আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্দশ সংখ্যা ● ১৬-৩১ জুলাই, ২০২৫ ● ১-১৫ শ্রাবণ, ১৪৩২

সমসাময়িক

আসামের ধর্ম-ভাষা ভিত্তিক বিভাজন


আসাম সরকার একটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র সংস্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। ৩৪০০ মেগাওয়াট নিহিত উৎপাদন ক্ষমতার প্রস্তাবিত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ধুবরি অথবা গোয়ালপাড়া জেলায় গড়ে তোলা হবে। রাজ্য সরকার নয়, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি আদানি শিল্পগোষ্ঠী গড়ে তুলবে। গত এপ্রিল মাসে আদানি গোষ্ঠীর প্রতিনিধি প্রকল্পের জমি দেখে যাওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী সরকারি ভাবে প্রস্তাবিত প্রকল্প সম্পর্কে ঘোষণা করেন। বিবৃতিতে তিনি আরও জানান যে ওই একই এলাকায় একটি বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পও স্থাপন করা হবে।

ধুবরি, গোয়ালপাড়া, লখিমপুর, নলবাড়ি জেলায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার পরিবারকে বাস্তুচ্যুত করে প্রস্তাবিত প্রকল্পের জমি সংগ্ৰহ করার জন্য জুলাই মাসের প্রথম ১২ দিনেই পাঁচ দফায় উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে প্রায় দেড় হাজার একর জমি দখল করেছে আসাম সরকার। তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পটি প্রথমে কোকরাঝারে স্থাপনের কথা থাকলেও স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে তা ধুবরিতে সরিয়ে আনা হয়।

উচ্ছেদের নোটিশ ১৮৮৬ সালের আসাম ল্যান্ড অ্যান্ড রেভিনিউ রেগুলেশনের অধীনে জারি করা হয়। পরিবারপিছু ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ এবং ব্রহ্মপুত্রের চরাঞ্চলে পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যেখানে নেই জল, রাস্তা, স্বাস্থ্য বা শিক্ষার পরিকাঠামো। এবং ব্রহ্মপুত্রর এই চরাঞ্চল বার্ষিক বন্যায় ভেসে যায়। শতাধিক পরিবার হাইকোর্টে মামলা করেছে। শুনানি ২২ জুলাই। তার আগেই উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে জমি দখল করে নেওয়া হচ্ছে। ২৪ জুন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সফরের পর উচ্ছেদ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। তিন হাজারেরও বেশি পুলিশ মোতায়েন করে ১০০-রও বেশি বুলডোজার দিয়ে অভিযান চলছে। সফল উচ্ছেদ অভিযানের পর মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, এরা এক বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ এবং বিভিন্ন সময় অবৈধভাবে ভারতে ঢুকেছেন। তাঁর মতে রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে এঁরা খুব সাবধানে কিছু কিছু এলাকায় স্থানান্তরিত হয়। যেসব এলাকায় সরকারের জমি রয়েছে সেখানে হঠাৎ করেই এঁদের জনসংখ্যা বেড়ে যায়। রাজ্য সরকার রাজ্যের জমি এবং আদি বাসিন্দাদের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে আপস করতে রাজি নয়। ফলে এসব উচ্ছেদ অভিযান অনিবার্য। তাঁর বোধ হয় জানা নেই যে গারো পাহাড়ের অপরদিকের প্রতিবেশী ময়মনসিংহ (এখন বাংলাদেশ) জেলার কৃষিজীবী মানুষকে চাষাবাদের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৮৭৪ থেকে এখানে নিয়ে আসতে শুরু করে। পাহাড় ডিঙিয়ে আসা কৃষিজীবী মানুষ স্থানীয় গারো জনজাতির কাছ থেকে জমি কিনে শুরু করে চাষাবাদ। সেই কারণেই আসামের জমি হস্তান্তর সংক্রান্ত আইনটি ১৮৮৬-তে প্রণয়ন করা হয় যার আইনী নাম ‘আসাম ল্যান্ড অ্যান্ড রেভিনিউ রেগুলেশন’।

উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর অধিকাংশই বাংলা ভাষাভাষী মুসলমান সম্প্রদায়ের। তারা মূলত বন্যা এবং নদীভাঙনের শিকার। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তাঁরা এই এলাকায় বসবাস করছেন। আদতে তাঁরা ব্রহ্মপুত্রের আশেপাশে থাকতেন এবং প্রতিবছর বন্যায় সর্বস্বান্ত হওয়া ছিল দস্তুর। অনেকের ঘরবাড়ি নদীতে তলিয়ে গেছে। তাঁদের দেখার কেউ ছিল না, নিজেরাই প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে রয়েছেন। এবার হঠাৎ করে সরকার ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়ার পর, কোথায় যাবেন তাঁরা?

মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন যে এই জমি অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের থেকে উদ্ধার করে স্থানীয় খিলঞ্জিয়াদের জন্য ব্যবহার করা হবে। খিলঞ্জিয়া মানে আদি বাসিন্দা। তাঁর মতে যারা বাধা দিচ্ছে, তারা একটি নির্দিষ্ট (ধর্মীয়) সম্প্রদায়ের জন্য কাজ করছে। অর্থাৎ সেই মেরুকরণ। ধর্মীয় বিভাজন।

প্রকৃত অর্থে আসামের মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যবাসীর বিরুদ্ধে এমন একটা তরবারি নিয়ে যুদ্ধে নেমেছেন যার দু’ দিকেই শান রয়েছে। অর্থাৎ দু’দিক থেকেই কোপানো যায়। নাগরিকত্ব প্রমাণের অছিলায় বহু নাগরিককে আগেই ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। এখন শুরু হয়েছে ধর্মভিত্তিক বিভাজন। সরকারি ক্ষমতার দাপটে হাজার হাজার মানুষ আজ বাস্তুহারা। বাসিন্দাদের চোখের সামনে বুলডোজার, জেসিবি ইত্যাদি দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে কৃষিজীবী মানুষের ঘর-সংসার। প্রবল বর্ষণে বিধ্বস্ত মানুষগুলি রাস্তার পাশে ত্রিপল টাঙিয়ে কোনওরকমে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েও শান্তি নেই। ক্ষমতা প্রদর্শন করে রাষ্ট্রের রক্ষীবাহিনী সেই ছাউনিও ভেঙে দিয়েছে। ধর্মীয় মেরুকরণের চূড়ান্ত নিদর্শন।

পাশাপাশি শুরু হয়েছে বাংলাভাষী নাগরিকদের উপর আক্রমণ। রাজ্যের বাংলাভাষী মানুষের বিরুদ্ধে ‘বাংলাদেশি’ পরিচয় দিয়ে উচ্ছেদের ঘটনায় রাজ্যজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে বরাক উপত্যকার বাঙালি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে। বোঝা যাচ্ছে যে আসাম বিধানসভার আসন্ন নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে রাজ্য সরকার নতুন খেলা শুরু করেছে। এখন তারা যুগ যুগ ধরে আসামের মাটিতে বসবাস করে আসা বাংলাভাষীদের বাংলাদেশি তকমা লাগিয়ে উচ্ছেদের খেলায় মেতেছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক এক মন্তব্যে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। তিনি বলেছেন, আগামী জনশুমারিতে কেউ মাতৃভাষা হিসেবে বাংলা উল্লেখ করলে তাঁকে ‘বিদেশি’ বলে চিহ্নিত করা হবে। অর্থাৎ ভাষাগত বিভাজন শুরু হয়েছে।

প্রসঙ্গত, বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি, কাছাড় ও হোজাই জেলার পাশাপাশি ধুবরি ও গোয়ালপাড়ায়ও বহুদিন ধরে বাঙালি বসতির অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। বরাক উপত্যকার জেলাগুলোতে বাংলা ভাষাকে সরকারি কাজে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহারের নির্দেশ দিতে বাধ্য হয়েছিল আসাম সরকার। বরাক উপত্যকার ৮০ শতাংশ মানুষ বাংলায় কথা বলেন। এই বরাক উপত্যকাতেই বাংলা ভাষার দাবিতে ১৯৬১ সালের ১৯ মে বাংলাদেশের বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের ধাঁচে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন হয়েছিল। সেই আন্দোলনে শিলচর স্টেশনে ১১ আন্দোলনকারী পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন। এ আন্দোলনের জেরে আসামের বরাক উপত্যকার জেলাগুলোতে সরকারি কাজে বাংলা ভাষাকে রাজ্য ভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

এই কঠিন পরিস্থিতিতে রাজ্যের বিরোধী দলগুলির সক্রিয় প্রতিবাদ আন্দোলন সংগঠিত করায় কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। কংগ্রেস এবং বামপন্থী দলগুলি নিজের নিজের সাংগঠনিক শক্তি অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবাদ আন্দোলন শুরু করেছে। উচ্ছেদের প্রতিবাদে ১৬ জুলাই বিভিন্ন দলের কর্মীরা দিল্লির যন্তরমন্তরে এক অবস্থান ধর্মঘটে বসছেন। সেখানে আসামের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে আসামের উচ্ছেদ অভিযান বন্ধের দাবি তুলে ধরা হবে। ১৭ জুলাই দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে এক সুধী সমাবেশ ডেকে আসামের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এর নিরসনের আবেদন জানানো হবে।

ধর্মীয় মেরুকরণের বিরুদ্ধে অনেক বাংলাভাষী মানুষ আজ মৌন থাকাকেই শ্রেয় বলে বিবেচনা করছেন। অদূর ভবিষ্যতে তাঁদেরও বিদেশি আখ্যা দিয়ে যখন আক্রমণ করা হবে তখন বোঝা যাবে আসামের বর্তমান সরকার সত্যি সত্যিই দু’ ধারে শান দেওয়া এক তরবারি নিয়ে ধর্মীয় ও ভাষাগত আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। বিচ্ছিন্নভাবে নয় সমস্ত ধর্মনিরপেক্ষ-গণতান্ত্রিক ও শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের সংঘবদ্ধ প্রতিবাদ এই ভয়ঙ্কর বিপদ প্রতিহত করতে পারে। সময়ের দাবি মেনে নিয়ে সে পথে অগ্রসর হওয়া ছাড়া আর কোনো পন্থা নেই।