আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ সপ্তদশ সংখ্যা ● ১-১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ● ১৬-৩১ ভাদ্র, ১৪৩২

সমসাময়িক

জম্মু কাশ্মীরে নিষিদ্ধ ২৫টি বই


জম্মু-কাশ্মীরের লেফ্টেন্যান্ট গভর্নর আচমকাই ২৫টি বই‍‌কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। গত ৫ আগস্টের এই বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশ্যে আসে ৭ আগস্ট। প্রসঙ্গত, ২০১৯-এর ৫ আগস্ট সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হয়। হয়তো দিল্লির প্রভুদের সন্তুষ্ট করার জন্যই লেফ্টেন্যান্ট গভর্নরের তরফে এমন একটি বিশেষ দিনকে স্বৈরাচারী নির্দেশনামা ঘোষণার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে।

বইগুলি নিষিদ্ধ করার যুক্তি হল, - যুবদের বিভ্রান্ত করা, সন্ত্রাসবাদকে মাহিমান্বিত করা এবং ভারত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নাকি হিংসায় প্ররোচনা দেবার মতো রসদ রয়েছে বইগুলিতে। এই ঘটনায় একদিকে যেমন কেন্দ্রের সরকারের জম্মু-কাশ্মীর সম্পর্কে অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে, অন্যদিকে রাজ্যে কতটা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা-ও স্পষ্ট হচ্ছে।

যে বইগুলি নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তার মধ্যে দেশ-বিদেশের বিখ্যাত লেখক ও ইতিহাসবিদদের বই রয়েছে এবং বইগুলি বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা থেকেই প্রকাশিত হয়েছে। বইগুলি নিষিদ্ধ করার পিছনে এমনই মিথ্যা তথ্য দেওয়া হয়েছে - বইগুলি নাকি জম্মু-কাশ্মীর নিয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে। রাজ্যের যুবদের হিংসা ও সন্ত্রাসবাদে অংশ নেওয়ার জন্য ইন্ধন জোগাচ্ছে।

নিষিদ্ধ তালিকায় থাকা বইগুলির মধ্যে রয়েছে ভারতের সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী এ. জি. নুরানির 'দ্য কাশ্মীর ডিসপিউট - ১৯৪৭-২০১২', ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ভিক্টোরিয়া স্কোফিল্ডের 'কাশ্মীর ইন কনফ্লিক্ট', বিশিষ্ট লেখিকা ও সমাজকর্মী বুকার পুরস্কার জয়ী অরুন্ধতি রায়ের 'আজাদিঃ ফ্রিডম, ফ্যাসিজম, ফিকশন', লন্ডল স্কুল অফ্ ইকনমিক্সের অধ্যাপক সুমন্ত্র বসুর 'কনটেস্টেড ল্যান্ডস' এবং 'কাশ্মীর অ্যাট দ্য ক্রসরোডসঃ ইনসাইড আ টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি কনফ্লিক্ট' তারিক আলি, হিলল ভাট, অঙ্গনা পি চ্যাটার্জি, পঙ্কজ মিশ্র, হাব্বা খাতুন এবং অরুন্ধতি রায়ের 'কাশ্মীরঃ দ্য কেস অব ফ্রিডম', সুগত বসু এবং আয়েশা জালাল সম্পাদিত 'কাশ্মীর অ্যান্ড দ্য ফিউচার অব সাউথ এশিয়া', সাংবাদিক ও সম্পাদক অনুরাধা ভাসিনের 'এ ডিসম্যান্টেলড স্টেটঃ দ্য আনটোল্ড স্টোরি অব কাশ্মীর আফটার আর্টিকেল ৩৭০', পিয়োতর বলসেরোউইকজ্ এবং অ্যগ্নিইস্কা কুসজেউস্কার 'ল্য অ্যান্ড কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন ইন কাশ্মীর' প্রভৃতি বিখ্যাত বই।

এই বইগুলি বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। এমন নয় যে, এগুলি সম্প্রতি প্রকাশিত হওয়া বই। পেঙ্গুইন, ব্লুমসবেরি, হার্পার কলিনস্, প্যান ম্যাকমিলান ইন্ডিয়া, রুথলেজ, ভেরসো বুকস্ প্রভৃতি বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা থেকে বইগুলি প্রকাশিত হয়েছে।

বইগুলি নিষিদ্ধ করার যুক্তি হিসেবে দাবি করা হয়েছে, এইসব সাহিত্য তরুণদের মানসিকতায় গভীরভাবে প্রভাব ফেলবে, অভিযোগের সংস্কৃতি, নিপীড়িতের ভীতি এবং সন্ত্রাসবাদীদের বীরত্ব প্রচার করবে। ঐতিহাসিক তথ্যের বিকৃতি, সন্ত্রাসবাদীদের মহিমান্বিত করা, নিরাপত্তাবাহিনীর অবমাননা, ধর্মীয় উগ্রবাদ, বিচ্ছিন্নতার প্রচার, সহিংস এবং সন্ত্রাসবাদের পথ ইত্যাদির মাধ্যমে এই বইগুলি জম্মু-কাশ্মীরের যুবদের মৌলবাদী করে তোলায় বিশেষ ভূমিকা নিয়েছে বলে লেফ্টেন্যান্ট গর্ভনরের বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এই বইগুলিতে বিচ্ছিন্নতাবাদকে উসকে দেওয়ার এবং ভারতের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতাকে বিপন্ন করার উপাদান রয়েছে। তাই ভারতীয় ন্যায়সংহিতার বিভিন্ন ধারায় বইগুলিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং বইগুলি বাজেয়াপ্ত করতে বলা হয়েছে।

গণতন্ত্রে সবথেকে পশ্চাদগামী কাজ বই নিষিদ্ধ করা। এই পদক্ষেপ থেকে স্পষ্ট হয়, বিতর্ক এবং ভিন্নমতের প্রতি এই সরকারের সহজাত ভয় রয়েছে। স্বৈরাচারী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার সময় খেয়াল থাকে না যে পণ্ডিত এবং খ্যাতিমান ইতিহাসবিদদের বই নিষিদ্ধ করলে ঐতিহাসিক তথ্য এবং কাশ্মীরের মানুষের জীবন্ত স্মৃতি মুছে যাবে না। এটি কেবল এই ধরণের কর্তৃত্ববাদী কর্মকাণ্ডের পিছনে থাকা ব্যক্তিদের নিরাপত্তাহীনতা এবং সীমিত বোধগম্যতা প্রকাশ করে। বই নিষিদ্ধ করার সমালোচনায় মুখর হয়েছেন দেশের লেখক, শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মীদের একাংশ। তাঁদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কাশ্মী‍‌রের রাজনৈতিক ইতিহাস বা বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে মুক্তচিন্তা ও আলোচনার পরিসরকে ব্যাহত করতে পারে।

নিষিদ্ধ হওয়া বইগুলির একটির লেখিকা অনুরাধা ভাসিন বলেছেন, এই নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য হল মানুষের মনে ভয় ঢোকানো। ভবিষ্যতে যে কোনও ধরণের বই কেনার সময়েই তাঁদের সতর্ক থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে। তিনি মনে করেন, এটা অবৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত। এত বই একসঙ্গে নিষিদ্ধ করা! পুরোনো সময়ের পদক্ষেপের মতো লাগছে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, আজকের দিনে এইভাবে বই নিষিদ্ধ করা যায়? লোকে অন্য নানাভাবে বইগুলি পেয়েই যাবে। কীভাবে সরকার এই সিদ্ধান্তকে কার্যকর করবে? অনুরাধা ভাসিন সরকারের অভিযোগ খারিজ করে দিয়ে বলেছেন, নিষিদ্ধ বইগুলির অধিকাংশ আমি পড়েছি, সরকার যে দাবি করছে বইগুলো সন্ত্রাসবাদ-বিচ্ছিন্নতাবাদকে মহিমান্বিত করছে - এটা সম্পূর্ণ ভুল কথা। নিজের বই 'এ ডিসম্যান্টেলড স্টেটঃ দ্য আনটোল্ড স্টোরি অব কাশ্মীর আফটার আর্টিকেল ৩৭০' সম্পর্কে তিনি বলেছেন - বইতে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে কিছু লেখাই নেই, মহিমান্বিত করা তো পরের বিষয়। ৩৭০ ধারা বাতিল করার দিনের কথা এবং তারপরে কী ঘটেছে কাশ্মীরে, সেকথা আছে। সন্ত্রাসবাদকে মহিমান্বিত করার বিষয় নেই। তাঁর মতে, সরকার আসলে তাদের আনুষ্ঠানিক ভাষ্যটাই বজায় রাখতে চায়। আগে সাংবাদিকদের আটকাতে চাইছিল, এখন মনে হচ্ছে বইয়ের মাধ্যমেও যাতে তথ্য পৌঁছতে না পারে, সেটা নি‍‌শ্চিত করতে চাইছে।

প্রাক্তন মুখ্য তথ্য কমিশনার এবং কাশ্মীর বিশেষজ্ঞ ওয়াজাহাত হাবিবুল্লা বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ হাস্যকর। যেভাবে লেফ্টেন্যান্ট গভর্নর সেখানে সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক এবং অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সরকার চালাচ্ছে এই সিদ্ধান্তও তেমনই অগণতান্ত্রিক এবং অসাংবিধানিক।

সংবাদ সংস্থা পিটিআই'র কাছে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে সুমন্ত্র বসু বলেছেন, ১৯৭৩ সাল থেকে কাশ্মীর নিয়ে যে কাজ করেছি, তার মূল উদ্দেশ্য থেকেছে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ খোঁজা। যাতে সমস্ত হিংসার অবসান হয় এবং স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ, ভয় এবং যুদ্ধমুক্ত পরিবেশ পান সংঘর্ষদীর্ণ এই অঞ্চল, গোটা ভারত এবং এই উপমহাদেশ।

অঙ্গনা পি চ্যাটার্জি কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, কর্তৃত্ববাদী শাসকগোষ্ঠী তাদের ক্ষমতা জাহির এবং সক্রিয় করার জন্য এই বইগুলি নিষিদ্ধ করে।

'ইন সার্চ অব ফিউচারঃ দ্য স্টোরি অব কাশ্মীর' বইয়ের লেখক ডেভিড দেবাদাস এই সিদ্ধান্তকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, এই বই নিষিদ্ধ করা আমাদের গণতান্ত্রিক আদর্শ এবং সভ্যতার নীতির পরিপন্থী।

জন্মসূত্রে কাশ্মীরি পণ্ডিত আরতি টিকু সিংহ 'এক্স' হ্যান্ডেলে লিখেছেন, ১৯৪৭ সাল-পরবর্তী কাশ্মীরের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে অন্যতম সেরা কাজ ডেভিড দেবাদাস-এর 'দ্য স্টোরি অব কাশ্মীর'। সেই বইও নিষিদ্ধ তালিকায় রয়েছে। ভারত সরকার কী করে বই নিষিদ্ধ করতে পারে? তিনি বলেছেন, আমি হয়তো এই তালিকার অধিকাংশ বইয়ের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নই, কিন্তু সাহিত্য নিষিদ্ধ করাকে আমি কখনই সমর্থন করি না। কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী ধর্মীয় কট্টরপন্থী আর জেহাদি মৌলবাদীদের তীব্র বিরোধিতার মধ্যেও আমি নির্ভয়ে কাজ করে এসেছি, কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গি বা বিশ্বাসে নিষেধাজ্ঞা চাপানোকে আমি সমর্থন করি না। তিনি মনে করেন ইন্টারনেট ও বিনামূল্যের ই-বইয়ের যুগে কোনো বই বা সাহিত্যকে নিষিদ্ধ করাটাই বোকামি।

এদিকে নিষেধাজ্ঞা চাপানোর পরই বইগুলোর খোঁজ হঠাৎ করে বেড়ে গেছে কাশ্মীরে। সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, নিষিদ্ধ তালিকায় থাকা বইগুলি খুঁজছেন সাধারণ মানুষ, যাঁদের অনেকেই তরুণ প্রজন্মের। প্রসঙ্গত আজকের ডিজিটাল দুনিয়ায় বই নিষিদ্ধ করে নিজের কর্তৃত্ব ফলানো ছাড়া আর কোনো লাভ আছে কি? আন্তর্জালের সহায়তায় যে কোনও বই সহজেই পড়ে নেওয়া যায়। এবং এখনকার নবীন প্রজন্ম আন্তর্জালের ব্যবহারে অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ। তবুও কর্তৃত্ব ফলানোর জন্য এমন এক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে যার কোনও গুরুত্বই নেই।

একই সঙ্গে শুরু হয়েছে সরকারি পদ্ধতিতে হিন্দি ভাষার প্রবর্তন। সাইনবোর্ড থেকে উর্দু ভাষা সরিয়ে দিয়ে হিন্দিতে লেখা হচ্ছে। দু'শোর বেশি মাদ্রাসায় উর্দু শিক্ষা বাতিল করা হয়েছে। সবমিলিয়ে সেই হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান স্লোগান বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত।

বাস্তবিকই বইয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা কর্তৃত্ববাদের আরও এক বহিঃপ্রকাশ এবং বাক্‌-স্বাধীনতার ওপরে নির্লজ্জ আক্রমণ। কেন্দ্রের সরকারের প্রতিনিধি হিসাবে লেফ্টেন্যান্ট গর্ভনর ভারতের সংবিধানে স্বীকৃত মৌলিক অধিকারগু‍লিকে আগ্রাসীভাবে খর্ব করে চলেছেন। 'বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং সন্ত্রাসবাদ'-এ মদত দেওয়ার নাম করে লেফ্টেন্যান্ট গর্ভনরের প্রশাসন ২৫টি এমন বইয়ের উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, যা কাশ্মীরের ইতিহাস এবং বর্তমান বিষয়গুলির শিকড়ের খোঁজ করে। দেশের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলগুলি অবিলম্বে এই সমস্ত বইয়ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবার দাবি জানিয়েছে।

জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যের মর্যাদা, পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকারকে ফিরিয়ে দেওয়ার বদলে বই নিষিদ্ধ করে আধিপত্যবাদী শক্তি ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারে তবে তা চিরস্থায়ী হতে পারে না। সমাজ সভ্যতার ইতিহাসে বই বহু সময়েই শাসকের বিষ নজরে পড়েছে। এবং বই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু মানুষের দাবিতে শেষ পর্যন্ত বই নিষেধাজ্ঞা মুক্ত হয়েছে। আশা করা যায় জম্মু ও কাশ্মীরের ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটবে।