আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ ত্রয়োদশ সংখ্যা ● ১-১৫ জুলাই, ২০২৫ ● ১৬-৩২ আষাঢ়, ১৪৩২

প্রবন্ধ

লিপি ও লিখন

স্বপন ভট্টাচার্য


অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ যে ব্যাপারে মোটের উপর সহমত তা হল এই যে, হিসেব রাখার প্রয়োজনীয়তা থেকেই লিখনের উদ্ভব ঘটেছিল। সম্ভবত মেসোপটেমিয়াতে খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দে সুমেরীয় বণিকদের বাণিজ্য ও বিনিময় যে স্তরে পৌঁছেছিল তাতে হিসেব-পত্তর কেবল স্মৃতিতে রেখে কাজ চালানোটা অসম্ভব হয়ে পড়ছিল। বাণিজ্যের চুক্তি, শর্ত, হিসেব সবই স্থায়ীভাবে কোথাও একটা ধরে রাখার তাগিদ সভ্যতার এই আদি দোলনাঘরে বড়ো হয়ে দেখা দিল। কেউ কেউ বলেছেন অনামী কোনো ইতিহাসবিস্মৃত মানুষের হাতে উরুক (Uruk, বাইবেল বর্ণিত Erech) শহরে খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩০০ নাগাদ লিখনের উদ্ভব ঘটেছিল। হয়ত একা কেউ নয়, একদল সমভাবনার মানুষের কাজ হয়ে থাকবে সেটা। কেউ কেউ আকস্মিক আবিষ্কারের তত্ত্বে বিশ্বাসী তো কেউ কেউ বলেছেন লিখন একটা দীর্ঘদিনের ভাবনার ফসল। মধ্যপ্রাচ্যের নানা খননকার্য থেকে পাওয়া মাটির ফলকে উৎকীর্ণ নানা সংকেতের হদিশ আগেই মিলেছিল। ত্রিমাত্রিক সেই খোদাইয়ের একটা দ্বিমাত্রিক প্রতিস্থাপনের ভাবনা থেকেই এসেছিল মানুষের লিখন ভাবনা যাকে আদিলিখন বা প্রোটো-রাইটিং বলা যেতে পারে। নানা দেশে প্রাপ্ত আদি গ্রাফিতিতে এমন প্রোটো রাইটিং-এর অনেক নজির আছে। ফ্রান্স থেকে পাওয়া একটা তুষার যুগের গ্রাফিতিতে দেখা যায় হাতের ছাপ আর সেটাকে ঘিরে থাকা অনেকগুলো লাল রঙের বিন্দু। অর্থাৎ কেউ জানাতে চেয়েছে - আমি এখানে এসেছিলাম, আমার সঙ্গে থাকা পশুদের নিয়ে। এই যে দেওয়ালের গায়ে আঁকা চিহ্ন বা মাটির ফলকে উৎকীর্ণ সংকেত বা ইনকাদের কিপাস (Quipus) যেগুলো রজ্জুর গায়ে নানারকম হিসেব-তারতম্য নির্দেশক গিঁটের সমাহার - এগুলোর সঙ্গে হাইওয়ে সংকেত, গানের নোটেশন বা গাণিতিক সংকেত বা কম্পিউটার আইকনগুলোর অন্তত বার্তাবহ হিসেবে ততটা পার্থক্য নেই। প্রোটো-রাইটিং এই বার্তাবহ হয়ে ওঠার কাজে কথার ভূমিকা নিয়েছিল। ডি. ফ্রান্সিস [১] যাকে বলেছেন ভিসিবল স্পিচ বা দৃশ্যকথা।

লিখনরীতির বিবর্তন ও বিকাশ

প্রোটো-রাইটিং বা দৃশ্যকথার সীমাবদ্ধতা ছিল। হতে পারে এক ধরনের বিশেষ সংযোগ মাধ্যম, কিন্তু ভাবনাকে পুরোপুরি প্রকাশের ক্ষমতা তার ছিল না, অথচ তাগিদটা ছিল। যেটা কথা পারে, সংকেত সেটা পারে সামান্যই, সুতরাং সংকেতকে কথ্যভাষার সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে যুক্ত করার প্রয়োজন দেখা দিল। ভাবনা ও শব্দ হল যে কোনো ভাষার দুটি অঙ্গাঙ্গী উপাদান। সুইস ভাষাতত্ত্ববিদ ফেরদিন্য দ সস্যুর [২] (Ferdinand De Saussure)-এর কথায় ভাষা হল কাগজের একটা পৃষ্ঠার মতো, যার একপিঠে রয়েছে ভাবনা আর অন্যপিঠে রয়েছে শব্দ। এই দুটো পিঠকে বা তলকে যেমন কাগজটা অক্ষত রেখে আলাদা করা যায় না তেমনই ভাবনা থেকে শব্দকে আলাদা করা অসম্ভব। মিশর ও মেসোপটেমিয়া থেকে পাওয়া খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দের কিউনিফর্ম বা কীলকাকার সংকেতবাক্যই হয়ত ভাষাকে সংকেতের মাধ্যমে প্রকাশ করার বা শব্দকে দৃশ্যরূপ দেবার প্রথম প্রয়াস। মধ্যপ্রাচ্যের লিখন এই কিউনিফর্ম সংকেতরীতিকে প্রায় তিন হাজার বছর ধরে অনুসরণ করে এসেছে। কিন্তু এর সীমাবদ্ধতা ছিল একই সংকেতের বহু অর্থসাধক ব্যবহারে, 'রিবাস' বলা হয় যাকে। ভাষাবিজ্ঞানের 'রিবাস' তত্ত্বের প্রায়োগিক রূপ দেখা যায় সুমেরীয় ফলকগুলিতে। যেমন 'পূরণ করা' বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে খড় বা খাগড়া-র চিহ্ন এবং খাগড়ার জন্যও বলা বাহুল্য সেটাই। ধ্বনিগত সাযুজ্যই এর কারণ। ধ্বনিবিজ্ঞানের নিয়মে সুমেরীয় 'gi' পদটি ছিল উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। সুতরাং খাগড়ার সংকেত ঠিক কী বলতে চাইছে কোন ফলকে, তা একান্তভাবেই প্রসঙ্গনির্ভর। এরকম উদাহরণ অজস্র, কিন্তু এসব সীমাবদ্ধতা নিয়েই পিক্টোগ্রাম পৌছে গিয়েছিল সুমের থেকে মিশরে খ্রিষ্টপূর্ব ৩১০০ নাগাদ, সিন্ধু সভ্যতায় (খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০) এবং ক্রীটে (খ্রিষ্টপূর্ব ১৭৫০)। চিনে যে আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ নাগাদ এই সংকেতবাক্যের প্রচলন ছিল তা জানা যায় 'ওরাক্যাল বোন্‌স'-এ গ্রথিত কীলকাকার চিহ্ন নজরে আসার পর এবং মেক্সিকো থেকে পাওয়া আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৯০০ সালের 'ওলমেক স্ক্রিপ্ট'ও একই পরিযানের ইঙ্গিত দেয়।

দেখা যাচ্ছে এক সভ্যতা থেকে অন্য সভ্যতায় লিখনের ভাবনাটা পৌঁছতেই কয়েক শতাব্দী সময় লেগেছে। তাতে খুব অবাক হবার মতো কিছু নেই। যদি সদ্য অতীতে ছাপাখানা চীন থেকে ইউরোপে পৌঁছাতে ছ'শো বছর সময় লেগে যায় তাহলে মানবসভ্যতার ঊষাকালে সময় লাগাটা স্বাভাবিক বলেই মনে হতে পারে, তবে কিনা এসবই তো প্রাপ্ত প্রত্ন-উপাদানের উপর ভিত্তি করে নেওয়া আপেক্ষিক সিদ্ধান্ত। এমন অনেক মিসিং লিংক, অনেক অমীমাংসিত বিতর্ক এবং অনেক অপঠিত সংকেতলিপি এখনও রয়ে গেছে যে লিখনের পরিযান-ইতিহাস বা মাইগ্রেশন নিয়ে শেষ কথা বলার অবকাশই নেই বলা যায়। অনেকেই বিশ্বাস করেন বিভিন্ন সভ্যতায় লিখনের বিকাশ ঘটেছিল স্বাধীনভাবে স্বতন্ত্রভাবে। এমনকি একে অন্যের যথেষ্ট নিকটবর্তী সংস্কৃতিতেও এই স্বতন্ত্রতার অনেক নজির আছে। 'ল্যাঙ্গুয়েজ বরোয়িং' বা দেনা-করা-ভাষা স্থানিক নিকটাবর্তীতাকে অতিক্রম করে স্বাধীনভাবে বিকশিত হবার নজির তো চিন ও জাপানের লিখনরীতির ইতিহাস থেকেই প্রতীয়মান হয়। চীনের লিখনে ১,০০০-এর ওপর সংকেতের ব্যবহার জাপানের লিখনরীতিতে বিবর্তিত হয়ে দাঁড়ালো একশোর কাছাকাছি। এমনকি পৃথিবীতে মূল স্থলভূমি থেকে সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ইস্টার আইল্যান্ডে কিভাবে যে রোঙ্গোরোঙ্গো (Rongorongo) লিপির উদ্ভব ঘটেছিল তা জানা যায় নি, কেবল অনুমান করা যায় পলিনেশিয়া থেকে ভেসে পড়ার কালে আরও অনেক কিছুর মতো লিখনভাবনাও এরা সঙ্গে নিয়েছিল।

সব প্রোটো-রাইটিং যদি পড়ে ওঠা যেত অনুমানের গুরুত্ব কিছু কমত এবং সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে আসতে সুবিধে হতো। কিন্তু তা হয় নি এখনও। মিশরের চিত্রলিপি বা হিয়েরোগ্লিফ যেমন অবিতর্কিতভাবে পড়া সম্ভব, সিন্ধু সভ্যতার লিপিতে তা সম্ভব হয় নি, মায়া চিত্রলিপির ৮৫ শতাংশের অর্থোদ্ধার করা গেছে, কিন্তু বাকিটা ধোঁয়াশায় মোড়া। অবিতর্কিত অর্থে বোঝাতে চাইছি Random sample থেকে ভিন্ন ভিন্ন পাঠ যেখানে অর্থদ্বৈততা তৈরি করে না। মিশরের হিয়েরোগ্লিফ ১৮২০-তে পড়লেন শ্যাঁপোলিয়ঁ (Jean Francois Champollion), ১৮৫০-এ ব্যাবিলনের কিউনিফর্ম পাঠে সফল হলেন রলিনসন (Henri Creswicke Rawlinson), গ্রীসের ব্রোঞ্জ যুগের সভ্যতা মাইসেনিয়ার সংকেতলিপি লিনিয়ার-বি পাঠিত হয়েছে ১৯৫২-৫৩-তে মাইকেল ভেন্ট্রিস দ্বারা এবং ঐ পঞ্চাশের দশকেই ইউরি নোরোজভ ও অন্যান্যরা মায়ান হিয়েরোগ্লিফ-এর অর্থোদ্ধারে সফলকাম হলেন এবং এগুলোর কোনওটার ক্ষেত্রেই অর্থ-বিভিন্নতার অবকাশ তৈরি হয় নি। কিন্তু সিন্ধু লিপি বা ইটালির এট্রুস্কান লিপি বা ইরানের প্রোটো-এলামাইট, ইস্টারের রোঙ্গোরোঙ্গো, ক্রীটের লিনিয়ার-এ লিপি নিয়ে সে কথা বলা যায় না। ফলে এরা এখনও অপঠিত গোত্রভুক্ত। অপঠিত লিখনের তিনটে শ্রেণি আছে। প্রথম শ্রেণিতে পড়বে অচেনা লিপি চেনা ভাষায় ব্যবহৃত, মায়া বা জাটোপেক স্ক্রিপ্ট পঠিত হবার আগে পর্যন্ত এই শ্রেণিতে পড়ত কেননা এই ভাষাগুলিতে অল্পসংখ্যক হলেও এখনও কিছু মানুষ কথা বলে। দ্বিতীয়টি হল চেনা লিপি অজানা ভাষায় ব্যবহৃত যেমন, অপঠিত এট্রুস্কান ভাষা, যার লিপি গ্রীক বর্ণমালা অনুসারী অথচ ইন্দো-ইউরোপিয়ান গ্রুপের ভাষাই নাকি নয় এটা। তৃতীয়টি হল অচেনা লিপি, ভাষাও অচেনা। সিন্ধু-লিপির ক্ষেত্রে এটাই হয়েছে, লিপি ও ভাষা দুটোই মৃত এবং সমসাময়িক বা অন্য যুগের অন্য কোনো ভাষার সঙ্গে মিল নেই আমাদের এই আদিভাষাটির। অনেকেই মনে করেন এটা দক্ষিণ ভারতীয় দ্রাবিড়ীয় গোষ্ঠীর ভাষা, কিন্তু তেমন প্রকল্পের সমর্থনে জোরদার প্রমাণ নেই। সুতরাং লিপি সন্ধানে সূত্র অনেক, সংশয় অনেকতর।

লিখনরীতির শ্রেণিবিভাগ

প্রথমেই মেনে নেওয়া যাক, এমন কোনো লিখনরীতি নেই যা কথাকে শুধুমাত্র বর্ণমালায় ধরে রাখতে সক্ষম। কেন না লিখন হল বর্ণমালা, সংকেত, প্রতীক বা লোগোগ্রাম ইত্যাদি নানা কিছুর সমন্বয়। যেমন, ইংরাজি লিখনে ৫২টি বর্ণ (বড়ো ও ছোট হাতের মিলে) ছাড়াও রয়েছে যতিচিহ্ন, সংখ্যা এবং প্রতীক (logograms যেমন, @,$,%,&) ও গাণিতিক সংকেত। এদের বলা হয় অ্যানালফাবেট (analphabets)। কাজ চালাতে গেলে ইংরাজি ভাষাভাষী লোককে এমন অল্প কিছু সংকেত জানলেই চলে। জাপানী পাঠককে সে তুলনায় কম করেও ২,০০০ সংকেত জানতে হয় এবং উচ্চশিক্ষিত লোক ৫,০০০-এর মতো অ্যানালফাবেট যে জানবেন তা প্রত্যাশিত। ইংরাজি ভাষায় লিখনে বর্ণমালার সঙ্গে উচ্চারণের ফোনেটিক বা ধ্বনিগত সাযুজ্য অনেকটাই, ফলে লিখন থেকে উচ্চারণ বুঝতে অসুবিধা কম। তুলনায় চিনা বা জাপানী লিখনে বর্ণমালা সংকেতপ্রধান হবার দরুণ লিখনের থেকে উচ্চারণের ব্যবধান দুস্তর। বিশুদ্ধ লোগোগ্রাফি থেকে বিশুদ্ধ ফোনোগ্রাফির মধ্যে অনেকগুলি স্তর রয়েছে যার ভিত্তিতে অ্যান্ড্রু রবিনসন [৩] (১৯৯৫) লিখনরীতির একটা শ্রেণিবিভাগ করেছেন। নীচের ছবিটা থেকে তার একটা রূপরেখা যা আমরা বুঝে ওঠার চেষ্টা করতে পারি:

লোগোগ্রাফি থেকে ফোনোগ্রাফি।

বর্ণমালার গোড়ার কথা

অ্যালফাবেট কথাটার মধ্যেই রয়েছে গ্রীক প্রথম বর্ণদ্বয়ের জোড় - আলফা ও বিটা। বর্ণমালার উদ্ভবও সম্ভবত গ্রীসে। সম্ভবত বলছি এই কারণে যে বর্ণমালার উৎস নিয়ে মিথও কম নেই। কেউ কেউ বলেন হোমারের মহাকাব্যগুলিকে ধরে রাখার প্রয়াসে গ্রীকরা প্রথম বর্ণ সংস্থান করে থাকবে। আবার অনেকেই বিশ্বাস করেন বর্ণমালা মধ্যপ্রাচ্যে কোনো শিশুর মাথায় আসা আকস্মিক স্ট্রোক অফ জিনিয়াস। হয়ত সিরিয়ার রাস্তায় ধুলিতে বসে একটা সরকাঠি দিয়ে সে একটা সাদামাটা ঘর এঁকে তার ভাষায় উচ্চারণ করেছিল - বেথ (beth)। বর্ণমালায় তা হয়ে দাঁড়ালো - বেট (bet) এবং ক্রমে সেখান থেকে - b; এ প্রসঙ্গে রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর 'হাউ দি অ্যালফাবেট ওয়াজ মেড' নামের বিখ্যাত আখ্যানটির কথা স্মরণ করা যেতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যীয় উৎসের বিজ্ঞানসম্মত সমর্থন মিলেছিল সিনাই মরুতে প্রাপ্ত খ্রীস্টপূর্ব ১৫০০-এর একটা স্ফিংক্সের সামনের দুই থাবার মাঝখানে মেলা হিয়েরোগ্লিফ ও খোদিত ভাষ্যের সমন্বয়ে। ভাষ্য ছিল ৩০টি সংকেতের সমাহারে রচিত যেগুলোকে বলা হচ্ছে প্রোটো-সিনাইটিক সংকেত। অ্যালান গার্ডিনার [৪] এদের সঙ্গে মিশরীয় হিয়েরোগ্লিফের সাযুজ্য দেখাতে সক্ষম হন। তিনি দেখান যে এই সংকেতলিপির সঙ্গে হিব্রুর উচ্চারণগত মিল রয়েছে তবে হিব্রু বর্ণমালার গঠন সম্পূর্ণ অন্যরকম। অনুমান করা হয়, মোজেসের 'টেন কম্যান্ডমেন্টস্' এমন প্রোটো-সিনাইটিক বর্ণমালায় কোনো পাথরের গায়ে প্রথম খোদিত হয়েও থাকবে! পরবর্তীকালে নতুন নতুন প্রত্ন-নমুনা মিলতে থাকার পর প্রোটো-সিনাইটিক প্রকল্প ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে। খ্রীস্টপূর্ব সপ্তদশ বা ষোড়শ শতকে বর্ণমালা খোদিত ফলক মেলে ক্যানান ভূমি থেকে। ক্যানানরা ছিল মূলত বণিক। মিশর-আনাতোলিয়া-ব্যাবিলন-ক্রিটের বণিকদের যাতায়াত পথে ছিল এই 'ল্যান্ড অফ ক্যানানস' বর্তমানে যে ভূমিকে ইজরায়েল, ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক, জর্ডন, সিরিয়ার দক্ষিণভাগ এবং লেবাননের অংশবিশেষকে দিয়ে সনাক্ত করা যায়। এই আলাদা আলাদা সেমিটিক বা আফ্রো-এশীয় ভাষাভাষী মানুষের দেশে, বিশেষত বণিকদের মধ্যে, কিউনিফর্ম প্রোটো-রাইটিং-এর চল ছিল। এতগুলি ভিন্ন ভিন্ন সংকেতলিপি ক্যানান বণিকদের সম্যক জানা না থাকায় বাণিজ্যের প্রয়োজনেই তারা একটা সহজবোধ্য ও সহজে লেখার মত লিপি সংস্থান করে ফেলে এবং এভাবেই জন্ম নেয় প্রথম বর্ণমালা। এর পরে অবশ্য ডারনেল [৫] ওয়াদি-এল-হল থেকে খ্রীস্টপূর্ব ১৯ থেকে ১৮ শতকের লিখননমুনা সহ ফলকের সন্ধান পান।

ওয়াদি-এল-হল-এর আদি বর্ণমালা।

ওয়াদি-এল-হল বর্ণমালার পাঠ।

ক্রমশ চিত্রলিপির জায়গা নিয়ে নিল বর্ণমালা। গ্রীকদের মাধ্যমে অ্যালফাবেট ছড়িয়ে পড়ল রোম ও ইউরোপে। বিশ্বাস রয়েছে এমনটাই যে ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে তা পৌঁছে গিয়েছিল আরামাইক ভাষাভাষীদের হাত ধরে। আরামাইক হল একটি পূর্বকথিত সেমেটিক ভাষা যা সরকারি কাজে ও বানিজ্যে তিন হাজার বছর ধরে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। ঔপনিবেশিক বণিক-যাজকদের ভাষা দখলের যুদ্ধে ক্রমশ হেরে গিয়ে পিছু হঠতে হয়েছে আদি ভাষাসংস্কৃতিকে। চিন ও জাপান ছাড়া প্রায় সর্বত্রই লিখন বর্ণমালার দখলে চলে আসে। ২০ থেকে ৪০টি মূল সংকেত হল যে কোনো বর্ণমালার ভিত্তি। সর্বনিম্ন রয়েছে পাপুয়া নিউগিনির রোটোকাস স্ক্রিপ্টে - মাত্র ১২টি। সর্বোচ্চ ৭৪টি কম্বোডিয়ার খেমের ভাষায়। সংকেতজ্ঞাপক চিহ্ন (যেমন, কিউনিফর্ম) থেকে উচ্চারণজ্ঞাপক বর্ণমালায় উত্তরণ হঠাৎ করে হয়নি। বিবর্তনের মধ্যবর্তী ধাপগুলোর ইঙ্গিতবাহী প্রত্ন উপাদান পাওয়া গেছে নানা দেশেই। মেসোপটেমিয়া থেকে পাওয়া খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর কিউনিফর্ম নথিতে রয়েছে ২২টি আরামাইক অ্যালফাবেট। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের আগে পর্যন্ত কিউনিফর্ম বেঁচে ছিল বলেই মনে করা হয়। শেষ কিউনিফর্ম লিখন বলে যা শনাক্ত হয় তা ৭৫ খ্রিস্টাব্দের। মিশরে হিয়েরোগ্লিফ অচল হয়ে পড়ে কপটিক বর্ণমালার প্রভাবে। বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের যুগে খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীরা ব্যবহার করত এই স্ক্রিপ্ট। ২৪টি গ্রিক বর্ণ এবং ইজিপ্টের সনাতনী আদি ডিমোটিক লিপি থেকে ধার করা ৬খানি সংকেত - এই ছিল নব্য মিশরীয় কপটিক বর্ণমালা যা শেষ ব্যবহৃত হয় ৩৯৪ খ্রিস্টাব্দে। আরামাইক থেকে জন্ম নেয় আধুনিক আরবী লিখনরীতি। আধুনিক হিব্রুও (বর্গক্ষেত্রাকার হিব্রু) এসেছিল একই সূত্র থেকে। এ ছাড়াও হিব্রুর একটা প্রাচীন লিখনরীতি ছিল যা ফিনিসিয়ান (লেভান্ট ও তাঁর উপনিবেশগুলিতে ব্যবহৃত সরকারি ভাষা। সম্ভবত প্রথম রাষ্ট্রীয় ভাষা ছিল এই ফিনিশিয়ান।) উৎসজাত। দুটোই কেবল ব্যঞ্জনবর্ণ আশ্রিত, স্বরবর্ণ এখানে অনুপস্থিত। 'মাত্রেস লেকতিওনেস' (Matres Lectionis)-এর ব্যবহারে সে সমস্যা সমাধান করা হয়। ল্যাটিন এই শব্দবন্ধটির ইংরাজি অনুবাদ হল Mother of all readings - পঠনজননী। আসলে আর কিছু নয় তা, চিহ্ন। চিহ্ন বা বিন্দু ব্যঞ্জণবর্ণগুলির উপরে বা নীচে বসে ভাওয়েল পয়েন্ট বা স্বরবর্ণস্থলে। ফলে বর্ণমালা আধুনিক হলেও সম্পূর্ণভাবে লোগোগ্রাম বিবর্জিত থাকার অবকাশ রইল না। আজকের কম্পিউটারনির্ভর লিখনরীতিতে সংকেত বা চিহ্ন বর্ণমালার মতই গুরুত্বপূর্ণ। যন্ত্রে বাংলা লেখেন যিনি তিনি যদি তা কি-বোর্ডের সংকেত ব্যতিরেকে করতে চান, বলাই বাহুল্য, বর্ণমালা তাঁর সঙ্গ পরিহার করবে।


তথ্যসূত্রঃ

1) J. De Francis (1984). Visible Speech in The Chinese Language.
2) Ferdinand De Saussure (1983). Course in General Linguistics.
3) A. Robinson (2007). The Story of Writing.
4) J. Darnell Ed (2006). Two Early Alphabetic Inscriptions from Wadi el Hol.