আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ সপ্তদশ সংখ্যা ● ১-১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ● ১৬-৩১ ভাদ্র, ১৪৩২
সমসাময়িক
রাজ্যে উচ্চশিক্ষার সংকট
অবশেষে রাজ্যের স্নাতক স্তরে ভর্তির জট কেটেছে। কেন্দ্রীয় অনলাইন পোর্টালে পড়ুয়াদের আবেদন ঝাড়াই-বাছাই শেষে রাজ্যে মোট সাড়ে নয় লক্ষ আসনের মধ্যে মাত্র ২৫% আসনে পড়ুয়া ভর্তি হয়েছে। বাকি ৭৫% আসন খালি। শূন্য আসনের নিরিখে এই সংখ্যা স্বাধীনতা উত্তরকালে এ রাজ্যে নতুন রেকর্ড গড়েছে। ইঞ্জিনিয়ারিং-এর প্রবেশিকা জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ভর্তি শুরু হতে চলেছে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে। যেখানে গত বছর ৩৮,০০০ আসনের অর্ধেক ছিল খালি এবার ভর্তি বিলম্বের কারণে সেই কলেজগুলোতে খালি আসন কতটা ভরবে সেটাই এখন দেখার। সরকারি ঘোষণা মতো ভর্তি শেষে ক্লাস পুজোর আগে শুরু হবে বলা হলেও সেই লক্ষ্যপূরণ কার্যত অসম্ভব।
এবারের ভর্তি জটে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে রাজ্যে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি। আর সরকার সৃষ্ট এই ভর্তি জটে পরোক্ষভাবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে এ রাজ্য কিংবা পড়শি রাজ্যের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি। মনে রাখা দরকার যে রাজ্যের সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে চালানোর প্রাথমিক দায় প্রতিটি রাজ্যের নির্বাচিত সরকারের। কিন্তু তার পরিবর্তে সরকারের নীতি পঙ্গুত্বে যদি শিক্ষাবর্ষ পিছিয়ে যায় তিন থেকে চার মাস, সে ক্ষেত্রেও এ রাজ্যের পড়ুয়ারা অঙ্কের নিয়মেই পিছিয়ে যাবে জাতীয় ক্ষেত্রের তুলনায়।
এবারের উচ্চশিক্ষার রেকর্ড পরিমাণ খালি আসনের সম্ভাব্য কারণ বহু। প্রথমত, এবার গতবারের তুলনায় দু' লক্ষ উচ্চ মাধ্যমিক পড়ুয়ার সংখ্যা কমে গেছে যারা আসলে ছিল এই শিক্ষাবর্ষে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাব্য পড়ুয়া। ফলে এক ধাক্কায় দু' লক্ষ উচ্চমাধ্যমিক পড়ুয়া কমে যাওয়াটাও রাজ্যের শিক্ষায় নেতিবাচক পরিবর্তনের এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। দ্বিতীয়ত, গত কয়েক বছর ধরেই এই রাজ্যের সাধারণ স্নাতক স্তরের কলেজগুলিতে স্বশাসন এবং সুশাসনের অভাবে ধুঁকছিল প্রতিষ্ঠানগুলি। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অন্দরে শিক্ষক পড়ুয়ার যে জীবন্ত সম্পর্ক ছিল, পারস্পরিক নির্ভরতার যে গভীর বোঝাপড়া ছিল সেটা আস্তে আস্তে ভেঙে পড়ছে। ফলে হাতে গোনা কিছু প্রতিষ্ঠান বাদ দিলে পঠনপাঠনের সাধারণ মান নিম্নগামী হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগ প্রায় বন্ধের মুখে এ রাজ্যে। এমন অবস্থায় রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ কলেজগুলি মেধাবী পড়ুয়াদের ক্যাম্পাসে টেনে আনার আকর্ষণ হারাচ্ছে। কত কয়েক বছর ধরেই ধীরে ধীরে ভিন রাজ্যে পড়তে যাওয়ার প্রবণতা বেড়ে চলেছে, এই রাজ্যের উচ্চ এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের। আর্থিক মানদণ্ডের নিরিখে রাজ্যের সিংহভাগ সচ্ছল পড়ুয়ারাই উচ্চশিক্ষা লাভের লক্ষ্যে রাজ্য ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে আরও দক্ষতা এবং পেশাদারিত্ব অর্জনের লক্ষ্যে।
আর এই সবের সাথে এবারের ভর্তি জট ওই সংকটে কফিনের শেষ পেরেক মেরে দিয়েছে। ফলে অনিশ্চয়তার আবহে হাজারে হাজারে পড়ুয়ারা তাদের সাধ ও সাধ্য অনুযায়ী ভিনরাজ্যে পাড়ি দিয়েছে। ফলে এ রাজ্যের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলির হাতছাড়া হচ্ছে রাজ্যের মেধাবী পড়ুয়াদের সিংহভাগ। অথচ ভালো ছাত্র না জুটলে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখা অত্যন্ত কঠিন। মেধাবী পড়ুয়াদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও গবেষণার ফসল হয়ে ওঠে যেকোনও প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের মূল ভিত্তি। এমন ভিত্তি নড়বড় হলে, কৃতি পড়ুয়াদের রাজ্যে অনুপস্থিতি আখেরে রাজ্যের শিক্ষাক্ষেত্রে আরও বড় শূন্যতার জন্ম দেবে। শিল্পের অভাবে তৈরি হওয়া পরিযায়ী শ্রমিকের মতো এখন এ রাজ্য থেকে পরিযায়ী পড়ুয়ার ঢল নামছে। পড়ুয়ারা এভাবে দলে দলে রাজ্যের বাইরে যেতে থাকলে রাজ্যের লক্ষ লক্ষ শূন্য আসনের কলেজগুলিও সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা হারাবে। যেমন এরাজ্যে ৩,২৫৪টি পড়ুয়াহীন স্কুল চলছে তেমনি অচিরেই রাজ্যের কলেজগুলির হাজার হাজার পড়ুয়াহীন কোর্স চিহ্নিত হওয়াটা কেবল আজ সময়ের অপেক্ষা। সেখানে কোর্স থাকবে, শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী থাকবে, থাকবে কলেজের বাড়ি ঘর থেকে খেলার মাঠ কিন্তু থাকবে না পড়ুয়ারা। এমন ভয়াবহ অবস্থার দিকেই এগোচ্ছে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা।
রাজ্যের উচ্চশিক্ষায় পড়ুয়াদের অনাগ্রহের আরও একটা কারণ হচ্ছে এরাজ্যের লেখাপড়া শেষ করে সীমাবদ্ধ কাজের সুযোগ। এখন শিল্প-পরিষেবাকেন্দ্রিক কাজেই নিযুক্ত হয় উচ্চশিক্ষিত পড়ুয়াদের সিংহভাগ। কিন্তু দুর্ভাগ্য এ রাজ্যে সংগঠিত ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষিতদের কাজের বাজার খুবই সংকুচিত। যতটুকু বা ছিল, শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির ধাক্কায় সে গুড়েও বালি। লক্ষ লক্ষ সরকারি শূন্যপদে নিয়োগ বন্ধ। রাজ্যে শিল্পায়ন স্তব্ধ। এই অবস্থায় ভিন রাজ্যে পড়ুয়ারা যাচ্ছে শুধু লেখাপড়া করতে নয়, সাথে সেই শহরে লেখাপড়া শেষে উন্নত কাজের খোঁজেও। ফলে বাঙ্গালুরু, ভুবনেশ্বর, পুণে কিংবা দিল্লির মতো শহর হয়ে উঠছে এ রাজ্যের মধ্যবিত্ত পড়ুয়াদের অন্যতম গন্তব্য। নতুন প্রজন্ম এভাবে দলে দলে রাজ্য ছাড়ার কারণে রাজ্যের শহরাঞ্চলগুলি দ্রুত বৃদ্ধাবাসে পরিণত হচ্ছে। আর সার্বিক এই আর্থ-সামাজিক অধঃপতন হয়ে চলেছে রাজ্যের সরকারের নীতি পঙ্গুত্বের কারণে। হঠকারী ঢঙে সরকার চলার মাসুল দিচ্ছে আজ রাজ্যের নতুন প্রজন্মের পড়ুয়ারা। আর সেখানেই শিক্ষার প্রতি বাড়ছে তীব্র অনাগ্রহ। যার দায় কোনওভাবেই রাজ্য সরকার এড়াতে পারে না।