আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ সপ্তদশ সংখ্যা ● ১-১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ● ১৬-৩১ ভাদ্র, ১৪৩২

সম্পাদকীয়

অগণতান্ত্রিক সংবিধান সংশোধন বিল


কেন্দ্রের বিজেপি সরকার অবশেষে তার স্বরূপ প্রকাশ করতে শুরু করেছে। যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা ক্ষমতায় বসেছে সেই প্রক্রিয়াকেই তারা আজ যেনতেন ভাবে নিজেদের সুবিধার্থে পালটে ফেলতে চাইছে। সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজনীয় গরিষ্ঠতা তারা পায়নি বটে, কিন্তু তাতে বিজেপি বিশেষ আমল দিতে চায়না। তাই সংবিধানের নতুন ধারা যোগ করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের বিলোপ করার কাজটি তারা করে চলেছে। ভারতের সংসদে ২০২৫ সালে উত্থাপিত কনস্টিটিউশন (১৩০তম অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল তারই নবতম উদাহরণ। এই বিল আসলে দেশের গণতন্ত্রকে উৎখাত করে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার একটি কৌশল মাত্র। কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, এই আইন নাকি রাজনীতিতে "নৈতিকতা ফিরিয়ে আনবে"। কিন্তু সামান্য বিশ্লেষণে বোঝা যায় বাস্তবে এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য একেবারেই ভিন্ন।

বিলের বিধান অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী বা কোনও মন্ত্রী যদি ৩০ দিনের বেশি জেলে থাকেন এবং অভিযোগটি যদি পাঁচ বছরের বেশি শাস্তিযোগ্য হয়, তবে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পদচ্যুত হবেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংসদে বলেছেন এই বিলের উদ্দেশ্য হল রাজনীতিকদের "নৈতিকতার পুনরুদ্ধার"। কিন্তু সত্যিই কি তাই? বাস্তবে এই প্রস্তাব কেন্দ্রীয় সরকারের সেই স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতাকেই প্রকাশ করেছে, যেখানে বিরোধী শক্তিকে একে একে গুঁড়িয়ে দিয়ে দেশকে একদলীয় শাসনের পথে ঠেলে দেওয়া হবে।

গণতন্ত্রের অন্যতম মৌলিক নীতি হলো 'নির্দোষীতার অনুমান'। অর্থাৎ আদালত দোষী সাব্যস্ত না করা পর্যন্ত কোনও নাগরিককে শাস্তি দেওয়া যায় না। ভারতীয় সংবিধানের ২১তম ধারা এই অধিকার নিশ্চিত করেছে। কিন্তু ১৩০তম সংশোধনী বিল সেই মূল নীতিকেই পদদলিত করছে। কেবল গ্রেপ্তার আর ৩০ দিনের হেফাজতেই একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে সরিয়ে দেওয়ার বিধান আসলে বিচারপ্রক্রিয়ার আগেই শাস্তি কার্যকর করার নামান্তর। এটি আসলে একটি "অ্যাবসার্ড ট্র্যাপ"। এতে বিচার বিভাগের ভূমিকা কার্যত অস্বীকার করা হচ্ছে, আর নির্বাহী সংস্থাগুলোকে দেওয়া হচ্ছে অসীম ক্ষমতা। অথচ পরিসংখ্যান বলছে, কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা ইডি আর সিবিআই-এর দোষী সাব্যস্ত করার হার মাত্র ০.১ শতাংশ। অর্থাৎ ৯৯.৯ শতাংশ মামলাই শেষ পর্যন্ত আদালতে টেকসই হয়না। কিন্তু অভিযোগ ওঠার মুহূর্তেই যদি পদ হারাতে হয়, তবে সেই অভিযোগগুলো রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হওয়াই স্বাভাবিক।

এখানেই স্পষ্ট হয়ে যায় সরকারের আসল উদ্দেশ্য। যারা দাবি করছে এটি নৈতিকতার প্রশ্ন, তাদের কাছে সহজ প্রশ্ন কেন এখনও কোনও বিজেপি মন্ত্রী এভাবে গ্রেপ্তার হননি? উত্তর জানা সবারই। কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলো একচোখা হয়ে কাজ করছে। ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারাই নিশানা হচ্ছেন। আবার সেই অভিযুক্ত বিরোধী নেতারা যদি বিজেপিতে যোগ দেন তাহলে নৈতিকতার পাঠ পড়ানো অমিত শাহের কোনও আপত্তি থাকে না, তাদেরকে দলীয় পতাকা হাতে তুলে দিতে। বিজেপিতে যোগ দিলেই 'সাত খুন মাফ'। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার এই নকশাকে আইনের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে কেবল। একথা বলাই যায় যে এটি কোনও সংস্কার নয়, বরং বিরোধীদের রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার সাংবিধানিক ফাঁদ। ইতিমধ্যেই বিরোধীরা অভিযোগ করছেন, কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলোকে বিজেপি নিছক রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। PMLA, UAPA-এর মতো কঠোর আইন দিয়ে বিরোধী শিবিরকে জর্জরিত করা হচ্ছে। এ আইন পাস হলে সেই প্রবণতা বহুগুণে বাড়বে। কেবল ৩০ দিনের হেফাজতই যথেষ্ট হবে একটি রাজ্য সরকারকে উলটে দেওয়ার জন্য। এমনকি নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীও কেন্দ্রের ইশারায় অপসারিত হতে পারেন। ফলে গণতন্ত্রে জনগণের দেওয়া রায় অর্থহীন হয়ে যাবে।

ভারত একটি ইউনিয়ন অফ স্টেটস বা যুক্তরাজ্য। সংবিধান সেই কাঠামো রক্ষার জন্যই রাজ্য কেন্দ্র ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করেছে। কিন্তু এই বিল কার্যত সেই ভারসাম্যই ভেঙে দিচ্ছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বা মন্ত্রীদের পদচ্যুত করার মতো ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে গেলে রাজ্যগুলোর স্বায়ত্তশাসন ধ্বংস হবে। ইতিমধ্যেই তথ্য বলছে, বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলোতে ইডি রেইডের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। যদি এই বিল আইন হয়, তবে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়বে, রাজ্য সরকারগুলো নিছক কেন্দ্রের পুতুলে পরিণত হবে। এর ফল হবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন আর প্রশাসনিক অচলাবস্থা। গণতন্ত্র তখন কেবল কাগজে থাকবে, বাস্তবে নয়।

অন্যদিকে, এই বিল আনার সময় আর প্রেক্ষাপটও লক্ষ্য করার মতো। দেশ অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে, বেকারত্ব বাড়ছে, মূল্যস্ফীতি চেপে ধরেছে সাধারণ মানুষকে। প্রকৃত সমস্যাগুলো থেকে মনোযোগ সরাতেই এই বিলকে হাতিয়ার করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি এক ধরনের রেড হেরিং। জনগণের ক্রোধ যাতে সরকারের বিরুদ্ধে না যায়, তাই কৃত্রিম বিতর্ক সৃষ্টি করে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ানো হচ্ছে। শাসকদলের সঙ্গে যুক্ত বৃহৎ দুর্নীতির মামলাগুলো নিয়ে যেন কোনও আলাপ আলোচনা না হয়, সেইজন্যই এই ধরণের পদক্ষেপ।

অন্যদিকে বিহারে চলমান এসআইআর ও ভোট চুরি বিরোধী আন্দোলন প্রতিনিয়ত মানুষের সমর্থন পাচ্ছে। রাহুল গান্ধী এবং অন্যান্য বিরোধী দলগুলির সমন্বয় ভোটার তালিকায় কারচুপির অভিযোগের বিরুদ্ধে লাগাতার বাড়ছে। নির্বাচন কমিশন বিজেপি-র ডানহাতে পরিণত হয়েছে এই ধারণা মানুষের মনে প্রোথিত হচ্ছে। যদিও মূলধারার সংবাদমাধ্যমে এই আন্দোলনের কথা প্রায় বলাই হচ্ছে না, তবু এই আন্দোলন দেশের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। এই সময়ে অতএব মানুষের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য নিয়ে আসা হল এই গণতন্ত্রবিরোধী বিল। সরকার পক্ষ খুব ভালো করেই জানে যে সংবিধান সংশোধন করতে হলে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগে, যা বর্তমানে বিজেপি-র নেই। তবু এই বিল নিয়ে আসা হল জনগণের নজর ঘোরাতে এবং বিরোধীদের এই বার্তা দিতে যে তাদের গদিচ্যুত করার জন্য এখন আর জনগণ বা আদালতের প্রয়োজন নেই, অমিত শাহের নির্দেশে ইডি কোনও নেতাকে ৩০ দিন জেলে রাখতে পারলেই মন্ত্রীত্ব চলে যাবে।

আবার বিরোধী দলগুলিকেও ভাবতে হবে যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তারা কতটা আন্তরিক। আজকে যদি তৃণমূল কংগ্রেসের মতো একটি দল, যাদের একাধিক মন্ত্রী দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত, এমনকি জেলবন্দী তারা যদি এইসব নেতাদের দলে সসম্মানে রেখে দিয়ে এই বিলের বিরোধিতা করতে নামে তাহলে বিজেপির ভাষ্যই আরও বেশী করে প্রতিষ্ঠিত হয়। একইভাবে সমাজবাদী পার্টি, আপ, ডিএমকে, কংগ্রেস-সহ কমবেশী সব বিরোধী দলই তাদের দলের দুর্নীতিগ্রস্ত নেতানেত্রীদের বিরুদ্ধে একধরণের উদাসীন মনোবৃত্তি নিয়ে চলে। ফলে জনমানসে এই দলগুলোর বিভিন্ন নেতা মন্ত্রীদের কোনও স্বচ্ছ ভাবমুর্তি নেই। অন্যদিকে জনগণেরও দায়িত্ব থাকে এই রাজনৈতিক পরিবেশ বদল করার। মানুষ যদি সত্যিই মনে করেন রাজনীতি দুর্নীতিমুক্ত হওয়া দরকার তাহলে তাঁদেরও উচিত এই ধরণের রাজনীতিকদের নির্বাচিত না করা, তাদের ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত না করা। নিজেদের তাৎক্ষণিক সুবিধার্থে ভোট না দিয়ে একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে রক্ষা করে ভোট দিলে এই দুর্নীতি চক্রের অবসান হতে পারে। কিন্তু তার বদলে মানুষ যদি ভাবেন একটি আইন করেই এই সংস্কৃতি পরিবর্তন হয়ে যাবে তাহলে তারা আদতে নিজেদের বিপদই ডেকে আনছেন।

অতএব, স্পষ্ট যে ১৩০তম সাংবিধানিক সংশোধনী বিল ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোতে ভয়াবহ একটি আক্রমণ। এটি সংবিধানের অধিকারকে ভেঙে দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ধ্বংস করছে, জনগণের নির্বাচনী রায়কে অর্থহীন করে তুলছে। এ পরিস্থিতিতে জনগণের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। কারণ গণতন্ত্র কেবল রাজনীতিবিদদের দায় নয়। এটি জনগণের অস্তিত্বের প্রশ্ন। যদি জনগণ আজও চুপ থাকে, তবে কাল ইতিহাস লেখা হবে অন্যভাবে, যেখানে ভারত নামক দেশটি এক অন্ধকার যুগে প্রবেশ করবে, আর গণতন্ত্র কেবল পাঠ্যবইয়ের পাতায় পড়ে থাকবে, বাস্তবে নয়।