আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ একবিংশ সংখ্যা ● ১-১৬ নভেম্বর, ২০২৫ ● ১৬-৩০ কার্তিক, ১৪৩২

সম্পাদকীয়

নৈরাজ্যের এপিসেন্টার হয়ে উঠছে রাজ্যের সরকারি হাসপাতাল


আবার রাজ্যে বিতর্কের কেন্দ্রে শহরের অন্যতম জরুরি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান এসএসকেএম হাসপাতাল। শতাব্দী প্রাচীন এই সরকারি হাসপাতাল রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের মধ্যবিত্ত থেকে প্রান্তিক পরিবারের কঠিন ও জটিল রোগের চিকিৎসার অন্যতম গন্তব্য। ফলে এমন একটি প্রতিষ্ঠান সামাজিক কিংবা প্রশাসনিক গুরুত্বের নিরিখে যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের হবে সেটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই হাসপাতালে দিনেদুপুরে চিকিৎসা করাতে আসা এক নাবালিকা নির্যাতনের শিকার হল সেই হাসপাতালেরই এক নিরাপত্তা রক্ষীর হাতে! গত বছর আর. জি. কর হাসপাতালে প্রাতিষ্ঠানিক ষড়যন্ত্রে সেখানকার এক সিভিক ভলেন্টিয়ার যেভাবে এক কর্মরতা চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুন করে ইতিমধ্যে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে তাতে গোটা সমাজ যেভাবে নাড়া খেয়েছিল সেটা স্বাধীনতা উত্তর বাংলায় কখনও হয়নি।

কিন্তু আর. জি. করের ঘটনার পর হাসপাতালে চিকিৎসক কিংবা রোগীদের নিরাপত্তা নিয়ে নবান্ন থেকে সুপ্রিম কোর্ট অবধি আলোচনার জল গড়ালেও বাস্তবে যে সেই নিরাপত্তা আজও কত ঠুনকো অবস্থায় রয়েছে তার প্রমাণ মিলল শহরের আরও এক প্রথম শ্রেণির হাসপাতালে নিরাপত্তারক্ষীর দৌরাত্ম্যের ঘটনায়। কার্যত যে ভাড়াটে নিরাপত্তাকর্মীরা হাসপাতালে নিরাপত্তায় নিযুক্ত হয়েছিল এখন প্রমাণ হচ্ছে তাদেরই একাংশ হাসপাতালের আইন ভাঙার কারবারে নিযুক্ত! ফলে 'সর্ষের মধ্যে ভূত'-এর মতোই হাসপাতালের অলিন্দে অলিন্দে নিরাপত্তারক্ষীর পোশাকধারীরা আইন রক্ষার প্রয়োজনে নাকি আইন ভঙ্গে ব্যস্ত, সেটাই হয়ে উঠেছে মূল প্রশ্ন! সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য দপ্তরের ভূমিকা নিয়েও। ইতিমধ্যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসএসকেএম-এর নিরাপত্তাহীনতার ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এমন ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রীর এমন বিস্ময় আমজনতার হতাশাকে আরও তীব্র করে তুলেছে! কারণ রাজ্যের প্রথম শ্রেণির হাসপাতালে নিরাপত্তাহীনতার এই চেহারা ঘোচানোর জন্য প্রয়োজন যথেষ্ট পরিমাণ স্থায়ী নিরাপত্তা কর্মী। কিন্তু দুর্ভাগ্য জনসংখ্যার বিচারে বিহারের পরেই সবচেয়ে কম সংখ্যক পুলিশ রয়েছে এই রাজ্যের প্রশাসনে।

গত কয়েক বছর ধরে রাজ্যে পুলিশের শূন্য পদে নিয়োগ বন্ধ। আর সেই শূন্যস্থান পূরণ করা হচ্ছে অস্থায়ী সিভিক পুলিশের দল দিয়ে। আদালতের আদেশ অনুযায়ী যাদের রাস্তায় ট্রাফিক সামলানোর কথা তাদের এখন রাজ্যে 'জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ'-এর মতো সব কাজেই নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে পুলিশের জার্সি গায়ে চাপিয়ে। না আছে তাদের ঢাল তরোয়াল, না আছে তাদের দক্ষতা কিংবা অভিজ্ঞতা। অথচ এমন মানুষেরাই কখনো সিভিক পুলিশ আবার কখনো বেসরকারি এজেন্সির ছাতার তলায় নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করছে। এসএসকেএম-এর ঘটনার পর রাজ্যের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী এইসব ভাড়াটে সৈন্যদের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করার কথা বলেছেন প্রশাসনিক কর্তাদের। কিন্তু বাস্তবতা হল যে এমন অস্থায়ী নিরাপত্তা কর্মীদের সিংহভাগের ব্যাকগ্রাউন্ডে শাসকদলের আশীর্বাদ না থাকলে সেই চাকরি এ রাজ্যে জোটে না। নিরাপত্তা এজেন্সি খুলতে গেলেও শাসকদল কিংবা প্রশাসনের আশীর্বাদ ধন্য হতে হবেই। অন্যথায় মিলবে না ওই ব্যবসার অনুমতি। ফলে নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠিতেই অস্থায়ী নিরাপত্তারক্ষীদের সিংহভাগ হয়ে উঠেছে শাসক অনুগত স্বেচ্ছাসেবকের দল। ফলে পরনে আইনরক্ষকের উর্দি আর মাথায় শাসকদলের ছাতার দৌলতেই এই অংশের আইন ভাঙ্গার ঘটনা উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে এ রাজ্যে।

এমনকি নিরাপত্তা কর্মীর কাজ করে এনআরএস হাসপাতালে আর এসএসকেএম হাসপাতালে এসে ডাক্তারের পোশাক দেহে ঝুলিয়ে চিকিৎসা করাতে আসা নাবালিকাকে তার অভিভাবকদের হাত থেকে ফুসলিয়ে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে টয়লেটে ধর্ষণের সাহস অর্জন করেছে এই বাহিনী! আর. জি. কর হাসপাতালের সিভিক ভলেন্টিয়ার যেমন খুন ধর্ষণের পর নির্লিপ্ত ঢঙে বারবার খুনের ঘটনাস্থলে পায়চারি করে বেরিয়েছিল এখন তেমন পায়চারি এই অপরাধপ্রবণ নিরাপত্তারক্ষীদের একাংশ করে চলেছে জেলায় জেলায় হাসপাতাল থেকে স্বাস্থ্য কেন্দ্রের বিভিন্ন ওয়ার্ড জুড়েই। ফলে কেবল রাজধানী শহর কলকাতায় নয় পাঁশকুড়া থেকে উলুবেড়িয়া, কান্দি থেকে ইসলামপুর - হাসপাতালগুলিতে লাগাতার ঘটে চলেছে চিকিৎসক থেকে স্বাস্থ্যকর্মী নির্যাতনের ঘটনা। উলুবেড়িয়া সুপারস্পেশালিটি হাসপাতালে প্রসূতি বিভাগে ঢুকে কর্মরতা চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের হুমকি দিয়ে গেছে স্থানীয় শাসকঘনিষ্ঠ এক সিভিক পুলিশ।

এমন ঘটনা উত্তরোত্তর ঘটে চললেও অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি না হওয়ায় এমন অপরাধের সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। ধর্ষকদের অপরাধের কঠোর শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে না কি অন্তরায় হয়ে পড়ছে রাজ্য প্রশাসনের কড়া আইন না থাকার কারণ? এমন হাস্যকর যুক্তি প্রকাশ্যে চলে আসছে রাজ্যের শাসকদল ও প্রশাসনের ভাষ্যে এবং আচার-আচরণে। আসলে এমন অপরাধীদের দল বছরের অন্যান্য সময়, বিশেষত ভোটের সময় শাসকের বুথ রক্ষী বাহিনীর কাজ করে বলেই শাসকদল এদের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিতে অপারগ। ফলে এমন অপরাধীদের আড়াল করতেই এখন সামাজিক ব্যাধি হিসেবে ধর্ষণকে রাজনীতির ময়দানে ভাসিয়ে তুলছে শাসকদল। ফলে প্রশাসনিক সদিচ্ছার অভাবেই এই অপরাধীদের কড়া সাজা হচ্ছে না। ফলে বেড়ে চলেছে তথাকথিত 'সামাজিক ব্যাধি'। ধর্ষণ সংক্রমিত হচ্ছে দ্রুতগতিতে। এমন সামাজিক ব্যাধির অজুহাতে এবার ঘুষ নিয়ে চাকরি দেওয়া কিংবা কাটমানি আদায় অথবা চিটফান্ডের প্রতারকেরা সবাই রেহাই পেতে থাকবে শাসকের অনুগ্রহে। আর সেপথেই এক নৈরাজ্যের কবলে পড়ে চলেছে এই রাজ্যের মানুষ। যে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চলে কোটি কোটি মানুষের করের টাকায় আজ সরকারি উদাসীনতায় সেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গঙ্গাযাত্রা শুরু হয়েছে। একই ঘটনা রাজ্যের মানুষ দেখেছে সরকারি স্কুলশিক্ষায় বেলাগাম নিয়োগ দুর্নীতিতে! সেখানেও আক্রান্ত হয়েছে রাজ্যের মধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক পরিবারের পড়ুয়ারা। একের পর এক সরকারি স্কুল বন্ধ হচ্ছে। মাধ্যমিক স্তরে স্কুলছুটের হারে দেশের সর্বোচ্চ স্থানে পৌঁছে গেছে বাংলা। আর একইভাবে রাজ্যের স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলিতে এই নিরাপত্তাহীনতায় শেষমেষ সরকারি হাসপাতালের প্রতি আমজনতা আস্থা হারালে ওই হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলি অচিরেই বন্ধ স্কুলের মতো চেহারা নেবে। এটা বুঝেও অযোগ্য, অথর্ব এক রাজ্য প্রশাসন নির্বিকার ঢঙে রাজনীতির পাশা খেলায় মত্ত। বিড়ম্বনা এখানেই, বিপদ এখানেই।