আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ ষোড়শ সংখ্যা ● ১৬-৩১ আগস্ট, ২০২৫ ● ১-১৫ ভাদ্র, ১৪৩২

সমসাময়িক

একুশে আইন


ভারতের উপর বিপুল শুল্ক চাপিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প! রাশিয়া থেকে তেল কেনার সাজা হিসেবে তিনি ভারতের ঘাড়ে এই শুল্ক বোঝা চাপিয়েছেন - কোনো রাখঢাক না করে ট্রাম্প নিজেই তা জানিয়ে দিয়েছেন। একই অপরাধে অবশ্য সমান বিচার প্রত্যাশা করা ট্রাম্প-এর পৃথিবীতে আকাশকুসুম কল্পনা। তাই চীনের উপর মার্কিনি শুল্ক বোঝা হল, ৩০ শতাংশ, আর জরিমানা ইত্যাদি নিয়ে ভারতের উপরে মার্কিনি শুল্ক দাঁড়িয়েছে ৫০ শতাংশ। আরেক ব্রিক দেশ ব্রাজিলকেও তিনি ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে সাজা দিয়েছেন।

ট্রাম্প বলেছেন, এই অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের বিষয়টি রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। ২০২২ সাল থেকে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের বিক্রি ভারতে তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, রাশিয়া এখন তার মোট তেল রফতানির প্রায় ৩৫-৪০ শতাংশ করে ভারতে। ওয়াশিংটন-এর দৃষ্টিকোণ থেকে, এই বাণিজ্য মস্কোর জন্য সরাসরি জীবনরেখা। অবশ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভারত রাজনৈতিক ভণ্ডামির অভিযোগ করেছে - মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর পরেও, রাশিয়ার সঙ্গে ইউরেনিয়াম এবং প্যালাডিয়ামের মতো পণ্যের বাণিজ্য মহানন্দে অব্যাহত রেখেছে।

আসলে এই দ্বন্দ্ব তেলের বাইরেও প্রবাহমান।

রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক দেশের বিদেশ নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ, দীর্ঘস্থায়ী স্তম্ভ। ভারতের ৬০ শতাংশেরও বেশি সামরিক সরঞ্জাম মস্কো থেকে আসে। এই নির্ভরতার কারণে ভারতের পক্ষে রাশিয়ার কৌশলগত অংশীদারিত্ব ত্যাগ করা সম্ভব নয়। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক আরোপকে হুমকি দেবার প্রচেষ্টা বলা যায় যাতে ভারত তার দীর্ঘদিনের মিত্র রাশিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে একটি বেছে নিতে বাধ্য হয়। জাতীয় কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী রাশিয়ার তেল কেনার জন্য জরিমানাকে ট্রাম্পের 'অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইল' বলেছেন।

আপাতত ভারতের বিদেশনীতি বিশ বাঁও জলে। 'হাউডি মোদী'-র দিন শেষ। দুই দেশের মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্কের ছবি তুলে ধরতে সে কী হাত জড়াজড়ি! প্রবাসী ভারতীয়দের উত্তাল উত্তেজনা - ভারত আবার জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন নেবে। এবারেও ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হবার পরে ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গেছিলেন তার সঙ্গে দেখা করতে। দীর্ঘ করমর্দন ও যুগল চিত্রের ছবি, বিশেষ হাসি, তাদের 'বিশেষ বন্ধন' খবরের কাগজের পাতা জুড়ে আলোকিত ছিল। ৬ মাস কাটেনি, সেসব এখন ডাস্টবিন-এ।

আর আমাদের বিদেশমন্ত্রী! তিনি সাক্ষাৎকার দিতে খুব ভালোবাসেন, ইদানিং অবশ্য আর তাকে দেখছি না।

ভারতবর্ষের বিদেশনীতি আজ অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়েছে। এ বড়ো সুখের দিন নয়। তবে তার দায় সরকারের। তাদেরই ঠিক করতে হবে, কোন পাল্লায় তারা কতটা ওজন চাপাবে। তা এইবারে ডোনাল্ড ট্রাম্প দেখিয়ে দিয়েছেন, মোদীর সঙ্গে তার বন্ধুত্বটি আসলে বড়োর পিরিতি। বালির বাঁধের মতো তা ভেঙে পড়েছে। মনমোহন সিং আর নেই, তিনিও আর তা দেখে যেতে পারলেন না।

ট্রাম্প বোঝেন 'বিজিনেস', নিজের ও দেশের। পাকিস্তানের সঙ্গে ট্রাম্প-এর দোস্তি ও নীতিবিরুদ্ধ চুক্তি এই প্রসঙ্গে স্মর্তব্য।

পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল, ঐতিহ্যশালী তবুও দরিদ্র এই দেশ - ভারতবর্ষ। ঘোষিত মার্কিন শত্রু চীনের উপরে শুল্ক চেপেছে ভারতের থেকে অনেকটা কম - ৩৫ শতাংশ। কারণটা সকলেই বুঝি।

দিল্লি দূর অস্ত, অনেক কাজ বাকি, উন্নয়ন না হলে, মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি না পেলে ভারতবর্ষের বিদেশনীতি নিয়ে খুব বেশি নিরীক্ষা করা সম্ভব নয়। সরকারের 'বিশেষ বন্ধন' গড়ে উঠুক দেশের মানুষের সঙ্গে, তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে।