আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ বিংশ সংখ্যা ● ১৬-৩১ অক্টোবর, ২০২৫ ● ১-১৫ কার্তিক, ১৪৩২
প্রবন্ধ
অস্তিত্বই যেখানে প্রতিরোধ
শুভনীল চৌধুরী

অবশেষে স্বস্তি। গাজায় ঘোষণা হয়েছে যুদ্ধবিরতি। দীর্ঘ দুই বছর ধরে গাজার প্রায় ৭০,০০০ প্যালেস্টিনীয় মানুষকে গণহত্যা করার পর, ইজরায়েল তথা বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু রাজি হয়েছেন যুদ্ধবিরতি চুক্তি করতে হামাসের সঙ্গে। মার্কিন রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় একটি বিশ দফা বয়ানের প্রেক্ষিতে এই যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে হামাস, অপহৃত ইজরায়েলি নাগরিকদের মুক্তি দিয়েছে। যেই অপহৃত ব্যক্তিদের মৃত্যু হয়েছে তাঁদের দেহ তুলে দেওয়া হয়েছে ইজরায়েলের কাছে। ইজরায়েল তাদের জেলে বন্দী অসংখ্য প্যালেস্টিনীয় ব্যক্তিদের মুক্তি দিয়েছে। গাজার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইজরায়েলি সেনা সরে এসেছে। সংবাদপত্রের পাতায় আমরা দেখেছি হাজারো প্যালেস্টিনীয় মানুষ হেঁটে চলেছেন গাজা শহরের দিকে। ক্রমাগত বোমাবর্ষণে জর্জরিত মানুষ আবারও বুকে স্বপ্ন এবং মনে প্রতিরোধ নিয়ে নতুন করে গড়ে তুলতে যাচ্ছেন তাদের জীবন। গাজায় আপাতত শান্তি কায়েম হয়েছে, যা গোটা পৃথিবীর মানুষকে স্বস্তি দিয়েছে।
তাহলে এই যুদ্ধে জিতল কে? ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি প্রস্তাব দেখলে মনে হবে যে ইজরায়েল এই যুদ্ধে জিতেছে। কারণ এই প্রস্তাবে প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির কথা সোচ্চারে বলা নেই। ইজরায়েল সৈন্য গাজা থেকে সম্পূর্ণভাবে কবে প্রত্যাহার করা হবে তার কোনও স্পষ্ট সময় বা দিকনির্দেশিকা দেওয়া নেই। ইজরায়েলের হাতেই গাজার নিরাপত্তার দায়িত্ব থাকবে যতদিন না তারা সন্তুষ্ট হচ্ছে যে গাজা থেকে ইজরায়েলের আর কোনও বিপদের আশংকা নেই। আবার বলা হয়েছে যে হামাসকে আত্মসমর্পণ করতে হবে, ভবিষ্যতের প্যালেস্টাইনের পরিচালনায় হামাসের কোনও ভূমিকা থাকবে না, এবং হামাস সংগঠনটির অস্তিত্বও থাকবে না।
এই প্রস্তাব নিয়ে সমস্ত শান্তিপ্রিয় এবং উপনিবেশ বিরোধী মানুষের চিন্তিত হওয়া উচিত কারণ এই প্রস্তাবটি আদতে একবিংশ শতাব্দীর উপনিবেশবাদী দলিল। হামাসের পরে প্যালেস্টাইনের শাসনভার কার থাকবে? প্যালেস্টিনীয়দের নয়, ট্রাম্প এবং টনি ব্লেয়ারের নেতৃত্বাধীন একটি কাউন্সিলের উপর। প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র গঠনের কোনও কথা এই প্রস্তাবে বলা নেই। বরং ইজরায়েল তথা আমেরিকাই ঠিক করবে কবে তারা সেনা প্রত্যাহার করবে। আবার তারাই ঠিক করবে যে সেনা প্রত্যাহার করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কি না। অর্থাৎ যখন তখন তারা কোনও একটি ঘটনাকে অজুহাত করে আবারও গাজার উপর আক্রমণ শানাতে পারে। মনে রাখতে হবে যে প্যালেস্টাইন মানে শুধু গাজা নয়, তার মধ্যে ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক-ও পড়ে। কিন্তু তা নিয়ে এই প্রস্তাবে কোনও আলোচনা নেই। অতএব বলা যেতেই পারে যে ট্রাম্প প্রস্তাবটি বিজয়ীর দ্বারা রচিত বিজিতদের আরও বেশি নিগৃহীত করার জন্য তৈরি একটি আপাত শান্তি প্রস্তাব।
কিন্তু এর পরেও কিছু কথা রয়ে যায়। এমন নয় যে ট্রাম্প তথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার জানে না যে এর আগেও বহুবার প্যালেস্টাইন এবং ইজরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়েছে, শান্তি প্রস্তাব রচিত হয়েছে। কিন্তু কোনোটাই কার্যকর হয়নি। হামাস নিজেদের বিলুপ্তির শর্ত মেনে নেবে না। তারা জানিয়েছে যে তারা আরও আলোচনা চায় এবং গাজার শাসনভার তারা প্যালেস্টাইনের কোনও প্রতিনিধিত্ব নির্ভর সরকারের হাতে হস্তান্তর করবে, ট্রাম্প বা ব্লেয়ারের হাতে নয়। ট্রাম্পের শান্তি প্রস্তাবের এই গুরুত্বপূর্ণ বিন্দুতে হামাস যে একমত নয় তা তারা স্পষ্ট করে দেওয়ার পরেও যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়েছে। আবার আরব দেশগুলিও সমস্ত প্রস্তাবের সঙ্গে যে একমত হয়েছে তা নয়। তারাও আলোচনা জারি রাখার কথা বলেছে। অতএব সবাই এই প্রস্তাব একবাক্যে বিনা মন্তব্যে মেনে নিয়েছে এই ধারণাটি ভুল। ইতিহাসের থেকে শিক্ষা নিলে দেখা যাবে যে বহুবার প্যালেস্টাইন ও ইজরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও তা বেশিদিন টেকেনি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইজরায়েল প্যালেস্টাইনের পক্ষে একটি কোনও হামলার ঘটনাকে অজুহাত করে গাজার উপর বিপুল বোমা বর্ষণ করেছে। অথবা বিনা কারণেই যুদ্ধবিরতি উল্লঙ্ঘন করেছে, এবং তার দায় মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে চাপিয়েছে প্যালেস্টাইনের উপর। অনেকেই হয়ত ভুলে গেছেন যে এই বছরের জানুয়ারি মাসেও যুদ্ধবিরতির ঘোষণা হয়েছিল, যার পরে ইজরায়েল লাগাতার হামলা চালিয়েছে, খাদ্যের সন্ধানে আসা ক্ষুধার্ত মানুষদের উপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে। এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ খুব দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। ইতিহাসের স্বাক্ষ্য মানলে এবং ট্রাম্পের প্রস্তাবের বিচার করলে এই সিদ্ধান্তে আসা যায়।
বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এই যুদ্ধ বিগত দুই বছর ধরে নরমেধ যজ্ঞে পরিণত করেছিলেন হামাসকে ধ্বংস করার লক্ষ্য নিয়ে। তিনি কি তাতে সফল হয়েছেন? দ্বিধাহীনভাবে এর উত্তরে না বলতে হবে। আবার নেতানিয়াহু কোনোদিন প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে ছিলেন না। তিনি বরাবর বলেছেন যে তিনি বৃহত্তর ইজরায়েলের পক্ষে। অর্থাৎ ঐতিহাসিকভাবে যা প্যালেস্টাইন ছিল তার সবটাই ইজরায়েলের আওতায় নিয়ে আসার প্রধান প্রবক্তা তিনি। এই কাজটি করতে হলে গাজা, ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক তথা লেবানন, সিরিয়া বা জর্ডনে স্থিত প্যালেস্টিনীয়দের নিকেশ না করে করা সম্ভব হবে না। অতএব গণহত্যাই একমাত্র নীতি হতে হবে। ইজরায়েল-প্যালেস্টাইনের ভূ-সীমানায় যত মানুষ বসবাস করেন তার মধ্যে ইহুদী এবং মুসলমানদের অনুপাত প্রায় ৫০-৫০। অতএব যদি এই ভূখণ্ডকে যদি সম্পূর্ণভাবে ইহুদীদের ভূখণ্ডে পরিণত করতে হয় তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আসবে। সেই প্রতিরোধকে ভাঙতে গণহত্যা সংগঠিত করে, জনসংখ্যার বিন্যাস বদলে দেওয়ার চেষ্টা ইজরায়েল রাষ্ট্রের পুরোনো রণনীতি। কিন্তু এখনও অবধি তারা এই কাজটি করে উঠতে পারেনি। ৭০,০০০ মানুষের হত্যার পরেও প্যালেস্টিনীয় প্রতিরোধ বেঁচে আছে, স্বাধীনতা সংগ্রাম জারি আছে, কারণ প্যালেস্টিনীয়দের কাছে অস্তিত্বই প্রতিরোধ। তাদের নিশ্চিহ্ন করতে চায় নেতানিয়াহুর মতন জায়নবাদীরা। তাই তাদের বেঁচে থাকাই প্রতিরোধ, এবং আমরা চাই বেঁচে থাকুক এই প্রতিরোধ।
কিন্তু তাহলে যুদ্ধবিরতি কেন? এর প্রধানত তিনটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, ইজরায়েলের ভিতরে অপহৃত ব্যক্তিদের দেশে না ফেরাতে পারার বিরুদ্ধে লাগাতার প্রতিবাদ সংগঠিত হয়েছে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে। তার বিরোধী শক্তিদের জোর ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই অপহৃত ব্যক্তিদের হামাসের হাত থেকে ফিরিয়ে আনা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দুই বছরের যুদ্ধের পরেও এই কাজে ইজরায়েল ব্যর্থ হয়েছে। অতএব যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে যদি নাগরিকদের ফিরিয়ে আনা যায় তাহলে কিছুটা ইজ্জত বাঁচে। হামাসকে অথবা প্যালেস্টিনীয় প্রতিরোধকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করার যে আকাঙ্ক্ষা ইজরায়েলের ছিল তা ব্যর্থ হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ইজরায়েলের দ্বারা সংঘটিত এই গণহত্যা কোনও গোপন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে ঘটেনি। এই গণহত্যা প্রকাশ্যে টিভি ক্যামেরা, সমাজ মাধ্যমের ক্যামেরার সামনে চালানো হয়েছে। নিরন্তর মানুষের মৃত্যু, দুর্ভিক্ষের বিরুদ্ধে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ পথে নেমেছেন। মানবতা এখনও বেঁচে রয়েছে, শুধু রাষ্ট্রশক্তির আস্ফালনে এবং দম্ভে তা ঢাকা পড়ে যায়। কিন্তু মানুষ রাস্তায় নামলে রাষ্ট্রশক্তি বাধ্য হয় মানুষের কথা শুনতে। ইউরোপ জুড়ে চলতে থাকা একের পর এক প্যালেস্টাইনের সমর্থনে গণসমাবেশ সেখানকার সরকারকে বাধ্য করেছে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে। ফ্রান্স, ব্রিটেনের মতন দেশ যার ইজরায়েলের অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক, তাদের পক্ষেও আর এই গণহত্যাকে সমর্থন করা সম্ভব হয়নি। তারা প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রকে মান্যতা দিয়েছে, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার মতন দেশের সঙ্গে হাত মিলিয়ে।
কিন্তু তাতেও কিছু যায় আসে না। নোয়াম চমস্কি বহু বছর ধরেই বলে চলেছেন যে যতদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইজরায়েলকে সমর্থন করবে, ততদিন এই পরিস্থিতির কোনও বদল হবে না। এমনকি বাকি সমস্ত দেশও যদি ইজরায়েলের বিরুদ্ধে যায়, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের পক্ষে থাকে তাহলেও ইজরায়েল তার কার্যকলাপ চালিয়ে যাবে। এই পরিস্থিতির কিঞ্চিৎ বদল অবশ্যই ঘটেছে। 'নিউ ইয়র্ক টাইমস' বা 'ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল'-এর মতন কাগজে সমীক্ষা রিপোর্ট বেরিয়েছে যে মার্কিন জনগণের ইজরায়েলের উপর সমর্থন ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্নে এসে ঠেকেছে। এমনকি ট্রাম্পের সমর্থকদের মধ্যেও ইজরায়েলের সমর্থন কমেছে। এই পরিস্থিতিতে এই গণহত্যাকে মান্যতা দেওয়া ট্রাম্পের পক্ষেও কঠিন হয়ে পড়ে। তার উপরে তিনি 'নোবেল শান্তি পুরস্কার' চান। তাই নেতানিয়াহুকে কিছুটা স্বস্তি দিতে এবং বাড়তে থাকা জনপ্রতিবাদকে প্রশমিত করতে এই যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়েছে।
প্যালেস্টাইনের মুক্তির রাস্তা এখনও দেখা যাচ্ছে না। ইজরায়েলের বিরুদ্ধে যে বিশ্বজনমত তৈরি হয়েছে তা জিইয়ে রাখতে হবে। ইউরোপ তথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর আরও বেশি চাপ তৈরি করতে হবে ইজরায়েলের পাশে না দাঁড়াবার। একবিংশ শতাব্দীতে কোনও পরাধীন দেশ থাকতে পারে না। অন্যদিকে হামাস তথা অন্যান্য প্যালেস্টিনীয় সংগঠনকে ভাবতে হবে আগামীদিনে তাদের রণনীতি কী হতে পারে। বিশ্বজুড়ে প্যালেস্টাইনের প্রতি মানুষের ভাবাবেগকে মর্যাদা দিয়ে তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নীতি গ্রহণ করতে হবে। প্যালেস্টাইনের মুক্তি হবেই, এই আশা নিয়ে আগামীদিনের লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।
চিত্র: অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।