আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ পঞ্চদশ সংখ্যা ● ১-১৫ আগস্ট, ২০২৫ ● ১৬-৩১ শ্রাবণ, ১৪৩২

প্রবন্ধ

পাথর কুঁদে লেখা নেই

অনিন্দিতা রায় সাহা


গুজরাট, রাজস্থান, দিল্লী আর হরিয়ানার প্রায় ৬৭০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে আরাবল্লী পাহাড়। প্রাচীন এই পর্বতশ্রেণি মাঝে মাঝে ভগ্ন। তার কারণ যতটা না প্রাকৃতিক, তার চেয়ে বেশি মানুষের হস্তক্ষেপ। এখানকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ব্যাপকহারে নির্মাণ আর খোদাই কার্য চলে। সারা দেশের নানা জায়গায় গড়ে ওঠা মন্দিরের গাত্র কিংবা ঝাঁ-চকচকে অট্টালিকার মেঝেতে ব্যবহৃত পাথরের এক বৃহদংশ আসে এইসব এলাকা থেকে। এর মধ্যে আছে নানা রঙের বেলেপাথর, আলংকারিক পাথর, স্লেট, কোয়ার্টজ ইত্যাদি। স্বভাবতই এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান পেশা পাথর উত্তোলন, কাটাই, খোদাই। পর্যটকরা রাজস্থানে গেলেই নানা ইমারতে পাথরের শোভা দেখতে পান। জয়পুরের গোলাপি বেলেপাথর তো ব্যবহার হয় দেশের বহু জায়গায়। হরিয়ানাতে পর্যটন শিল্প অতখানি প্রতিষ্ঠিত নয় বলে পাথরের বাহার ততটা চোখে পড়ে না। কিন্তু পাথর উত্তোলন (stone quarrying) কার্যে এ রাজ্য অগ্রগণ্য। নুহ, ফরিদাবাদ, মহেন্দ্রগড়, রেওয়ারী, গুরুগ্রাম ইত্যাদি জায়গায় বহু শ্রমিক পাথর উত্তোলনের কাজে নিযুক্ত আছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ স্থানীয়, আবার অনেকে আসে বিহার, উত্তরপ্রদেশ ও পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলি থেকে।

পাথর উত্তোলনের কাজ মানে খনি বা খোলা এলাকায় প্রাকৃতিক শিলাস্তর থেকে ড্রিলিং, ব্লাস্টিং এবং বহুবিধ যন্ত্রের ব্যবহার করে পাথর সংগ্রহ করা। এই শ্রমসাধ্য কাজে আছে আরও এমন এক সমস্যা যা শ্রমিকের জন্য বিধ্বংসী। অথচ এর সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক কৌতুহল তেমন নেই, পত্রপত্রিকায় আলোচনাও প্রায় অনুপস্থিত। পেশাগত স্বাস্থ্য (occupational health) ও বিপদ (hazard) নিয়ে সচেতনতা সাধারণত দেখা যায় ভারী শিল্পের ক্ষেত্রে। পাথর উত্তোলনের কাজে যে বিপুল ঝুঁকি আছে, তার থেকে যে কত প্রকারের শ্বাসজনিত রোগ দেখা দেয়, তা নিয়ে গবেষণা আমাদের দেশে তেমন হয় না। বিশেষ করে উত্তর ভারতের পাথর উত্তোলন শ্রমিকদের নিয়ে তো তেমন অনুসন্ধান হয়ইনি। পাথর উত্তোলন পদ্ধতির প্রধান সংকট তৈরী হয় হাওয়ায় ওড়া পাথরের গুঁড়ো বা ধুলো থেকে। ফলস্বরূপ হতে পারে নিউমোকনিওসিস (pneumoconiosis), সিলিকোসিস (silicosis), বাইসিনোসিস (byssinosis), গ্রেইন ফিভার নামক জ্বর (grain fever syndrome), শ্বাস কষ্ট (asthma), ফার্মার্স লাং (farmer's lung), পালমোনারি ফাইব্রোসিস (pulmonary fibrosis) ইত্যাদি নানারকমের ফুসফুসের রোগ। আজকাল বহুশ্রুত COPD (Chronic Obstructive Pulmonary Disease) আর ফুসফুসের ক্যান্সার এমনই আরো দুটি রোগ যার কারণ হিসাবে এই বিশেষ পেশাটির উল্লেখ করা যায়। এইসব রোগগুলিকে একসাথে করে বলা যেতে পারে পেশাগত কারণে উদ্ভূত ফুসফুসের বা শ্বাসের রোগ (occupational lung diseases)। বায়ুদূষণের বর্তমান দুঃসময়ে এই রোগগুলি সংকট আরও বাড়িয়ে তুলছে। শ্রমিকের সাথে সাথে আক্রান্ত হচ্ছে আরও অনেক মানুষ, তাদের পরিবার, পরিজন, প্রতিবেশি। তাই এটি শুধু কর্মক্ষেত্রের পরিবেশের সমস্যা নয়, এটি প্রাকৃতিক পরিবেশের সমস্যা এবং এক বৃহত্তর সামাজিক সমস্যা।

পাথর উত্তোলন ঠিক খননকার্য নয়। খনিজ বের করা হয় মাটির ভেতর খুঁড়ে, আর পাথর উত্তোলন করা হয় সাধারণত খোলা জায়গায়। এই শিল্পে মূলত তিন ধরণের পদ্ধতি ব্যবহার হয়। প্রথমত, অপেক্ষাকৃত ছোট এলাকায় এবং নরম পাথরের ক্ষেত্রে হস্তচালিত যন্ত্রপাতি ব্যবহার হয়। দ্বিতীয় পদ্ধতিতে পুরো উত্তোলন প্রক্রিয়াটি ভারী যন্ত্রনির্ভর। সেক্ষেত্রে মেশিন দিয়ে প্রণালী খুঁড়ে নেওয়া হয়, আর বড়ো বড়ো ছিদ্র বানিয়ে পাথরকে আলগা করে তারপর উত্তোলন করা হয়। আর তৃতীয়ত, সবচেয়ে কঠিন আর বড়ো পাথরকে বিস্ফোরণ দ্বারা ফাটিয়ে বের করা হয়। এর পর আসে পাথর গুঁড়ো করার পালা (stone crushing)। খুব সহজেই বোঝা যাচ্ছে, পুরো পদ্ধতিতে প্রচুর পাথরের গুঁড়ো তৈরী হয় আর তা অনায়াসে হাওয়ায় ওড়ে। পাথর খোঁড়া, বিস্ফোরণ, এমনকি পাথর বোঝাইয়ের কাজেও PM-১০-এর মতো প্রচুর বস্তুকণা উৎপন্ন হয়। পরের ধাপে পাথর গুঁড়ো করার সময় তৈরী হয় PM-২.৫-এর মতো সূক্ষ্মতর বস্তুকণা। ফল, ফুসফুসের রোগ। পাথর উত্তোলন শিল্পের শ্রমিকরা সহজেই শ্বাসকষ্ট, কাশি, ক্লান্তি, বুকে ব্যাথা, ক্ষুধামান্দ্য, জ্বর ইত্যাদিতে আক্রান্ত হয়। এগুলি সবই উপরে উল্লিখিত কোনো না কোনো রোগের লক্ষণ। ছোট ছোট ধূলিকণা, যাদের মাপ মোটামুটি ০.৫ থেকে ৩.০ মাইক্রন, সেগুলি আক্রান্ত শ্রমিকের ফুসফুসে রয়ে যায় দীর্ঘকাল। তার থেকে ধীরে ধীরে সৃষ্টি হয় RCS (Respirable Crystalline Silica) আর পরিশেষে হয় ফুসফুসের নানা রোগ। দেখা গিয়েছে, মাত্র ৬ মাস পাথর উত্তোলনের কাজ করলেই শ্রমিকের স্বাস্থ্যহানি ও রোগের ঝুঁকি তৈরি হয়। সম্প্রতি প্রকাশিত ন্যাশনাল গ্রীন ট্রাইবুনালের রিপোর্ট বলছে, গত এক দশকে শুধু হরিয়ানার মহেন্দ্রগড় অঞ্চলেই এই শিল্পে নিযুক্ত শ্রমিকদের মধ্যে ফুসফুসের রোগ ১০০ শতাংশ বেড়েছে।

এই যে এক নিঃশব্দ সংকট, যার বলি হচ্ছে অসংখ্য শ্রমিক, তাদের জীবনযাপন, কাজের জায়গার সুরক্ষা, অসুখের করাল গ্রাস, এইসব নিয়ে সচেতনতার প্রয়োজন। প্রয়োজন উপযুক্ত পরিবেশ - কর্মক্ষেত্রেও, বাসস্থানেও। সঙ্গে চাই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য বীমা, এবং রোগের ক্ষতিপূরণ। সম্প্রতি মহেন্দ্রগড়ের পাথর উত্তোলন শিল্পের শ্রমিকদের ওপর একটি বেসরকারি সমীক্ষায় জানা গিয়েছে এমনি অনেক তথ্য। বর্তমানে অনেকেই এই কাজ করছে ৩ থেকে ১০ বছর যাবৎ। তার আগেও তারা কাজ করেছে সংলগ্ন শিল্পে, যেমন, রাস্তা বানানো, দেওয়াল প্লাস্টার করা, নানারকমের খোদাই কাজ, ইত্যাদি। সেখানেও ছিল শ্বাসজনিত রোগ সৃষ্টির সম্ভাবনা। অর্থাৎ শুধু বর্তমানে পাথর উত্তোলনের ফলেই কতখানি ঝাঁঝরা হয়েছে ফুসফুস, তা সঠিকভাবে বলা কঠিন। অতীতের প্রভাব হয়তো গভীরতর হয়েছে এই কাজে এসে। আর দুই মিলে শ্রমিকের স্বাস্থ্য সংকট হয়েছে তীব্রতর। এবার দেখা যাক, কেমন পরিবেশ আর সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে এই শ্রমক্ষেত্রে? উত্তর, অতি অপ্রতুল। যেমন, এখানে শ্রমিকদের কাজের সময় ফেস মাস্ক দেওয়া হয় না, নেই সুরক্ষা-পোশাক বা পার্সোনাল প্রোটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট (PPE)। ঘিঞ্জি ছোট ঘরে অনেক শ্রমিকের বাস, কারণ ভিন রাজ্য থেকে আসা পরিযায়ী শ্রমিক অনেকেই। ঘরে বায়ু চলাচল সীমিত, রান্না মূলত কাঠ]0) বা কয়লার উনুনে। অর্থাৎ বায়ুদূষণ ঘরেও, বাইরেও। রোগ তবে রুখবে কে! বেশিরভাগ জায়গাতেই মালিক কাজ চালান ঠিকাদারের মাধ্যমে। অতএব স্বাস্থ্য বীমার প্রশ্ন নেই, নেই চিকিৎসার কোনো সুবিধা। এইসব দূরদূরান্তের পাথরের খনি এলাকা থেকে হাসপাতাল বা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে প্রায় ৩ থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে। সেও যাওয়া হয় যখন অসুখ গুরুতর হয়ে ওঠে, কেবল তখনই। নিয়মিত আর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে যায় কে! মালিকের এমন কোন স্বাস্থ্য নীতি নেই। তার ওপর অনেক শ্রমিকেরই আছে পান-তামাক-গুটকার বদভ্যাস। অতএব, সমস্যা প্রায় সমাধানহীন। বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে পুরোনো শ্রমিক বাতিল, যোগ দেবে নতুন আরেক দল। পাথরের কাজ চলতেই থাকবে।

একদিকে ক্রমবর্ধমান পাথরের ব্যবহার ধনাঢ্য বাড়িঘর আর মন্দির-মসজিদ নির্মাণে, আর অন্যদিকে সেই পাথরের স্তূপের নিচেই আছে এক প্রায়-না-জানা স্বাস্থ্য সংকটের কাহিনি। উন্নয়নশীল দেশে অনেক শিল্পনীতি প্রণয়ন হয়, বিকাশের জন্য পরিকল্পনা তৈরী হয়, ক্ষুদ্র, মাঝারি নানাস্তরে। পরিবেশ নিয়ে বহু চর্চা হয়, পরিবেশ মন্ত্রক, দপ্তর, সরকারি-বেসরকারি সংগঠনগুলি আলোচনা করে পরিবেশ দূষণ নিয়ে, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের সম্পর্ক নিয়ে। কিন্তু এই একটি শিল্পক্ষেত্রের এমন জ্বলন্ত এক স্বাস্থ্য সংকট উহ্যই থেকে গেছে এতদিন। দুঃখের বিষয়, অনেক মজুররা নিজেরাই জানে না কী ভীষণ ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে তারা। তাই পাথর উত্তোলন ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন করতে হলে শ্রমিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া দরকার। এতে উপকৃত হবে সংশ্লিষ্ট শিল্পক্ষেত্রও কারণ এখানকার শ্রমিকেরা ঘোরাফেরা করে এই ক্ষেত্রগুলির মধ্যেই। এমন আরও অনেক ক্ষেত্র আছে যেখানে নানা ধরণের স্বাস্থ্য সংকট নিরুচ্চারে বেড়ে চলেছে। টেঁকসই উন্নয়নের জন্য এই সব ক্ষেত্রেই নীতির প্রণয়ন ও প্রতিষ্ঠা আশু প্রয়োজন।


ঋণস্বীকারঃ

লেখাটিতে ব্যবহৃত মহেন্দ্রগড় সংক্রান্ত তথ্য নেওয়া হয়েছে লেখিকার এক ছাত্রের বায়ুদূষণ বিষয়ক গবেষণা থেকে। ছেলেটি ওই অঞ্চলেরই ভূমিপুত্র, তার আশেপাশে নিত্য ঘটে চলা এই সংকট তার মনে জাগিয়েছে খোঁজার তাগিদ। তারই কিছু এখানে আলোচনা করা হল।