আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ ষোড়শ সংখ্যা ● ১৬-৩১ আগস্ট, ২০২৫ ● ১-১৫ ভাদ্র, ১৪৩২
প্রবন্ধ
পুজোর নামে, উৎসবের নামে
সুগত ত্রিপাঠী
বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপুজো। আর সেই দুর্গাপুজোর জৌলুস কলকাতা শহরেই সর্বাধিক। ছোট-বড় মিলিয়ে এখানে হাজারেরও বেশি পুজো হয়। কিন্তু এ প্রসঙ্গে কিছু কিছু বিষয় দেখে অবাক হই। কলকাতার যে সমস্ত বড় ক্লাবগুলির পুজো অতি বিখ্যাত, তার পেছনে কর্তাব্যক্তি এমন সব মানুষ, যাঁদের অধিকাংশের ভাবমূর্তি ঠিক পরিচ্ছন্ন নয়। উচ্চশিক্ষিত, ভদ্র-সভ্য, লেখক-শিল্পী, বৈজ্ঞানিক, শিক্ষাবিদ শ্রেণির মানুষজন কোনও পুজোর উদ্যোক্তা - তেমনটা প্রায় দেখা যায় না। দেখা যায় এমন সব মানুষকে, যাঁদের ভাবমূর্তি মোটামুটি এঁদের বিপরীত। নামে ভগবানের আরাধনা, প্রকৃতপক্ষে বৈভবের আরাধনা-প্রদর্শন চলে ওখানে।
এই উৎসব-সময়ে সাধারণ বাঙালি ত্রি-ফলায় আক্রান্ত হন। যে তিনটি ফলা তাঁদের বিদ্ধ করে, সেগুলি হল - চাঁদা, মাইক-সাউন্ড বক্স এবং আতশবাজি।মোটা চাঁদা দেওয়ার হাত থেকে বাঁচতে অনেক গৃহস্থ পুজোর বেশ ক'দিন আগেই বাড়ি ছেড়ে আত্মীয়-কুটুম্বের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন - এমন ঘটনা বহুবার দেখা গিয়েছে। কারণ, চাঁদাপার্টির দলে অনেক সময় এমন কিছু গুণ্ডামার্কা, অভব্য চালচলনযুক্ত যুবক থাকে, যারা ঠিক সুস্থ-স্বাভাবিক-প্রকৃতিস্থ মানুষের মধ্যে পড়ে না। বর্তমান লেখক একবার চাঁদা না-দেওয়ায় ক্লাবের ছেলেরা যাওয়ার সময় বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে চলে গিয়েছিল। বহুকষ্টে উদ্ধার পেয়েছিলাম সে-বার। আর একবার চাঁদা চাইতে আসা কিছু বয়স্ক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, "কী আশ্চর্য! আপনারা পুজো করবেন, আমি টাকা দিতে যাব কেন! পুজো করা, চাঁদার পরিমাণ নির্ধারণ করার আগে কি আমার সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন?" ভদ্রলোকেরা এমনভাবে প্রশ্নকর্তার দিকে তাকিয়েছিলেন, যেন গ্রহান্তর থেকে কোনও কথা আমদানি করছি। ক্রোধের সঙ্গে বলেছিলেন, "কী বলতে চাইছেন? এটা পাড়ার পুজো। চাঁদা দেবেন না!" বলেছিলাম, "পাড়া-টাড়া বুঝি না। তবে এটা বুঝে গিয়েছি দীর্ঘদিন এখানে থেকে, আমি বিপদে পড়লে কেউ আমাকে দশ টাকা দিয়েও সাহায্য করবে না। শীতের রাতে অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে পৌঁছবার ব্যবস্থা কেউ করে দেবে না।" জোঁকের মুখে নুন পড়লে যে অবস্থা হয়, ভদ্রমহোদয়দের মুখের সেই অভিব্যক্তি হয়েছিল, তা আজও ভুলিনি। অবশ্য মুষ্টিমেয় কিছু ক্লাব আছে, যাদের ছেলেরা অত্যন্ত সভ্য-ভদ্র। এরা বিনীতভাবে গৃহস্থের কাছে আসে। 'দাদা', 'কাকু', 'মাসিমা' ইত্যাদি সম্বোধন করে বলে, "আপনাদের সাধ্যমতো যেটুকু পারেন দিন, কোনও চাপ নেই।" লোকেরা নিজের থেকেই আগ্রহের সঙ্গে এদের পুজোর জন্য অর্থসাহায্য করেন। কিন্তু বড় আফসোসের বিষয়, এই শ্রেণির পুজো-উদ্যোক্তা হাতে গোনা। এই গেল প্রথম ফলা।
দ্বিতীয় ফলা - মাইক-সাউন্ড বক্স, বিশেষত ডিজে বক্স নামক এক বিকট বস্তুর তাণ্ডব। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, যে সমস্ত তথাকথিত পুজো-আয়োজক এভাবে বিপুল পরিমাণ শব্দযন্ত্রণা সৃষ্টি করে তারা নিজেরা ঠিকভাবে লেখাপড়া কোনওদিন করেনি। তাই বিকট শব্দে পড়ুয়া ছেলে-মেয়েদের কতখানি অসুবিধে হয়, সে সম্পর্কে কিছু ধারণা নেই। এরা যেটা করে - নাম-কা-ওয়াস্তে প্যাণ্ডেলে একটা প্রতিমা বসিয়ে তার পেছনে নেশাভাঙ, আর বক্স বাজিয়ে কুৎসিত নাচানাচি। অথচ কতরকম সমস্যা আছে শব্দতাণ্ডব-সংক্রান্ত। হৃদযন্ত্রের গোলযোগের রোগী-সহ নানা ধরনের অসুখের প্রাবল্য বেড়ে যায় দূষণ সৃষ্টিকারী এ-রকম আওয়াজের ফলে। খুব উচ্চগ্রামের শব্দ কানে এসে পৌঁছলে কানের পর্দা ফেটে যেতে পারে। ফলস্বরূপ সৃষ্টি হবে বধিরতা। বলা বাহুল্য, পুজোর কর্মকর্তাদের এসব বোধ নেই। আইন-কানুনের তোয়াক্কা এঁরা করেন না। তাই নির্দিষ্ট শব্দসীমা-সময়সীমা মেনে মাইক বাজান না। আর ডিজে বক্সের কোনওরকম উৎপাদন ও বিক্রি কার্যকরীরূপে পূর্ণ নিষিদ্ধ হওয়া একান্ত প্রয়োজন। শব্দদূষণ তথা পরিবেশদূষণ সৃষ্টিকারী এইসব নরাধমদের হয় কঠোর হাতে দমন করতে হবে, নচেৎ পুজো কিংবা অন্য সমস্ত অনুষ্ঠানে মাইক্রোফোন, লাউড স্পিকার ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দিতে হবে। যাঁর যা প্রতিভা বিকাশ করার ইচ্ছে, সে লেকচার হোক কিংবা অনুষ্ঠান - গান-বাজনা, আবৃত্তি, নাটক ইত্যাদি - সব করতে হবে ঘেরা জায়গায়, যার শব্দ বাইরে আসবে না। অনিচ্ছুক ব্যক্তিকে জবরদস্তি এসব শোনানোর অধিকার কারও নেই।
ফলা সংখ্যা তিন - আতশবাজি। যে সমস্যা মাইক্রোফোনের ভয়ানক আওয়াজে হয়়, একই তথা ততোধিক অধিকতর সমস্যা হয় বাজির প্রচণ্ড শব্দে। হঠাৎ কানের কাছে এরকম শব্দে হার্টের অসুখের রোগীদের হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাওয়াও বিচিত্র নয়। আর শব্দবাজি হোক কিংবা শব্দবিহীন দৃশ্যবাজি - উভয়ই সাঙ্ঘাতিক পরিবেশ দূষণ করে। এমন অনেক আতশবাজি আছে যা তীব্র আলো বিকিরণ করে। এই আলো চোখের পক্ষে খুব ক্ষতিকর। আর বাজি বানাতে গিয়ে এবং বাজি পোড়াতে গিয়ে কত মানুষ যে চিরতরে বিকলাঙ্গ হয়ে গিয়েছেন, মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন তার ইয়ত্তা নেই।
অবশ্য কেবল আমাদের দেশেই এ ব্যাপারটি আছে তা নয়, পৃথিবীর অসংখ্য দেশ - যেগুলির মধ্যে বেশ কয়েকটি তথাকথিত উন্নত দেশ বলে পরিচিত - সেখানেও বাজির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, হাঙ্গেরী, সুইৎজারল্যাণ্ড, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যাণ্ড, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর - বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে এসব দেশে যথেষ্ট বাজি পোড়ানো হয়। যেমন ৪ জুলাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসে প্রচুর বাজি ফাটে, একইরকম ভাবে বাস্তিল-দিবসে ফ্রান্সে বাজির প্রদর্শনী হয়। তবে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষে এর অত্যাচার অত্যধিক। শুধু দুর্গাপুজো কিংবা অন্য পুজো-পার্বণ নয়, ব্যক্তিগত উৎসব-অনুষ্ঠানেও বাজি ফাটানো হয়। যেমন - বিয়ে, অন্নপ্রাশন, জন্মদিন ইত্যাদি। খেলাধুলোয় দেশ জিতলে বাজি পোড়ানোর রেওয়াজ আছে। এই বিয়ে ইত্যাদির মতো অনুষ্ঠানে বাজি পোড়ানোর রেওয়াজ আগে বাঙালির ছিল না, এই ব্যাধিটা তাকে গ্রাস করেছে সম্ভবত উত্তর ভারতের কোনও কোনও অঞ্চলের কাছ থেকে 'শিক্ষা' গ্রহণ করে। যেমন 'সঙ্গীত', 'মেহেন্দি'-র মতো সম্পূর্ণ বঙ্গসংস্কৃতি-বর্জিত অনুষ্ঠান এখন বাঙালি তার বিয়েতে ভালোই রপ্ত করেছে, একইরকম ভাবে আতশবাজির হাত ধরে পরিবেশ-দূষণটাও তার মজ্জাগত হয়ে যাচ্ছে।
অনেকে এসব পড়ে বিরক্ত নিশ্চিত। ভাবছেন, লোকটা বেজায় বেয়াড়া, অসভ্য, নির্বোধ তো! যত দোষ নন্দ ঘোষ! একদিন-দু'দিন-তিনদিনের বাজি ফাটানোতেই তার সব বিষ উগরে দিচ্ছে! আর সারা বছর যে অজস্র যানবাহন, কলকারখানা প্রতিনিয়ত বিষ ঢেলে চলেছে প্রকৃতিতে, পরিবেশে - তার বেলা? হক কথা। কিন্তু এখানে দু'টি ব্যাপার আছে। প্রথম - কলকারখানা কিংবা যানবাহন প্রচণ্ড দূষণ সৃষ্টি করে ঠিক, কিন্তু তা থেকে আমরা প্রভূত উপকারও পাই। এককথায়, এগুলি ছাড়া আমাদের জীবন প্রায় স্থবির হয়ে যাবে। অতএব এগুলিকে বজায় রাখতে হবে। তবে দূষণ যথাসম্ভব যেন কম হয় সে ব্যবস্থাও করতে হবে। কিন্তু বাজি থেকে তো আমরা এরকম কোনও উপকার পাই না। তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত কেবল অপকার আর অপকার। তাহলে ওটা আমরা মেনে নেব কেন? যে গরু দুধ দেয়, তার লাথি খাওয়া যায়; যে গরু দুধ দেয় না, তার লাথি খেতে যাব কোন দুঃখে?
প্রসঙ্গত বলি, প্রায় সবাই জানেন, 'বিশ্ব পরিবেশ দিবস' পালিত হয় প্রতিবছর ৫ জুন তারিখে। ১৯৭৪ সালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের স্পোকেন শহরে রাষ্ট্রসঙ্ঘের উদ্যোগে পরিবেশ-সচেতনতার উদ্দেশে যে সমাবেশ আহ্বান করা হয়েছিল, তা-ই 'বিশ্ব পরিবেশ দিবস' নামে পরিচিত। তারপর থেকে চলে আসছে। ভারত প্রথম সুযোগ পায় ২০১১ সালে। পরবর্তী সুযোগ আসে ভারতের ২০১৮ সালে। কিন্তু বাস্তব এই - বর্তমান পৃথিবী এতটাই কলুষিত যে, মনে হয় প্রতিদিন, প্রতিটি মুহূর্তই পরিবেশ বাঁচানোর জন্য ব্যয় করা দরকার। সেক্ষেত্রে প্রতিদিনই 'বিশ্ব পরিবেশ দিবস' হওয়া উচিত - কথায় নয়, কাজে।
বেশ কয়েক বছর ধরে মানবজাতির ঘাড়ে চেপে বসেছে বিশ্ব-উষ্ণায়ন। যার প্রধান কারণ মারাত্মক বায়ুদূষণ। অনেক বিজ্ঞানীর মতে, নিয়ন্ত্রণ করা না-গেলে পৃথিবী নামক গ্রহের ধ্বংস ডেকে আনবে উষ্ণায়নই। মেরুদেশে বরফ দ্রুত গলিত হচ্ছে। আগামী তিরিশ বছরের মধ্যে ভয়াবহ জলস্ফীতি হলে আশ্চর্যের কিছু নেই। কিশোরী পরিবেশবিদ গ্রেটা থুনবার্গ বছর তিনেক আগে অনুষ্ঠিত গ্লাসগো জলবায়ু সম্মেলন নিয়ে 'ব্লা ব্লা ব্লা' (অর্থাৎ আলোচনার নামে অর্থহীন প্রলাপ) বলে যে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন, তা সম্পূর্ণরূপে সমর্থনযোগ্য। কেবল গ্লাসগো নয়, পৃথিবীর নানা স্থানে সারা বছর জুড়ে এ-জাতীয় অসংখ্য সমাবেশ-কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে। কিন্তু লাভের ঘর মোটামুটি শূন্যই থাকে।
এসব ভারি ভারি কথা মুলতুবি রেখে পুনরায় পুজো-প্রসঙ্গে আসি। অনেক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে মানুষ ডোনেশন বা দান প্রদান করেন। বস্তুত, দানের অর্থেই চলে বহু আশ্রম। আশ্রমিকরা কিন্তু বাড়ি বাড়ি গিয়ে টাকা তোলেন না। মানুষ নিজের থেকেই টাকা দেন তাঁদের প্রতিষ্ঠানে গিয়ে। অর্থাৎ ধর্মীয় উদ্দেশ্যে বহু মানুষ সোৎসাহে অর্থপ্রদান করেন। পুজোগুলি যে হয়, সেগুলিও তো মূলত ধর্মীয় অনুষ্ঠান। তাহলে যে মানুষটি ধর্মপ্রতিষ্ঠানে আগ্রহের সঙ্গে টাকা দেন, সেই মানুষ-ই সর্বজনীন পুজোয় চাঁদা দিতে বিরক্তি প্রকাশ করেন কেন? কারণ, তাঁরা দেখেন, আশ্রমগুলি অনেক জনহিতকর কাজ করে। উল্টোদিকে, ক্লাবগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রে অশান্তি সৃষ্টি ছাড়া কিছু করে না। তাই তাঁদের এই অনীহা।
মোট কথা, একজনেরও অসুবিধা সৃষ্টি করে কোনও উৎসব করা যাবে না। তার অসুবিধার কথা জেনে তা প্রতিকারের ব্যবস্থা করে তবেই সব আয়োজন করতে হবে। নচেৎ একশ্রেণীর মানুষের ফূর্তির কারণে যদি একজন লোকও অসুস্থ হয়ে পড়েন কিংবা মারা যান (বিভিন্ন উৎসবের আবহে এরকম ঘটনা ঘটেছে), বিকট শব্দ বা গোলমালের জেরে কোনও পরীক্ষার্থীর পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যাঘাত ঘটে এবং তার ফলে যদি তিনি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন কিংবা চাকরিটা না-পান, সেক্ষেত্রে তাঁর পরিণতির জন্য কিন্তু বহুলাংশে দায়ী থাকবে এই তাণ্ডব-করা মানুষজন।
ভারতবর্ষে তো প্রায় সমস্ত ধর্ম-সম্প্রদায়ের মানুষজন আছেন। বৌদ্ধরা কি বুদ্ধ-পূর্ণিমায় তাঁদের এলাকায়় এসব (অর্থাৎ বাঙালির দুর্গোৎসবের মতো) কাণ্ডকারখানা করেন? অজস্র খ্রিস্টান রয়েছেন কলকাতায়। বড়দিনে পার্ক স্ট্রিট, চৌরঙ্গী এলাকায় কি তাঁরা অন্যের অশান্তি করেন? এখন কেউ যদি বলেন, আমাদের ধর্মাচরণ, উৎসব-পালনের পদ্ধতি আর ওঁদের পদ্ধতি ভিন্ন। সে কথা আংশিক সত্য বলে মেনে নিয়েও উদাহরণ দিতে হয় বেলুড় মঠের কথা। পুজো তো ওখানেও হয়। সেও তো এক অর্থে সর্বজনীন পুজো। সেখানকার উৎসব-পালনের সঙ্গে অমুক সঙ্ঘ, তমুক সঙ্ঘ, এই ক্লাব-ওই ক্লাবের ব্যাপারস্যাপারের তুলনা হয় কি? তা সত্ত্বেও দর্শনার্থীর ভিড় উপচে পড়ে ওখানে। ওই তথাকথিত অনাড়ম্বর পুজো দেখতে। অতএব বোঝাই যাচ্ছে, আড়়ম্বর-মোচ্ছবের সঙ্গে জনসমাগমের কোনও সম্পর্ক নেই। এমন অসংখ্য মানুষ বেলুড়ে আসেন পুজোর সময়, মঠের সঙ্গে যাঁদেের যোগাযোগ নেই। কিন্তু তাঁরা জানেন, এখানে পুজোটা হয় পুজোর মতো। সেটা দেখতেই তাঁদের আসা।
সর্বজনীন পুজোয় এই বিপুল বৈভবের টাকা কোথা থেকে আসে সেটাও একটা প্রশ্ন। এক-একটা ক্লাবের আয়োজন দেখে তো মনে হয় কোটি ছাড়িয়ে যাবে বাজেটের অঙ্ক। বিজ্ঞাপন থেকে টাকা পাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু তার পরিমাণ কি এত! আর কলকাতা এবং জেলা-শহরগুলির বিখ্যাত বহু পুজোর মাথায় থাকেন প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ। তাঁদের নামেই পুজোর নামকরণ প্রচলিত হয়ে যায়। এটা অমুক বোসের পুজো, সেটা তমুক চ্যাটার্জির।
সেইসঙ্গে কিছু খবরের কাগজ কোম্পানি, গয়নার কোম্পানি, টিভি চ্যানেল কিছু নির্বোধ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে - 'কোন মণ্ডপ শ্রেষ্ঠ', 'কোন প্রতিমা সেরার সেরা' ইত্যাদি। একদল 'বিচারক' পৌঁছে যান মণ্ডপে, গম্ভীর মুখে খুঁটিয়ে সব পর্যবেক্ষণ করেন। অতঃপর - রায়দান। যাঁর ভাগ্যে পুরস্কারের শিকে ছিঁড়ল, তিনি মনে করেন, কী-না-কী করে ফেললাম! একেবারে ফাটিয়ে দিলাম! এখন আবার বিভিন্ন আবাসনের পুজোর ভেতরেও এই ব্যাপার ঢুকেছে। উপরোক্ত কোম্পানিগুলি আবাসনের পুজোতেও টক্করের আয়োজন করে। সেখানকার হুজুগে বাসিন্দারা অবান্তর পুরস্কারের লোভে দেদার খরচ করেন পুজোয়। কপালে পুরস্কার না-জুটলে মুখ কালো। এসব তামাশার কোনও মানে হয় কি? বাঙালি এমনিতেই হুজুগে জাত। শহুরে বাঙালির মধ্যে এই প্রবণতা অধিক। তাই পুজো শুরু হওয়ার তিন-চার দিন আগে থেকেই ঠাকুর দেখার জন্য লাইন দেন। ঘন্টার-পর-ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে উদ্যোক্তাদের উৎসাহ বাড়িয়ে দেন। পরের বছর নব উদ্যমে উদ্যোক্তারা আবার কোমর বাঁধেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ যদি আড়ম্বরের পুজোগুলোকে উপেক্ষা করতে থাকেন, আয়োজকদের এই উৎকট উৎসাহ আর থাকবে না।
পুজো বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য। বিশ্বকর্মা পুজো, দুর্গাপুজো, কালীপুজো, জগদ্ধাত্রী পুজো, বাসন্তী পুজো - সবই অতি প্রাচীনকাল থেকে বাংলায় চলে আসছে। তখন কি পুজোয় এরকম জৌলুস-প্রদর্শনের আখড়া বসত? নিশ্চয়ই নয়। তৎকালীন পুঁথিপত্রে পুজোর যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তাতে দেখা গিয়েছে, পুজোটা হত নিষ্ঠার সঙ্গে। দেখনদারির চেয়ে প্রাণপ্রতিষ্ঠা সেখানে গুরুত্ব পেত। এখন ব্যাপারটা উল্টে গেছে। তথাপি অনেক গৃহস্থ বাড়িতে, মঠ-মিশন-আশ্রমে পুজোটা ঈশ্বরের আরাধনা হিসেবেই হয় - নিষ্ঠার সঙ্গে (যেমন বলেছি বেলুড় মঠের কথা); অর্থহীন মোচ্ছব হিসেবে নয়। আর যদি দুর্গাপুজো হিসেবে না-ধরে একে শারদোৎসব হিসেবে বিবেচনা করি, সেক্ষেত্রেও রূপ এর অনেক মার্জিত হওয়া প্রয়োজন।
ভেবে দেখতে বলি দৃশ্যটা - তৈরি হয়েছে সুদৃশ্য শিল্পশ্রীমণ্ডিত মণ্ডপ। তার অভ্যন্তরে সুদৃশ্য প্রতিমা। আমাদের কল্পনার মণ্ডপ তৈরি হয়েছে কোনও রাস্তা গ্রাস করে নয়, কারও অসুবিধা সৃষ্টি করে নয়; নিজস্ব জায়গায়। সেখানে না-আছে কোনও শব্দতাণ্ডব, না কোনও দূষণদৈত্য। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে চলছে দেব-আরাধনা। এমন পুজো অসংখ্য হলেও মানুষের কোনও ক্ষতি, অশান্তি হয় না। সারা বছর ধরে যদি এই ধারায় উৎসব চলে, প্রতিদিন উৎসব হলেও বোধহয় কারও অসুবিধা হবে না। সেক্ষেত্রে মানুষ উৎসবের প্রতি, ক্লাবগুলির প্রতি বিরক্ত না-হয়ে বরং নিজে থেকেই তাদের সহযোগিতা করবেন।
সেই দিনের আশায় রইলাম।