আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্দশ সংখ্যা ● ১৬-৩১ জুলাই, ২০২৫ ● ১-১৫ শ্রাবণ, ১৪৩২
সমসাময়িক
ডবল ইঞ্জিন সরকার ও পরিকাঠামো ব্যবস্থা
আজকের শিল্প পরিষেবা নির্ভর অর্থনীতির মাপকাঠিতে দেশের অর্থব্যবস্থায় বিহার নয় বরং গুজরাট মডেলের কথাই বারবার উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যমের দৌলতে। কার্যত গত বর্ষায় টানা দুই সপ্তাহে এক ডজন সেতু বিপর্যয়ের রেকর্ড গড়েছিল দেশের ডবল ইঞ্জিন শাসিত রাজ্য বিহার। কিন্তু এবার সেই গুজরাতেই সম্প্রতি একের পর এক পরিকাঠামোর বিপর্যয় ঘটে চলেছে বিরামহীন গতিতে। সাম্প্রতিককালে গুজরাটের আনন্দ ও বরোদার মধ্যে সংযোগকারী রাজ্য সড়কের উপর কংক্রিটের সেতু মাহিনগর নদীর ওপর যানবাহন সহ ভেঙে পড়ায় প্রাণ হারিয়েছেন কুড়িজন মানুষ। মডেল রাজ্য গুজরাটেই গত চার বছরে ষোলোটি ছোট বড় সেতু বিপর্যয়ের ঘটনায় রাজ্যের পরিকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণের মান নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠে গেছে আজ। কার্যত এমন ধারাবাহিক সেতু বিপর্যয়গুলির চরিত্র বিশ্লেষণ করলে উঠে আসছে সেই রাজ্যের সরকারি পরিকল্পনার দৈন্য দশা। দেশে আজকের রেকর্ড গড়া তিন বারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গুজরাতের চার বারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে যে উন্নয়নের রোড ম্যাপ রচনা করেছিলেন সেটাও যে ত্রুটিমুক্ত ছিল না, এখন সেটা স্পষ্ট হচ্ছে, রাজ্যের সরকারি ব্যবস্থাপনার অসংখ্য ছিদ্রপথ প্রকাশ্যে বেরিয়ে আসায়।
সন্দেহ নেই যে উন্নত যোগাযোগ ও নিরাপদ পরিবহন পরিকাঠামো গড়ে তোলার প্রাথমিক দায় দেশের কিংবা রাজ্যের সরকারেরই। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে এদেশে সড়ক-সেতু-বিমানবন্দর কিংবা রেলস্টেশনের মতো পরিবহন পরিকাঠামো গড়ার ক্ষেত্রে সরকার যতটা আগ্রহী সেগুলি রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে সেই আগ্রহের ভগ্নাংশেরও দেখা মেলে না। কারণ নতুন প্রকল্পের ক্ষেত্রে যে বিজ্ঞাপনী মূল্য থাকে ভোটবাক্সের নিরিখে, তেমনটা নজর কাড়ে না প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণের মান আমজনতার চোখে। কারণ এদেশে পরিকাঠামোর অব্যবস্থা কিংবা দুরবস্থা ক্রমশ গা সওয়া হয়ে গেছে মানুষের। ফলে যতক্ষণ পর্যন্ত না কোনো গুরুত্বপূর্ণ একটা বড় দুর্ঘটনা কিংবা বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে সেই পরিকাঠামো ততক্ষণ সেটা ইস্যু হয়না মানুষের জীবনে। ফলে কিছু প্রসাধনী সংস্কার ব্যতিরেকে পরিকাঠামোর মৌলিক সুরক্ষার উপরে তেমন জোর পড়ে না প্রশাসনিক পরিকল্পনায়। অথচ সেতু থেকে সড়ক, অরক্ষিত অবস্থায় দিনের পর দিন ব্যবহৃত হতে থাকে। আর সকলের চোখের অলক্ষে সেই কাঠামোর ভেতরে বাড়তে থাকে নানা ধরনের রোগ ব্যাধির বিপদ! যার অন্তিম পরিণতি হয় দুর্ঘটনার কবলে সেতু বিপর্যয়। ঘটে বহু মানুষের প্রাণহানি। মেয়াদের আগেই ভেঙে পড়া সেতু বিপর্যয়ের কারণে ঘটে সরকারি অর্থের প্রবল অপচয়। আর এসব জেনেও যখন প্রশাসন নির্বিকার নিষ্ক্রিয় থাকে তখন সেই সরকারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং দূরদর্শিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে বৈকি।
সম্প্রতি গুজরাতের ভেঙে পড়া সেতুটি মাত্র চল্লিশ বছর আগে তৈরি হলেও মূলত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেই ভেঙে পড়েছে এমনটাই প্রাথমিক তদন্তে অনুমান। কয়েক বছর আগেও সে রাজ্যে এক উৎসবের আবহে 'মোরবি'-তে ইস্পাতের এক ঝুলন্ত সেতু ভেঙে নিহত হয়েছিলেন প্রায় ১৪১ জন মানুষ। সেবার ব্রিটিশ আমলে তৈরি দুর্বল ইস্পাতের সেতু মেরামতির অব্যবহিত পরেই ঘটেছিল সেই দুর্ঘটনা। ফলে সেই সেতুর মেরামতির মান নিয়ে সেবার প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু এবার 'মাহিসাগর' সেতুর ভরা যৌবনে মৃত্যু বুঝিয়ে দিয়েছে সেতু স্বাস্থ্যের বেহাল দশা।
দেশের নিয়ম অনুযায়ী এমন রাজ্য কিংবা জাতীয় সড়কের ওপর অবস্থিত সেতুগুলির নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা জরুরী। দেশজুড়ে সরকারি স্তরে গোছা গোছা নির্দেশনামা প্রকাশিত হলেও বাস্তবে কাজের কাজ হচ্ছে না। ফলে 'নামকাওয়াস্তে' নমো নমো করে কিছু পরীক্ষা কখনও কখনও বিচ্ছিন্নভাবে হলেও নিয়মিত প্রযুক্তি নির্ভর উপায়ে সেতুর ভারবাহন ক্ষমতার যাচাই হয় না। এই ব্যাধি কেবল গুজরাট নয়, বরং দেশের রাজ্যে রাজ্যে কম বেশি সংক্রামিত হয়েছে সরকারি ব্যবস্থায়। ফলে ডবল ইঞ্জিন সরকারের শ্রেষ্ঠ মডেল রাজ্যে পরিকাঠামোর সুরক্ষার এমন বেহাল অবস্থা হলে দেশের অন্যত্র পরিস্থিতি যে যথেষ্টই উদ্বেগের সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কার্যত দেশের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের সরকারগুলির সেতু থেকে শুরু করে নদীবাঁধ কিংবা সড়ক থেকে নিকাশি অথবা দূষণ নিয়ন্ত্রণ থেকে বজ্র নিষ্কাশন এমন প্রতিটি জরুরী পরিকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণে সরকারি বাজেটের করুণ বরাদ্দ দেখলেই বোঝা যাবে কতটা অরক্ষিত দেশের মানুষের জীবন!
গত চার বছরে ষোলোটি সেতু বিপর্যয়ের ঘটনা গুজরাটে ঘটলেও সে রাজ্যের প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে সেগুলির যথাযথ তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে। ফলে নির্মাণকারী সংস্থার সাথে শাসকদল এবং প্রশাসনের যোগসাজশে এমন সেতু বিপর্যয়ে অভিযুক্তরা জামার 'কলার' তুলে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে রাজপথে। ফলে নির্মাণকারী সংস্থাগুলির মধ্যেও এক ধরনের বেপরোয়া মনোভাব তৈরি হয়ে চলেছে। এদের সিংহভাগ আবার নির্বাচনী বন্ডে শাসকদলের ভাঁড়ারে দানধ্যান করে নিজের নিজের অবস্থান সুরক্ষিত রেখেছে সরকারের খাতায়। এমনকি সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাগ্রস্ত সেতুর নির্মাণকারী সংস্থা ২০১৯ সালে গুজরাটে কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার পরেও ভুরিভুরি কাজ করে চলেছে সে রাজ্যেই! ফলে এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট ডবল ইঞ্জিন শাসিত রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার হাল 'বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো'র মতোই! সরকার তদন্ত কমিটি গড়ে ব্যর্থতার দায় ঝেড়ে ফেলছে। ফলে আমেদাবাদ থেকে আনন্দ 'ড্রিমলাইনার' থেকে সেতু কাঠামো সবই ভেঙে পড়ছে তাসের ঘরের মতো সরকারি অব্যাবস্থার কারণে। দুশ্চিন্তা সেখানেই।