুক্তিপূর্ণ? প্রথমত, ২০০২ সালের নির্বাচনী তালিকায় অনেকের নামই থাকবে না। সেই ক্ষেত্রে তাদের বাবা-মা বা কোনো আত্মীয়র নাম এই তালিকায় আছে তা প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু সাধারণ গরীব মানুষের পক্ষে এই তালিকা যোগাড় করে, সেখানে নিজের নাম আছে তা খুঁজে বার করে প্রমাণ হিসেবে তা দাখিল করা সহজ নয়। এই দুই দশকের মধ্যে আপনার শহর পরিবর্তন হয়ে থাকতে পারে, জেলা পরিবর্তন হতে পারে, অতএব ঠিকানা পরিবর্তিত হবে। ২৩ বছর আগে আপনি কোন স্কুলে ভোট দিতেন, এমনকি বিধানসভার নামও পরিবর্তন হয়ে গিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু আপনাকে ওই তালিকায় আপনার নাম আছে, তা এই সমস্ত কিছু অতিক্রম করে প্রমাণ করতে হবে।

এরপরে আসবে দলিলের কথা। সুপ্রিম কোর্ট বারংবার বলা সত্ত্বেও আধার কার্ডকে প্রামাণ্য দলিল হিসেবে গ্রাহ্য করতে অস্বীকার করছে নির্বাচন কমিশন। সব থেকে সহজলভ্য দলিলকে কেন প্রামাণ্য দলিল হিসেবে গ্রাহ্য করা হবে না, তার উত্তরে নির্বাচন কমিশন জানাচ্ছে যে আধার কার্ড নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। তাহলে জন্মের শংসাপত্র কি নাগরিকত্বের প্রমাণ? তাও নয়। কিন্তু একটা গ্রাহ্য করা হবে, আরেকটি নয়। এর থেকেই প্রশ্ন জাগে যে সবাইকে ভোটার তালিকায় নথিভুক্ত করা নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্য, নাকি মানুষকে হয়রান করে তাদের নাম বাদ দেওয়াই উদ্দেশ্য?

SIR-এর মাধ্যমে আমাদের দেশের সাংবিধানিক কাঠামোর একটি গুরুতর রূপান্তর নির্বাচন কমিশন করে ফেলেছে, প্রায় নিঃশব্দে। এর আগে রাষ্ট্র নিজেই সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে ভোটার তালিকায় জায়গা দেওয়ার বিষয়ে মূল দায়িত্ব নিত। কোনও বেনাগরিক সেই তালিকায় স্থান পেলে, তাকে অযোগ্য প্রমাণ করার দায় নিত রাষ্ট্র। কিন্তু এখন ভোটার তালিকায় নাম তোলার দায়িত্ব সাধারণ মানুষের। রাষ্ট্রের নয়। প্রত্যেককে প্রমাণ করতে হবে যে তারা ভোটার তালিকায় স্থান পাওয়ার যোগ্য। অর্থাৎ সাধারণ যুক্তিতে বর্তমানে আমাদের সবাইকে আমাদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হবে। গণতান্ত্রিক কাঠামোয় রাষ্ট্রের ক্ষমতা জনগণের নিচে হওয়া উচিত। SIR-এর মাধ্যমে এই মৌলিক গণতান্ত্রিক রীতিকে পরিবর্তন করে দেওয়া হল নিঃশব্দে। অন্যদিকে, সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদী শক্তি বিজেপি-র মুসলমান বিরোধী রাজনীতির আবহে এই প্রকল্প আসলে তাদের বিরোধীদের এবং বিশেষ করে গরীব-দলিত-আদিবাসী-মুসলমানদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার একটি পরিকল্পনা হিসেবে দেখা উচিত।

এর থেকে সহজ নীতি হতো, ২০২৪ সালের ভোটার তালিকা নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে প্রকৃত ভোটার চিহ্নিত করা। কিন্তু তা না করে মানুষের উপরে নাগরিকত্ব প্রমাণ করার দায় চাপিয়ে রাষ্ট্র আসলে সাধারণ মানুষকে তার ক্ষমতা জাহির করছে। মানুষের অধিকারকে সংকুচিত করার চেষ্টা করছে।

অতএব, SIR-এর রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো গণতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়ানো। ভারতের রাজনীতিতে ভোটার তালিকার ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আজ অবধি ধরে নেওয়া হতো যে এই ভোটার তালিকা মোটের উপর দেশের প্রাপ্তবয়স্ক মানুষদের তালিকা। কিন্ত এখন ভোটার তালিকা তৈরি হওয়াও রাজনীতির আঙিনায় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে, কারণ নাগরিকত্বই এখন রাজনীতির কেন্দ্রে। দেশের মানুষের মধ্যে প্রভেদ ঘটিয়ে হিন্দুত্বের ধারণাকেই ভারতীয়ত্বের একমাত্র সূচক হিসেবে গড়ে তোলার রাজনীতির আবহে নাগরিকত্বের ধারণাকেই পালটে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে এনআরসি এবং সিএএ-র মাধ্যমে। SIR ঘুরপথে এই প্রক্রিয়ারই নামান্তর, এই অভিযোগ ওঠা স্বাভাবিক। আগামী এক মাস সমস্ত গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষকে সজাগ থাকতে হবে যাতে আমাদের কোনও ন্যায্য সহনাগরিকের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ না পড়ে।