আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ ত্রয়োদশ সংখ্যা ● ১-১৫ জুলাই, ২০২৫ ● ১৬-৩২ আষাঢ়, ১৪৩২

প্রবন্ধ

লিঙ্গ অসমতা, লিঙ্গ সত্তা ও যৌন স্বাধীনতা

শ্রীদীপ ভট্টাচার্য


লিঙ্গ ভিত্তিক বৈষম্য শারীরিক হলেও, সেই শারীরিক বৈষম্যকে সামাজিক অসমতায় পরিণত করার কাজটি করে থাকে বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান। পরিবার, পাড়া, স্কুল, গণমাধ্যম আমাদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয় এবং শেখায় - নারী পুরুষের বিভেদ ও ব্যবধান। কে কী পরবে? কে কী ভাবে হাঁটবে, বসবে, চাইবে? কার কী সামাজিক ভূমিকা? কে রোজগার করবে আর কে রাঁধবে? কে রাষ্ট্র চালনা করবে আর কে গৃহকাজ - সেসব নির্দিষ্ট হয় সামাজিক রীতি রেওয়াজের দ্বারা। আলাদা পোশাক, আলাদা নাম-ডাক, আলাদা কাজ, ভিন্ন গতিবিধি, পৃথক ভঙ্গিমার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে নারী ও পুরুষ সত্তা - যা সামাজিক বিধিনিষেধ দ্বারা নির্মিত ও নিয়ন্ত্রিত। আমরা নারী বা পুরুষ হয়ে উঠি ক্রমে ক্রমে। আমরা মেনে নিই বা আমাদের মানতে শেখানো হয় যে নারী-পুরুষ মানসিকতা, অভিব্যক্তি, ভূমিকা, কর্মক্ষেত্র, অধিকার, সংবেদনশীলতা - সবই আলাদা। যা পুরুষোচিত তা নারীচিত নয়।

এই হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি মোটেও প্রাকৃতিক নয়। ‘নারী’ বা ‘পুরুষ’ হয়ে ওঠার মূলে রয়েছে যথেচ্ছ অসমতা যার ভিত্তিঃ পুরুষতান্ত্রিক স্বার্থ, শক্তি ও ক্ষমতা বজায় রাখার প্রয়াস। আছে নির্মম শাসন ও শাস্তি। পুরুষতন্ত্রের শর্ত মেনে ঠিক হয় নারী ও পুরুষের পরিধি-বন্টন। নারী আর পুরুষ - কে কী করবে, কে কী পাবে, কার কী দাবি - ঐতিহাসিকভাবে তার বিধান রচনা করেছে পুরুষ। তাই নারী আর পুরুষের ভূমিকা, ভঙ্গিমা, স্বাধীনতার পরিমাণ ও অধিকারের মাপকাঠি আলাদা। বলিষ্ঠতা, করুণা, নমতীয়তা, আবেগ, দমন, দাপট - এ সকলের লিঙ্গ না থাকলেও পুরুষতন্ত্র ঠিক করে দেয় কতটা বল প্রয়োগ করতে পারলে তা পুরুষজাতীয় আর কতটা সহনশীল হতে হবে নারীকে। পুরুষের পরিচর্যা করে, তার তন্ত্রের নিয়মাবলী মেনে, প্রশংসা বা স্বীকৃতির প্রত্যাশা না রেখে, নির্যাতন সহ্য করে - নারী হয়ে উঠবে পরম দয়াময়ী। আবার পুরুষেরই প্রয়োজনে, নারী হবে তার লালসার ভোগ্য-পণ্য। এমনই অসম, অথচ স্বাভাবিক এ বিধান।

বিচরণের স্বাধীনতা, পোশাকের দৈর্ঘ্য, ভদ্র-অভদ্রের বিভাজন, সভ্য-অসভ্যের সংজ্ঞা, ঘর আর বাহিরের নির্দিষ্ট গণ্ডি - সকলই পুরুষের তন্ত্র মেনে। কে সুশীলা আর কে সস্তা তা নির্ধারণ করে পুরুষের তন্ত্র। নারীকে তর্ক করা থেকে বিরত রেখে, চোখ বা কণ্ঠ তুলতে না দিয়ে - পরম্পরার পাঠ পড়ায় পুরুষ। নারীর অসময়ে বাড়ি থেকে বেরোনো বারণ আর বেরোলেই বিপদ - পুরুষের হাতে হেনস্থা হয়ে, অপবাদ ও উচিৎ শিক্ষা পাওয়ার ভয়। শালীনতার স্বার্থে, তার অঙ্গ সামান্য অধিক উন্মোচিত হলেই ইজ্জত যাওয়ার ভয়। এই খেলাটা আসলে ক্ষমতার। উদ্দেশ্য একটাই - সম্ভ্রমের ধারক ও বাহক বানিয়ে, রীতির বোঝা নারীর ঘাড়ে চাপিয়ে, তার ওপর নিয়ন্ত্রণ অটুট রাখা। নারীকে পুরুষের প্রয়োজনে, নিজের কামনা ও আকাঙ্ক্ষা জলাঞ্জলি দিয়ে নিজের মাহাত্ম প্রমাণ করতে হবে। তবেই সে পুরুষের চোখে হয়ে উঠবে আদর্শ নারী। আর আদর্শ পুরুষ হবে তার অভিভাবক, রক্ষক, প্রতিপালক। নারীর শরীর, সামর্থ, শখ, স্বপ্ন - পুরুষের ইচ্ছে মতো না হলেই দ্বন্দ্ব।

সমাজ আমাদের শেখায় এই লিঙ্গ অসমতা অহরহ মেনে নিতে; মনে গেঁথে নিতে ও তার বিস্তার ঘটাতে। সামাজিকরণের মাধ্যমে এই অসমতার স্বাভাবিকরণ হয়। কর্তৃত্ব ও বশ্যতাকে আমাদের স্বাভাবিক মনে হয়। বিলীন হয় প্রতিরোধের সম্ভাবনা। অপ্রয়োজনীয় মনে হয় পরিত্রাণের পথ খোঁজা। কায়েম থাকে পুরুষের বিধান। এই আরোপিত ব্যবস্থা থেকে মুক্তির পথ কী? লিঙ্গের এই লাঞ্ছনা মেটাতে কুইয়ার-তত্ত্ব বাতলাচ্ছে মুক্তির পথ। পুরুষের আরোপিত এই অসমতার হাত থেকে মুক্তি পেতে হলেঃ লিঙ্গ সত্তাকে অস্বীকার করো। লিঙ্গকে উলঙ্ঘন ও অতিক্রম করো। অতিক্রম করার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। নানাবিধ লিঙ্গভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা উল্লঙ্ঘন করে পুরুষতন্ত্রের কাঠামোকে আঘাত করা সম্ভব। সমকামী, উভয়কামী, রূপান্তরকামী ও বিকল্প-যৌনতা-মনস্ক নানা ধারায় বইবে পরাভূত কামনা বাসনা যা আরোপিত লিঙ্গ অসমতা থেকে সমাজকে মুক্ত করবে।

পুরুষতন্ত্রের বিপক্ষে বহু তর্ক সাজালেও আর পাঁচটা ক্ষমতাশালী শক্তি-প্রবাহের মতো - পুরুষতন্ত্রের সামাজিক বৈধতা ও মান্যতা অনস্বীকার্য। অসম সমস্ত প্রবাহের সমালোচনা ও প্রতিরোধ প্রয়োজন। কিন্তু সেই প্রতিরোধের জন্য নিজ লিঙ্গ-সত্তা বিসর্জন দেওয়া কতটা প্রয়োজনীয়? যৌনতার অবস্থান কখনই ক্ষমতার প্রেক্ষাপট ও কক্ষপথের বাইরে নয় - সমকামী, উভয়কামী, বিকল্পকামী নির্বিশেষে। লিঙ্গসত্তা অগ্রাহ্য করলেই পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিপাত যাবে ও সমতার বিপ্লব আসবে এমন স্বপ্ন অলীক। স্বাভাবিক-কে প্রশ্ন করা, বা তাকে অস্বীকার বা অমান্য করাটা ব্যক্তিগত পছন্দের নজির হলেও, তা মুক্তির তাৎক্ষণিক ফর্মুলা বা লিঙ্গ-প্রগতিশীলতার একমাত্র সার্বজনীন মানদণ্ড হতে পারে না। মানুষের সুখ যেখানে, সেখানে সে অর্থ ও তৃপ্তি খুঁজে পায়। তার জন্য পরাভূত হওয়া বা লিঙ্গের দ্বৈত সত্তাকে দায়ী করা বাধ্যতামূলক নয়। নিজের লিঙ্গ সত্তা বিসর্জন না দিয়েও লিঙ্গ অসমতার প্রতিবাদে যথেচ্ছ মুখরিত হওয়া যায়।

জুডিথ বাটলার তাঁর লিঙ্গ সমস্যা বিষয়ক বইতে লিঙ্গের অদম্য দ্বৈত সত্তাকে বর্জন করে, তরল ও বৈচিত্রময় লিঙ্গ সত্তা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। যৌনতাত্ত্বিক পল প্রেসিয়াদো সে আহ্বানকে নিয়ে গেছেন আরেক কল্পরাজ্যের মার্গে। তাঁর বই 'বিরুদ্ধ-যৌন ইস্তেহার'-এ তিনি চাইছেন এক যৌনাঙ্গ-উত্তর (পোস্ট জেনিটাল) পৃথিবীর হদিশ। লিঙ্গের দ্বৈততা উল্লঙ্ঘন করতে এবং লিঙ্গ-অস্বীকার ক্রিয়ায় তিনি চাইছেনঃ ডিলডোর ব্যবহার (ডিলডোট্রনিক্স)। বোঝা দায়, যে কীভাবে পুঁজিবাদী একটি বিলাস-পণ্য লিঙ্গ অসমতা মিটিয়ে মুক্তির চাবিকাঠি হতে পারে? এও বোঝা দায় যে কিছু শ্বেতাঙ্গ প্রাধিকারপ্রাপ্ত মানুষজন কেন আপনার বা আমার ব্যক্তিগত যৌন তৃপ্তি বা মুক্তির ইস্তেহার লিখবেন? কে দিয়েছে তাদের সেই অধিকার? নাকি, সাড়ে তিনশো বছর ধরে সাদা মানুষের, অন্য মানুষের জন্য সভ্যতা-সাধনের প্রবণতার দীর্ঘ তালিকায় - এটি আরও এক সংযোজন?

কার যৌন স্বাধীনতা কে কোথায় কীভাবে খুঁজবে ও লাভ করবে সেটা ব্যক্তির ওপর ছেড়ে দিলেই তা প্রকৃত অর্থে বৈচিত্রময়। পুরুষতন্ত্রের সমালোচনা করার জন্য নারীবাদী সংবেদনশীলতাই যথেষ্ট তার জন্য লিঙ্গসত্তা পরিত্যাগের প্রয়োজন আছে কি? আমার মনে হতেই পারে লিঙ্গ অসমতার মূলেঃ একগামিতার গতানুগতিকতা ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকারবোধ। আমি আমার লিঙ্গসত্তার যথেচ্ছ উদযাপন করেও পুরুষতন্ত্রের উৎপীড়ণ ও শোষণের প্রতিরোধে সামিল হতে পারি। আমি আমার জীবন, আমার যৌনতা ও আমার প্রতিবাদের ভাষা - সমকামিতায় খুঁজব, না বিপরীতকামীতায়, না বহুগামিতায়, না বিচ্ছিন্নতাবাদী বন্ধনহীন বাউন্ডুলে ঘনিষ্টতায়, না অন্য কোনো যৌন দুঃসাহসিকতায় - সেটা কোনো ডিসকোর্স ঠিক করে দিতে পারে না।