আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ বিংশ সংখ্যা ● ১৬-৩১ অক্টোবর, ২০২৫ ● ১-১৫ কার্তিক, ১৪৩২
সম্পাদকীয়
জলবায়ু পরিবর্তন ও লোভের শিকার উত্তরবঙ্গ

জলবায়ু পরিবর্তনে দেশজুড়ে বিনাশের পালা ভাবিয়ে তুলছে আমাদের একের পর এক বিপর্যয়ে, যার সর্বশেষ নজির হল উত্তরবঙ্গের বিধ্বংসী বন্যা। রাজ্যের সরকার পরিচালনায় যখন পরিবেশ উপেক্ষিত হয়, প্রকৃতি ব্রাত্য হয়, তখন আধুনিকতার মোড়কে উন্নয়নের ধ্বংসলীলা চলে অবাধে যার খেসারত দিতে হয় দলে দলে মানুষকে। জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় সমতলে অতিবৃষ্টির দাপটে কলকাতা, দিল্লী, মুম্বাইয়ের মতো মেগাসিটিগুলি দিনের পর দিন জলবন্দি হয়ে থাকলেও পাহাড়ে অতিবৃষ্টির প্রভাব একেবারেই ভিন্ন। শহরের নিকাশি নালার ধারণক্ষমতা ছাপিয়ে অতিবৃষ্টি হলে কিংবা নিকাশি অবরুদ্ধ হলে শহর জমা জলে অবরুদ্ধ হয় কিন্তু পাহাড়ে বৃষ্টির জলের নিকাশির পথ অবরুদ্ধ হলে পাহাড়ি উপত্যকা বানের জলে ভেসে যায়। পাহাড়ে বৃষ্টির জলের নিকাশির পথ হল সেই পাহাড়ের গা বেয়ে ছুটে চলা ঝোরা আর পাহাড় সংলগ্ন উপত্যকা দিয়ে বয়ে চলা নদীগুলি।
প্রবল বৃষ্টিতে এবার ভূমিধস নেমেছে পাহাড়ের জায়গায় জায়গায় বৃষ্টির জলের তোড়ে। পাহাড়ের উপরিভাগের নরম ঝুরো পাথর-মাটি আলগা হয়ে জলের সাথে বয়ে গেছে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। কাদামাটির ওই প্রবল জলস্রোতের মুখে পড়ে ধ্বংস হয়েছে সেই অঞ্চলের দোকান বাজার থেকে ঘরবাড়ি। এবারের বিপর্যয়ের এপিসেন্টার ছিল পাহাড়ে বেশি জনঘনত্বের লোকালয় মিরিক মহকুমা। উত্তরবঙ্গের বন্যার মৃতের সিংহভাগ এই অঞ্চলের। বিশেষত ভূমিধসের সময় পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা পাথর কাদার স্তুপ তরল হয়ে নদীখাতে কখনও নেমে আসে আবার কখনও নদীখাত সংলগ্ন নিচু চাষের জমির ওপর দিয়েও বয়ে যায়। বন্যার জল কিছুদিন পর নেমে গেলেও নদীবক্ষে কিংবা পাশের জমিতে থেকে যায় বোল্ডার, নুড়ি পাথরের স্তর। নদীবক্ষে জমে যাওয়া এমন স্তরগুলি পরবর্তীকালে নদীর জলধারণ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে পরবর্তী বৃষ্টিতে ধারণ ক্ষমতা কমে যাওয়া নদীগুলোতেই বাড়ে প্লাবনের সম্ভাবনা। কার্যত গোটা উত্তরবঙ্গের নদীগুলির এই বেহাল অবস্থা সম্পর্কে উদাসীন থেকেছে রাজ্যের সরকার। ফলে দক্ষিণবঙ্গের পলি জমে নদীতে প্লাবনের যে বিপদ নিয়ে নাকানি চোবানি খাচ্ছে মানুষ এবার পাহাড়ের অতিবৃষ্টিতে তার এক ভিন্ন সংস্করণ দেখল উত্তরবঙ্গের মানুষ। ফলে পাহাড় সংলগ্ন উপত্যকার নদীর নিকাশির পথ অবরুদ্ধ হয়ে থাকলে প্রতিবেশী দেশ ভুটান কিংবা প্রতিবেশী রাজ্যকে দায়ী করে লাভ নেই। সেটা করে নিজের দায় অন্যের ঘাড়ে চালান দেওয়া যায় কিন্তু সেপথে রাজ্যের মানুষকে বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচানো যায় না।
দেশের পাহাড় সম্বলিত ১৭টি রাজ্যের ১৪৭টি জেলার উপগ্রহ চিত্র-নির্ভর সমীক্ষা অনুযায়ী ভূমিধসের ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী দেশের প্রথম ৩৫টি জেলার মধ্যে রয়েছে দার্জিলিং। এমন বিপদজনক জেলাগুলিতে আবার জনঘনত্ব এবং বাড়ির ঘনত্ব তুলনায় মাত্রাছাড়া বেশি। যেখানে ধারাবাহিকভাবে পর্যটন কেন্দ্রীক অর্থনীতিতে স্থায়ী এবং অস্থায়ী জনসংখ্যার বৃদ্ধি ঘটে চলেছে। লাগামছাড়া নগরায়নের দাপটে শহরে যেমন জলাজমি বুজিয়ে বাড়ি তৈরি হচ্ছে তেমনি পাহাড়ি উপত্যকা অঞ্চলে নদীখাতের জমি দখল করে হোটেল, হোম-স্টে বানানোর হিড়িক পড়েছে। এরাজ্যে শাসকদলের এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদতে চলছে নদীর বুকে, নদীর পাশে জমির লুঠ 'রিয়েল এস্টেট' গড়ার লক্ষ্যে। আর সেই লুঠের মাশুল হিসাবে প্রতিদিন বিপর্যস্ত হচ্ছে উত্তরবঙ্গের বাস্তুতন্ত্র এবং পরিবেশ। পাশাপাশি ভঙ্গুর শিলাস্তরের পাথর মাটির পাহাড়ে সুড়ঙ্গ এবং ঝুঁকিবহুল পাহাড়ি ঢালের ওপর ভারি গাড়ি চলাচলের জন্য রাস্তাঘাট নির্মাণের অপরিকল্পিত উদ্যোগে ভয়াবহভাবে ব্যাহত হচ্ছে পাহাড়ের ভারসাম্য। ফলে বাড়ছে ভূমিধসের মতো বিপর্যয় পাহাড় জুড়েই।
পাহাড় সন্নিহিত জেলাগুলিতে এখন পর্যটন কেন্দ্রীক অর্থনীতির দাপট। ফলে সেইসব অঞ্চলে পর্যটনকেন্দ্রিক পরিকাঠামো উন্নতির সাথে সেই অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রের সামঞ্জস্য রক্ষার পরিকল্পনা প্রয়োজন। অথচ বাজারকেন্দ্রিক অর্থনীতির দাপটে পাহাড় জুড়ে বাস্তুতন্ত্রের ওপর নেমে আসছে সবচেয়ে বড় আঘাত। পুঁজির দাপটে ত্রাহি রব ছাড়ছে প্রকৃতি। আর রাজ্যের সরকার থেকে স্থানীয় জিটিএ কিংবা পুরসভা পরিবেশ রক্ষার চেয়ে বেশি সক্রিয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থের সুরক্ষায়। ফলে পরিবেশের দফা রফা করে পাহাড়ের হাসি দেখছে সরকার। আর এমন প্রতিটি বিপর্যয়ের পর পাহাড় জুড়ে উঠছে স্বজনহারা বাস্তুচ্যুতদের কান্নার রোল।
প্রতিটি বিপর্যয় থেকেই শিক্ষা নিলে পরবর্তী বিপর্যয় নিয়ন্ত্রণে কিছু সুরাহা আশা করা যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে এদেশে নিয়মিত ব্যবধানে ঘটে চলা বিপর্যয় সত্ত্বেও সরকারি প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বিপর্যয় মোকাবিলায় বিপর্যয়ের আগের প্রস্তুতি কিংবা পরিকল্পনার খামতি উত্তরাখন্ড থেকে উত্তরবঙ্গ সর্বত্রই ধরা পড়ছে। ১৯৭০ থেকে ২০১০ এই চার দশকে হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চল জুড়ে তিরিশটি 'মেঘভাঙা বৃষ্টি'র নথিভুক্ত ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের দাপটে সেই 'মেঘভাঙা বৃষ্টি'র সংখ্যা গত দশকে ঘটেছে আশিটা। ফলে বোঝাই যাচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে (২০১০-২০২০) ভয়াবহ গতিতে 'মেঘভাঙা বৃষ্টি'র সংখ্যা অতীতের তুলনায় আটগুণ বেড়েছে। ফলে অতীতের তুলনায় এমন বিপর্যয়ের ঘটনা বহুগুণে বেড়ে চলবে বলেই আশঙ্কা। এই অবস্থায় অতীতের পরিকাঠামো কিংবা পরিকল্পনা নিয়ে বসে থাকলে ভবিষ্যৎ মোকাবিলার পথ অধরা থেকে যাবে। ফলে দেশজুড়ে এই জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সঙ্গতি রেখেই প্রয়োজন পরিবর্তনশীল বাস্তুতন্ত্রের সাথে মানানসই নির্মাণ ভাবনা, নির্মাণ সামগ্রী এবং নির্মাণ পদ্ধতির প্রয়োগ, বিশেষত পাহাড়ি এলাকায়। প্রয়োজন নির্মাণের স্থান কাল পাত্রের উপর নিয়ন্ত্রণ। অন্যথায় উত্তরবঙ্গ থেকে উত্তরাখণ্ডের বিপর্যয়ে প্রাণ হারাবে আরও মানুষ এই একুশ শতকে।